শেখ হাসিনার নেতৃত্বে “১০ বছরে আর্থিক খাতের কয়েকটি মাইলফলক অর্জন” খাতে অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির দশ বছর (২০০৯-২০১৮)

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে “১০ বছরে আর্থিক খাতের কয়েকটি মাইলফলক অর্জন” খাতে অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির দশ বছর (২০০৯-২০১৮) ।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে “১০ বছরে আর্থিক খাতের কয়েকটি মাইলফলক অর্জন” খাতে অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির দশ বছর (২০০৯-২০১৮)

 

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে "১০ বছরে আর্থিক খাতের কয়েকটি মাইলফলক অর্জন" খাতে অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির দশ বছর (২০০৯-২০১৮)

 

১. নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জন

বাংলাদেশ ২০১৫ সালে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে বেরিয়ে এসে মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। বিশ্বব্যাংক ২০১৫ সালের ১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে এই তালিকা প্রকাশ করে।

 

বিশ্বব্যাংকের আয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস

বিশ্বব্যাংক প্রতিবছর ১ জুলাই মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়ের (GNI per capita) ভিত্তিতে দেশগুলোকে চারটি আয়ভিত্তিক গ্রুপে ভাগ করে—

  1. নিম্ন আয়ের দেশ (LIC):
    • মাথাপিছু আয় ১,০৪৫ মার্কিন ডলার বা তার নিচে
  2. নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ (LMIC):
    • মাথাপিছু আয় ১,০৪৬ – ৪,১২৫ মার্কিন ডলার
  3. উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ (UMIC):
    • মাথাপিছু আয় ৪,১২৬ – ১২,৭৩৫ মার্কিন ডলার
  4. উচ্চ আয়ের দেশ (HIC):
    • মাথাপিছু আয় ১২,৭৩৬ মার্কিন ডলার বা তার বেশি

 

বাংলাদেশের অবস্থান

  • ২০১৪–১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে বাংলাদেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় ছিল ১,৩১৪ মার্কিন ডলার
  • ফলে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে প্রবেশ করে।
  • বর্তমানে (সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী) বাংলাদেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১,৭৫১ মার্কিন ডলার

 

এই অর্জন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও উন্নয়ন ধারার এক ঐতিহাসিক মাইলফলক, যা প্রমাণ করে—শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের টেকসই পথের দিকে এগোচ্ছে

 

২. স্বল্পোন্নত দেশ হতে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ

স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর বাংলাদেশ অর্জন করেছে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। ২০১৮ সালের ১৫ মার্চ, জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ECOSOC) উন্নয়ন নীতি বিষয়ক কমিটি (CDP) ঘোষণা করে যে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করেছে।

উত্তরণের মানদণ্ড

জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, তিনটি সূচকের মধ্যে কমপক্ষে দুইটিতে উত্তীর্ণ হতে হয়—

  • মাথাপিছু আয়
  • মানবসম্পদ সূচক (HAI)
  • অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক (EVI)

বাংলাদেশের অর্জন (২০১৮ সালের পর্যালোচনায়)

  • মাথাপিছু আয়:
    • নির্ধারিত মানদণ্ড: ১,২৩০ মার্কিন ডলার বা তার বেশি
    • বাংলাদেশের গড় আয়: ১,২৭২ মার্কিন ডলার
  • মানবসম্পদ সূচক (HAI):
    • নির্ধারিত মানদণ্ড: ৬৬ বা তার বেশি স্কোর
    • বাংলাদেশের স্কোর: ৭২.
  • অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক (EVI):
    • নির্ধারিত মানদণ্ড: ৩২ বা তার কম স্কোর
    • বাংলাদেশের স্কোর: ২৫

 

ভবিষ্যৎ রূপরেখা

জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, দুই ধারাবাহিক পর্যালোচনায় (২০১৮ ও ২০২১) এই অর্জন ধরে রাখতে হবে। বাংলাদেশ তা সফলভাবে অর্জন করেছে। ফলে ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে অন্তর্ভুক্ত হবে।

এই উত্তরণ প্রমাণ করে, দারিদ্র্য হ্রাস, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা এখন আর ধরা-ছোঁয়ার বাইরে নয়, বরং একটি টেকসই বাস্তবতা।

 

৩. পদ্মা সেতু

সকল দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র ও প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসী ও দূরদর্শী নেতৃত্বে নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণাধীন ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক।

অবস্থান ও সংযোগ

  • পদ্মা সেতুর এক প্রান্ত মুন্সীগঞ্জের মাওয়া এবং অপর প্রান্ত শরীয়তপুরের জাজিরা
  • এ সেতুর মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলা সরাসরি রাজধানী ঢাকার সঙ্গে যুক্ত হবে।

নির্মাণ ও অগ্রগতি

  • ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে পদ্মা সেতুর মূল নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন।
  • ২০১৮ সালের ১৩ অক্টোবর তিনি ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ কাজেরও উদ্বোধন করেন, যা পদ্মা সেতুর সঙ্গেই যুক্ত।
  • ২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সেতুর প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ সমাপ্ত হয়েছিল।
  • আশা করা হচ্ছিল যে ২০১৯ সাল থেকে জনগণ এ সেতুর সুফল ভোগ করতে পারবে।

সম্ভাবনা ও সুফল

পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে—

  • দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে।
  • কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যে ঘটবে বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন
  • সৃষ্টি হবে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ
  • রাজধানীর সঙ্গে দূরপাল্লার ভ্রমণ হবে সহজ, দ্রুত ও সাশ্রয়ী।

পদ্মা সেতু কেবল একটি অবকাঠামো নয়, এটি বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস, স্বনির্ভরতা উন্নয়নযাত্রার প্রতীক

 

৪. মেট্রোরেল

ঢাকার যানজট নিরসন ও আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ঢাকা মাস র‍্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (মেট্রোরেল) চালু করা হচ্ছে। এটি বাংলাদেশের প্রথম মেট্রোরেল প্রকল্প, যা ঢাকাবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ করবে।

প্রকল্পের মূল তথ্য

  • প্রকল্প ব্যয়: প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা
    • জাইকা (JICA) ঋণ: ৭৫%
    • বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়ন: ২৫%
  • বাণিজ্যিক চালুর লক্ষ্য: ২০১৯ সালের ডিসেম্বর
  • মোট দৈর্ঘ্য: ২০.১০ কিলোমিটার (উত্তরা তৃতীয় ধাপ থেকে মতিঝিল পর্যন্ত)

ট্রেন চলাচল ও যাত্রীসুবিধা

  • প্রতিদিন চলবে ২৪টি ট্রেন
  • সময়: সকাল ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত
  • প্রতিটি ট্রেনে থাকবে ৬টি বগি
  • এক ট্রেনে পরিবহন করা যাবে প্রায় ১,৬৯৬ জন যাত্রী

রুট অ্যালাইনমেন্ট

মেট্রোরেল রুট হবে:
উত্তরা তৃতীয় ধাপ – পল্লবী – রোকেয়া সরণি (চন্দ্রিমা উদ্যান, সংসদ ভবন) – খামারবাড়ি – ফার্মগেট – সোনারগাঁও হোটেল – শাহবাগ – টিএসসি – দোয়েল চত্বর – তোপখানা রোড – বাংলাদেশ ব্যাংক।

ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন পরিকল্পনা

  1. প্রথম ধাপ (২০১৯):
    • পল্লবী থেকে সোনারগাঁও হোটেল পর্যন্ত ১১ কিমি রেলপথ চালু।
  2. দ্বিতীয় ধাপ (২০২০):
    • সোনারগাঁও হোটেল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত ৪.৪০ কিমি চালু।
  3. তৃতীয় ধাপ (২০২২):
    • পল্লবী থেকে উত্তরা পর্যন্ত ৪.৭ কিমি চালু।

ঢাকা মেট্রোরেল চালু হলে রাজধানীতে যাতায়াতের গতি দক্ষতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে, কর্মঘণ্টা বাঁচবে, জ্বালানি খরচ কমবে এবং যানজট নিরসনে আসবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন।

 

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে "১০ বছরে আর্থিক খাতের কয়েকটি মাইলফলক অর্জন" খাতে অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির দশ বছর (২০০৯-২০১৮)

 

৫. মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ

২০১৮ সালের ১২ মে রাত ২টা ১৫ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে দেশের প্রথম যোগাযোগ উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট– সফলভাবে মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ পৃথিবীর কৃত্রিম উপগ্রহের অধিকারী ৫৭তম দেশ হিসেবে মর্যাদা অর্জন করে।

উৎক্ষেপণ ও নির্মাণ

  • উৎক্ষেপণকারী সংস্থা: মার্কিন কোম্পানি স্পেসএক্স (SpaceX)
  • ব্যবহৃত রকেট: ফ্যালকন–
  • উৎক্ষেপণ মঞ্চ: যুক্তরাষ্ট্রের কেপ ক্যানাভেরাল

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ২০১৫ সালের নভেম্বরে ফ্রান্সের থালেস এলিনিয়া স্পেস কোম্পানির সঙ্গে ২৪৮ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি করে স্যাটেলাইটটির নির্মাণ শুরু করে।
স্যাটেলাইটের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর এটি ফ্রান্সে সংরক্ষণ করা হয় এবং পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ২৯ মার্চ ফ্লোরিডায় স্থানান্তর করা হয় উৎক্ষেপণের জন্য।

গ্রাউন্ড স্টেশন

উপগ্রহের সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার জন্য দুটি গ্রাউন্ড স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে—

  • গাজীপুরের জয়দেবপুর
  • রাঙামাটির বেতবুনিয়া

কক্ষপথ ও প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য

  • ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ রাশিয়ার ইন্টারস্পুটনিক থেকে কোটি ৮০ লাখ ডলারে ১১৯.১° পূর্ব দ্রাঘিমায় কক্ষপথ (orbital slot) অধিগ্রহণ করে।
  • ট্রান্সপোন্ডার: ৪০টি
    • ২৬টি কে-ইউ (Ku) ব্যান্ড
    • ১৪টি সি (C) ব্যান্ড
  • বাংলাদেশ নিজে ব্যবহার করবে ২০টি ট্রান্সপোন্ডার
  • অবশিষ্ট ২০টি ট্রান্সপোন্ডার ভাড়া দিয়ে বছরে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার আয় হবে বলে আশা করা হয়।

সেবার পরিধি

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট–১ শুধু বাংলাদেশ নয়, বরং দক্ষিণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তৃত অঞ্চল কাভার করবে।
সুযোগ নিতে পারবে—

  • সার্ক দেশসমূহ
  • ইন্দোনেশিয়া
  • ফিলিপাইন
  • মিয়ানমার
  • তাজিকিস্তান
  • কিরগিজস্তান
  • উজবেকিস্তান
  • তুর্কমেনিস্তান
  • কাজাখস্তানের একটি অংশ

ব্যবহার ও সম্ভাবনা

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট–১ এর মাধ্যমে—

  • ডাইরেক্ট–টু–হোম (DTH) ভিডিও সার্ভিস
  • ই–লার্নিং টেলি–মেডিসিন
  • পরিবার পরিকল্পনা ও কৃষি খাতের তথ্যপ্রবাহ
  • দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ভয়েস সার্ভিস ও সেলুলার নেটওয়ার্ক কার্যক্রম
  • SCADA, AOHQ ডাটা সার্ভিস
  • বিজনেস–টু–বিজনেস (VSAT) কানেকশন

আরও সহজ ও কার্যকরভাবে পরিচালনা সম্ভব হবে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট–১ শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়; এটি ডিজিটাল বাংলাদেশ মহাকাশ অভিযাত্রায় বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপের প্রতীক

 

৬. রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প

বাংলাদেশের জ্বালানি ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। দীর্ঘ কয়েক দশকের পরিকল্পনা ও উদ্যোগের পর এটি বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যায় এবং বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন যুগের সূচনা করে।

প্রারম্ভিক উদ্যোগ

  • ১৯৬১: প্রথমবারের মতো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়।
  • ১৯৬২–১৯৬৮: পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার পদ্মা নদীর তীরবর্তী রূপপুরকে কেন্দ্রের স্থান হিসেবে নির্বাচন করা হয়।
  • ১৯৬৯–১৯৭০: ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও পাকিস্তান সরকার তা বাতিল করে দেয়।

স্বাধীন বাংলাদেশের উদ্যোগ

  • ১৯৭২–১৯৭৫: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেন।
  • ১৯৯৭–২০০০: বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. এম. এ. ওয়াজেদ মিয়া ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন প্রকল্পের প্রস্তাব করেন।

আধুনিক বাস্তবায়ন পরিকল্পনা

  • ২০০৮: আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়।
  • ২০০৯ (১৩ মে): বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও রাশিয়ার রোসাটোম-এর মধ্যে পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।
  • ২০১৩ (১৫ জানুয়ারি): প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাশিয়া সফরে Preperatory Stage of Construction-এর জন্য State Export Credit Agreement স্বাক্ষরিত হয়।
  • ২০১৩ (অক্টোবর): প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রথম পর্যায়ের কাজ উদ্বোধন করেন।
  • ২০১৬ (২৬ জুলাই): মূল পর্যায়ের কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য বাংলাদেশ সরকার ও রাশিয়া সরকারের মধ্যে স্টেট ক্রেডিট চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

নির্মাণ অগ্রগতি

  • ২০১৭ (৩০ নভেম্বর): প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের প্রথম কংক্রিট ঢালাই উদ্বোধন করেন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ ক্লাবে প্রবেশ করে।
  • ২০১৮ (১৪ জুলাই): প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ইউরি ইভানোভিচ দ্বিতীয় ইউনিটের কংক্রিট ঢালাই কাজ উদ্বোধন করেন।

বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সম্ভাবনা

  • পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে
  • এ কেন্দ্র চালু হলে—
    • দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে আসবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন
    • জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা আসবে
    • শিল্প, কৃষি ও প্রযুক্তি নির্ভর অর্থনীতির অগ্রযাত্রা আরও বেগবান হবে

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি অবকাঠামো নয়, বরং এটি বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সাহসী নেতৃত্ব টেকসই উন্নয়নের প্রতীক

 

৭. ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে (বিমানবন্দর-কুতুবখালী)

ঢাকার যানজট নিরসন ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য নির্মিত হচ্ছে দেশের প্রথম ও দীর্ঘতম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। এটি হবে চার লেনবিশিষ্ট আধুনিক সড়ক, যার দৈর্ঘ্য ৪৭ কিলোমিটার। প্রকল্পটি তিন ধাপে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

উদ্বোধন

  • প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১১ সালের ৩০ এপ্রিল এর নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন।

ধাপে ধাপে নির্মাণ পরিকল্পনা

  1. প্রথম পর্ব:
    • বিমানবন্দর থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত ২১ কিমি
    • সমাপ্তির লক্ষ্য: ২০১৯ সালের মধ্যে
  2. দ্বিতীয় পর্ব:
    • তেজগাঁও থেকে মগবাজার পর্যন্ত
    • সমাপ্তির লক্ষ্য: ২০২০ সালের মধ্যে
  3. তৃতীয় পর্ব:
    • মগবাজার থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত
    • সমাপ্তির লক্ষ্য: জুন ২০২১ সালের মধ্যে

ব্যয় ও বাস্তবায়ন

  • মোট ব্যয়: ১৩,৮২৫ কোটি টাকা
  • বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান: ইতাল–থাই ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন লিমিটেড (Ital–Thai Development Co. Ltd.)
  • প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) মডেলে।

অন্যান্য পরিকল্পিত এক্সপ্রেসওয়ে

ঢাকা শহর ও আশেপাশের সড়ক যোগাযোগ আরও গতিশীল করতে সরকার হাতে নিয়েছে অতিরিক্ত দুটি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প—

  • বিমানবন্দর–আশুলিয়া–চন্দ্রা এক্সপ্রেসওয়ে: দৈর্ঘ্য ৩৫ কিমি
  • ইস্ট–ওয়েস্ট এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে (হেমায়েতপুর–মদনপুর): দৈর্ঘ্য ৪০ কিমি

ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মিত হলে রাজধানীর যানজট নিরসনে ব্যাপক স্বস্তি আসবে, ভ্রমণের সময় কমবে এবং দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সঞ্চার হবে।

 

৮. ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল

বাংলাদেশ সরকার দেশের সমতা ভিত্তিক টেকসই উন্নয়নবৃহৎ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

অনুমোদন ও বর্তমান অগ্রগতি

  • ইতোমধ্যে ৩৭টি অর্থনৈতিক অঞ্চল অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
  • চট্টগ্রামের মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল:
    • মোট জায়গা: ৩০,০০০ একর
    • এর মধ্যে প্রায় ১,১৫০ একর জমি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
  • কক্সবাজারের মহেশখালীতে ৪টি অঞ্চল,
  • ফেনী, নাটোরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

সম্ভাবনা ও সুফল

  • অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ: প্রায় ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার
  • কর্মসংস্থান: প্রায় কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হবে।
  • দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য হবে নতুন সম্ভাবনার দ্বার, যা শিল্পায়ন ও আঞ্চলিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ শুধু রপ্তানিমুখী শিল্পে নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও একটি শক্তিশালী বিনিয়োগকেন্দ্রিক দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

 

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে "১০ বছরে আর্থিক খাতের কয়েকটি মাইলফলক অর্জন" খাতে অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির দশ বছর (২০০৯-২০১৮)

 

৯. কর্নফুলী টানেল

বাংলাদেশের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী প্রকল্প হলো কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে নির্মিত টানেল। প্রায় ৮,৪৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই চার লেনবিশিষ্ট টানেলের দৈর্ঘ্য হবে ৩.কিলোমিটার

প্রকল্পের বৈশিষ্ট্য

  • টানেলের দৈর্ঘ্য: ৩.৫ কিলোমিটার
  • অ্যাপ্রোচ রোড: দুই পাশে মোট ৬ কিলোমিটার
  • লেন সংখ্যা: ৪ লেন
  • প্রকল্প ব্যয়: প্রায় ৮,৪৫০ কোটি টাকা

আঞ্চলিক সংযোগ ও সুফল

  • এটি হবে বাংলাদেশের প্রথম নদীর তলদেশের টানেল।
  • টানেলটি ঢাকা–চট্টগ্রাম–কক্সবাজার এশিয়ান হাইওয়ের অংশ হিসেবে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে আঞ্চলিক সংযোগ (Regional Connectivity) স্থাপন করবে।
  • টানেল নির্মিত হলে চট্টগ্রাম কক্সবাজারের মধ্যে দূরত্ব কমবে, ভ্রমণ সময় হবে আরও স্বল্প।
  • দেশের পূর্বাঞ্চলে নতুন নতুন শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে, যা কর্মসংস্থান বাড়াবে এবং অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে।

সময়সীমা

  • প্রকল্পের লক্ষ্য অনুযায়ী, টানেলের নির্মাণকাজ ২০২০ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল

কর্ণফুলী টানেল কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়, বরং এটি হবে বাংলাদেশের উন্নয়ন, শিল্পায়ন আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার এক নতুন দিগন্ত