বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের রাজনীতিতে ভারতের দালাল থিওরির শুভঙ্করের ফাঁকি । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের রাজনীতিতে একটি কমন এলিমেন্ট বা সাধারণ উপাদান হলো ‘ভারত’। এই দেশ দুটির রাজনৈতিক ময়দানে কোনো দল যদি প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে চায়, তবে সবচেয়ে সহজ এবং সস্তা অস্ত্রটি হলো তাকে ‘ভারতের দালাল’ হিসেবে আখ্যায়িত করা। অদ্ভুত বিষয় হলো, এই তকমা দেওয়ার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের প্রয়োজন হয় না; কেবল জনগনের ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী সেন্টিমেন্টকে উস্কে দেওয়াই যথেষ্ট। কিন্তু এই ‘ঘৃণার রাজনীতি’র আড়ালে যে বিশাল অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত ক্ষতি হচ্ছে, তা সাধারণ জনগন খুব কমই উপলব্ধি করতে পারে। এটি মূলত শাসকগোষ্ঠীর এক সুনিপুণ ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’।

যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল
যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল – ভারতের দালাল হিসেবে তকমা পাওয়া প্রথম পাকিস্থানি আইন মন্ত্রী

 

Table of Contents

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাদের তাবেদারেরা যাদের ‘ভারতের দালাল’ বা ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দিয়েছিল:

নিচে এমন কিছু বরেণ্য রাজনৈতিক নেতা, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, সামরিক কর্মকর্তা এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের তালিকা দেওয়া হলো, যাদের পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ‘ভারতের দালাল’ বা ‘চর’ হিসেবে নথিবদ্ধ (Documentation) করেছিল। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন সময়ে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ও ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে এই ‘ভারত কার্ড’ ব্যবহার করে তাদের বিরুদ্ধে কুৎসিত অপপ্রচার চালিয়েছিল। এই ঠুনকো অজুহাতে কাউকে পাকিস্তানে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে, কাউকে প্রহসনের মামলা দিয়ে বছরের পর বছর কারারুদ্ধ করে রাখা হয়েছে, আবার কাউকে সরকারি বা নির্বাচিত পদ থেকে অন্যায়ভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। নিচের নামগুলো দেখুন:

প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিজীবী ও জাতীয় নেতা

১. শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক (১৮৭৩–১৯৬২) — লাহোর প্রস্তাবের উত্থাপক এবং পূর্ব বাংলার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী; ১৯৫৪ সালে তাঁকে সরাসরি ‘দেশদ্রোহী ও ভারতের চর’ আখ্যা দিয়ে গৃহবন্দী করা হয়।

২. মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী (১৮৮০–১৯৭৬) — মজলুম জননেতা; যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের পর বিদেশ থেকে দেশে ফেরায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে তাঁকে নির্বাসিত করার চেষ্টা হয়।

৩. ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত (১৮৮৬–১৯৭১) — প্রখ্যাত ভাষা সংগ্রামী ও আইনবিদ; ১৯৪৮ সালে গণপরিষদে বাংলার দাবি তোলায় লিয়াকত আলী খান কর্তৃক ‘ভারতের উস্কানিদাতা’ তকমা পান। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

৪. কমরেড মুজাফফর আহমদ (কাকাবাবু) (১৮৮৯–১৯৭৩) — উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অগ্রদূত; তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের কারণে পাকিস্তান সরকার সর্বদা তাঁকে ‘ভারতের চর’ মনে করত।

৫. খান আবদুল গাফফার খান (বাচ্চা খান) (১৮৯০–১৯৮৮) — কিংবদন্তি পশতুন নেতা ও ‘সীমান্ত গান্ধী’; ভারত বিভাগের বিরোধিতা করায় পাকিস্তানে ১৫ বছরেরও বেশি সময় কারারুদ্ধ থাকেন এবং ‘কংগ্রেসের পেইড দালাল’ অপবাদ পান।

৬. হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী (১৮৯২–১৯৬৩) — পাকিস্তানের ৫ম প্রধানমন্ত্রী ও গণতন্ত্রের মানসপুত্র; আইয়ুব খানের সামরিক জান্তা ১৯৬২ সালে তাঁকে ‘ভারত থেকে অর্থ নিয়ে পাকিস্তান ভাঙার’ মিথ্যা অভিযোগে করাচির জেলে বন্দি করে।

৭. রণদাপ্রসাদ সাহা (আর. পি. সাহা) (১৮৯৬–১৯৭১) — খ্যাততনামা দানবীর ও ব্যবসায়ী; বাঙালি সংস্কৃতিতে অর্থায়নের অপরাধে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাঁকে ‘ভারতের চর’ আখ্যা দিয়ে হত্যা করে।

৮. আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৮–১৯৭৯) — প্রখ্যাত সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সাবেক কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী; পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষে সমতার দাবি তোলায় ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান কর্তৃক ‘ভারতপন্থী’ হিসেবে রাজনীতিতে নিষিদ্ধ ও কারারুদ্ধ হন।

৯. ড. কুদরাত-এ-খুদা (১৯০০–১৯৭৭) — আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ; মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চার দাবি তোলায় পাকিস্তানি নীতিনির্ধারকদের কাছে ‘ইসলাম ধ্বংসের ভারতীয় চক্রান্তকারী’ হিসেবে চিহ্নিত হন।

১০. কমরেড মণি সিংহ (১৯০১–১৯৯০) — বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (CPB) প্রতিষ্ঠাতা; পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই ‘নেহরুর আন্ডারগ্রাউন্ড এজেন্ট’ তকমা দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি রাখা হয়।

১১. মোতাহের হোসেন চৌধুরী (১৯০৩–১৯৫৬) — মননশীল প্রাবন্ধিক ও ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’-এর পুরোধা; বাঙালির সংস্কৃতির পক্ষে কথা বলায় পাকিস্তানি ধর্মান্ধ গোষ্ঠী তাঁকে ‘ভারতীয় সংস্কৃতির দালাল’ হিসেবে দাগিয়ে দেয়।

১২. যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল (১৯০৪–১৯৬৮) — পাকিস্তানের প্রথম আইন ও শ্রমমন্ত্রী; সরকারের ভেতরে সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে কথা বলায় ‘ভারতের গোপন শুভাকাঙ্ক্ষী’ তকমা দিয়ে একঘরে করা হয়, যার ফলে তিনি পদত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।

১৩. জি. এম. সৈয়দ (১৯০৪–১৯৯৫) — সিন্ধু প্রদেশের আধুনিক জাতীয়তাবাদের জনক; সিন্ধুর স্বায়ত্তশাসন ও ভাষার মর্যাদা চাওয়ায় পাকিস্তানি গোয়েন্দারা তাঁকে ভারতীয় ‘র’ (RAW)-এর এজেন্ট সাজিয়ে জীবনের ৩০ বছর জেলে ও গৃহবন্দী করে রাখে।

১৪. আতাউর রহমান খান (১৯০৭–১৯৯১) — পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী; প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি তোলায় ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান তাঁকে ‘ভারতপন্থী উপদলীয় নেতা’ আখ্যা দিয়ে রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করেন।

১৫. কমরেড জ্ঞান চক্রবর্তী (১৯০৮–১৯৮৮) — ময়মনসিংহের প্রখ্যাত কৃষক নেতা ও বামপন্থী ব্যক্তিত্ব; দীর্ঘ সময় হুলিয়া মাথায় নিয়ে আত্মগোপনে বা পাকিস্তানের কারাগারে কাটাতে হয়েছে।

১৬. তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া (১৯১১–১৯৬৯) — ঐতিহাসিক ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক; ক্ষুরধার লেখনীর কারণে আইয়ুব সরকার তাঁর বিরুদ্ধে ‘ভারত থেকে চোরাপথে কাগজের ফান্ডিং নেওয়ার’ বানোয়াট অভিযোগ এনে প্রেস বাজেয়াপ্ত ও কারারুদ্ধ করে।

১৭. কামরুদ্দীন আহমদ (১৯১২–১৯৮২) — কূটনীতিবিদ, লেখক ও স্বাধিকার আন্দোলনের তাত্ত্বিক; দুই পাকিস্তানের বৈষম্য নিয়ে বই লেখায় ‘ভারতের বুদ্ধিবৃত্তিক দালাল’ হিসেবে প্রতিনিয়ত গোয়েন্দা নজরদারিতে থাকতেন।

১৮. জহুর আহমদ চৌধুরী (১৯১৬–১৯৭৪) — চট্টগ্রামের প্রবীণ শ্রমিক নেতা ও আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা; চট্টগ্রামে শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলায় পাকিস্তানি গোয়েন্দারা (ISI) তাঁকে ‘আগরতলা ও ত্রিপুরার ভারতীয় চর’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে।

১৯. গাউস বক্স বিজেনজো (১৯১৭–১৯৮৯) — বেলুচিস্তানের প্রগতিশীল নেতা ও সাবেক গভর্নর; ১৯৭৩ সালে জুলফিকার আলী ভুট্টো তাঁর নির্বাচিত সরকার ভেঙে দিয়ে ‘হায়দরাবাদ চক্রান্ত মামলায়’ ভারতের চর হিসেবে বন্দি করেন।

২০. আবদুল ওয়ালী খান (১৯১৭–২০০৬) — ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং বাচ্চা খানের পুত্র; বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে শক্তিশালী ভূমিকা রাখায় জুলফিকার আলী ভুট্টো ১৯৭৫ সালে তাঁর দল নিষিদ্ধ করে তাঁকে ‘আফগান-ভারত চর’ অপবাদে বন্দি করেন।

২১. শওকত ওসমান (১৯১৭–১৯৯৮) — কালজয়ী কথাশিল্পী ও প্রগতিশীল প্রাবন্ধিক; ‘ক্রীতদাসের হাসি’ উপন্যাসের মাধ্যমে স্বৈরাচারের বিরোধিতা করায় আইয়ুব সরকার তাঁকে ‘কলকাতা-কেন্দ্রিক ভারতীয় সংস্কৃতির তল্পিবাহক’ হিসেবে প্রশাসনিক হয়রানি করে।

২২. এম. এ. জি. ওসমানী (জেনারেল ওসমাণী) (১৯১৮–১৯৮৪) — মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি ও সাবেক পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা; ১৯৭১ সালের মার্চে গোপনে বাঙালি সেনাসদস্যদের সংগঠিত করার সময় আইয়ুব-ইয়াহিয়া জান্তা তাঁকে ‘ভারতীয় সেনাবাহিনীর এজেন্ট’ আখ্যা দিয়ে ফাঁসির রায় দেয়।

২৩. ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী (১৯১৯–১৯৭৫) — আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ও মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রী; ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলনের সময় উত্তরবঙ্গে আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ায় ‘ভারতের সাথে গোপন সীমান্ত আঁতাত’ এর মিথ্যা অভিযোগে কারারুদ্ধ হন।

২৪. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১৯২০–১৯৭৫) — বাঙালি জাতির পিতা; ১৯৬৬ সালে ৬ দফা দেওয়ার পর ১৯৬৮ সালে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায়’ ১ নম্বর আসামি করে ফাঁসি দেওয়ার চক্রান্ত হয়। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খান রেডিও ভাষণে তাঁকে আবারও ‘পাকিস্তানের শত্রু ও ভারতের চর’ আখ্যা দিয়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় চূড়ান্ত করেন।

২৫. বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী (১৯২১–১৯৮৭) — ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও প্রখ্যাত আইনজ্ঞ; ১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদে উপাচার্য পদ থেকে পদত্যাগ করলে পাকিস্তান সরকার তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ভারতের চর ও দেশদ্রোহী’ ঘোষণা করে।

২৬. এম. এ. আজিজ (১৯২১–১৯৭১) — চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের কিংবদন্তি সংগঠক; ১৯৬৬ সালে ৬ দফার মাঠে অনন্য ভূমিকা রাখায় পাকিস্তানি গোয়েন্দারা অপপ্রচার চালায় যে তিনি ‘ভারতের আগর্তলা থেকে অর্থ ও অস্ত্র’ আনছেন।

২৭. জহুর হোসেন চৌধুরী (১৯২২–১৯৮০) — ঐতিহত্মবাহী ‘দৈনিক সংবাদ’ পত্রিকার কালজয়ী সম্পাদক; অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে সম্পাদকীয় লেখায় আইয়ুব জান্তা তাঁকে ‘নেহরু-ইন্দিরা সরকারের পেইড প্রোপাগান্ডিস্ট’ হিসেবে কারারুদ্ধ করে।

২৮. অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ (ন্যাপ প্রধান) (১৯২২–২০১৯) — প্রগতিশীল রাজনীতিক ও ন্যাপ প্রধান; আইয়ুব খানের মার্কিনঘেঁষা নীতির বিরোধিতা করায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাঁকে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড কমিউনিস্ট ও ভারতের চর’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে, যার কারণে তিনি ৮ বছর আত্মগোপনে থাকেন।

২৯. অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চৌধুরী (ড. এম এ চৌধুরী) (১৯২২–১৯৭৮) — প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ঢাবি শিক্ষক; দুই পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্য অ্যাকাডেমিক ডেটা দিয়ে প্রমাণ করায় পাকিস্তানি এস্টাবলিশমেন্ট তাঁকে ‘হিন্দুয়ানি বুদ্ধিজীবী ও ভারতের দালাল’ ব্র্যান্ডিং করে।

৩০. এ. এইচ. এম. কামারুজ্জামান (১৯২৩–১৯৭৫) — রাজশাহীর জনপ্রিয় নেতা ও মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রী; পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে পশ্চিম পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধে জোরালো বক্তব্য রাখায় পাকিস্তানি গোয়েন্দারা (ISI) তাঁকে ‘ভারতের নিয়মিত তথ্য সরবরাহকারী’ হিসেবে তালিকায় রাখে।

৩১. সৈয়দ নজরুল ইসলাম (১৯২৫–১৯৭৫) — আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ও মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি; ১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলন সফলভাবে পরিচালনা করায় আইয়ুব জান্তা অপপ্রচার চালায় যে তিনি ‘দিল্লির গোয়েন্দা ছক’ অনুযায়ী পাকিস্তান ভাঙছেন।

৩২. তাজউদ্দীন আহমদ (১৯২৫–১৯৭৫) — স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী; ৬ দফার অর্থনৈতিক রূপরেখা তৈরি করায় পাকিস্তানি জান্তা তাঁকে ‘কট্টর ভারতপন্থী তাত্ত্বিক’ ভাবত। ১৯৭১ সালের মার্চে রেডিও ও সরকারি শ্বেতপত্রে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ভারতের পেইড ওয়ান-ম্যান এজেন্ট’ ঘোষণা করা হয়।

৩৩. সন্তোষ গুপ্ত (১৯২৫–২০০৪) — দৈনিক সংবাদ-এর কালজয়ী বার্তা সম্পাদক ও কলামিস্ট; ধারালো রাজনৈতিক কলামের মাধ্যমে সামরিক জান্তার মুখোশ খোলায় ‘দিল্লির প্রেস নোট অনুযায়ী কাজ করা প্রোপাগান্ডিস্ট’ অপবাদ দিয়ে কারারুদ্ধ করা হয়।

৩৪. নূরজাহান বেগম (১৯২৫–২০১৬) — সাপ্তাহিক ‘বেগম’ পত্রিকার কালজয়ী সম্পাদক; নারীদের সামাজিক জাগরণ ও প্রগতিশীল চিন্তা ছড়ানোর কারণে রক্ষণশীল পাকিস্তানিরা তাঁকে ‘ভারতীয় হিন্দুয়ানি সংস্কৃতির দালাল’ হিসেবে হেয় করার চেষ্টা করে।

৩৫. মহিউদ্দিন আহমদ (১৯২৫–১৯৯৭) — আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি ও প্রগতিশীল নেতা; স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রাখায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাঁকে ‘ভারতপন্থী চরম সমাজতন্ত্রী’ আখ্যা দিয়ে বিনাবিচারে বারবার আটকে রাখত।`

৩৬. শহীদুল্লা কায়সার (১৯২৭–১৯৭১) — প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক ও সাংবাদিক; মেহনতি মানুষের পক্ষে কথা বলায় ‘দিল্লি ও মস্কোর পেইড এজেন্ট’ হিসেবে ১৯৫২ থেকে ১৯৬২ সালের মধ্যে প্রায় ৮ বছর পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকেন। ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর আল-বদর বাহিনী তাঁকে হত্যা করে।

৩৭. নওয়াব আকবর বুগতি (১৯২৭–২০০৬) — বেলুচিস্তানের জাতীয়তাবাদী নেতা ও উপজাতি প্রধান; ১৯৭৩ সালে ইরাকি দূতাবাসে বানোয়াট অস্ত্র উদ্ধারের নাটক সাজিয়ে জুলফিকার আলী ভুট্টো তাঁর নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকার ভেঙে দেন এবং ‘পাকিস্তানের অখণ্ডতা ধ্বংসকারী ভারতীয় চর’ হিসেবে চিহ্নিত করেন।

৩৮. চিত্তরঞ্জন সুতার (১৯২৮–২০০৭) — প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ও বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী; সংখ্যালঘু নেতা হওয়ায় পাকিস্তানি গোয়েন্দারা তাঁকে ‘ইন্দিরা গান্ধী সরকারের সাথে ঢাকার যোগাযোগের মূল গোপন সেতু’ হিসেবে ১৯৬৮ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আসামি করে।

৩৯. কে. জি. মুস্তফা (১৯২৮–২০১০) — প্রখ্যাত প্রগতিশীল সাংবাদিক ও কলামিস্ট; অর্থনৈতিক শোষণের চিত্র পত্রিকায় তোলায় আইয়ুব জান্তা তাঁকে ‘দিল্লি-মস্কো অক্ষের পেইড প্রোপাগান্ডিস্ট’ হিসেবে দাগিয়ে দিয়ে বারবার গ্রেফতার করে।

৪০. এম. আর. আখতার মুকুল (১৯২৯–২০০৪) — স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ‘চরমপত্র’ খ্যাত সাংবাদিক; ষাটের দশকে সাহসী সাংবাদিকতার কারণে পাকিস্তানি গোয়েন্দারা তাঁকে ‘দিল্লির পেইড প্রোপাগান্ডিস্ট’ হিসেবে কালো তালিকাভুক্ত করে।

৪১. শহীদ সাবের (১৯৩০–১৯৭১) — দৈনিক সংবাদ-এর নির্ভীক সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক; বামপন্থী রাজনীতির কারণে ১৯৫০-এর দশকে ৪ বছর বিনাবিচারে পাকিস্তানের অন্ধকার কারাগারে বন্দি রাখা হয়, যেখানে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারান। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ ‘সংবাদ’ অফিসে আগুনে পুড়ে শহীদ হন।

৪২. অধ্যাপক রেহমান সোবহান (১৯৩৫—বর্তমান) — বরেণ্য অর্থনীতিবিদ ও ‘দুই অর্থনীতি’ তত্ত্বের প্রবক্তা; পূর্ব পাকিস্তানের রাজস্ব পাচারের অকাট্য গবেষণা প্রকাশ করায় পাকিস্তানি আমলারা তাঁকে ‘ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ও দিল্লি-ওয়াশিংটন অক্ষের পেইড তাত্ত্বিক’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করে।

৪৩. অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ (অর্থনীতিবিদ) (১৯৩৬–২০১২) — বরেণ্য অর্থনীতিবিদ ও ঢাবি শিক্ষক; পূর্ব পাকিস্তানের ওপর চরম অর্থনৈতিক বৈষম্যের খতিয়ান ডেটা দিয়ে তুলে ধরায় আইয়ুব আমলে ‘ভারতের তৈরি করা বানোয়াট তত্ত্ব ছড়ানোর দালাল’ তকমা দিয়ে কোণঠাসা করা হয়।

খান আবদুল গাফফার খান
খান আবদুল গাফফার খান
ছাত্র ও যুব নেতৃত্ব (ষাট ও সত্তরের দশকের আন্দোলন অনুযায়ী)

৪৪. অলি আহাদ (১৯২৮–২০১২) — ভাষা সংগ্রামী ও প্রবীণ রাজনীতিক; পাকিস্তানের মার্কিনপন্থী পররাষ্ট্রনীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে আপসহীন হওয়ায় ‘ভারতপন্থী চরমপন্থী’ আখ্যা দিয়ে প্রায় ৯ বছর কারারুদ্ধ করে রাখা হয়।

৪৫. সেলিন আখতার (ডলি আজাদ) (১৯erase২৮—নিশ্চিত নয়) — তৎকালীন জাতীয় পরিষদের প্রগতিশীল নারী সদস্য; সংসদে নারীদের অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা নিয়ে কথা বলায় ‘কলকাতার বামপন্থী নারী ও ভারতীয় সংস্কৃতির এজেন্ট’ অপবাদ দেওয়া হয়।

৪৬. গাজীউল হক (১৯২৯–২০০৭) — ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক আমতলার সভার সভাপতি; ১৪৪ ধারা ভাঙার আন্দোলনের কারণে মুসলিম লীগ সরকার পুরো বিষয়টিকে ‘ঢাকাকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার হিন্দুয়ানি ও কলকাতা-কেন্দ্রিক চক্রান্ত’ বলে তাঁকে ভারতের পেইড এজেন্ট ঘোষণা করে।

৪৭. সিরাজুল হোসেন খান (১৯২৬–২০০৭) — সাংবাদিক ও প্রগতিশীল ট্রেড ইউনিয়ন নেতা; সুতা ও চা-বাগানের শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন গড়ে তোলায় পাকিস্তানি মিল-মালিক ও জান্তা একে ‘পাকিস্তানের শিল্প ধ্বংসের ভারতীয় ছক’ হিসেবে ট্যাগ করে।

৪৮. গাজী গোলাম মোস্তফা (১৯৩২–১৯৭৯) — ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি; ঢাকার হরতাল ও গণআন্দোলন সফল করার মূল চালিকাশক্তি হওয়ায় পাকিস্তানি গোয়েন্দারা (ISI) প্রচার করে যে তিনি ‘ভারতের আগরতলা থেকে অবৈধ চোরাচালানি ফান্ড’ এনে দাঙ্গা উসকে দিচ্ছেন।

৪৯. ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম (১৯৩৭—বর্তমান) — তরুণ আইনবিদ ও মুজিবনগর সরকারের রূপরেখার ড্রাফটার; ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের সময় আইনি পরামর্শ দেওয়ায় পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দারা প্রচার করে যে তিনি ‘ভারতের সংবিধানের আদলে পাকিস্তান ভাঙার গোপন ফর্মুলা’ তৈরি করছেন।

৫০. কমরেড ফরহাদ (মোহাম্মদ ফরহাদ) (১৯৩৮–১৯৮৯) — সিপিবি-র সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও ছাত্রনেতা; প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলন গড়ে তোলায় পাকিস্তান সরকার তাঁকে ‘ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা র (RAW)-এর পেইড এজেন্ট’ হিসেবে হুলিয়া জারি করে।

৫১. শেখ ফজলুল হক মণি (১৯৩৯–১৯৭৫) — ছাত্র ও যুবনেতা, ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক; ৬ দফা আন্দোলন সফল করতে মাঠে ভূমিকা রাখায় আইয়ুব সরকার ‘ভারতের অর্থ ও অস্ত্র সহায়তায় পূর্ব পাকিস্তানে অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড চালানোর’ অভিযোগে বারবার কারারুদ্ধ করে।

৫২. এম. শামসুদ্দোহা (১৯৪০—বর্তমান) — আওয়ামী লীগের সাবেক प्रचार সম্পাদক ও সাংবাদিক; পাকিস্তানের আমলাতান্ত্রিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রবন্ধ লেখায় ‘ভারতের বুদ্ধিবৃত্তিক দালাল’ হিসেবে গোয়েন্দা নজরদারিতে থাকতেন।

৫৩. লুৎফর রহমান (১৯৪০—নিশ্চিত নয়) — প্রগতিশীল সাংবাদিক ও বার্তা কক্ষের চালিকাশক্তি; বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার কারণে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাঁকে ‘দিল্লি-মস্কো অক্ষের পেইড প্রোপাগান্ডিস্ট’ ও ভারতের দালাল হিসেবে হয়রানি করে।

৫৪. নূরে আলম সিদ্দিকী (১৯৪০–২০২৩) — একাত্তরের মার্চে ছাত্রলীগের সভাপতি ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা; স্বাধীন বাংলাদেশের রূপরেখা ও ছাত্র আন্দোলন চূড়ান্ত করায় ইয়াহিয়া জান্তা সরকারি রেডিওতে প্রচার করে যে এরা ‘ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা র (RAW)-এর অর্থ সহায়তায় রাজপথে নেমেছে’।

৫৫. সিরাজুল আলম খান (১৯৪১–২০২৩) — নিউক্লিয়াসের প্রধান তাত্ত্বিক ও ছাত্রনেতা; স্বাধীনতার গোপন সেল গঠনের কারণে আইয়ুব ও ইয়াহিয়া জান্তা একে ‘পাকিস্তানকে খণ্ডবিখণ্ড করার ভারতীয় র (RAW)-এর নিখুঁত চক্রান্ত’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করে তাঁর পেছনে হুলিয়া জারি রাখে।

৫৬. আবদুর রাজ্জাক (১৯৪২–২০১১) — ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও নিউক্লিয়াসের প্রধান; ছাত্রদের বৈপ্লবিক চেতনাকে স্তব্ধ করতে পাকিস্তানি এস্টাবলিশমেন্ট তাঁকে ‘ভারতের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিচ্ছিন্নতাবাদী চর’ আখ্যা দিয়ে ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৯ সালের মধ্যে বারবার গ্রেফতার করে।

৫৭. তোফায়েল আহমেদ (১৯৪৩—বর্তমান) — ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক ও ছাত্রনেতা; তাঁর নেতৃত্বে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে উঠলে সরকারি গণমাধ্যমে প্রচার করা হয় যে এই ছাত্রনেতারা ‘ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা এবং ভারতীয় কমিউনিস্টদের উস্কানিতে’ রাজপথে নেমেছে।

৫৮. অধ্যাপক আবু সাঈদ (১৯৪৩—বর্তমান) — ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে রাকসু-র ভিপি ও ছাত্রনেতা; ড. শামসুজ্জোহা হত্যার পর উত্তরবঙ্গে আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ায় সরকারি গোয়েন্দা রিপোর্টে তাঁকে ‘পশ্চিমবঙ্গের নকশাল ও ভারতীয় গোয়েন্দাদের কাছ থেকে উসকানি নেওয়া চর’ হিসেবে ট্যাগ করা হয়।

৫৯. আবদুর রাজ্জাক (সিলেট) (১৯৪০–২০২৪) — আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও সিলেটের নির্বাচিত গণপরিষদ সদস্য; ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের সময় সিলেট সীমান্ত অঞ্চলে আন্দোলন সংগঠিত করায় পাকিস্তানি গোয়েন্দারা (ISI) তাঁকে ‘সীমান্তের ওপার (ভারত) থেকে সরাসরি নির্দেশে কাজ করা চর’ হিসেবে নথিবদ্ধ করে।

৬০. কোরবানি আলী (১৯২৪–১৯৯২) — আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি ও প্রবীণ আইনজীবী; ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী মহকুমাগুলোতে ৬ দফার মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সংগঠিত করায় পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রামাণ্য দলিল ছাড়াই তাঁকে ‘ভারতের গোয়েন্দাদের নিয়মিত তথ্য সরবরাহকারী’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।

৬১. আ হ ম মুস্তফা কামাল (লোটাস কামাল) (১৯৪৭—বর্তমান) — সত্তরের দশকের ছাত্র ও যুব সংগঠক; ক্রীড়া ও যুব সমাজকে বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ করায় সরকারি গোয়েন্দা রিপোর্টে তাঁকে ‘ক্রীড়া সংস্কৃতির মোড়কে পাকিস্তানি যুবসমাজকে বিপথগামী করতে ভারত থেকে আসা গোপন ফান্ডিংয়ের চর’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল।

৬২. সেলিনা হোসেন (১৯৪৭—বর্তমান) — কথাশিল্পী, তৎকালীন বাংলা একাডেমির সাংস্কৃতিক কর্মী; রবীন্দ্রসঙ্গীত রক্ষা আন্দোলন এবং বাঙালি সংস্কৃতির পক্ষে সোচ্চার হওয়ায় তৎকালীন আইয়ুব-ইয়াহিয়া সরকার ও ডানপন্থীরা তাঁকে ‘ভারতীয় হিন্দুয়ানি সংস্কৃতির অন্ধ অনুসারী ও সাংস্কৃতিক দালাল’ হিসেবে ট্যাগ করে।

৬৩. শাহ আলী ফরহাদ (১৯৪০—নিশ্চিত নয়) — স্বাধিকার আন্দোলনের মাঠপর্যায়ের সংগঠক ও প্রচার কর্মী; প্রগতিশীল রাজনৈতিক লিফলেট বিতরণ ও বক্তৃতায় পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্য তুলে ধরায় অনুগত ডানপন্থী সংবাদমাধ্যমগুলো তাঁকে ‘ভারতের বুদ্ধিবৃত্তিক দালাল’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করে।

 

১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের মাধ্যমে গঠিত পূর্ববঙ্গ মন্ত্রীসভা
১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের মাধ্যমে গঠিত পূর্ববঙ্গ মন্ত্রীসভা। মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় (৩০ মে, ১৯৫৪) গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ বিশেষ ক্ষমতা (৯২-ক ধারা) প্রয়োগ করে এই জনপ্রিয় নির্বাচিত সরকার ভেঙে দেন এবং পূর্ব বাংলায় গভর্নর শাসন জারি করেন। তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী বগুড়া রেডিওতে দেওয়া এক জরুরি ভাষণে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হককে “ভারতের দালাল ও দেশদ্রোহী” হিসেবে আখ্যা দেন।

 

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের রাজনীতিতে ভারতের দালাল থিওরির শুভঙ্করের ফাঁকি

 

১. পাকিস্তান ও ‘এগজিসটেনশিয়াল থ্রেট’ বা অস্তিত্বের সংকট থিওরি

পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই দেশটির সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে একটি ‘অস্তিত্বের সংকট’ বা ‘এগজিসটেনশিয়াল থ্রেট’ (Existential Threat)-এর তত্ত্ব ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। শাসকগোষ্ঠী, বিশেষ করে দেশটির শক্তিশালী সামরিক জান্তা, দশকের পর দশক ধরে জনগণকে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয়েছে যে প্রতিবেশী ভারত যেকোনো মুহূর্তে তাদের গিলে ফেলবে। এই কৃত্রিম ভয়ের সংস্কৃতিকে এমনভাবে জাতীয়তাবাদের অংশ বানিয়ে ফেলা হয়েছে যে, রাষ্ট্রকে রক্ষা করার নামে যেকোনো যৌক্তিক প্রশ্ন তোলাকে সেখানে এক প্রকার দেশদ্রোহিতা হিসেবে গণ্য করা হয়।

অথচ ইতিহাস এবং বাস্তবতার দিকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ভারতের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের প্রতি এই তথাকথিত ‘অস্তিত্বের সংকট’ বা আগ্রাসনের ভয়টি সম্পূর্ণ ভুয়া এবং রাজনৈতিকভাবে সাজানো। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো, ভারত কখনোই আগে পাকিস্তানকে আক্রমণ করতে যায়নি, বরং পাকিস্তানই বারবার ভারতকে আক্রমণ করেছে। এই কাল্পনিক ভয়কে জনগণের চোখে বাস্তব দেখানোর নোংরা খেলাটি শুরু হয়েছিল ১৯৪৭ সালেই, যখন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের রাজনৈতিক সায় এবং মেজর জেনারেল আকবর খানের সামরিক ছকে ‘অপারেশন গুলমার্গ’ পরিচালনা করে ছদ্মবেশে কাশ্মীর দখল করতে পাঠানো হয়েছিল।

পরবর্তীতে পাকিস্তানের মসনদে বসা একেকজন শাসক নিজেদের গদি ও আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে এই একই আগ্রাসী উদ্যোগের পুনরাবৃত্তি করেছেন। ১৯৬৫ সালে আইয়ুব খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর হঠকারী ‘অপারেশন জিব্রাল্টার’ কিংবা ১৯৯৯ সালে জেনারেল পারভেজ মুশাররফের মরণকামড় ‘কারগিল যুদ্ধ’—সবগুলোই ছিল পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আগে নেওয়া সামরিক চাল। শুধু বড় বড় যুদ্ধই নয়, দুই দেশের সীমান্তে প্রতিনিয়ত একটা কৃত্রিম যুদ্ধাবস্থা বা উত্তেজনা জিইয়ে রাখতে যা যা করার দরকার, তার সবটাই করে এসেছে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী।

এই অবাস্তব ভয়ের সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় এবং নির্মম প্রভাব পড়েছে দেশটির বাজেট বরাদ্দে। পাকিস্তান ঐতিহাসিকভাবে তার জিডিপির (GDP) একটি বিশাল অংশ—গড়ে ৩ থেকে ৪ শতাংশ, যা অনেক সময় তার চেয়েও বেশি—ব্যয় করে এসেছে সামরিক খাতে। এর বিপরীতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের মতো মৌলিক মানবাধিকারের জায়গাগুলোতে বরাদ্দ থাকে ১ থেকে ২ শতাংশেরও নিচে। ফলস্বরূপ, দেশটির পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র বা অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান থাকলেও, কোটি কোটি শিশু শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত এবং সাধারণ মানুষ ন্যূনতম চিকিৎসা সুবিধা পাওয়ার জন্য হাহাকার করছে।

আসলে এই ‘ভয়ের অর্থনীতি’ স্রেফ কোনো ভুল নীতি নয়, এটি একটি সচেতন রাজনৈতিক কৌশল। পাকিস্তানের জেনারেল এবং সুযোগসন্ধানী রাজনীতিবিদরা খুব ভালো করেই জানেন যে, ভারতের সাথে যদি বৈরিতা বা কাশ্মীর ইস্যুর স্থায়ী সমাধান হয়ে যায়, তবে সমাজে সামরিক বাহিনীর এই একচ্ছত্র আধিপত্য এবং আকাশচুম্বী বাজেটের কোনো যৌক্তিকতা থাকবে না। নিজেদের ক্ষমতা, প্রিভিলেজ এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা টিকিয়ে রাখতেই তারা প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে ভারত-বিদ্বেষের আগুনকে সবসময় জ্বালিয়ে রাখে, যাতে জনগণ নিজের পেটের ভাতের কথা ভুলে সীমান্তের ওপারে শত্রু খুঁজতে ব্যস্ত থাকে।

এই দীর্ঘমেয়াদী ভুল অগ্রাধিকারের চূড়ান্ত খেসারত পাকিস্তান আজ হাতেনাতে দিচ্ছে। দেশটি এখন ঋণের জালে জর্জরিত, মুদ্রাস্ফীতি আকাশচুম্বী এবং অর্থনীতি এক প্রকার পঙ্গু। গত ৭০ বছরে ভারত-বিদ্বেষী প্রোপাগান্ডা আর আগে গিয়ে যুদ্ধ বাঁধানোর পেছনে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ অন্ধের মতো ওড়ানো হয়েছে, তার অর্ধেকও যদি মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিল্পায়ন আর প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ করা হতো, তবে আজ পাকিস্তানের অবস্থান এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ ও সম্মানিত অর্থনীতির কাতারে থাকত। বন্দুকের নল বা আগে গিয়ে আক্রমণ করা নয়, বরং নাগরিকদের সচ্ছলতাই যে রাষ্ট্রের আসল নিরাপত্তা—এই সত্যটি বুঝতে না পারাই পাকিস্তানের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।

 

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী

 

২. বাংলাদেশে ‘ভারতের দালাল’ কার্ড: অযোগ্যতা ঢাকার ঢাল

বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুরুর থেকেই ‘ভারত কার্ড’ বা কাউকে ‘ভারতের দালাল’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করা একটি অত্যন্ত পরিচিত কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখনই কোনো রাজনৈতিক দল বা সরকার জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে, যেমন—ভোটের অধিকার রক্ষা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ কিংবা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়, তখনই তারা জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরাতে এই কার্ডটি খেলে। নিজেদের প্রশাসনিক অযোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রগঠনের দূরদর্শিতার অভাব ঢাকতে প্রতিবেশীর জুজু বা ভয় দেখানো এদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে সস্তা অথচ কার্যকর ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

এই ভারত-বিদ্বেষী রাজনীতিকে আমজনতার কাছে জনপ্রিয় করতে এর সাথে সুকৌশলে ধর্মীয় সুড়সুড়ি এবং হিন্দু-বিদ্বেষকে মিলিয়ে দেওয়া হয়। একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী অনবরত প্রচার করতে থাকে যে, অমুক দল ক্ষমতায় থাকলে বাংলাদেশ ভারতের অঙ্গরাজ্য হয়ে যাবে কিংবা এদেশ থেকে ইসলাম বিপন্ন হবে। এমনকি পাশের দেশ ভারতে ঘটা বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক অপ্রীতিকর ঘটনাকে ঢাল বানিয়ে এদেশের রাজপথে বড় বড় র‍্যালি ও পেশিশক্তির মহড়া দেওয়া হয়, যা প্রকারান্তরে বাংলাদেশের নিজস্ব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর হওয়া অন্যায়-অত্যাচারকে এক ধরনের সামাজিক বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টা মাত্র। অথচ প্রকৃত ধর্ম বা দেশপ্রেম কখনোই অন্য কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি ঘৃণা ছড়াতে শেখায় না।

সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি হয় দেশের উন্নয়ন ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে। যেসব রাজনীতিবিদের কাছে দেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা টেকসই উন্নয়নের কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নেই, তারা জনগণকে সস্তা ‘দেশপ্রেম’ আর ‘সার্বভৌমত্ব রক্ষা’র ধোঁয়াশা তুলে সবসময় আবেগ তাড়িত করে রাখে। দেশের সাধারণ মানুষ যখন চায়ের কাপে কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিল্লির আধিপত্য বা সীমান্ত নীতি নিয়ে অন্তহীন তর্কে লিপ্ত থাকে, ঠিক সেই সুযোগে পর্দার আড়ালে দেশের ব্যাংকিং খাত ধ্বংস হয়ে যায়, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যায়।

জনগণের ক্ষোভ এবং ন্যায্য অধিকারের দাবিকে অন্যদিকে ডাইভার্ট করার বা ভুলিয়ে দেওয়ার এটি একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও ক্ল্যাসিক রাজনৈতিক কৌশল। যতদিন না এদেশের মানুষ এই সস্তা ডাইভারশন ট্যাকটিক বুঝতে পারবে এবং ফাঁকা স্লোগানের চেয়ে নিজেদের অধিকারের হিসাব মেলাতে শিখবে, ততদিন এই চতুর রাজনীতির শিকার আমাদের হতেই হবে।

মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু ১৯৫৩ সালে খালি পায়ে ভাষা শহীদদের স্মরণে প্রভাত ফেরীতে
মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু ১৯৫৩ সালে খালি পায়ে ভাষা শহীদদের স্মরণে প্রভাত ফেরীতে

 

৩. ঐতিহাসিক সত্য বনাম রাজনৈতিক মিথ: ভারত কি সত্যিই দখল করতে চায়?

রাজনীতিবিদরা প্রচারণা চালান যে ভারত আমাদের সার্বভৌমত্ব কেড়ে নেবে। কিন্তু ইতিহাস এবং ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে:

১৯৭১-এর সুযোগ:

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারতীয় বাহিনী এখানে অবস্থান করছিল। তারা চাইলে কয়েক বছর থাকতে পারত বা একটি পুতুল সরকার বসিয়ে রাখতে পারত। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে ১৯৭২ সালের মার্চ মাসের মধ্যেই ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশ ত্যাগ করে। পৃথিবীর ইতিহাসে এটি বিরল যে একটি বিজয়ী বাহিনী এত দ্রুত বন্ধু রাষ্ট্র ত্যাগ করেছে।

সিকিম বনাম বাংলাদেশ/পাকিস্তান:

সিকিমের অন্তর্ভুক্তিকে উদাহরণ হিসেবে টানা হলেও, বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের মতো বিশাল জনসংখ্যার এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ভূখণ্ড শাসন করা ভারতের জন্য হবে এক অর্থনৈতিক ও সামাজিক আত্মাহুতি। ভারত কখনোই এই দায়ভার নেবে না, কারণ এতে ভারতের নিজস্ব স্থিতিশীলতা নষ্ট হবে।

ভারতের প্রকৃত চাহিদা:

ভারত একটি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের কাছে কেবল নিরাপত্তা (Security) চায়। তারা চায় তাদের সেভেন সিস্টার্স (উত্তর-পূর্ব ভারত) এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। তারা চায় জঙ্গি অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে। তারা চায় প্রতিবেশীরা যেন তাদের দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় না দেয়।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত
ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত

 

৪. নদী, ট্রানজিট ও ভূখণ্ড: প্রয়োজনটা যুদ্ধের না নেগোসিয়েশনের?

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নদী, ট্রানজিট বা কানেক্টিভিটি নিয়ে যে টানাপোড়েন, তা কোনো একপাক্ষিক বিষয় নয়। বাস্তব সত্য হলো—বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের যেমন ভৌগোলিক কারণে ভারতকে প্রয়োজন, ঠিক একইভাবে ভারতের অর্থনীতি, ভূখণ্ড ও নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানকে অপরিহার্য। এই আঞ্চলিক সমীকরণটি কোনো অস্তিত্বের লড়াই বা যুদ্ধের বিষয় নয়, বরং এটি নিখাদ ‘ভূ-অর্থনৈতিক’ (Geo-economics) ও কৌশলগত নেগোসিয়েশনের ক্ষেত্র।

ভৌগোলিক বাস্তবতা ও অববাহিকা কূটনীতি

আমরা প্রাকৃতিকভাবেই একই নদী অববাহিকা এবং পরিবেশতন্ত্রের অংশ। হিমালয় থেকে নেমে আসা অভিন্ন নদীগুলোর পানির হিস্যা বা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বিপাক্ষিক দরকষাকষি একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়া।

দুর্ভাগ্যবশত, এই স্বাভাবিক নেগোসিয়েশনকে দেশীয় রাজনীতিতে ‘দেশ বিক্রি’ বা ‘সার্বভৌমত্ব হারানো’র মতো চরমপন্থী তকমা দিয়ে গুলিয়ে ফেলা হয়।

পানি বা সীমান্ত কোনো স্থায়ী দেয়াল নয়; উজানের দেশ হিসেবে ভারতের যেমন ভাটির দেশের প্রতি আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা আছে, তেমনি দ্বিপাক্ষিক বোঝাপড়ার মাধ্যমেই কেবল এই সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব, সংঘাতে নয়।

কানেক্টিভিটির দ্বি-পাক্ষিক সমীকরণ: কে কেন নির্ভরশীল?

কানেক্টিভিটি বা ট্রানজিট কখনোই ‘একতরফা দান’ নয়, এটি একটি উইন-উইন (Win-Win) চুক্তি। এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক গতিশীলতা বজায় রাখতে প্রত্যেকেই প্রত্যেকের ওপর নির্ভরশীল:

ভারতের কেন প্রয়োজন?

  • উত্তর-পূর্ব ভারত (North-East): ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) সহজ, দ্রুত ও সাশ্রয়ী যোগাযোগের জন্য বাংলাদেশের ভূখণ্ড ও বন্দর ব্যবহার করা ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
  • পশ্চিম ও মধ্য এশিয়া: পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে স্থলপথ উন্মুক্ত না হলে ভারতের পক্ষে আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে সরাসরি প্রবেশ করা ব্যয়বহুল ও জটিল।

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের কেন প্রয়োজন?

  • বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ: ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না পারলে বাংলাদেশের পক্ষে নেপাল ও ভুটানের মতো ল্যান্ডলকড (স্থলবেষ্টিত) দেশগুলোর সাথে সরাসরি বাণিজ্য এবং জলবিদ্যুৎ আমদানি করা অসম্ভব।
  • পাকিস্তানের দৃষ্টিকোণ: ভারতের আকাশসীমা বা স্থলপথ ব্যবহার করতে না পারায় পাকিস্তান ইতিমধ্যেই পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার (চীন, বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, জাপান) বিশাল বাজার থেকে একপ্রকার বিচ্ছিন্ন এবং অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পূর্ব এশিয়ার সাথে যুক্ত হতে পাকিস্তানের ভারতকে তীব্র প্রয়োজন।

ইউরোপের দেশগুলো যদি শত বছরের যুদ্ধ ও রক্তক্ষয়ী ইতিহাস ভুলে নিজেদের সীমানা উন্মুক্ত করে ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন’ গঠনের মাধ্যমে পৃথিবীর অন্যতম শীর্ষ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে, তবে দক্ষিণ এশিয়ায় কেন তা সম্ভব নয়?

দক্ষিণ এশিয়ার এই কানেক্টিভিটির ব্লকেড বা বাধাটি অর্থনৈতিক বা ভৌগোলিক নয়; এর মূল কারণ দশকের পর দশক ধরে রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে লালন করা মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল এবং ‘ঘৃণা উৎপাদন’। আঞ্চলিক দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে ওঠার চাবিকাঠি কোনো যুদ্ধের দামামায় নেই, তা লুকিয়ে আছে আলোচনার টেবিলে পারস্পরিক স্বার্থের পরিপক্ক নেগোসিয়েশনে।

জি. এম. সৈয়দ
জি. এম. সৈয়দ

 

৫. ঘৃণার অর্থনীতি: সাধারণ মানুষের পকেট যেভাবে কাটা হয়

রাজনীতিবিদরা যখন ‘ভারত-বিদ্বেষ’ বা ‘ভারতের দালাল’ কার্ড খেলেন, তখন পর্দার আড়ালে এক বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধিত হয়। এই ক্ষতির ভার শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণের কাঁধেই পড়ে।

বাজার ব্যবস্থার অস্থিরতা:

দক্ষিণ এশিয়ায় পণ্য পরিবহনের সবচেয়ে সহজ ও সস্তা মাধ্যম হলো প্রতিবেশী দেশের সাথে সুসম্পর্ক। কিন্তু রাজনীতির কারণে যখন সীমান্ত বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হয়, তখন পণ্য আমদানিতে খরচ বেড়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, ভারত থেকে পেঁয়াজ বা প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য আমদানিতে যখন ‘রাজনৈতিক টানাপোড়েন’ তৈরি হয়, তখন দেশের বাজারে হু হু করে দাম বাড়ে। দিনশেষে লাভ হয় একদল সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীর, আর পকেট কাটে সাধারণ মানুষের।

অস্ত্র প্রতিযোগিতা বনাম দারিদ্র্য বিমোচন:

পাকিস্তানের দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা ভারতের সাথে ছায়া যুদ্ধ (Proxy War) এবং সীমান্ত উত্তেজনা বজায় রাখতে গিয়ে নিজেদের দেউলিয়া করে ফেলেছে। পাকিস্তানের সামরিক বাজেটের মাত্র ১০ শতাংশ যদি তারা স্বাস্থ্য খাতে দিত, তবে দেশটির প্রতিটি নাগরিক বিনামূল্যে আধুনিক চিকিৎসা পেত। এই ‘কাল্পনিক শত্রু’র ভয় দেখিয়ে জনগণের টাকা দিয়ে কেনা হয় ট্যাঙ্ক আর মিসাইল, যা ক্ষুধার্ত পেটে অন্ন যোগাতে পারে না।

ড. কুদরাত-এ-খুদা
ড. কুদরাত-এ-খুদা

 

৬. প্রোপাগান্ডা ও ‘ডাইভারশন ট্যাকটিক’: জনগনের নজর ঘোরানোর কৌশল

দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোতে এটি একটি পরীক্ষিত ফর্মুলা। যখনই কোনো সরকার অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি বা দুঃশাসনে কোণঠাসা হয়ে পড়ে, তখনই তারা একটি ‘বাইরের শত্রু’ (External Enemy) তৈরি করে।

জাতীয়তাবাদের আফিম:

মানুষকে বলা হয়, “আমরা না খেয়ে থাকলেও সমস্যা নেই, কিন্তু সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হতে দেওয়া যাবে না।” এই আবেগ ব্যবহার করে জনগণের মৌলিক অধিকার—যেমন ভোট, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিতা কেড়ে নেওয়া হয়। মানুষ যখন ভারতকে গালি দেওয়া বা হিন্দুদের ওপর আক্রমণ করায় ব্যস্ত থাকে, তখন দুর্নীতিবাজ আমলা ও রাজনীতিবিদরা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করে দেয়।

শিক্ষা ব্যবস্থার সাম্প্রদায়িকীকরণ:

ঘৃণা টিকিয়ে রাখতে হলে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে শেখাতে হয় যে প্রতিবেশী দেশ আমাদের চিরশত্রু। পাঠ্যপুস্তকে ভুল ইতিহাস এবং সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ঢুকিয়ে দিয়ে এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করা হয়, যারা যুক্তির চেয়ে আবেগে বেশি চালিত। এতে দীর্ঘমেয়াদে দেশের মেধা ও মননশীলতা ধ্বংস হয়ে যায়।

আবদুল ওয়ালী খান
আবদুল ওয়ালী খান

 

৭. ভারত আসলে কী চায়? নিরাপত্তা বনাম আধিপত্য

রাজনীতিবিদরা প্রচারণা চালান যে ভারত আমাদের দখল করে নেবে। কিন্তু আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে ‘ভূমি দখল’ করার চেয়ে ‘অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

নিরাপদ সীমান্ত:

ভারতের প্রধান চাহিদা হলো তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) নিরাপত্তা। তারা চায় না বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের মাটি ব্যবহার করে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ভারতের ভেতরে হামলা চালাক। এটি যে কোনো রাষ্ট্রের জন্য একটি যৌক্তিক চাহিদা।

জঙ্গিবাদ দমন:

ভারত চায় তার প্রতিবেশী দেশগুলো যেন উগ্রবাদী ও জঙ্গিবাদী শক্তির চারণভূমি না হয়। কারণ প্রতিবেশী দেশের অস্থিরতা সরাসরি ভারতের ওপর প্রভাব ফেলে।

ট্রানজিট ও কানেক্টিভিটি:

ভারত চায় কম খরচে পণ্য পরিবহন। এটি একটি বাণিজ্যিক আদান-প্রদান হতে পারে। কিন্তু রাজনীতিবিদরা একে ‘দেশ বিক্রি’র তকমা দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করেন, যাতে দুই দেশের জনগণের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে না ওঠে। কারণ বন্ধুত্ব গড়ে উঠলে তাদের ‘ঘৃণার দোকান’ বন্ধ হয়ে যাবে।

কমরেড মণি সিংহ
কমরেড মণি সিংহ

 

৮. ইতিহাস ও বাস্তবতা: দখলের সুযোগ ভারত নেয়নি

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে প্রায়ই ভারতকে একটি ‘দখলদার’ বা ‘সাম্রাজ্যবাদী’ শক্তি হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু ইতিহাস এবং বাস্তবতার গভীর বিশ্লেষণ সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে। এর সবচেয়ে বড় এবং অকাট্য ঐতিহাসিক প্রমাণ হলো ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে ভারতীয় বাহিনী মিত্রবাহিনী হিসেবে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। যুদ্ধজয়ের পর একটি সদ্য স্বাধীন দেশের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তারা চাইলে আরও বহু বছর বাংলাদেশে অবস্থান করতে পারত বা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারত। কিন্তু দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার প্রতি সম্মান জানিয়ে, স্বাধীনতার মাত্র কয়েকমাসের মাথায়, ১৯৭২ সালের ১২ই মার্চ ভারতীয় সামরিক বাহিনী সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ছেড়ে চলে যায়।

একইভাবে পাকিস্তানের রাজনৈতিক মহলেও বারবার এই প্রচার চালানো হয় যে, ভারত তাদের রাষ্ট্রকে চিরতরে ধ্বংস বা দখল করতে চায়। অথচ ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, সংকটের চরম মুহূর্তেও ভারত এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর ১৯৭২ সালের ঐতিহাসিক শিমলা চুক্তির সময় পাকিস্তানের ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দী এবং বিস্তর ভূখণ্ড ভারতের হাতে থাকা সত্ত্বেও তারা আলোচনার টেবিলে সেগুলো ফেরত দিয়েছিল। এমনকি ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধের মতো তীব্র সংঘাতের সময়েও ভারত আন্তর্জাতিক সীমান্ত পার হয়ে পাকিস্তান ভূখণ্ড দখল করার কোনো চেষ্টা করেনি, বরং নিজেদের সীমানা সুরক্ষাতেই সীমাবদ্ধ ছিল।

আবেগ সরিয়ে যদি একদম ঠান্ডা মাথার বাস্তবতার দিকে তাকানো যায়, তবে বোঝা যাবে যে কোনো দেশের ভূখণ্ড সামরিক জোর খাটিয়ে দখল করা আর কোটি কোটি মানুষকে শাসন করা এক জিনিস নয়। পাকিস্তান বা বাংলাদেশের মতো বিশাল জনসংখ্যার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল শাসন করার চিন্তা করাও আধুনিক ভারতের জন্য একটি চরম আত্মঘাতী এবং অবাস্তব পরিকল্পনা। এমন এক বিশাল ও ঐতিহাসিকভাবে বৈরী জনসংখ্যাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা ভারতের নিজস্ব অর্থনীতি, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোকে চিরতরে ধসিয়ে দেবে। কোনো দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক বা কৌশলবিদ কখনোই এমন ফাঁদে পা দেবেন না।

তাই ভারতের আসল কৌশলগত লক্ষ্য কোনো আঞ্চলিক সাম্রাজ্য বিস্তার বা জমি দখল নয়, বরং তাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ভারত কেবল এটাই চায় যেন তাদের পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্ত অশান্ত না থাকে এবং সেখান থেকে কোনো ধরনের উগ্রবাদ, অস্থিতিশীলতা বা নিরাপত্তা হুমকি তাদের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে না পারে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো স্থিতিশীল এবং শান্ত থাকলেই ভারতের নিজস্ব অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে ওঠার পথ মসৃণ হয়—এই সরল ভূ-রাজনৈতিক সত্যটি বুঝলে শত্রুতার কাল্পনিক ভয় অনেকটাই কেটে যায়।

গাউস বক্স বিজেনজো
গাউস বক্স বিজেনজো

৯. শত্রুতার রাজনীতিতে – কার লাভ কার? কার ক্ষতি কার?

ভূ-রাজনৈতিক শত্রুতা এবং ‘ঘৃণার চাষ’ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ব্যবসা। যখন দুটি দেশের মধ্যে কৃত্রিম দেয়াল তুলে রাখা হয়, তখন পর্দার আড়ালে একদল মানুষ বিপুল মুনাফা লোটে, আর তার চড়া মূল্য চোকাতে হয় কোটি কোটি সাধারণ মানুষকে।

লাভটা আসলে কার?

শত্রুতার এই অন্তহীন বয়ান সমাজে এমন একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর জন্ম দেয়, যাদের অস্তিত্বই টিকে থাকে যুদ্ধের ভয়ে। এই ১% সুবিধাভোগী শ্রেণির মধ্যে রয়েছে:

  • অযোগ্য ও দূরদর্শিতাহীন রাজনীতিবিদ: যাদের নিজেদের দেশকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বা সুশাসন দেওয়ার মতো মেধা বা যোগ্যতা নেই, তারা জনগণের দৃষ্টি অন্য দিকে ঘোরাতে এই ‘শত্রুর ভয়’ নামক তাসটি খেলেন।
  • উগ্রপন্থী ও স্বার্থান্বেষী ধর্মীয় নেতা: যারা সমাজে ঘৃণার বিষবাষ্প ছড়িয়ে নিজেদের ধর্মীয় ও সামাজিক আধিপত্য বজায় রাখেন এবং মানুষকে যুক্তিহীন অন্ধত্বের দিকে ঠেলে দেন।
  • সামরিক আমলাতন্ত্র ও নীতিনির্ধারক: শত্রুতার অজুহাতে প্রতি বছর যে বিশাল সামরিক বাজেট পাস হয়, তার প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগী হন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা এবং সামরিক সংশ্লিষ্ট আমলারা।
  • মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স (সামরিক-শিল্প গোষ্ঠী): যুদ্ধ বা প্রতিরক্ষার নাম করে যারা অস্ত্র, গোলাবারুদ, লজিস্টিকস এবং নানা আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র সাপ্লাই দেয়, সেই কর্পোরেট সিন্ডিকেট ও ঠিকাদাররা।

বাস্তবতা হলো- এই সুবিধাভোগী চক্রটি দেশের মোট জনসংখ্যার একটা নগণ্য অংশ মাত্র। এরা ভালো থাকলে বা এদের পকেট ভারী হলে সাধারণ মানুষের ভাগ্য এক চুলও বদলায় না।

ক্ষতিটা কার?

এই সাজানো নাটকের একমাত্র এবং স্থায়ী বলি হলো দেশের ৯৯% সাধারণ মানুষ। তাদের ক্ষতিটা শুধু আর্থিক নয়, এটি তাদের পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দেয়:

  • মৌলিক অধিকারের বঞ্চনা: যে টাকাটা ব্যয় হতে পারত নতুন স্কুল-কলেজ নির্মাণে, আধুনিক হাসপাতাল তৈরিতে কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবারের ওপর ভর্তুকি দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণে—সেই ট্যাক্সের টাকা চলে যায় বোমারু বিমান আর ট্যাংক কিনতে।
  • মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব: সাধারণ মানুষকে এক কাল্পনিক যুদ্ধের নেশা এবং উগ্র জাতীয়তাবাদের আফিম খাইয়ে বুঁদ করে রাখা হয়। ফলে তারা নিজেদের অধিকার, বেকারত্ব বা অনাহার নিয়ে প্রশ্ন করতে ভুলে যায়।
  • জীবন ও জীবিকার অপচয়: শেষ পর্যন্ত সীমান্তে যদি কোনো সংঘাত বা যুদ্ধ বাধে, তবে এই সুবিধাভোগী এলিটদের সন্তানরা মারা যায় না; প্রাণ হারায় সাধারণ ঘরের সন্তানরা, যারা স্রেফ রুটি-রুজির তাগিদে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল।

শত্রুতার রাজনীতি হলো এমন এক অদ্ভুত জাঁতাকল, যেখানে ঘৃণা কেনা-বেচা করে গুটি কয়েক মানুষ প্রাসাদে থাকে, আর রাষ্ট্রকে রক্ষার এক কাল্পনিক মোহে পড়ে সাধারণ মানুষ নিজের বেঁচে থাকার অধিকারটুকুও হারিয়ে ফেলে।

মোতাহের হোসেন চৌধুরী
মোতাহের হোসেন চৌধুরী

 

১০. ছায়াযুদ্ধ ও উন্নয়নের বৈপরীত্য: কেন আমরা পিছিয়ে?

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি ও মানবউন্নয়নের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো—এখানকার রাষ্ট্রীয় বাজেট এবং নীতি নির্ধারিত হয় ‘জনগণের ভালো থাকার তাগিদে’ নয়, বরং এক ধরনের ‘কাল্পনিক ভয়ের সংস্কৃতি’ বা ‘ভারত-ভীতি’ (India-phobia) পুঁজি করে। প্রতিরক্ষা এবং গোয়েন্দা খাতের পেছনে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢালা হয়, তার বিপরীতে জনকল্যাণমূলক খাতের দিকে তাকালে এক ভয়াবহ বৈপরীত্য চোখে পড়ে।

পাকিস্তানের ট্র্যাজেডি: অস্ত্রের জাঁতাকলে পিষ্ট জনজীবন

দশকের পর দশক ধরে পাকিস্তান তার জিডিপির (GDP) সিংহভাগ ব্যয় করছে ভারতের সাথে এক অন্তহীন সামরিক ও পারমাণবিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে। একটি বিশাল সেনাবাহিনীকে লালন-পালন করতে গিয়ে দেশটি অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হওয়ার পথে।

এই সামরিক অহংকারের বিপরীতে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের ন্যূনতম সুপেয় পানি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা মানসম্মত শিক্ষার অধিকার নেই। অথচ ভারতের সাথে যদি পাকিস্তানের একটি পরিপক্ক ও স্থিতিশীল কূটনৈতিক-বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকত, তবে এই বিপুল সামরিক বাজেট জনকল্যাণে ও শিল্পায়নে ব্যয় হতে পারত। পাকিস্তান আজ ঋণগ্রস্ত দেশ না হয়ে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ‘ইকোনমিক টাইগার’ হতে পারত।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: স্লোগান বনাম প্রকৃত সার্বভৌমত্ব

একই ছায়ার প্রতিফলন কম-বেশি বাংলাদেশেও দেখা যায়। যখনই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বা অর্থনীতি সংকটে পড়ে, তখনই ‘ভারত-বিদ্বেষ’ বা ‘সার্বভৌমত্ব গেল’ নামক সস্তা আবেগটিকে পলিটিক্যাল এজেন্ডা হিসেবে সামনে আনা হয়।

আপনারা বাংলাদেশের ইতিহাসে তাকিয়ে দেখুন – হুজুগে মেতে জনগণের মৌলিক অধিকার, সুশাসন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি বা কর্মসংস্থানের মতো জরুরি দাবিগুলোকে আড়াল করে ‘সীমান্ত রক্ষা’ বা ভূ-রাজনৈতিক শোরগোলকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

রুড় ও বাস্তাব সত্যটা হলো – একটি দেশের আসল সার্বভৌমত্ব সীমান্তের কাঁটাতারে, বন্দুকের নলে কিংবা প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে দেওয়া ফাঁকা স্লোগানের মধ্যে থাকে না। দেশের প্রকৃত সার্বভৌমত্ব রক্ষা হয় তখনই, যখন তার প্রতিটি নাগরিক শিক্ষিত, সচেতন এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার শক্তি অর্জন করে।

যতক্ষণ পর্যন্ত এই অঞ্চলের রাজনীতি মানুষের ‘পেটের ভাতের’ চেয়ে সীমান্তের ওপার থেকে আসা কাল্পনিক শত্রুর ভয়কে বেশি লাভজনক মনে করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার সাধারণ মানুষ এক অন্ধকার ছায়াযুদ্ধের বলি হতেই থাকবে।

তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া
তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া

 

১১/ দক্ষিণ এশিয়ার ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন’ স্বপ্ন বনাম বিভাজনের দেয়াল

ইউরোপের দেশগুলো (যেমন জার্মানি ও ফ্রান্স) শত বছর ধরে একে অপরের সাথে যুদ্ধ করেছে। কিন্তু তারা একসময় বুঝতে পেরেছে যে যুদ্ধ করে কোনো জাতির পেট ভরে না। তারা তাদের সীমানা উন্মুক্ত করেছে, তৈরি করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU)।

বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান যদি নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যিক দেয়াল তুলে না রাখত, তবে আমরা একে অপরের কাছ থেকে সস্তায় বিদ্যুৎ, গ্যাস, খাদ্যপণ্য ও প্রযুক্তি নিতে পারতাম। কিন্তু রাজনীতিবিদরা জানেন, যদি এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে যায়, তবে জনগনের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে এবং তারা তখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলবে। তাই তারা চায় মানুষ যেন সব সময় ‘ভারত আমাদের গিলে ফেলবে’—এই আতঙ্কে থাকে।

বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী
বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী

১২/ ঘৃণা উৎপাদনের কারখানা: ধর্ম ও জাতীয়তাবাদের অপব্যবহার

যেসব রাজনীতিবিদের দেশের জিডিপি বাড়ানোর বা সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা নেই, তারা ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন।

ভারতের সাথে রাজনৈতিক দ্বন্দকে হিন্দু ধর্মের সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়। এতে দুই দেশের সংখ্যালঘু জনগন বড় ধরণের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। রাজনীতিবিদরা এই ঘৃণা উৎপাদন করেন যাতে সাধারণ মানুষ একে অপরের রক্ত পিপাসু হয়ে থাকে এবং শাসকগোষ্ঠী নির্বিঘ্নে দেশের সম্পদ লুট করে বিদেশে (কানাডা বা দুবাই) পাচার করতে পারে। দিন শেষে রাজনীতিবিদদের সন্তানরা ঠিকই বিদেশে সুখে থাকে, আর দাঙ্গায় বা অভাবের তাড়নায় মরে সাধারণ জনগন।

জহুর আহমদ চৌধুরী
জহুর আহমদ চৌধুরী

১৩/ চূড়ান্ত সত্য: ভারতের চাওয়া বনাম আমাদের লাভ

ইতিহাস এবং বর্তমানের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারত কখনোই পাকিস্তান বা বাংলাদেশ দখল করতে চায় না। কারণ:

সাংস্কৃতিক ও জনসংখ্যাগত ঝুঁকি:

ভারত নিজের অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য সামলাতেই হিমশিম খায়। তার ওপর বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের মতো বিশাল জনসংখ্যার এবং ভিন্ন মতাদর্শের ভূখণ্ড দখল করা ভারতের জন্য হবে আত্মঘাতী।

নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা:

ভারত কেবল চায় তার চারপাশের দেশগুলো যেন স্থিতিশীল থাকে। প্রতিবেশী দেশে অরাজকতা মানেই ভারতের সীমানায় শরণার্থী ও উগ্রবাদের চাপ। তাই ভারতের স্বার্থেই তারা চায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তান শক্তিশালী হোক, কিন্তু যেন ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি না হয়ে দাঁড়ায়।

শুভঙ্করের ফাঁকি থেকে মুক্তি

‘ভারতের দালাল’ বা ‘ভারত-বিদ্বেষী’ এই তকমাগুলো আসলে আমাদের আসল শত্রু নয়। আমাদের আসল শত্রু হলো দারিদ্র্য, অশিক্ষা, দুর্নীতি এবং জবাবদিহিতাহীন শাসনব্যবস্থা। রাজনীতিবিদরা যখন আমাদের শেখান যে ভারত আমাদের শত্রু, তখন তারা আসলে আমাদের বোঝাতে চান না যে—আমাদের প্রকৃত শত্রু আমাদের নিজেদের ঘরের ভেতরে থাকা দুর্নীতিবাজ শাসকগোষ্ঠী।

দক্ষিণ এশিয়ার জনগনের মুক্তি তখনই সম্ভব হবে যখন আমরা ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী সেন্টিমেন্টের ঊর্ধ্বে উঠে নিজেদের অর্থনৈতিক ও মানবিক অধিকার নিয়ে কথা বলব। ভারত-বিদ্বেষ বা হিন্দু-বিদ্বেষ ছড়িয়ে যারা রাজনীতি করতে চায়, তারা আসলে দেশের বন্ধু নয়; তারা নিজেদের ক্ষমতার ভাগ বাটোয়ারা নিশ্চিত করতে সাধারণ জনগনের ভবিষ্যৎকে জিম্মি করে রেখেছে। এই শুভঙ্করের ফাঁকি বোঝার সময় এখনই।

তথ্যসূত্র ও সহায়ক গ্রন্থ (Sources):

১/ The Battle for Pakistan: The Bitter Messenger and a Failed State – Shuja Nawaz: পাকিস্তানে সামরিক আধিপত্য ও ভারত-বিদ্বেষী রাজনীতির অর্থনৈতিক ক্ষতির বিস্তারিত বিশ্লেষণ।

২/ The Idea of Pakistan – Stephen P. Cohen: পাকিস্তান কেন ভারতকে একটি ‘অস্তিত্বের হুমকি’ হিসেবে দেখে এবং এর ফলে দেশটি কীভাবে পিছিয়ে পড়েছে তার বর্ণনা।

৩/ Against the Stream: India’s Foreign Policy in the 1970s – J.N. Dixit: বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ভারতের পিছু হটা এবং দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির নেপথ্য কাহিনী।

৪/ একাত্তরের ঘাতক ও দালালেরা কে কোথায় – মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্র: সাম্প্রদায়িক রাজনীতি কীভাবে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সম্প্রীতির ক্ষতি করে তার আলোচনা।

৫/ Foreign Policy of Bangladesh – Dr. Abdul Momén: বাংলাদেশের সাথে ভারতের নদীর পানি বণ্টন ও ট্রানজিট নিয়ে কূটনৈতিক দরকষাকষির নির্মোহ বিশ্লেষণ।

৬/ Why Nations Fail – Daron Acemoglu & James A. Robinson: কীভাবে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কাল্পনিক শত্রু তৈরি করে জনগনের সম্পদ লুট করে, তার বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক উদাহরণ।

৭/ The Discovery of India – Jawaharlal Nehru: দক্ষিণ এশিয়ার অখণ্ড ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের ওপর আলোকপাত।

৮/ Human Development in South Asia (Reports by Mahbub ul Haq Center): সামরিক ব্যয় বনাম শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়ের তুলনামূলক পরিসংখ্যান।

 

আরও দেখুন: