দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি এবং অর্থনীতিতে যে কয়েকটি বিষয় নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা, বিতর্ক এবং রাজনৈতিক কাদা-ছোড়াছুড়ি হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম শীর্ষস্থানে রয়েছে—“ভারত-বাংলাদেশ ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট”।
আমাদের দেশে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠী, বিশেষ করে বিএনপি-জামায়াত ও কট্টর ভারত-বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বছরের পর বছর ধরে একটি ন্যারেটিভ বা প্রচারণাকে জনগণের মগজে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তাদের মূল বক্তব্য ছিল—“ট্রানজিট দিলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব শেষ হয়ে যাবে, ফেনী নদী থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম বন্দর ভারত দখল করে নেবে, আর বাংলাদেশ পরিণত হবে ভারতের একটি অঙ্গরাজ্যে।” আজকে আমরা কোনো রাজনৈতিক চশমা না পরে, একদম বস্তুনিষ্ঠ তথ্য, অর্থনীতি এবং বাস্তবতার নিরিখে বোঝার চেষ্টা করব—আদৌ কি ট্রানজিট আমাদের সার্বভৌমত্ব গিলে খাচ্ছে, নাকি এটি বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক হাবে (Hub) পরিণত করার এক ঐতিহাসিক সুযোগ?
১. সহজ ভাষায় বুুঝি: ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট কী?
অনেকেই এই দুটি শব্দের মারপ্যাঁচে পড়ে মূল বিষয়টি বুঝতে ভুল করেন। খুব সহজ ও সাধারণ মানুষের ভাষায় এই দুটির পার্থক্য এবং বাংলাদেশের আয়ের উৎসগুলো বুঝে নেওয়া যাক:
ক. ট্রানজিট (Transit) — রাস্তার ভাড়া ও মাশুল থেকে আয়
ধরুন, ভারতের মূল ভূখণ্ডের (যেমন: কলকাতা) একটি পণ্যবাহী ট্রাক বাংলাদেশের সীমান্ত দিয়ে ঢুকে আমাদের দেশের রাস্তা ব্যবহার করে সরাসরি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য বা সেভেন সিস্টার্স-এ (যেমন: ত্রিপুরা বা আসাম) চলে গেল। অর্থাৎ, ভারতের গাড়ি আমাদের দেশের ওপর দিয়ে গিয়ে আবার ভারতে ফিরে গেল।
এখানে বাংলাদেশের আয় কীভাবে হয়?
অনেকে মনে করেন এতে বাংলাদেশের কোনো লাভ নেই, কিন্তু বাস্তবতা হলো ভারতের গাড়িটি বাংলাদেশের মাটিতে চাকা ঘোরানোর সাথে সাথেই নিচের খাতগুলোতে আমাদের আয় শুরু হয়ে যায়:
- রোড ইউজার চার্জ (Road User Charge): আমাদের মহাসড়ক ব্যবহারের জন্য ভারতকে প্রতি কিলোমিটার মেপে নির্দিষ্ট হারে রাস্তার ভাড়া বা টোল দিতে হয়।
- সীমান্ত ও প্রশাসনিক ফি: বাংলাদেশে ঢোকার সময় কাস্টমস সুপারভিশন ফি, ট্রান্সপোর্টেশন ফি এবং সিকিউরিটি ফি (নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাশুল) বাবদ নির্ধারিত টাকা দিতে হয়।
- স্থানীয় অর্থনীতিতে খরচ: ভারতের ট্রাক ড্রাইভার ও স্টাফরা বাংলাদেশের ভেতরে থাকাকালীন আমাদের দেশের হোটেল-রেস্তোরাঁয় খাওয়া-দাওয়া করবে, গাড়িতে জ্বালানি (তেল/গ্যাস) কিনবে এবং কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি হলে আমাদের ওয়ার্কশপ ব্যবহার করবে। এতে আমাদের স্থানীয় অর্থনীতি সরাসরি চাঙ্গা হয়।
খ. ট্রান্সশিপমেন্ট (Transshipment) — দ্বিগুণ আয় ও বিশাল কর্মসংস্থান
এখানে একটু পার্থক্য আছে। ভারতের পণ্যবাহী গাড়ি বা জাহাজ বাংলাদেশের সীমান্তে বা বন্দরে (যেমন: চট্টগ্রাম বা মোংলা পোর্ট) আসবে। এরপর সেই পণ্যগুলো আমাদের দেশের নিজস্ব ট্রাকে বা জাহাজে খালাস (unload) করা হবে। আমাদের দেশি পরিবহন সেই পণ্যগুলোকে বাংলাদেশের অন্য প্রান্তে নিয়ে যাবে এবং সেখানে আবার ভারতের গাড়িতে তুলে দেওয়া হবে।
এখানে বাংলাদেশের আয় কীভাবে হয়?
ট্রান্সশিপমেন্টে বাংলাদেশের আয় ট্রানজিটের চেয়েও অনেক বেশি। কারণ এখানে পুরো প্রক্রিয়াটিতে বাংলাদেশের মানুষ সরাসরি কাজ পায়:
বন্দরের ফি: ভারতের জাহাজ আমাদের চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দর ব্যবহার করায় বড় অঙ্কের ‘পোর্ট ডিউজ’, ‘পাইলটেজ ফি’ এবং ‘বার্থিং চার্জ’ সরাসরি আমাদের সরকারি তহবিলে জমা হয়।
দেশি পরিবহনের ভাড়া: যেহেতু ভারতের ট্রাক দেশের ভেতরে ঢুকছে না, তাই পণ্য টানার পুরো ভাড়ার টাকাটা পান বাংলাদেশের ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মালিক এবং নৌপথের লাইটারেজ জাহাজের মালিকেরা।
শ্রমিকদের মজুরি: বন্দরে এবং সীমান্তে পণ্য খালাস ও পুনরায় লোড করার জন্য শত শত বাংলাদেশি কুলি ও ঘাট-শ্রমিক সরাসরি মজুরি পান।
ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়ার্ডিং (C&F): এই পুরো কাগজের কাজ ও লজিস্টিকস সামলানোর জন্য বাংলাদেশের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা মোটা অঙ্কের কমিশন বা ফি পেয়ে থাকেন।
২. রাজনৈতিক ন্যারেটিভ বনাম বাস্তবতার ব্যবচ্ছেদ
বিএনপি-জামায়াত ও অন্যান্য ভারত-বিরোধী দলগুলো যে ভয় বা অপপ্রচারগুলো ছড়ায়, তার বিপরীতে বাস্তব তথ্য কী বলে? আসুন পয়েন্ট আকারে দেখে নিই:
অপপ্রচার ১: “বাংলাদেশ কোনো মাশুল বা ফি পাচ্ছে না, ভারতকে বিনামূল্যে রাস্তা দেওয়া হচ্ছে।”
বাস্তবতা: এটি সম্পূর্ণ অসত্য ও ভিত্তিহীন তথ্য। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী, ভারত কোনো পণ্য বাংলাদেশের ওপর দিয়ে নিলে প্রতি মেট্রিক টনে নির্দিষ্ট হারে ‘রুট চার্জ’, ‘ডকুমেন্টেশন ফি’, ‘সিকিউরিটি ফি’ এবং ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ফি’ দিতে বাধ্য। এছাড়া চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত পোর্ট ডিউজ ও পাইলটেজ ফি রয়েছে।
সবচেয়ে বড় কথা, ট্রান্সশিপমেন্টের ফলে পণ্য পরিবহনের জন্য বাংলাদেশের নিজস্ব ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান এবং লাইটারেজ জাহাজ ব্যবহার করতে হচ্ছে। এর ফলে আমাদের দেশের পরিবহন মালিক, চালক, এবং ঘাট শ্রমিকরা সরাসরি লাভবান হচ্ছেন।
অপপ্রচার ২: “ভারতের ভারী গাড়ি চলাচলের কারণে বাংলাদেশের রাস্তাঘাট ধ্বংস হয়ে যাবে।”
বাস্তবতা: আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো ট্রানজিট রুটে গাড়ির সর্বোচ্চ এক্সেল লোড (Axle Load) বা ওজন সীমা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বাংলাদেশ সড়ক ও জনপথ বিভাগ ভারতের পণ্যবাহী ট্রাকের জন্য সুনির্দিষ্ট ওজন সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। তাছাড়া, ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট থেকে প্রাপ্ত ফিজের একটি বড় অংশ আমাদের সড়ক ও অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের কাজেই ব্যয় করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
অপপ্রচার ৩: “সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়বে, ভারত এই পথে অস্ত্র বা সেনা পাচার করবে।”
বাস্তবতা: ট্রানজিট রুটে চলাচলকারী প্রতিটি ভারতীয় কনটেইনার এবং কার্গো বাংলাদেশের কাস্টমস (Customs) এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর নজরদারির মধ্য দিয়ে যায়। বাংলাদেশের সীমান্ত ও বন্দরগুলোতে আধুনিক স্ক্যানার বসানো হয়েছে। বাংলাদেশের অনুমতি ছাড়া কোনো পণ্য বা কনটেইনার আমাদের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে পারে না। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, ট্রানজিট সুবিধা কখনোই কোনো দেশের সামরিক উদ্দেশ্যে (সৈন্য বা অস্ত্র পারাপার) ব্যবহার করা যায় না এবং বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।
৩. বাংলাদেশের আসল লাভ কোথায়? (The Economic Reality)
একটি দেশ তখনই অর্থনৈতিকভাবে পরাশক্তি হয়ে ওঠে, যখন সে নিজেকে একটি ভৌগোলিক কানেক্টিভিটি হাব (Connectivity Hub) হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে। সিঙ্গাপুর বা দুবাইয়ের আজকের যে জৌলুস, তার মূল ভিত্তি কিন্তু তেল বা প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, বরং তাদের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হওয়া।
ভারত-বিরোধী রাজনৈতিক অপপ্রচারে সবসময় দেখানো হয় শুধু ভারতই সুবিধা নিচ্ছে। কিন্তু সত্য হলো, বাংলাদেশ অলরেডি ভারতের ভূখণ্ড এবং তাদের বিমানবন্দর ব্যবহার করে থার্ড কান্ট্রিতে (ইউরোপ-আমেরিকায়) পণ্য রপ্তানির বিশাল ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা ভোগ করছে।
বাংলাদেশ যদি নিজের স্বার্থ শতভাগ বজায় রেখে এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে, তবে আমাদের সামনে কী কী লাভ আসবে? আসুন বাস্তব চিত্রটি দেখি:
ক. দিল্লি এয়ারপোর্ট ব্যবহার করে গার্মেন্টস রপ্তানি
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক বা গার্মেন্টস পণ্য বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ট্রাকে করে সরাসরি ভারতের দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চলে যায়। সেখান থেকে কার্গো ফ্লাইটে করে আমাদের গার্মেন্টস পণ্য সরাসরি ইউরোপ ও আমেরিকায় পৌঁছায়। আমাদের ঢাকা বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে যখন অতিরিক্ত জট তৈরি হয় কিংবা কোনো সংকটের কারণে সরাসরি বুকিং পাওয়া যায় না, তখন ভারতের দেওয়া এই ট্রান্সশিপমেন্ট রুটটি আমাদের গার্মেন্টস ব্যবসায়ীদের কোটি কোটি টাকার লোকসান থেকে বাঁচিয়ে দেয়। কম খরচে এবং দ্রুততম সময়ে পণ্য পশ্চিমা বিশ্বে পাঠানোর জন্য এটি আমাদের রপ্তানি খাতের জন্য একটি মস্ত বড় আশীর্বাদ।
খ. উত্তরবঙ্গের মরা অর্থনীতিতে প্রাণের সঞ্চার (নেপাল-ভুটান কানেক্টিভিটি)
এই ট্রানজিট বা কানেক্টিভিটি কিন্তু একতরফা নয়, এটি একটি দ্বিমুখী রাস্তা। ভারতের ওপর দিয়ে ট্রানজিট সুবিধা পাওয়ার ফলেই নেপাল ও ভুটানের সাথে বাংলাদেশের সরাসরি যোগাযোগের ঐতিহাসিক পথ উন্মুক্ত হয়েছে।
ভারতের ভূখণ্ড (শিলিগুড়ি করিডোর বা চিকেনস নেক) ব্যবহার করে বাংলাদেশের পণ্যবাহী ট্রাক সরাসরি নেপাল ও ভুটানে যাচ্ছে এবং তাদের পণ্য আমাদের দেশে আসছে।
পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা বা কুড়িগ্রামের সোনাহাট স্থলবন্দর দিয়ে স্থলবেষ্টিত দেশ নেপাল ও ভুটান এখন বাংলাদেশের মোংলা ও চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য করার সুযোগ পাচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের অবহেলিত জেলাগুলোতে নতুন নতুন লজিস্টিক হাব, ব্যবসা ও হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে।
গ. আমাদের নিজস্ব বন্দরের আয় বৃদ্ধি
চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর এতদিন শুধু বাংলাদেশের নিজস্ব আমদানি-রপ্তানির কাজে ব্যবহৃত হতো। এখন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) বিশাল বাজারের পণ্য আমাদের বন্দর ব্যবহার করায় বন্দরের রাজস্ব আয় বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। যে অবকাঠামো আমাদের অলরেডি আছে, তা থেকে বাড়তি কোনো খরচ ছাড়াই স্রেফ লজিস্টিকস ও হ্যান্ডলিং ফি বাবদ কোটি কোটি বৈদেশিক মুদ্রা আমাদের সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে।
ঘ. ব্লু ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতির বিকাশ
আমাদের কোস্টাল বা উপকূলীয় জাহাজ চলাচল এবং অভ্যন্তরীণ নৌপথগুলো এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তির কারণে সচল হচ্ছে। কলকাতা থেকে আশুগঞ্জ কিংবা মোংলা হয়ে আসাম পর্যন্ত নৌ-রুট সচল হওয়ার ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন খাতে বিশাল দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আসছে, যা আমাদের নদীমাতৃক অর্থনীতিকে এক নতুন গতি দিচ্ছে।
এই কানেক্টিভিটি কোনো একতরফা দান নয়। ভারত যেমন তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যাওয়ার জন্য আমাদের পথ ব্যবহার করছে, বাংলাদেশও ঠিক একইভাবে ভারতের মাটি ও বিমানবন্দর ব্যবহার করে বিশ্ববাজারে নিজেদের ব্যবসা বড় করছে এবং নেপাল-ভুটানের মতো নতুন বাজার লুফে নিচ্ছে। এটি একটি শতভাগ ‘উইন-উইন’ (Win-Win) বা পারস্পরিক লাভের অর্থনৈতিক সমীকরণ।
৪. ভূরাজনীতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার সমীকরণ
রাজনীতিতে একটা কথা খুব প্রচলিত আছে—“আপনি আপনার বন্ধু বদলাতে পারেন, কিন্তু প্রতিবেশী নয়।” দক্ষিণ এশিয়ার মতো একটি জটিল ও সংবেদনশীল অঞ্চলে শান্তি ও স্থায়িত্ব বজায় রাখার জন্য ‘অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরশীলতা’ (Economic Interdependence) অত্যন্ত জরুরি। যখন দুটি প্রতিবেশী দেশ একে অপরের অর্থনৈতিক স্বার্থের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যায়, তখন তাদের মধ্যে যুদ্ধ বা বড় ধরণের সংঘাতের সম্ভাবনা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। কারণ, তখন যুদ্ধ মানে শুধু সীমানার লড়াই নয়, যুদ্ধ মানে নিজেদেরই বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির ধ্বংস।
এই সমীকরণে বাংলাদেশ কিন্তু কোনো দুর্বল পক্ষ নয়, বরং আমাদের ভৌগোলিক অবস্থানই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করা ভারতের জন্য একটি অপরিহার্য বিষয়। আর ঠিক এই জায়গাতেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের আসল ভূরাজনৈতিক শক্তি বা কূটনৈতিক চাবিকাঠি।
কূটনৈতিক অস্ত্র বা ‘ডিপ্লোম্যাটিক লিভারেজ’
অনেকে মনে করেন ট্রানজিট দিয়ে বাংলাদেশ ভারতের কাছে নতজানু হয়ে পড়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনীতির টেবিল অন্য কথা বলে। এই ট্রানজিট সুবিধাকে বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ‘ডিপ্লোম্যাটিক লিভারেজ’ (Diplomatic Leverage) বা কূটনৈতিক দরকষাকষির চাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। টেবিলে যখন ভারতের একটি বড় স্বার্থ আমাদের হাতে থাকবে, তখন বাংলাদেশ অনেক বেশি বুক ফুলিয়ে নিজের দাবিগুলো আদায় করতে পারবে। যেমন:
- তিস্তা ও অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন: ভারতের সাথে আমাদের অর্ধশতাধিক অভিন্ন নদী রয়েছে। তিস্তাসহ অন্যান্য নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের আলোচনায় এই ট্রানজিট সুবিধা আমাদের জন্য একটি বড় ট্রাম্পকার্ড।
- সীমান্ত হত্যা বন্ধ: সীমান্তকে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ রাখা এবং বিএসএফ-এর অনাকাঙ্ক্ষিত সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার দাবিতে ভারতকে আন্তর্জাতিক আইন মানতে বাধ্য করার জন্য এই দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক নির্ভরতা একটি বড় চাপ হিসেবে কাজ করে।
- বাণিজ্যিক ভারসাম্য ও শুল্কমুক্ত সুবিধা: ভারতের বিশাল বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের (যেমন: টেক্সটাইল, ওষুধ ও পাটজাত পণ্য) শুল্কমুক্ত ও নিরবচ্ছিন্ন প্রবেশাধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে এই ট্রানজিট রুটটি একটি চমৎকার দরকষাকষির মাধ্যম।
ট্রানজিট কোনো দাসত্ব নয়, এটি হলো একবিংশ শতাব্দীর স্মার্ট কূটনীতি। যেখানে আমরা ভারতকে একটি সুবিধা দিচ্ছি, কিন্তু তার বিনিময়ে আমাদের নিজেদের রাষ্ট্রীয়, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থগুলো কড়ায়-গণ্ডায় উসুল করে নেওয়ার ক্ষমতা নিজেদের হাতে রাখছি। চাবি যখন আমাদের হাতে, তখন ভয় পাওয়ার কিছু নেই, বরং সেই চাবি দিয়ে কীভাবে নিজেদের ভাগ্য বদলানো যায়—সেটাই হওয়া উচিত আমাদের মূল লক্ষ্য।
৫. কেন এই অন্ধ বিরোধিতা?
এতসব অর্থনৈতিক হিসেব-নিকেশ আর দ্বিপাক্ষিক লাভের খতিয়ান দেখার পর স্বাভাবিকভাবেই মনে একটি বড় প্রশ্ন জাগে—তাহলে দেশের একটি বড় রাজনৈতিক পক্ষ কেন এই ট্রানজিটের বিরুদ্ধে এত তীব্র বিষোদগার করে? কেন সাধারণ মানুষের মনে “দেশ বিক্রি হয়ে গেল” নামক একটা কাল্পনিক ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়?
এর উত্তর কোনো অর্থনৈতিক থিওরিতে নেই, এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের দেশের “পোলারাইজড” বা চরম মেরুকরণের নোংরা রাজনীতিতে।
আমাদের দেশের রাজনৈতিক বাজারে একটা চিরন্তন ফর্মুলা আছে—যখনই কোনো দল জনসমর্থনে পিছিয়ে পড়ে বা সুনির্দিষ্ট কোনো ইস্যু খুঁজে পায় না, তখনই তারা “সস্তা দেশপ্রেম” এবং “ধর্মীয় আবেগ” বিক্রি করা শুরু করে। আর এই আবেগ বিক্রির সবচেয়ে সহজ এবং আদিম হাতিয়ার হলো “ভারত-বিরোধিতা”। কোনো একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ভালো-মন্দ বিচার না করে, লাইনে লাইনে কী লাভ-ক্ষতি আছে তা খতিয়ে না দেখে, স্রেফ সেটি ভারতের সাথে করা হয়েছে বলেই তার বিরুদ্ধে রাজপথে দাঁড়িয়ে যাওয়া—এটি এক ধরণের সস্তা রাজনৈতিক দেউলিযাত্ব ছাড়া আর কিছুই নয়।
অতীতের ভুল ও তার খেসারত
ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা এর একটি বড় প্রমাণ পাই। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত যখন বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় ছিল, তখন তারা হীন রাজনৈতিক স্বার্থ ও ভারত-বিদ্বেষী ন্যারেটিভ বজায় রাখতে ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়নি। এমনকি সাউথ এশিয়ান ফ্রি ট্রেড এরিয়া (SAFTA) বা আঞ্চলিক যোগাযোগের অনেক বড় বড় প্রস্তাব তারা স্রেফ টেবিল থেকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল।
এর ফলাফল কী হয়েছিল?
ভারত তো আর থেমে থাকেনি, তারা তাদের নিজস্ব বিকল্প পথ উন্নত করেছে। কিন্তু খেসারত দিতে হয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে। আমরা যদি তখন বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে নিজেদের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগাতে পারতাম, তবে গত ২০ বছরে আমাদের বন্দর, পরিবহন ও উত্তরবঙ্গের অর্থনীতি আজ আরও শতগুণ শক্তিশালী অবস্থানে থাকত। রাজনৈতিক জেদের কারণে আমরা কোটি কোটি ডলারের রাজস্ব আয় থেকে নিজেদের বঞ্চিত করেছি।
বিচ্ছিন্ন দ্বীপের যুগ শেষ
আজকের একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক বাস্তবতায় কোনো দেশই নিজেকে পাঁচিল দিয়ে ঘিরে একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ বানিয়ে রাখতে পারে না। আজকে চীন ও তাইওয়ানের মধ্যে এত রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাত, অথচ তাদের নিজেদের মধ্যকার বার্ষিক বাণিজ্য শত বিলিয়ন ডলারের! ইউরোপের দিকে তাকালে দেখা যায়, এক সময়কার চরম শত্রু জার্মানি আর ফ্রান্সের সীমান্ত এখন উন্মুক্ত, তাদের ট্রেন ও ট্রাক একে অপরের বুক চিরে অনায়াসে যাতায়াত করছে। তারা কেউই “দেশ বিক্রি” হয়ে যাওয়ার সস্তা ভয়ে নিজেদের অর্থনীতিকে জিম্মি করে রাখেনি।
আমাদের দেশেও এই অন্ধ রাজনৈতিক জুজু এবং অপপ্রচারের মেয়াদ শেষ হওয়া দরকার। ট্রানজিট বা ট্রান্সশিপমেন্ট কোনো দল বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নীতি এবং আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার একটি বড় চালিকাশক্তি। সস্তা রাজনৈতিক প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হয়ে আমাদের চোখ রাখতে হবে দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দিকে।
সার্বভৌমত্ব কি গেল?
সবচেয়ে বড় যে জুজুটি আমাদের রাজনীতিতে খেলা হয়, তা হলো—”সার্বভৌমত্ব গেল, দেশ ভারতের অংশ হয়ে গেল!”
কিন্তু একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবুন তো, একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের মানচিত্র বা সার্বভৌমত্ব কি কোনো কাঁচের তৈরি সস্তা খেলনা, যে অন্য দেশের একটা সিলগালা করা ট্রাক আমাদের হাইওয়ে দিয়ে গেলেই তা ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে? মোটেও না। সার্বভৌমত্ব এত ভঙ্গুর কোনো জিনিস নয়। একটি দেশের সার্বভৌমত্ব আসলে টিকে থাকে এবং রক্ষা পায় সেই দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড, দক্ষ ও চতুর কূটনীতি এবং শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতার ওপর।
আসুন একটু বৈশ্বিক বাস্তবতার দিকে চোখ ফেরাই। ইউরোপের মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়—জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি বা পোল্যান্ডের সীমান্তগুলো কার্যত উন্মুক্ত। প্রতিদিন হাজার হাজার ভিনদেশি ট্রাক, লরি আর মালবাহী ট্রেন এক দেশের বুক চিরে অন্য দেশে অনায়াসে চলে যাচ্ছে। কেউ কারও কাস্টমসের অনুমতি ছাড়া পণ্য খালাস করতে পারছে না। এতে কি জার্মানি বা ফ্রান্সের সার্বভৌমত্ব নষ্ট হয়ে গেছে? তারা কি একে অপরের গোলাম হয়ে গেছে? একেবারেই না! বরং এই মুক্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণেই ইউরোপ আজ পৃথিবীর অন্যতম সবচেয়ে ধনী এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ আজ আর ১৯৭১ বা ১৯৭৫ সালের সেই যুদ্ধবিধ্বস্ত, তলাবিহীন ঝুড়ি কিংবা ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশ নয়। চার-পাঁচ দশক আগের সেই দুর্বলতা কাটিয়ে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল এবং উদীয়মান এক অর্থনৈতিক শক্তি। পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে শুরু করে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করা বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখেছে।
তাই কোনো ভিনদেশি ট্রাক আমাদের রাস্তা ব্যবহার করলে আমাদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই, বরং বুক ফুলিয়ে কড়া গণ্ডায় তার ভাড়া ও মাশুল উসুল করার আত্মবিশ্বাস আমাদের থাকতে হবে।
এখন সময় এসেছে এই রাজনৈতিক জুজু, সস্তা দেউলিয়াত্ব আর অপপ্রচারের ভয় কাটিয়ে ওঠার। একটি আধুনিক, প্রগতিশীল ও আত্মবিশ্বাসী নেশন বা জাতি হিসেবে আমাদের উচিত নিজেদের এই অনন্য ভৌগোলিক অবস্থানকে (Geographical Advantage) সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক ফায়দায় রূপান্তর করা।
একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক রাজনীতির মূল মন্ত্রই হলো আঞ্চলিক যোগাযোগ বা কানেক্টিভিটি। যে দেশ যত বেশি কানেক্টেড, সে দেশ তত বেশি সমৃদ্ধ। আর ভূরাজনীতির এই বিশাল দাবা খেলায় বাংলাদেশ কোনো সাধারণ ঘুঁটি নয়, বাংলাদেশ হলো এই অঞ্চলের কানেক্টিভিটির মূল চাবিকাঠি এবং কেন্দ্রবিন্দু। চাবি যখন আমাদের হাতে, তখন ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই; বরং এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের বুকে এক সমৃদ্ধ ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক আমাদের লক্ষ্য।
আরও দেখুন:
