সৌদি তো মধ্যপন্থী হবে, আমাদের কী হবে? | ইসলাম ও মুসলিম সিরিজ

সৌদি আরবে ‘মধ্যপন্থী ও উন্মুক্ত’ ইসলাম ফিরিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছেন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। তিনি সাফ জানিয়েছেন, সৌদি আরব আর কট্টরপন্থার চাদরে ঢাকা থাকবে না। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এটি একটি বিশাল পরিবর্তন। ২০১৭ সালে রিয়াদে এক অর্থনৈতিক ফোরামে দেওয়া ভাষণে তিনি বিশ্বের সকল দেশ ও ধর্মের মানুষের জন্য সৌদি আরবকে উন্মুক্ত করে দেওয়ার ঘোষণা দেন।

ভাষণে সৌদি প্রিন্স বলেন:

“আমরা একটি স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে চাই—যেখানে আমাদের ধর্ম এবং ঐতিহ্য হবে সহিষ্ণু। আমরা বিশ্বের বাকি দেশগুলোর সাথে সহাবস্থানে আসতে চাই এবং বৈশ্বিক উন্নয়নের অংশীদার হতে চাই। সৌদি আরব কট্টরপন্থী সব চিন্তাভাবনাকে দূরে ঠেলে দেবে। আমরা অতীতে যেমন (মধ্যপন্থী) ছিলাম, সেখানেই ফিরে যাব।”

যুবরাজের এই ঘোষণা অবশ্যই ইতিবাচক। তবে এর পেছনের কিছু অমীমাংসিত এবং রক্তাক্ত ইতিহাস নিয়ে আলাপ করতে চাই। তাঁর এই ‘স্বীকারোক্তি’র প্রেক্ষিতে কয়েকটি সম্পূরক প্রশ্ন তোলা আজ সময়ের দাবি:

১. উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া দায়ভার:

যুবরাজ বর্তমান ব্যবস্থাকে ‘অস্বাভাবিক’ বলছেন। প্রশ্ন হলো, যদি বর্তমান ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হয়, তবে ইসলামের নাম ব্যবহার করে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে কোটি কোটি মুসলিমকে একটি বিশেষ কাঠামোর ভেতর বন্দী করে রাখার দায়ে তাঁর পূর্বপুরুষদের ভূমিকা কী ছিল? পবিত্র ভূমির রক্ষক (খাদেমুল হারামাইন) হিসেবে তাঁরা যে ব্যবস্থা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়েছিলেন, তা কি তবে ভুল ছিল?

২. সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ক্ষতিপূরণ:

সৌদি আরব তার ‘পেট্রো-ডলার’ ব্যবহার করে বিশ্বব্যাপী ‘ওয়াহাবি’ মতবাদের যে উগ্র সংস্করণ প্রচার করেছে, তার ফলে বিভিন্ন দেশের স্থানীয় মুসলিম সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধ্বংস হয়ে গেছে। বাঙালি মুসলিমের শত বছরের যে উদার সাংস্কৃতিক পরিচয় ছিল, তা বদলে দিয়ে সেখানে যে কৃত্রিম আরবীয় কট্টরপন্থা আমদানি করা হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ কে দেবে?

৩. ‘কট্টর রাজনৈতিক ইসলাম’ ও মানবিক বিপর্যয়:

সৌদি ফ্যাক্টরিতে উৎপাদিত ‘কট্টর রাজনৈতিক ইসলাম’ নামের এই উগ্র আদর্শের কারণে গত কয়েক দশকে বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ মুসলিম নিহত হয়েছে, কোটি মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে। মুসলিম তরুণদের বড় একটি অংশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মূল স্রোত থেকে ছিটকে পড়ে উগ্রবাদী চিন্তায় নিমজ্জিত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের ভাবমূর্তি আজ যে ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে, এই ‘রপ্তানি করা আদর্শের’ দায়ভার কি সৌদি রাজপরিবার গ্রহণ করবে?

ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি ও বর্তমান বাস্তবতা:

রাসূল (সা:)-এর ওফাতের পর থেকেই ইসলামের নামে ক্ষমতা দখলের লড়াই এবং ষড়যন্ত্র বারবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ক্ষমতার লোভে ইসলামের মূলনীতিকে কলুষিত করে যে উগ্র মতবাদ তৈরি করা হয়েছিল, তাকেই ‘আসল ইসলাম’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। আজকের বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের এই চরম দুর্দশার মূল কারণ এখানেই।

ইসলামের নামে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের এই মতবাদ প্রচারকারীরা সংখ্যায় কম হলেও অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং শক্তিশালী। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমরা আজও তাদের ভয়ে তটস্থ, আত্মকলহে বিভক্ত এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের নিরব সমর্থক।

শেষ কথা:

আমি বারবার বলেছি—বর্তমানে ইসলামের নামে যা যা চর্চিত হয়, তার অনেক কিছুই রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর প্রচারিত ইসলামের অংশ নয়। সবচেয়ে ভয়াবহ বিদআত হলো—ইসলামের দোহাই দিয়ে অন্য কোনো মানুষ (মুসলিম বা অমুসলিম)-এর ওপর শারীরিক বা মানসিক চাপ প্রয়োগের অধিকার দেওয়া। এটি সরাসরি পবিত্র কুরআনের আদর্শবিরোধী।

প্রচলিত তথাকথিত ‘শরিয়া সিস্টেমে’র বড় একটি অংশ এই বিদআতের গর্ভেই জন্ম নিয়েছে। এই কট্টরপন্থা আমাদের অতীতকে কলঙ্কিত করেছে, বর্তমানকে বিষিয়ে তুলছে এবং সময়মতো রুখে না দাঁড়ালে এটি আমাদের ভবিষ্যৎকেও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে।

আরও দেখুন: