আমার ধারাবাহিক আয়োজন ‘আসুন আলাপ করিয়ে দেই’–এর আরেকটি পর্বে আপনাকে স্বাগতম। আজ তাঁর জন্মবার্ষিকীতে আমরা ইতিহাসের পাতা উল্টে পরিচিত হব এমন এক মানুষের সঙ্গে, যার সাহস লক্ষ লক্ষ মানুষের ভাগ্য বদলে দিয়েছিল। তিনি কোনো রাজা বা সৈনিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক মালী পরিবারের সন্তান, যিনি কলম ও বইকে অস্ত্র বানিয়ে লড়াই করেছিলেন। তাঁর নাম জ্যোতিরাও ফুলে, স্নেহের নামে জ্যোতিবা (১১ এপ্রিল ১৮২৭ – ২৮ নভেম্বর ১৮৯০)।
![জ্যোতিরাও ফুলে 2 মহাত্মা জ্যোতিরাও ফুলে [ আসুন আলাপ করিয়ে দেই ] 2 জ্যোতিরাও ফুলে](https://sufifaruq.com/wp-content/uploads/2026/02/জ্যোতিরাও-ফুলে-2-883x1024.png)
এক অপমান, যা ইতিহাস বদলে দেয়
১৮২৭ সালে মহারাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া জ্যোতিবা ফুলে ‘মালি’ জাতির অন্তর্ভুক্ত ছিলেন—যারা মূলত বাগান করা ও সবজি চাষের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন এবং স্কটিশ মিশন হাই স্কুলে পড়াশোনা করে ১৮৪৭ সালে শিক্ষা সম্পন্ন করেন।
তবে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায় ১৮৪৮ সালে, মাত্র ২১ বছর বয়সে। এক ব্রাহ্মণ বন্ধুর বিয়েতে অংশ নিতে গিয়ে শোভাযাত্রার সময় বন্ধুর পরিবার তাঁকে অপমান করে এবং কেবল ‘শূদ্র’ (নিম্নবর্ণ) হওয়ার কারণে তাদের সঙ্গে হাঁটার অধিকার নেই বলে তিরস্কার করে।
এই অপমান তাঁকে ভেঙে দেয়নি; বরং জাগিয়ে তুলেছিল। তিনি উপলব্ধি করেন, বর্ণব্যবস্থা মানুষের ওপর নিপীড়নের একটি হাতিয়ার এবং শিক্ষা হচ্ছে সেই একমাত্র শক্তি, যা মানুষকে মুক্ত করতে পারে।
শিক্ষার অগ্রদূত
থমাস পেইনের Rights of Man বই দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে জ্যোতিবা বিশ্বাস করতেন—সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে নারী ও নিম্নবর্ণের মানুষের শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু সমাজ যখন নারীদের শিক্ষাকে নিষিদ্ধ করে রেখেছে, তখন তাদের শেখাবে কে? তিনি শুরু করেছিলেন নিজের ঘর থেকেই—নিজের স্ত্রী সাভিত্রীবাই ফুলেকে পড়তে ও লিখতে শেখান।
এরপর সমাজের রক্ষণশীল অংশের পাথর নিক্ষেপ ও অপমান সহ্য করেও তারা ইতিহাস সৃষ্টি করেন—
- প্রথম পদক্ষেপ: ১৮৪৮ সালে পুনের ভিঢেওয়াড়ায় ভারতের প্রথম দেশীয় উদ্যোগে পরিচালিত মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।
- বিস্তার: ১৮৫২ সালের মধ্যে তারা তিনটি বিদ্যালয় পরিচালনা করছিলেন, যেখানে ২৭০-এর বেশি ছাত্রী পড়াশোনা করত।
- অন্তর্ভুক্তি: তখনকার ‘অস্পৃশ্য’ বলে বিবেচিত মহার ও মাং সম্প্রদায়ের শিশুদের জন্যও স্কুলের দরজা উন্মুক্ত করেন।
নির্যাতিত মানুষের প্রতি গভীর সহমর্মিতা
জ্যোতিবার মানবিকতা ছিল সীমাহীন। সে সময় সমাজে বিধবাদের দুর্দশা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
- শিশুহত্যা প্রতিরোধ: ১৮৬৩ সালে কাশিবাই নামের এক বিধবার করুণ ঘটনার পর তিনি একটি গোপন আশ্রয়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে গর্ভবতী বিধবারা নিরাপদে সন্তান জন্ম দিতে পারতেন। এতে মা ও শিশু উভয়ই শিশুহত্যার মতো নিষ্ঠুর পরিণতি থেকে রক্ষা পেত।
- অস্পৃশ্যতা ভাঙার উদ্যোগ: অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে তিনি নিজের বাড়ির পানির ট্যাংক সব বর্ণের মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেন এবং ঘোষণা করেন—বাতাসের মতো পানিও সবার অধিকার।
সত্যসন্ধানীদের সংগঠন
১৮৭৩ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর জ্যোতিরাও প্রতিষ্ঠা করেন সত্যশোধক সমাজ (Satyashodhak Samaj) বা ‘সত্যসন্ধানীদের সমাজ’। এটি ছিল এক বিপ্লবী সংগঠন। মুসলমান, ব্রাহ্মণ বা সরকারি কর্মচারী—যে কেউ এই সংগঠনে যোগ দিতে পারত, যদি সে সমতা ও যুক্তিবাদের আদর্শে বিশ্বাস করত। এই সংগঠন মানবাধিকারের পক্ষে কাজ করত এবং মানুষ ও ঈশ্বরের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পুরোহিতের প্রয়োজনীয়তাকে প্রত্যাখ্যান করত।
কেন তাঁকে ‘মহাত্মা’ বলা হয়
জ্যোতিবা ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী এবং পৌর কমিশনারও। তিনি গ্রামাঞ্চলে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন। সমাজের নিপীড়িত মানুষের জন্য আজীবন সংগ্রামের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৮৮৮ সালে তাঁকে ‘মহাত্মা’—অর্থাৎ “মহান আত্মা”—উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
১৮৯০ সালে মহাত্মা জ্যোতিরাও ফুলে মৃত্যুবরণ করেন, কিন্তু তাঁর আদর্শ অমর হয়ে আছে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন—সত্যিকারের বীরত্ব হলো অন্যকে তুলে ধরার মধ্যেই। তাঁর জন্মদিনে আমরা তাঁর এই শিক্ষাটি স্মরণ করতে পারি:
“সত্যই একমাত্র ধর্ম, আর শিক্ষা হলো মুক্তির একমাত্র পথ।”
![জ্যোতিরাও ফুলে 1 মহাত্মা জ্যোতিরাও ফুলে [ আসুন আলাপ করিয়ে দেই ] 1 জ্যোতিরাও ফুলে](https://sufifaruq.com/wp-content/uploads/2026/02/জ্যোতিরাও-ফুলে-1.png)