শিক্ষা কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক পণ্য নয়, এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। সংবিধানে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা দেওয়া হলেও, রাষ্ট্র একাই উচ্চশিক্ষার শতভাগ চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। এই বাস্তবতায় দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকাশ ঘটেছে। রাষ্ট্র যেখানে আসন স্বল্পতার কারণে ব্যর্থ, সেখানে অভিভাবকেরা নিজস্ব অর্থায়নে সন্তানদের উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করছেন।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল এবং ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির ওপর সাড়ে সাত শতাংশ (৭.৫%) হারে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) এই সিদ্ধান্তের ফলে উচ্চশিক্ষার খরচ এক ধাক্কায় কিছুটা বেড়ে গেছে, যা অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের বাজেটে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। এতে করে অনেক অভিভাবক যেমন সন্তানের পড়াশোনার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন, তেমনি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা সাময়িক বিঘ্নিত হওয়ার একটি অনাকাঙ্ক্ষিত শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেশী দেশ ভারতের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানেও শিক্ষার ওপর এমন কর আরোপের চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু তীব্র আপত্তির মুখে সরকার তা পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হয়।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে বেসরকারি খাতের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়। বর্তমানে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সীমিত আসনের বাইরে, উচ্চশিক্ষার প্রায় ৬৩ শতাংশ শিক্ষার্থীই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (UGC) তথ্যমতে, এই বিশাল জনগোষ্ঠীর শিক্ষার দায়িত্ব যদি আজ সরকারকে নিতে হতো, তবে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হতো। সেই হিসাবে, এই শিক্ষার্থীরা করদাতাদের টাকার ওপর নির্ভর না করে নিজেদের খরচে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন করছে।
অথচ এই স্পর্শকাতর বিষয়ে মাননীয় অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য কিছুটা দ্বিমুখী। এক বক্তব্যে তিনি বলছেন, যারা হাজার হাজার টাকা বেতন দিতে পারে, তারা সামান্য ভ্যাট কেন দিতে পারবে না? আবার অন্য একটি বক্তব্যে শিক্ষাকে বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর প্রতি কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন।
এখানেই মূলত আইনি ও কাঠামোগত দ্বন্দ্বটি দৃশ্যমান হয়। ১৯৯২ সালের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, এই প্রতিষ্ঠানগুলো হবে সম্পূর্ণ ‘অলাভজনক ও সেবামূলক’। ফলে শিক্ষার্থীদের ওপর সরাসরি ভ্যাট আরোপ করা সাংবিধানিক চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক। কাগজে-কলমে বলা হচ্ছে এই ভ্যাট দেবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, কিন্তু কৌশলে এর পুরো বোঝা আলটিমেটলি গিয়ে পড়ছে ছাত্র-ছাত্রীদের কাঁধেই। কারণ, ২০১০ সালের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের কিছু শব্দ ও ভাষার কৌশলগত পরিবর্তনের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো খরচ ও স্থায়িত্ব শিক্ষার্থীর ফি’র ওপরই নির্ভরশীল করে তোলা হয়েছে। ফলে পরোক্ষভাবে এই ভ্যাটের বোঝা শিক্ষার্থীদের ওপরেই বর্তায়।
ভ্যাট আরোপের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা এখন রাজপথে নেমেছে, যা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও জনভোগান্তি তৈরি করছে। তবে এই সংকটের দুটি ভিন্ন দিক আমাদের একটু গুরুত্ব সহকারে তলিয়ে দেখতে হবে:
প্রথমত: ‘শিক্ষার ওপর ভ্যাট আরোপ করা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না’—এই মর্মে মহামান্য হাইকোর্টে ইতিমধ্যেই রিট পিটিশন দায়ের করা হয়েছে এবং আদালতও রুল জারি করেছেন। বিষয়টি যখন দেশের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে, তখন রাজপথের আন্দোলন বা সহিংসতা এই সংকটের সঠিক সুরাহা দিতে পারে না।
দ্বিতীয়ত: বেশ কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইতিমধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে ভ্যাটের টাকা তারা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে না নিয়ে নিজেদের তহবিল থেকে পরিশোধ করবে। যদি এই তথ্যটি সঠিক হয়, তবে সমস্যার বড় সমাধান কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের হাতেই রয়েছে। তারা চাইলেই এই জটিলতার সুরাহা ক্যাম্পাসের ভেতরেই করতে পারেন, এর জন্য রাস্তা বন্ধ করে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলার প্রয়োজন হয় না। ঝামেলাটা মূলত বাঁধছে সেই সব বিশ্ববিদ্যালয়ে, যারা জোর করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এই ভ্যাটের টাকা আদায় করার চেষ্টা করছে।
এবার আসি মূল তাত্ত্বিক এবং পলিসিগত জায়গায়। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনেক উদ্যোক্তা বা মালিক পক্ষ শিক্ষার আড়ালে বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করছেন—এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তারা নানা আইনি ফাঁকফোকর গলে, ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে প্রতিষ্ঠান থেকে লভ্যাংশ বের করে নিয়ে যাচ্ছেন এবং এই অনিয়ম এখনো চলমান। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শিক্ষার্থীদের ওপর ঢালাওভাবে ভ্যাট আরোপ করে কি সেই ট্যাক্স ফাঁকি বা অর্থ লোপাট ঠেকানো যাবে? কখনই না।
আমাদের দেশের বর্তমান আইন অনুযায়ী, যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়কে বাধ্যতামূলভাবে ‘নন-প্রফিট’ বা অলাভজনক ফর্মেশনে রেজিস্টার্ড হতে হয়। এই আইনি বাধ্যবাধকতার কারণেই পুরো খাতটি সার্বিক করের আওতার (Tax Net) বাইরে থেকে যায়। কেউ যদি সৎভাবে ট্যাক্স দিয়ে বাংলাদেশে ‘শিক্ষা ব্যবসা’ করতেও চায়, আমাদের আইনে সেই সুযোগ বা প্রভিশন নেই। কঠোর রাষ্ট্রীয় নজরদারি ও সঠিক অডিটের অভাবে অনেক মুনাফালোভী উদ্যোক্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা খাতের কাল্পনিক খরচ দেখিয়ে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা বের করে নিচ্ছেন। দায়িত্ব না নিয়ে, ট্যাক্স না দিয়ে টাকা বানানোর এক চমৎকার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে এই খাত।
অথচ যুক্তরাজ্য (UK) বা যুক্তরাষ্ট্রের (USA) মতো উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষাব্যবস্থার রূপরেখা খুব স্পষ্ট ও আধুনিক। সেখানে পাবলিক ফান্ডেড বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ‘ফর-প্রফিট’ বা লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে চালানোর আইনি স্বীকৃতি আছে। ফলে তারা কর্পোরেট ট্যাক্স দেয়, কেনাকাটায় ভ্যাট দেয় এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক করের আওতায় থাকে। তাহলে আমাদের দেশে এই দ্বিমুখী কাঠামো চালু করতে বাধা কোথায়?
হাজার হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেবল ‘কাগজে-কলমে’ অলাভজনক করে রাখার মানে হলো সরকারের বিশাল রাজস্ব ক্ষতি। একই সাথে, একটি বিরাট অর্থনীতি রাষ্ট্রের মূল অর্থনৈতিক মনিটরিং নেটওয়ার্কের বাইরে থেকে যাচ্ছে। যেকোনো প্রতিষ্ঠান করের আওতায় আসা মানে শুধু কর আদায় নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নজরদারি ও জবাবদিহিতার ভেতরে আসা। বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে শিক্ষার মতো এত বড় একটি সংবেদনশীল খাতকে আর্থিক জবাবদিহিতার বাইরে রাখা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
তাই প্রকৃত সমাধান হলো—বেসরকারি ও বাণিজ্যিক শিক্ষার এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে একটি সুনির্দিষ্ট ট্যাক্স নেট এবং কঠোর রেগুলেশনের আওতায় আনা। রেগুলেটরি বডি (যেমন ইউজিসি) সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিক কোন খাতে কত টাকা খরচ করা যাবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয় নিয়মিত অডিট হোক। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন, অবকাঠামো, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন এবং গবেষণার খরচ মেটানোর পর বছর শেষে যদি কোনো ‘নিট উদ্বৃত্ত’ বা প্রফিট থাকে, তবে তার ওপর সরকার অবশ্যই কর্পোরেট ট্যাক্স ধরুক। আর বাকি টাকাটুকু বিশ্ববিদ্যালয়ের আপদকালীন বা কন্টিনজেন্সি ফান্ড হিসেবে জমা রাখা হোক।
পরিশেষে বলা যায়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, কলেজসহ দেশের সকল বাণিজ্যিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অবশ্যই প্রোপার ট্যাক্স নেটের আওতায় আসা উচিত এবং তাদের আর্থিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। তবে রাষ্ট্রকে রাজস্ব আদায়ের এই কৌশলটি এমনভাবে সাজাতে হবে, যেন করের বোঝা চাপুক মালিকপক্ষের নিট মুনাফার ওপর, শিক্ষার্থীর ডেস্কে বা টিউশন ফির ওপর নয়।
