আমার মাওলানা আবুল কালাম আজাদ

মাওলানা আবুল কালাম আজাদ আমার প্রিয় মানুষ, আদর্শ মানুষের একজন !

নিবেদিতপ্রাণ মুসলিম অথচ কুসংস্কারহীন এবং ধর্মনিরপেক্ষ, উদারবাদী, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন উন্নত চরিত্রের আদর্শ। মুসলিম হিসেবে আমার আত্মপরিচয় এবং মুসলিম হিসেবে সমাজ ও রাষ্ট্রের সাথে আমার সম্পর্ক ও দায়িত্ব বিষয়ে তিনি দারুণ প্রভাব বিস্তার করে আছেন। আমি তার থেকে অনুপ্রেরণা পাই এবং মুসলিম তরুণদের অনুপ্রেরণা নেবার হেদায়েত করি।

ছিলেন একজন বিশিষ্ট ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী ও স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী। তিনি মৌলানা আবুল কালাম আজাদ (তার ছদ্মনাম ছিল আজাদ) নামেই অধিক পরিচিত। মৌলানা আজাদ ইসলামি ধর্মশাস্ত্রে সুপণ্ডিত ছিলেন। তরুণ বয়সে তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির প্রবক্তা ছিলেন এবং দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত বিভাগের বিরোধিতা করেছিলেন।

নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রে সামরিক শাসন ও পাকিস্তান ভাগ সম্পর্কেও তিনি যে ভবিষ্যবাণী করে গিয়েছিলেন, তার সব গুলো সত্য হয়েছে। ১৯৯২ সালে তাকে ভারতের সর্বোচ্চ সম্মান ভারতরত্নে (মরণোত্তর) ভূষিত করা হয়। স্বাধীন ভারতে শিক্ষাবিস্তারে তার উজ্জ্বল ভূমিকার কথা স্মরণে রেখে তার জন্মদিনটি সারা দেশে “জাতীয় শিক্ষা দিবস” হিসেবে পালন করা হয়।

মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এর সাথে মহাত্মা গান্ধী ও জওহরলাল নেহেরু
মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এর সাথে মহাত্মা গান্ধী ও জওহরলাল নেহেরু

মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এর রেজিস্ট্রার্ড নাম আবুল কালাম মহিউদ্দিন আহমেদ [ مولانا ابوالکلام محی الدین احمد آزاد‎‎ ] মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ১১ নভেম্বর ১৮৮৮ সালে সৌদি আরবের মক্কায় জন্ম গ্রহণ করেন যেটি তখন উসমানীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল।  জন্মের সময় তার নাম রাখা হয় সৈয়দ গুলাম মুহিউদ্দিন আহমেদ বিন খায়েরুদ্দিন আল হুসায়নি, কিন্তু তিনি সময়ের আবর্তনে মওলানা আবুল কালাম আজাদ নামে পরিচিত হন। আজাদের পিতা দিল্লীতে বসবাসকারী একজন আলেম ছিলেন যিনি তার মাতামহের সাথে থাকতেন, কারণ তার পিতা অনেক কম বয়সে মারা যান।

মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এর শৈশব কাটে কিছুটা অসহায়ত্বের মধ্যে। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সময় আজাদের পিতা খায়েরউদ্দীন মক্কায় চলে যান এবং সেখানেই বসবাস করতে থাকেন। সেখানেই সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করেন। ১৮৮৮ সালের ১১ নভেম্বর সেখানে আজাদের জন্ম হয়। তারপর ১৮৯০ সালে তার পিতা সপরিবারে কলকাতায় চলে আসেন। খায়েরউদ্দীন কলকাতায় মৃত্যুবরণ করার পর থেকে আজাদের পরিবার এখানেই স্থায়ী হয়।

আজাদের পরিবার ছিল ধর্মীয়ভাবে রক্ষণশীল। তাই ছোটবেলায় ধর্মীয় শিক্ষা লাভের মধ্য দিয়ে তার শিক্ষাজীবন শুরু হয়। তখনকার সময়ে বৃটিশ নিয়ন্ত্রিত, প্রচলিত স্কুল কিংবা মাদ্রাসা শিক্ষায় খায়েরউদ্দীনের এর খুব একটা আস্থা ছিল না। তাই তিনি বাড়িতেই আজাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। বাড়িতেই আজাদ আরবি ভাষায় গণিত, জ্যামিতি, দর্শন প্রভৃতি শিক্ষালাভ করেন। আরবি মাতৃভাষা হওয়ায় এবং ধর্মের প্রতি একনিষ্ঠ ও দৃঢ় বিশ্বাসী পারিবারিক পটভূমির কারণে প্রচলিত ধারায় ইসলামী শিক্ষার চর্চা করা ছাড়া আজাদের অন্য কোনো বিকল্প ছিল না।

প্রাতিষ্ঠানিক আধুনিক শিক্ষা লাভ না করলেও ব্যক্তিগতভাবে অধ্যয়ন ও ব্যাপক পাঠাভ্যাসের মাধ্যমে তিনি উর্দু, ফারসি, হিন্দি ও ইংরেজিতে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। তার সময়ের অনেক যশস্বী ব্যক্তিদের মতো তিনিও নিজ চেষ্টায় শিক্ষিত হওয়ার পথ অনুসরণ করেন এবং বিশ্ব ইতিহাস ও রাজনীতি সম্পর্কে বিপুল জ্ঞানের অধিকারী হন।

পার্টিশনের মুখে দিল্লির জামে মসজিদের বক্তৃতা – মওলানা আবুল কালাম আজাদ (১৮৮৮ -১৯৫৮)

মওলানা আবুল কালাম আজদের সাহিত্য ও সঙ্গীতে বিশেষ আগ্রহ ছিল। তিনি নিজে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিখেছিলেন, সেতার শিখে বাজাতেন। তার নিজের ভাষায় সে সম্পর্কে তিনি তিনি লিখে গেছেন। তার সেই লেখা আবৃত্তি করেছেন বিখ্যাত বাচিক শিল্পী জিয়া মহিউদ্দিন।

পীর পরিবারের সন্তান মৌলানা আজাদ তরুণ বয়স থেকে উর্দু ভাষায় কবিতা এবং ধর্ম ও দর্শন-সংক্রান্ত নিবন্ধ রচনা করতে শুরু করেন। তিনি সাংবাদিকতার পেশা গ্রহণ করে ব্রিটিশ শাসনের সমালোচনা করেন এবং ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে সমর্থন জানান। পরে আজাদ খিলাফত আন্দোলনের নেতৃত্ব দান করেন। সেই সময় তিনি মহাত্মা গান্ধীর সংস্পর্শে আসেন। আজাদ ১৯১৯ সালের রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে গান্ধীজির অহিংস অসহযোগের ধারণায় অণুপ্রেরিত হয়ে অসহযোগ আন্দোলন সংগঠনে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯২৩ সালে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনিই ছিলেন কংগ্রেসের সর্বকনিষ্ঠ সভাপতি।

১৯৩১ সালে মৌলানা আজাদ ধারাসন সত্যাগ্রহ শুরু করেন। এই সময় তিনি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতা হয়ে ওঠেন। তিনি ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতান্ত্রিক ধ্যানধারণা এবং হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির কথা প্রচার করেন।

আজাদ সম্পূর্ণভাবে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেন যা তৎকালীন বেশিরভাগ মুসলিমদের জন্য চরমপন্থা হিসেবে বিবেচিত হত। তিনি ব্রিটিশদের ওপর জাতিগত বৈষম্য এবং ভারতীয় সাধারণ মানুষের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করার অভিযোগ তোলেন। বিপ্লবী ও সাংবাদিক জীবন: মুসলমান হলেও ধর্মের বদলে সেক্যুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদী আজাদ পুরোপুরি জাতীয়তাবাদী ভারতীয় (ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিস্ট) হয়ে যান। তিনি জাতিগত বৈষম্য উসকে দেওয়ার জন্য এবং সারা ভারতে সাধারণ মানুষের দাবি ও প্রয়োজন উপেক্ষা করায় ইংরেজদের অত্যন্ত তীব্র ভাষায় নিন্দা করেন। জাতীয় ইস্যুর আগে সাম্প্রদায়িক ইস্যুকে বড় করে দেখায় তিনি মুসলিম রাজনীতিবিদদেরও সমালোচনা করেন।

আজাদ স্যার সৈয়দ আহমদের ‘ন্যাশনালিস্ট’ আইডিয়ার প্রতি অনুরক্ত হন। ১৯০৮ সালে তিনি ইরাক, সিরিয়া, মিশর, তুরস্ক ও ফ্রান্স ভ্রমণ করেন ও তাদের যুব সমাজের মধ্যে কামাল আতাতুর্কের ধর্ম ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা ও জাতীয়তাবাদী মতবাদ তাঁকে প্রভাবিত করে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় তিনি সাধারণ মুসলিম সম্প্রদায়ের মতবাদের বিপরীতে অবস্থান নেন। এ সময় তিনি হিন্দু বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষ ও শ্যাম সুন্দর চক্রবর্তীর সংস্পর্শে আসেন। ধর্মের বদলে রাজনীতিতে মাওলানা আজাদের অনুরাগ দেখে মাওলানা শিবলী নোমানী তাঁকে ‘ওয়াকিল’ পত্রিকার সম্পাদক অমৃতসরের খান আতার কাছে পাঠান। সেখানে তিনি সম্পাদকমণ্ডলীর সভ্য হিসেবে পাঁচ বছর কাটান। কলকাতায় ফিরে ১৯১২ সালে তিনি ‘আল-হিলাল’ নামে একটি উর্দু পত্রিকা বের করেন। এতে ব্রিটিশ পলিসিকে আক্রমণ ও সাধারণ মানুষের সমস্যাগুলো তুলে ধরা হয়।

যে সকল ভারতীয় মুসলমান মুসলমানদের জন্য পৃথক পাকিস্তান রাষ্ট্রের দাবির বিরোধিতা করেছিলেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব ছিলেন মৌলানা আজাদ। আ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় তিনি হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির প্রচেষ্টা চালান। স্বাধীন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে তিনি বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষার জন্য আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি চালু করেন। তিনিই ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন স্থাপন করেন।

মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৮ মৃত্যুবরণ করেন।

মাওলানা আবুল কালাম আজাদকে জানতে আরও পড়ুন: