বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের রাজনীতিতে একটি কমন এলিমেন্ট বা সাধারণ উপাদান হলো ‘ভারত’। এই দেশ দুটির রাজনৈতিক ময়দানে কোনো দল যদি প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে চায়, তবে সবচেয়ে সহজ এবং সস্তা অস্ত্রটি হলো তাকে ‘ভারতের দালাল’ হিসেবে আখ্যায়িত করা। অদ্ভুত বিষয় হলো, এই তকমা দেওয়ার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের প্রয়োজন হয় না; কেবল জনগনের ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী সেন্টিমেন্টকে উস্কে দেওয়াই যথেষ্ট। কিন্তু এই ‘ঘৃণার রাজনীতি’র আড়ালে যে বিশাল অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত ক্ষতি হচ্ছে, তা সাধারণ জনগন খুব কমই উপলব্ধি করতে পারে। এটি মূলত শাসকগোষ্ঠীর এক সুনিপুণ ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের রাজনীতিতে ভারতের দালাল থিওরির শুভঙ্করের ফাঁকি
১. পাকিস্তান ও ‘এগজিসটেনশিয়াল থ্রেট’ বা অস্তিত্বের সংকট থিওরি
পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই দেশটির সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে একটি ‘অস্তিত্বের সংকট’ বা ‘এগজিসটেনশিয়াল থ্রেট’ (Existential Threat)-এর তত্ত্ব ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। শাসকগোষ্ঠী, বিশেষ করে দেশটির শক্তিশালী সামরিক জান্তা, দশকের পর দশক ধরে জনগণকে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয়েছে যে প্রতিবেশী ভারত যেকোনো মুহূর্তে তাদের গিলে ফেলবে। এই কৃত্রিম ভয়ের সংস্কৃতিকে এমনভাবে জাতীয়তাবাদের অংশ বানিয়ে ফেলা হয়েছে যে, রাষ্ট্রকে রক্ষা করার নামে যেকোনো যৌক্তিক প্রশ্ন তোলাকে সেখানে এক প্রকার দেশদ্রোহিতা হিসেবে গণ্য করা হয়।
এই ভয়ের সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় এবং নির্মম প্রভাব পড়েছে দেশটির বাজেট বরাদ্দে। পাকিস্তান ঐতিহাসিকভাবে তার জিডিপির (GDP) একটি বিশাল অংশ—গড়ে ৩ থেকে ৪ শতাংশ, যা অনেক সময় তার চেয়েও বেশি—ব্যয় করে এসেছে সামরিক খাতে। এর বিপরীতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের মতো মৌলিক মানবাধিকারের জায়গাগুলোতে বরাদ্দ থাকে ১ থেকে ২ শতাংশেরও নিচে। ফলস্বরূপ, দেশটির পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র বা অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান থাকলেও, কোটি কোটি শিশু শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত এবং সাধারণ মানুষ ন্যূনতম চিকিৎসা সুবিধা পাওয়ার জন্য হাহাকার করছে।
আসলে এই ‘ভয়ের অর্থনীতি’ স্রেফ কোনো ভুল নীতি নয়, এটি একটি সচেতন রাজনৈতিক কৌশল। পাকিস্তানের জেনারেল এবং সুযোগসন্ধানী রাজনীতিবিদরা খুব ভালো করেই জানেন যে, ভারতের সাথে যদি বৈরিতা বা কাশ্মীর ইস্যুর স্থায়ী সমাধান হয়ে যায়, তবে সমাজে সামরিক বাহিনীর এই একচ্ছত্র আধিপত্য এবং আকাশচুম্বী বাজেটের কোনো যৌক্তিকতা থাকবে না। নিজেদের ক্ষমতা, প্রিভিলেজ এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা টিকিয়ে রাখতেই তারা প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে ভারত-বিদ্বেষের আগুনকে সবসময় জ্বালিয়ে রাখে, যাতে জনগণ নিজের পেটের ভাতের কথা ভুলে সীমান্তের ওপারে শত্রু খুঁজতে ব্যস্ত থাকে।
এই দীর্ঘমেয়াদী ভুল অগ্রাধিকারের চূড়ান্ত খেসারত পাকিস্তান আজ হাতেনাতে দিচ্ছে। দেশটি এখন ঋণের জালে জর্জরিত, মুদ্রাস্ফীতি আকাশচুম্বী এবং অর্থনীতি এক প্রকার পঙ্গু। গত ৭০ বছরে ভারত-বিদ্বেষী প্রোপাগান্ডা আর সামরিক প্রতিযোগিতায় যে বিপুল পরিমাণ অর্থ অন্ধের মতো ওড়ানো হয়েছে, তার অর্ধেকও যদি মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিল্পায়ন আর প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ করা হতো, তবে আজ পাকিস্তানের অবস্থান এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ ও সম্মানিত অর্থনীতির কাতারে থাকত। বন্দুকের নল নয়, বরং নাগরিকদের সচ্ছলতাই যে রাষ্ট্রের আসল নিরাপত্তা—এই সত্যটি বুঝতে না পারাই পাকিস্তানের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।
২. বাংলাদেশে ‘ভারতের দালাল’ কার্ড: অযোগ্যতা ঢাকার ঢাল
বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুরুর থেকেই ‘ভারত কার্ড’ বা কাউকে ‘ভারতের দালাল’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করা একটি অত্যন্ত পরিচিত কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখনই কোনো রাজনৈতিক দল বা সরকার জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে, যেমন—ভোটের অধিকার রক্ষা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ কিংবা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়, তখনই তারা জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরাতে এই কার্ডটি খেলে। নিজেদের প্রশাসনিক অযোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রগঠনের দূরদর্শিতার অভাব ঢাকতে প্রতিবেশীর জুজু বা ভয় দেখানো এদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে সস্তা অথচ কার্যকর ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
এই ভারত-বিদ্বেষী রাজনীতিকে আমজনতার কাছে জনপ্রিয় করতে এর সাথে সুকৌশলে ধর্মীয় সুড়সুড়ি এবং হিন্দু-বিদ্বেষকে মিলিয়ে দেওয়া হয়। একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী অনবরত প্রচার করতে থাকে যে, অমুক দল ক্ষমতায় থাকলে বাংলাদেশ ভারতের অঙ্গরাজ্য হয়ে যাবে কিংবা এদেশ থেকে ইসলাম বিপন্ন হবে। এমনকি পাশের দেশ ভারতে ঘটা বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক অপ্রীতিকর ঘটনাকে ঢাল বানিয়ে এদেশের রাজপথে বড় বড় র্যালি ও পেশিশক্তির মহড়া দেওয়া হয়, যা প্রকারান্তরে বাংলাদেশের নিজস্ব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর হওয়া অন্যায়-অত্যাচারকে এক ধরনের সামাজিক বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টা মাত্র। অথচ প্রকৃত ধর্ম বা দেশপ্রেম কখনোই অন্য কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি ঘৃণা ছড়াতে শেখায় না।
সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি হয় দেশের উন্নয়ন ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে। যেসব রাজনীতিবিদের কাছে দেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা টেকসই উন্নয়নের কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নেই, তারা জনগণকে সস্তা ‘দেশপ্রেম’ আর ‘সার্বভৌমত্ব রক্ষা’র ধোঁয়াশা তুলে সবসময় আবেগ তাড়িত করে রাখে। দেশের সাধারণ মানুষ যখন চায়ের কাপে কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিল্লির আধিপত্য বা সীমান্ত নীতি নিয়ে অন্তহীন তর্কে লিপ্ত থাকে, ঠিক সেই সুযোগে পর্দার আড়ালে দেশের ব্যাংকিং খাত ধ্বংস হয়ে যায়, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যায়।
জনগণের ক্ষোভ এবং ন্যায্য অধিকারের দাবিকে অন্যদিকে ডাইভার্ট করার বা ভুলিয়ে দেওয়ার এটি একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও ক্ল্যাসিক রাজনৈতিক কৌশল। যতদিন না এদেশের মানুষ এই সস্তা ডাইভারশন ট্যাকটিক বুঝতে পারবে এবং ফাঁকা স্লোগানের চেয়ে নিজেদের অধিকারের হিসাব মেলাতে শিখবে, ততদিন এই চতুর রাজনীতির শিকার আমাদের হতেই হবে।
৩. ঐতিহাসিক সত্য বনাম রাজনৈতিক মিথ: ভারত কি সত্যিই দখল করতে চায়?
রাজনীতিবিদরা প্রচারণা চালান যে ভারত আমাদের সার্বভৌমত্ব কেড়ে নেবে। কিন্তু ইতিহাস এবং ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে:
১৯৭১-এর সুযোগ:
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারতীয় বাহিনী এখানে অবস্থান করছিল। তারা চাইলে কয়েক বছর থাকতে পারত বা একটি পুতুল সরকার বসিয়ে রাখতে পারত। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে ১৯৭২ সালের মার্চ মাসের মধ্যেই ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশ ত্যাগ করে। পৃথিবীর ইতিহাসে এটি বিরল যে একটি বিজয়ী বাহিনী এত দ্রুত বন্ধু রাষ্ট্র ত্যাগ করেছে।
সিকিম বনাম বাংলাদেশ/পাকিস্তান:
সিকিমের অন্তর্ভুক্তিকে উদাহরণ হিসেবে টানা হলেও, বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের মতো বিশাল জনসংখ্যার এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ভূখণ্ড শাসন করা ভারতের জন্য হবে এক অর্থনৈতিক ও সামাজিক আত্মাহুতি। ভারত কখনোই এই দায়ভার নেবে না, কারণ এতে ভারতের নিজস্ব স্থিতিশীলতা নষ্ট হবে।
ভারতের প্রকৃত চাহিদা:
ভারত একটি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের কাছে কেবল নিরাপত্তা (Security) চায়। তারা চায় তাদের সেভেন সিস্টার্স (উত্তর-পূর্ব ভারত) এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। তারা চায় জঙ্গি অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে। তারা চায় প্রতিবেশীরা যেন তাদের দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় না দেয়।
৪. নদী, ট্রানজিট ও ভূখণ্ড: প্রয়োজনটা যুদ্ধের না নেগোসিয়েশনের?
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নদী, ট্রানজিট বা কানেক্টিভিটি নিয়ে যে টানাপোড়েন, তা কোনো একপাক্ষিক বিষয় নয়। বাস্তব সত্য হলো—বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের যেমন ভৌগোলিক কারণে ভারতকে প্রয়োজন, ঠিক একইভাবে ভারতের অর্থনীতি, ভূখণ্ড ও নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানকে অপরিহার্য। এই আঞ্চলিক সমীকরণটি কোনো অস্তিত্বের লড়াই বা যুদ্ধের বিষয় নয়, বরং এটি নিখাদ ‘ভূ-অর্থনৈতিক’ (Geo-economics) ও কৌশলগত নেগোসিয়েশনের ক্ষেত্র।
ভৌগোলিক বাস্তবতা ও অববাহিকা কূটনীতি
আমরা প্রাকৃতিকভাবেই একই নদী অববাহিকা এবং পরিবেশতন্ত্রের অংশ। হিমালয় থেকে নেমে আসা অভিন্ন নদীগুলোর পানির হিস্যা বা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বিপাক্ষিক দরকষাকষি একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়া।
দুর্ভাগ্যবশত, এই স্বাভাবিক নেগোসিয়েশনকে দেশীয় রাজনীতিতে ‘দেশ বিক্রি’ বা ‘সার্বভৌমত্ব হারানো’র মতো চরমপন্থী তকমা দিয়ে গুলিয়ে ফেলা হয়।
পানি বা সীমান্ত কোনো স্থায়ী দেয়াল নয়; উজানের দেশ হিসেবে ভারতের যেমন ভাটির দেশের প্রতি আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা আছে, তেমনি দ্বিপাক্ষিক বোঝাপড়ার মাধ্যমেই কেবল এই সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব, সংঘাতে নয়।
কানেক্টিভিটির দ্বি-পাক্ষিক সমীকরণ: কে কেন নির্ভরশীল?
কানেক্টিভিটি বা ট্রানজিট কখনোই ‘একতরফা দান’ নয়, এটি একটি উইন-উইন (Win-Win) চুক্তি। এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক গতিশীলতা বজায় রাখতে প্রত্যেকেই প্রত্যেকের ওপর নির্ভরশীল:
ভারতের কেন প্রয়োজন?
- উত্তর-পূর্ব ভারত (North-East): ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) সহজ, দ্রুত ও সাশ্রয়ী যোগাযোগের জন্য বাংলাদেশের ভূখণ্ড ও বন্দর ব্যবহার করা ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- পশ্চিম ও মধ্য এশিয়া: পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে স্থলপথ উন্মুক্ত না হলে ভারতের পক্ষে আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে সরাসরি প্রবেশ করা ব্যয়বহুল ও জটিল।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের কেন প্রয়োজন?
- বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ: ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না পারলে বাংলাদেশের পক্ষে নেপাল ও ভুটানের মতো ল্যান্ডলকড (স্থলবেষ্টিত) দেশগুলোর সাথে সরাসরি বাণিজ্য এবং জলবিদ্যুৎ আমদানি করা অসম্ভব।
- পাকিস্তানের দৃষ্টিকোণ: ভারতের আকাশসীমা বা স্থলপথ ব্যবহার করতে না পারায় পাকিস্তান ইতিমধ্যেই পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার (চীন, বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, জাপান) বিশাল বাজার থেকে একপ্রকার বিচ্ছিন্ন এবং অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পূর্ব এশিয়ার সাথে যুক্ত হতে পাকিস্তানের ভারতকে তীব্র প্রয়োজন।
ইউরোপের দেশগুলো যদি শত বছরের যুদ্ধ ও রক্তক্ষয়ী ইতিহাস ভুলে নিজেদের সীমানা উন্মুক্ত করে ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন’ গঠনের মাধ্যমে পৃথিবীর অন্যতম শীর্ষ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে, তবে দক্ষিণ এশিয়ায় কেন তা সম্ভব নয়?
দক্ষিণ এশিয়ার এই কানেক্টিভিটির ব্লকেড বা বাধাটি অর্থনৈতিক বা ভৌগোলিক নয়; এর মূল কারণ দশকের পর দশক ধরে রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে লালন করা মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল এবং ‘ঘৃণা উৎপাদন’। আঞ্চলিক দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে ওঠার চাবিকাঠি কোনো যুদ্ধের দামামায় নেই, তা লুকিয়ে আছে আলোচনার টেবিলে পারস্পরিক স্বার্থের পরিপক্ক নেগোসিয়েশনে।
৫. ঘৃণার অর্থনীতি: সাধারণ মানুষের পকেট যেভাবে কাটা হয়
রাজনীতিবিদরা যখন ‘ভারত-বিদ্বেষ’ বা ‘ভারতের দালাল’ কার্ড খেলেন, তখন পর্দার আড়ালে এক বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধিত হয়। এই ক্ষতির ভার শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণের কাঁধেই পড়ে।
বাজার ব্যবস্থার অস্থিরতা:
দক্ষিণ এশিয়ায় পণ্য পরিবহনের সবচেয়ে সহজ ও সস্তা মাধ্যম হলো প্রতিবেশী দেশের সাথে সুসম্পর্ক। কিন্তু রাজনীতির কারণে যখন সীমান্ত বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হয়, তখন পণ্য আমদানিতে খরচ বেড়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, ভারত থেকে পেঁয়াজ বা প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য আমদানিতে যখন ‘রাজনৈতিক টানাপোড়েন’ তৈরি হয়, তখন দেশের বাজারে হু হু করে দাম বাড়ে। দিনশেষে লাভ হয় একদল সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীর, আর পকেট কাটে সাধারণ মানুষের।
অস্ত্র প্রতিযোগিতা বনাম দারিদ্র্য বিমোচন:
পাকিস্তানের দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা ভারতের সাথে ছায়া যুদ্ধ (Proxy War) এবং সীমান্ত উত্তেজনা বজায় রাখতে গিয়ে নিজেদের দেউলিয়া করে ফেলেছে। পাকিস্তানের সামরিক বাজেটের মাত্র ১০ শতাংশ যদি তারা স্বাস্থ্য খাতে দিত, তবে দেশটির প্রতিটি নাগরিক বিনামূল্যে আধুনিক চিকিৎসা পেত। এই ‘কাল্পনিক শত্রু’র ভয় দেখিয়ে জনগণের টাকা দিয়ে কেনা হয় ট্যাঙ্ক আর মিসাইল, যা ক্ষুধার্ত পেটে অন্ন যোগাতে পারে না।
৬. প্রোপাগান্ডা ও ‘ডাইভারশন ট্যাকটিক’: জনগনের নজর ঘোরানোর কৌশল
দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোতে এটি একটি পরীক্ষিত ফর্মুলা। যখনই কোনো সরকার অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি বা দুঃশাসনে কোণঠাসা হয়ে পড়ে, তখনই তারা একটি ‘বাইরের শত্রু’ (External Enemy) তৈরি করে।
জাতীয়তাবাদের আফিম:
মানুষকে বলা হয়, “আমরা না খেয়ে থাকলেও সমস্যা নেই, কিন্তু সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হতে দেওয়া যাবে না।” এই আবেগ ব্যবহার করে জনগণের মৌলিক অধিকার—যেমন ভোট, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিতা কেড়ে নেওয়া হয়। মানুষ যখন ভারতকে গালি দেওয়া বা হিন্দুদের ওপর আক্রমণ করায় ব্যস্ত থাকে, তখন দুর্নীতিবাজ আমলা ও রাজনীতিবিদরা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করে দেয়।
শিক্ষা ব্যবস্থার সাম্প্রদায়িকীকরণ:
ঘৃণা টিকিয়ে রাখতে হলে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে শেখাতে হয় যে প্রতিবেশী দেশ আমাদের চিরশত্রু। পাঠ্যপুস্তকে ভুল ইতিহাস এবং সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ঢুকিয়ে দিয়ে এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করা হয়, যারা যুক্তির চেয়ে আবেগে বেশি চালিত। এতে দীর্ঘমেয়াদে দেশের মেধা ও মননশীলতা ধ্বংস হয়ে যায়।
৭. ভারত আসলে কী চায়? নিরাপত্তা বনাম আধিপত্য
রাজনীতিবিদরা প্রচারণা চালান যে ভারত আমাদের দখল করে নেবে। কিন্তু আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে ‘ভূমি দখল’ করার চেয়ে ‘অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নিরাপদ সীমান্ত:
ভারতের প্রধান চাহিদা হলো তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) নিরাপত্তা। তারা চায় না বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের মাটি ব্যবহার করে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ভারতের ভেতরে হামলা চালাক। এটি যে কোনো রাষ্ট্রের জন্য একটি যৌক্তিক চাহিদা।
জঙ্গিবাদ দমন:
ভারত চায় তার প্রতিবেশী দেশগুলো যেন উগ্রবাদী ও জঙ্গিবাদী শক্তির চারণভূমি না হয়। কারণ প্রতিবেশী দেশের অস্থিরতা সরাসরি ভারতের ওপর প্রভাব ফেলে।
ট্রানজিট ও কানেক্টিভিটি:
ভারত চায় কম খরচে পণ্য পরিবহন। এটি একটি বাণিজ্যিক আদান-প্রদান হতে পারে। কিন্তু রাজনীতিবিদরা একে ‘দেশ বিক্রি’র তকমা দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করেন, যাতে দুই দেশের জনগণের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে না ওঠে। কারণ বন্ধুত্ব গড়ে উঠলে তাদের ‘ঘৃণার দোকান’ বন্ধ হয়ে যাবে।
৮. ইতিহাস ও বাস্তবতা: দখলের সুযোগ ভারত নেয়নি
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে প্রায়ই ভারতকে একটি ‘দখলদার’ বা ‘সাম্রাজ্যবাদী’ শক্তি হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু ইতিহাস এবং বাস্তবতার গভীর বিশ্লেষণ সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে। এর সবচেয়ে বড় এবং অকাট্য ঐতিহাসিক প্রমাণ হলো ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে ভারতীয় বাহিনী মিত্রবাহিনী হিসেবে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। যুদ্ধজয়ের পর একটি সদ্য স্বাধীন দেশের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তারা চাইলে আরও বহু বছর বাংলাদেশে অবস্থান করতে পারত বা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারত। কিন্তু দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার প্রতি সম্মান জানিয়ে, স্বাধীনতার মাত্র কয়েকমাসের মাথায়, ১৯৭২ সালের ১২ই মার্চ ভারতীয় সামরিক বাহিনী সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ছেড়ে চলে যায়।
একইভাবে পাকিস্তানের রাজনৈতিক মহলেও বারবার এই প্রচার চালানো হয় যে, ভারত তাদের রাষ্ট্রকে চিরতরে ধ্বংস বা দখল করতে চায়। অথচ ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, সংকটের চরম মুহূর্তেও ভারত এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর ১৯৭২ সালের ঐতিহাসিক শিমলা চুক্তির সময় পাকিস্তানের ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দী এবং বিস্তর ভূখণ্ড ভারতের হাতে থাকা সত্ত্বেও তারা আলোচনার টেবিলে সেগুলো ফেরত দিয়েছিল। এমনকি ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধের মতো তীব্র সংঘাতের সময়েও ভারত আন্তর্জাতিক সীমান্ত পার হয়ে পাকিস্তান ভূখণ্ড দখল করার কোনো চেষ্টা করেনি, বরং নিজেদের সীমানা সুরক্ষাতেই সীমাবদ্ধ ছিল।
আবেগ সরিয়ে যদি একদম ঠান্ডা মাথার বাস্তবতার দিকে তাকানো যায়, তবে বোঝা যাবে যে কোনো দেশের ভূখণ্ড সামরিক জোর খাটিয়ে দখল করা আর কোটি কোটি মানুষকে শাসন করা এক জিনিস নয়। পাকিস্তান বা বাংলাদেশের মতো বিশাল জনসংখ্যার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল শাসন করার চিন্তা করাও আধুনিক ভারতের জন্য একটি চরম আত্মঘাতী এবং অবাস্তব পরিকল্পনা। এমন এক বিশাল ও ঐতিহাসিকভাবে বৈরী জনসংখ্যাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা ভারতের নিজস্ব অর্থনীতি, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোকে চিরতরে ধসিয়ে দেবে। কোনো দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক বা কৌশলবিদ কখনোই এমন ফাঁদে পা দেবেন না।
তাই ভারতের আসল কৌশলগত লক্ষ্য কোনো আঞ্চলিক সাম্রাজ্য বিস্তার বা জমি দখল নয়, বরং তাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ভারত কেবল এটাই চায় যেন তাদের পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্ত অশান্ত না থাকে এবং সেখান থেকে কোনো ধরনের উগ্রবাদ, অস্থিতিশীলতা বা নিরাপত্তা হুমকি তাদের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে না পারে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো স্থিতিশীল এবং শান্ত থাকলেই ভারতের নিজস্ব অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে ওঠার পথ মসৃণ হয়—এই সরল ভূ-রাজনৈতিক সত্যটি বুঝলে শত্রুতার কাল্পনিক ভয় অনেকটাই কেটে যায়।
৯. শত্রুতার রাজনীতিতে – কার লাভ কার? কার ক্ষতি কার?
ভূ-রাজনৈতিক শত্রুতা এবং ‘ঘৃণার চাষ’ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ব্যবসা। যখন দুটি দেশের মধ্যে কৃত্রিম দেয়াল তুলে রাখা হয়, তখন পর্দার আড়ালে একদল মানুষ বিপুল মুনাফা লোটে, আর তার চড়া মূল্য চোকাতে হয় কোটি কোটি সাধারণ মানুষকে।
লাভটা আসলে কার?
শত্রুতার এই অন্তহীন বয়ান সমাজে এমন একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর জন্ম দেয়, যাদের অস্তিত্বই টিকে থাকে যুদ্ধের ভয়ে। এই ১% সুবিধাভোগী শ্রেণির মধ্যে রয়েছে:
- অযোগ্য ও দূরদর্শিতাহীন রাজনীতিবিদ: যাদের নিজেদের দেশকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বা সুশাসন দেওয়ার মতো মেধা বা যোগ্যতা নেই, তারা জনগণের দৃষ্টি অন্য দিকে ঘোরাতে এই ‘শত্রুর ভয়’ নামক তাসটি খেলেন।
- উগ্রপন্থী ও স্বার্থান্বেষী ধর্মীয় নেতা: যারা সমাজে ঘৃণার বিষবাষ্প ছড়িয়ে নিজেদের ধর্মীয় ও সামাজিক আধিপত্য বজায় রাখেন এবং মানুষকে যুক্তিহীন অন্ধত্বের দিকে ঠেলে দেন।
- সামরিক আমলাতন্ত্র ও নীতিনির্ধারক: শত্রুতার অজুহাতে প্রতি বছর যে বিশাল সামরিক বাজেট পাস হয়, তার প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগী হন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা এবং সামরিক সংশ্লিষ্ট আমলারা।
- মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স (সামরিক-শিল্প গোষ্ঠী): যুদ্ধ বা প্রতিরক্ষার নাম করে যারা অস্ত্র, গোলাবারুদ, লজিস্টিকস এবং নানা আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র সাপ্লাই দেয়, সেই কর্পোরেট সিন্ডিকেট ও ঠিকাদাররা।
বাস্তবতা হলো- এই সুবিধাভোগী চক্রটি দেশের মোট জনসংখ্যার একটা নগণ্য অংশ মাত্র। এরা ভালো থাকলে বা এদের পকেট ভারী হলে সাধারণ মানুষের ভাগ্য এক চুলও বদলায় না।
ক্ষতিটা কার?
এই সাজানো নাটকের একমাত্র এবং স্থায়ী বলি হলো দেশের ৯৯% সাধারণ মানুষ। তাদের ক্ষতিটা শুধু আর্থিক নয়, এটি তাদের পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দেয়:
- মৌলিক অধিকারের বঞ্চনা: যে টাকাটা ব্যয় হতে পারত নতুন স্কুল-কলেজ নির্মাণে, আধুনিক হাসপাতাল তৈরিতে কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবারের ওপর ভর্তুকি দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণে—সেই ট্যাক্সের টাকা চলে যায় বোমারু বিমান আর ট্যাংক কিনতে।
- মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব: সাধারণ মানুষকে এক কাল্পনিক যুদ্ধের নেশা এবং উগ্র জাতীয়তাবাদের আফিম খাইয়ে বুঁদ করে রাখা হয়। ফলে তারা নিজেদের অধিকার, বেকারত্ব বা অনাহার নিয়ে প্রশ্ন করতে ভুলে যায়।
- জীবন ও জীবিকার অপচয়: শেষ পর্যন্ত সীমান্তে যদি কোনো সংঘাত বা যুদ্ধ বাধে, তবে এই সুবিধাভোগী এলিটদের সন্তানরা মারা যায় না; প্রাণ হারায় সাধারণ ঘরের সন্তানরা, যারা স্রেফ রুটি-রুজির তাগিদে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল।
শত্রুতার রাজনীতি হলো এমন এক অদ্ভুত জাঁতাকল, যেখানে ঘৃণা কেনা-বেচা করে গুটি কয়েক মানুষ প্রাসাদে থাকে, আর রাষ্ট্রকে রক্ষার এক কাল্পনিক মোহে পড়ে সাধারণ মানুষ নিজের বেঁচে থাকার অধিকারটুকুও হারিয়ে ফেলে।
১০. ছায়াযুদ্ধ ও উন্নয়নের বৈপরীত্য: কেন আমরা পিছিয়ে?
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি ও মানবউন্নয়নের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো—এখানকার রাষ্ট্রীয় বাজেট এবং নীতি নির্ধারিত হয় ‘জনগণের ভালো থাকার তাগিদে’ নয়, বরং এক ধরনের ‘কাল্পনিক ভয়ের সংস্কৃতি’ বা ‘ভারত-ভীতি’ (India-phobia) পুঁজি করে। প্রতিরক্ষা এবং গোয়েন্দা খাতের পেছনে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢালা হয়, তার বিপরীতে জনকল্যাণমূলক খাতের দিকে তাকালে এক ভয়াবহ বৈপরীত্য চোখে পড়ে।
পাকিস্তানের ট্র্যাজেডি: অস্ত্রের জাঁতাকলে পিষ্ট জনজীবন
দশকের পর দশক ধরে পাকিস্তান তার জিডিপির (GDP) সিংহভাগ ব্যয় করছে ভারতের সাথে এক অন্তহীন সামরিক ও পারমাণবিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে। একটি বিশাল সেনাবাহিনীকে লালন-পালন করতে গিয়ে দেশটি অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হওয়ার পথে।
এই সামরিক অহংকারের বিপরীতে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের ন্যূনতম সুপেয় পানি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা মানসম্মত শিক্ষার অধিকার নেই। অথচ ভারতের সাথে যদি পাকিস্তানের একটি পরিপক্ক ও স্থিতিশীল কূটনৈতিক-বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকত, তবে এই বিপুল সামরিক বাজেট জনকল্যাণে ও শিল্পায়নে ব্যয় হতে পারত। পাকিস্তান আজ ঋণগ্রস্ত দেশ না হয়ে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ‘ইকোনমিক টাইগার’ হতে পারত।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: স্লোগান বনাম প্রকৃত সার্বভৌমত্ব
একই ছায়ার প্রতিফলন কম-বেশি বাংলাদেশেও দেখা যায়। যখনই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বা অর্থনীতি সংকটে পড়ে, তখনই ‘ভারত-বিদ্বেষ’ বা ‘সার্বভৌমত্ব গেল’ নামক সস্তা আবেগটিকে পলিটিক্যাল এজেন্ডা হিসেবে সামনে আনা হয়।
আপনারা বাংলাদেশের ইতিহাসে তারিয়ে দেখুন – হুজুগে মেতে জনগণের মৌলিক অধিকার, সুশাসন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি বা কর্মসংস্থানের মতো জরুরি দাবিগুলোকে আড়াল করে ‘সীমান্ত রক্ষা’ বা ভূ-রাজনৈতিক শোরগোলকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
রুড় ও বাস্তাব সত্যটা হলো – একটি দেশের আসল সার্বভৌমত্ব সীমান্তের কাঁটাতারে, বন্দুকের নলে কিংবা প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে দেওয়া ফাঁকা স্লোগানের মধ্যে থাকে না। দেশের প্রকৃত সার্বভৌমত্ব রক্ষা হয় তখনই, যখন তার প্রতিটি নাগরিক শিক্ষিত, সচেতন এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার শক্তি অর্জন করে।
যতক্ষণ পর্যন্ত এই অঞ্চলের রাজনীতি মানুষের ‘পেটের ভাতের’ চেয়ে সীমান্তের ওপার থেকে আসা কাল্পনিক শত্রুর ভয়কে বেশি লাভজনক মনে করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার সাধারণ মানুষ এক অন্ধকার ছায়াযুদ্ধের বলি হতেই থাকবে।
১১/ দক্ষিণ এশিয়ার ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন’ স্বপ্ন বনাম বিভাজনের দেয়াল
ইউরোপের দেশগুলো (যেমন জার্মানি ও ফ্রান্স) শত বছর ধরে একে অপরের সাথে যুদ্ধ করেছে। কিন্তু তারা একসময় বুঝতে পেরেছে যে যুদ্ধ করে কোনো জাতির পেট ভরে না। তারা তাদের সীমানা উন্মুক্ত করেছে, তৈরি করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU)।
বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান যদি নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যিক দেয়াল তুলে না রাখত, তবে আমরা একে অপরের কাছ থেকে সস্তায় বিদ্যুৎ, গ্যাস, খাদ্যপণ্য ও প্রযুক্তি নিতে পারতাম। কিন্তু রাজনীতিবিদরা জানেন, যদি এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে যায়, তবে জনগনের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে এবং তারা তখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলবে। তাই তারা চায় মানুষ যেন সব সময় ‘ভারত আমাদের গিলে ফেলবে’—এই আতঙ্কে থাকে।
১২/ ঘৃণা উৎপাদনের কারখানা: ধর্ম ও জাতীয়তাবাদের অপব্যবহার
যেসব রাজনীতিবিদের দেশের জিডিপি বাড়ানোর বা সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা নেই, তারা ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন।
ভারতের সাথে রাজনৈতিক দ্বন্দকে হিন্দু ধর্মের সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়। এতে দুই দেশের সংখ্যালঘু জনগন বড় ধরণের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। রাজনীতিবিদরা এই ঘৃণা উৎপাদন করেন যাতে সাধারণ মানুষ একে অপরের রক্ত পিপাসু হয়ে থাকে এবং শাসকগোষ্ঠী নির্বিঘ্নে দেশের সম্পদ লুট করে বিদেশে (কানাডা বা দুবাই) পাচার করতে পারে। দিন শেষে রাজনীতিবিদদের সন্তানরা ঠিকই বিদেশে সুখে থাকে, আর দাঙ্গায় বা অভাবের তাড়নায় মরে সাধারণ জনগন।
১৩/ চূড়ান্ত সত্য: ভারতের চাওয়া বনাম আমাদের লাভ
ইতিহাস এবং বর্তমানের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারত কখনোই পাকিস্তান বা বাংলাদেশ দখল করতে চায় না। কারণ:
সাংস্কৃতিক ও জনসংখ্যাগত ঝুঁকি:
ভারত নিজের অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য সামলাতেই হিমশিম খায়। তার ওপর বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের মতো বিশাল জনসংখ্যার এবং ভিন্ন মতাদর্শের ভূখণ্ড দখল করা ভারতের জন্য হবে আত্মঘাতী।
নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা:
ভারত কেবল চায় তার চারপাশের দেশগুলো যেন স্থিতিশীল থাকে। প্রতিবেশী দেশে অরাজকতা মানেই ভারতের সীমানায় শরণার্থী ও উগ্রবাদের চাপ। তাই ভারতের স্বার্থেই তারা চায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তান শক্তিশালী হোক, কিন্তু যেন ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি না হয়ে দাঁড়ায়।
শুভঙ্করের ফাঁকি থেকে মুক্তি
‘ভারতের দালাল’ বা ‘ভারত-বিদ্বেষী’ এই তকমাগুলো আসলে আমাদের আসল শত্রু নয়। আমাদের আসল শত্রু হলো দারিদ্র্য, অশিক্ষা, দুর্নীতি এবং জবাবদিহিতাহীন শাসনব্যবস্থা। রাজনীতিবিদরা যখন আমাদের শেখান যে ভারত আমাদের শত্রু, তখন তারা আসলে আমাদের বোঝাতে চান না যে—আমাদের প্রকৃত শত্রু আমাদের নিজেদের ঘরের ভেতরে থাকা দুর্নীতিবাজ শাসকগোষ্ঠী।
দক্ষিণ এশিয়ার জনগনের মুক্তি তখনই সম্ভব হবে যখন আমরা ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী সেন্টিমেন্টের ঊর্ধ্বে উঠে নিজেদের অর্থনৈতিক ও মানবিক অধিকার নিয়ে কথা বলব। ভারত-বিদ্বেষ বা হিন্দু-বিদ্বেষ ছড়িয়ে যারা রাজনীতি করতে চায়, তারা আসলে দেশের বন্ধু নয়; তারা নিজেদের ক্ষমতার ভাগ বাটোয়ারা নিশ্চিত করতে সাধারণ জনগনের ভবিষ্যৎকে জিম্মি করে রেখেছে। এই শুভঙ্করের ফাঁকি বোঝার সময় এখনই।
তথ্যসূত্র ও সহায়ক গ্রন্থ (Sources):
১/ The Battle for Pakistan: The Bitter Messenger and a Failed State – Shuja Nawaz: পাকিস্তানে সামরিক আধিপত্য ও ভারত-বিদ্বেষী রাজনীতির অর্থনৈতিক ক্ষতির বিস্তারিত বিশ্লেষণ।
২/ The Idea of Pakistan – Stephen P. Cohen: পাকিস্তান কেন ভারতকে একটি ‘অস্তিত্বের হুমকি’ হিসেবে দেখে এবং এর ফলে দেশটি কীভাবে পিছিয়ে পড়েছে তার বর্ণনা।
৩/ Against the Stream: India’s Foreign Policy in the 1970s – J.N. Dixit: বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ভারতের পিছু হটা এবং দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির নেপথ্য কাহিনী।
৪/ একাত্তরের ঘাতক ও দালালেরা কে কোথায় – মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্র: সাম্প্রদায়িক রাজনীতি কীভাবে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সম্প্রীতির ক্ষতি করে তার আলোচনা।
৫/ Foreign Policy of Bangladesh – Dr. Abdul Momén: বাংলাদেশের সাথে ভারতের নদীর পানি বণ্টন ও ট্রানজিট নিয়ে কূটনৈতিক দরকষাকষির নির্মোহ বিশ্লেষণ।
৬/ Why Nations Fail – Daron Acemoglu & James A. Robinson: কীভাবে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কাল্পনিক শত্রু তৈরি করে জনগনের সম্পদ লুট করে, তার বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক উদাহরণ।
৭/ The Discovery of India – Jawaharlal Nehru: দক্ষিণ এশিয়ার অখণ্ড ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের ওপর আলোকপাত।
৮/ Human Development in South Asia (Reports by Mahbub ul Haq Center): সামরিক ব্যয় বনাম শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়ের তুলনামূলক পরিসংখ্যান।
