মাওলানা মওদুদী ও জামায়াতে ইসলামীর রাষ্ট্রভাবনা

বিশ শতকের মুসলিম রাজনৈতিক চিন্তাধারার ইতিহাস বুঝতে গেলে কয়েকটি নাম অনিবার্যভাবে সামনে আসে—হাসান আল-বান্না, সাইয়েদ কুতুব, রুহুল্লাহ খোমেনি এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে প্রভাবশালী হিসেবে মাওলানা সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী। এই চারজনের মধ্যে মওদুদীই একমাত্র ব্যক্তি যিনি কেবল তাত্ত্বিক লেখালেখির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং সরাসরি একটি সংগঠিত রাজনৈতিক-ধর্মীয় আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা তৈরি করেছিলেন। তার চিন্তার বাস্তব রূপ আজও দেখা যায় জামায়াতে ইসলামি নামক কাঠামোর মধ্যে—ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে।

মওদুদীর চিন্তাধারা শুধু ধর্মতত্ত্ব ছিল না; এটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রতত্ত্ব বা Political Theology। এর কেন্দ্রে ছিল এই বিশ্বাস যে আধুনিক জাতিরাষ্ট্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ—সবই মানুষের তৈরি ব্যবস্থা এবং তাই ইসলামের সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক। তার মতে, প্রকৃত সার্বভৌমত্ব মানুষের হাতে নয়; আইন প্রণয়নের অধিকার একমাত্র আল্লাহর। ফলে মানুষের বানানো সংবিধান, সংসদ ও রাষ্ট্র কাঠামো তার দৃষ্টিতে ছিল অবৈধ বা কুফরি ব্যবস্থা।

এই দর্শনই পরবর্তীতে ইসলামপন্থী রাজনীতির বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়—যেখান থেকে অনুপ্রেরণা নেয় জামায়াতে ইসলামি, মুসলিম ব্রাদারহুড, এমনকি পরোক্ষভাবে তালেবান ও আল-কায়েদার মতো সংগঠনও। মওদুদী এমন এক রাজনৈতিক ধারা তৈরি করে গেছেন, যারা আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের ভেতরে বসবাস করেও সেই রাষ্ট্রের আদর্শিক বৈধতাকে অস্বীকার করে, আবার একই সঙ্গে সেই রাষ্ট্রের ক্ষমতায় পৌঁছাতে চায়। তারা তত্ত্বে গণতন্ত্রকে হারাম বলে, কিন্তু বাস্তবে জন্মলগ্ন থেকেই নির্বাচনে অংশ নিয়ে এমএনএ, এমপি, মন্ত্রী পর্যন্ত হয়েছে।

এই দ্বিচারিতাই তাদের রাজনীতিকে সাধারণ মানুষের কাছে দুর্বোধ্য করে তোলে। বাইরে থেকে তারা কখনো গণতান্ত্রিক দল, কখনো ধর্মীয় আন্দোলন—আবার ভেতরে ভেতরে সম্পূর্ণ ভিন্ন রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন। এই লেখার উদ্দেশ্য হলো সেই বিভ্রান্তির পর্দা সরিয়ে, তাদের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, আদর্শ ও রাজনৈতিক কৌশলকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা—যাতে বোঝা যায়, এই ধারাটি আসলে কী চাইছে এবং কেন তা আধুনিক সমাজের জন্য গভীরভাবে সমস্যাজনক।

 

Table of Contents

মওদুদীর শৈশব ও পশ্চিমা শিক্ষাজীবন

মাওলানা মওদুদী জন্মগ্রহণ করেন ১৯০৩ সালে হায়দ্রাবাদের আওরঙ্গাবাদে। তার পূর্বপুরুষরা মুঘল ও নিজাম দরবারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার পিতা আহমদ হাসান প্রথমে ছিলেন পুরেপুরি পশ্চিমামনস্ক, পরে সুফিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ফলে মওদুদীর শৈশবেই ধর্মীয় আচার ও আধুনিক শিক্ষার এক দ্বৈত পরিবেশ তৈরি হয়।

তিনি পড়াশোনা করেন ওরিয়েন্টাল হাই স্কুল, পরে আলীগড়ের চিন্তাধারার সঙ্গে পরিচিত হন। এখানে তার শিক্ষক ছিলেন ব্রিটিশ ইসলামি পণ্ডিত থমাস আর্নল্ড, যিনি পাশ্চাত্য দর্শনের সঙ্গে ইসলামের তুলনামূলক পাঠ দিতেন। তরুণ মওদুদী তখন স্পষ্টভাবে বিশ্বাস করতেন—পাশ্চাত্য সভ্যতা মুসলিমদের তুলনায় উন্নত এবং মুসলিম সমাজের পিছিয়ে পড়ার কারণ হচ্ছে ধর্মীয় রক্ষণশীলতা।

নিজের লেখায় তিনি একসময় বলেছিলেন:

“আমি তখন ভাবতাম মুসলিম আলেমরা কেন ইংল্যান্ডে গিয়ে পাশ্চাত্যের রহস্য বোঝে না।”

কিন্তু পরবর্তী জীবনে তিনি এই পর্যায়কে আখ্যা দেন অজ্ঞতার যুগ বলে।

 

মার্কস, হেগেল কমিউনিজমের প্রভাব

একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু জামায়াতে ইসলামির জন্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর ঐতিহাসিক সত্য হলো—মাওলানা মওদুদী জীবনের এক পর্যায়ে স্পষ্টভাবে মার্কসবাদের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন এবং কমিউনিস্ট বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। তার ঘনিষ্ঠ গুরু ছিলেন দিল্লির প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা আব্দুল সাত্তার খায়রি, যিনি তখন ভারতে মস্কোভিত্তিক বলশেভিক প্রচার কমিটির প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। এই সম্পর্ক শুধু ব্যক্তিগত ছিল না; এটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শিক সংযোগ, যেখানে তরুণ মওদুদী নিয়মিতভাবে সমাজতান্ত্রিক সাহিত্য, বিপ্লবী তত্ত্ব এবং ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যার সঙ্গে পরিচিত হন।

শুধু তাই নয়, মওদুদীর পারিবারিক পরিসরও ছিল মার্কসবাদী প্রভাবের ভেতরে। তার শ্যালক ছিলেন একজন মার্কসবাদী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, যিনি কার্ল মার্কসের লেখা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন। ফলে মওদুদী প্রত্যক্ষভাবে মার্কস, হেগেল, দ্বন্দ্বমূলক ইতিহাসচিন্তা, শ্রেণিসংগ্রাম এবং বিপ্লবী সামাজিক পরিবর্তনের ধারণাগুলো গভীরভাবে অধ্যয়ন করার সুযোগ পান। এই সময় তিনি ইতিহাসকে দেখতেন মূলত সংঘাত ও সংগ্রামের ধারাবাহিকতা হিসেবে—যেখানে সমাজ এগোয় দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়েই।

পরবর্তী জীবনে মওদুদী প্রকাশ্যে মার্কসবাদের সমালোচনা করেন এবং একে “আংশিক সত্য” হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু তিনি নিজেই স্বীকার করেন—“মার্কস সত্যের অর্ধেক দেখেছিলেন, পুরো সত্য পেতে হলে তাকে কুরআন পড়তে হতো।” এই বক্তব্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে তার চিন্তার প্রকৃত রূপান্তর। তিনি দ্বন্দ্ব, সংগ্রাম ও বিপ্লবের ধারণা ত্যাগ করেননি; বরং সেগুলোকে ধর্মীয় পরিভাষায় পুনর্গঠন করেন এবং ইসলামী কাঠামোর ভেতরে বসান।

এর ফলেই তার দর্শনের মূল কাঠামো তৈরি হয়—ইসলাম বনাম জাহেলিয়াত, Truth বনাম Falsehood, Haq বনাম Batil। অর্থাৎ ইতিহাস আর শ্রেণির সংঘর্ষ নয়, বরং সত্য ও মিথ্যার যুদ্ধ; আর বিপ্লব আর সামাজিক নয়, বরং ধর্মীয় কর্তব্য। এই দ্বিমুখী বিশ্বদর্শনই পরবর্তীতে সাইয়েদ কুতুবসহ আধুনিক ইসলামপন্থী চিন্তকদের মধ্যে গভীরভাবে প্রতিধ্বনিত হয় এবং ইসলামকে একটি আধ্যাত্মিক ধর্ম থেকে রূপান্তরিত করে এক ধরনের বিপ্লবী রাজনৈতিক মতাদর্শে।

 

কংগ্রেস, গান্ধী জাতীয় রাজনীতি

মাওলানা মওদুদী প্রথম জীবনে কেবল ধর্মীয় চিন্তাবিদ ছিলেন না; তিনি সক্রিয়ভাবে ভারতীয় জাতীয় রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে তিনি কংগ্রেসে যোগ দেন, খিলাফত আন্দোলনে অংশ নেন এবং গান্ধীর নেতৃত্বাধীন সত্যাগ্রহে সমর্থন জানান। এমনকি ১৯১৯ সালে তিনি হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতা মদন মোহন মালব্যর একটি জীবনীও লেখেন, যেখানে তাকে “ভারতের জাহাজের ক্যাপ্টেন” হিসেবে বর্ণনা করে মুসলিমদের তার নেতৃত্ব অনুসরণ করতে আহ্বান জানান। এই পর্যায়ে মওদুদী নিজেকে একই সঙ্গে “হিন্দুস্তানি ও মুসলিম” হিসেবে ভাবতেন এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে যৌথ জাতীয় প্রকল্প হিসেবেই দেখতেন।

কিন্তু ধীরে ধীরে তার মনে হতে থাকে যে কংগ্রেসে মুসলিম নেতারা প্রকৃত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা পাচ্ছেন না এবং জাতীয় রাজনীতির ভেতরে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সমাজের সংস্কৃতি ও প্রতীকই ক্রমশ জাতীয় পরিচয়ের মূল রূপ নিচ্ছে। তার দৃষ্টিতে জাতীয়তাবাদ আর একটি রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং সংখ্যাগরিষ্ঠ সংস্কৃতির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার একটি হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে। এই ধারণা থেকেই তিনি লিখতে শুরু করেন যে, ভারতে গণতন্ত্রের বাস্তব অর্থ হলো সংখ্যার জোরে একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক কাঠামো চাপিয়ে দেওয়া।

এই মানসিকতা থেকেই মওদুদী কংগ্রেসের ‘কন্টাক্ট প্রোগ্রাম’-এর তীব্র বিরোধিতা করেন এবং এটিকে মুসলিম পরিচয় ধ্বংসের একটি পরিকল্পিত প্রয়াস হিসেবে উপস্থাপন করেন। বিশেষ করে তিনি জওহরলাল নেহরুকে অভিযুক্ত করেন মুসলিমদের “রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শুদ্ধি অভিযানে” ঠেলে দেওয়ার জন্য। এগুলো ছিল মূলত তার নিজস্ব ব্যাখ্যা ও আশঙ্কা, যেগুলো তিনি রাজনৈতিক বাস্তবতার বিশ্লেষণ হিসেবে উপস্থাপন করেন, যদিও সেগুলোকে ঐতিহাসিকভাবে সর্বজনস্বীকৃত সত্য বলা যায় না।

এই পর্যায়ে এসে মওদুদীর ভাষা আরও চরম ও ধর্মীয় রূপ নেয়। তিনি ঘোষণা করেন—
ভারতীয় জাতীয়তাবাদ হলো কুফর জাহেলিয়াত।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি জাতীয়তাবাদকে একটি ঈশ্বরবিরোধী ব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং ধর্মীয় পরিচয়কে জাতীয় পরিচয়ের সম্পূর্ণ বিপরীতে দাঁড় করান। এখান থেকেই তার চিন্তায় এক মৌলিক মোড় আসে—তিনি ধর্মকে রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি উপাদান হিসেবে নয়, বরং আধুনিক জাতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার সম্পূর্ণ প্রতিপক্ষ হিসেবে কল্পনা করতে শুরু করেন, যা পরবর্তীতে তাকে একজন ধর্মতান্ত্রিক ও চরমপন্থী আদর্শবাদীতে পরিণত করে।

 

মুসলিম জাতিসত্তা বিভাজনের বীজ

এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি কেবল দ্বিজাতিতত্ত্বের সঙ্গেই একাত্ম হননি, বরং ভারতীয় সমাজকে মৌলিকভাবে বিভক্ত জাতিগত সত্তার সমষ্টি হিসেবে কল্পনা করতে শুরু করেন। তার মতে, ভারত আসলে একক জাতি নয়; বরং এটি হিন্দু, মুসলিম, শিখ, দলিতসহ একাধিক জাতির সমাহার, যাদের প্রত্যেকেরই আলাদা ধর্মীয় সার্বভৌমত্ব থাকা উচিত। এই ধারণার ভেতরে ঐক্যের চেয়ে বিভাজনের উপাদানই ছিল বেশি, কারণ তিনি ভারতের মতো একটি বহুত্ববাদী রাস্ট্রের জাতীয় পরিচয়কে নাগরিকতার ভিত্তির বদলে ধর্ম ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে চাইছিলেন।

হয়তো এজন্যই মওদুদী মুসলিম লিগের পাকিস্তান পরিকল্পনাকেও সমর্থন করেননি। তার দৃষ্টিতে পাকিস্তানও ছিল একটি সমস্যাযুক্ত রাষ্ট্র, কারণ সেটিও আধুনিক জাতিরাষ্ট্র কাঠামোর ওপর দাঁড়ানো এবং মূলত ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হওয়ার কথা। অর্থাৎ পাকিস্তানে ইসলাম রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি হবে, কিন্তু আইনি ও রাজনৈতিক ভিত্তি হবে মানুষের তৈরি সংবিধান—যা মওদুদীর মতে ছিল আল্লাহর সার্বভৌমত্বের সরাসরি বিরোধী।

এই কারণে তিনি কেবল কংগ্রেস নয়, মুসলিম লিগ ও জমিয়তে উলামাকেও এক কাতারে ফেলে দেন এবং ঘোষণা করেন—সব রাজনৈতিক দলই মূলত “কুফরের পথে” চলছে। তার মতে, মুসলিম লিগ মুসলিমদের জন্য রাষ্ট্র চাইলেও সেটি প্রকৃত ইসলামী রাষ্ট্র নয়, বরং পশ্চিমা মডেলের অনুকরণ। তাই তার চোখে সমস্যার মূল সমাধান কোনো জাতীয় রাষ্ট্র নয়, বরং একমাত্র বিকল্প হলো ইসলামী রাষ্ট্র (Darul Islam)—যেখানে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব মানুষের হাতে নয়, বরং সরাসরি আল্লাহর নামে পরিচালিত হবে। এই অবস্থানই তাকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বাইরে এনে দাঁড় করায় একটি সম্পূর্ণ ধর্মতান্ত্রিক ও চরমপন্থী রাষ্ট্রভাবনার দিকে।

 

জামায়াতে ইসলামির জন্ম: একটি ধর্মীয় ক্যাডার সংগঠন

১৯৪১ সালে মাওলানা মওদুদী প্রতিষ্ঠা করেন জামায়াতে ইসলামি, যা কোনো সাধারণ রাজনৈতিক দল ছিল না, বরং ছিল একটি আদর্শগতভাবে কঠোর ধর্মীয় ক্যাডার সংগঠন। এর কাঠামো গড়া হয়েছিল অনেকটা বিপ্লবী পার্টির মতো—যেখানে সদস্যদের কাজ ছিল শুধু রাজনৈতিক প্রচার নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় মতাদর্শ অনুযায়ী নিজেদের জীবন সম্পূর্ণভাবে ঢেলে সাজানো। জামায়াতে যোগ দেওয়া মানে ছিল একটি সাধারণ সংগঠনে প্রবেশ নয়, বরং একটি আলাদা “নৈতিক ও ধর্মীয় সম্প্রদায়”-এর অংশ হয়ে যাওয়া।

সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হলো, জামায়াতে সদস্য হতে গেলে অনেক ক্ষেত্রে নতুন করে কালিমা পাঠ করানো হতো। এর পেছনে মওদুদীর যুক্তি ছিল—তার মতে জামায়াতের বাইরে থাকা মুসলিমরা প্রকৃত অর্থে ইসলাম বোঝে না, তাই তারা সত্যিকারের মুসলিমও নয়। তিনি প্রকাশ্যেই দাবি করতেন, “জামায়াতের বাইরে থাকা মুসলিমরা প্রকৃত মুসলিম নয়।” এই ধারণার মাধ্যমে তিনি কার্যত মুসলিম সমাজের বিশাল অংশকে ধর্মীয় বৈধতার বাইরে ঠেলে দেন এবং তাদের “কানেশুমারি মুসলিম” বা নামেমাত্র মুসলিম হিসেবে চিহ্নিত করেন।

এই চিন্তাধারাই ছিল তার মতবাদের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক। কারণ এখানে ইসলামকে আর একটি সর্বজনীন ধর্ম হিসেবে দেখা হয়নি, বরং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত মতাদর্শ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এর ফলে ধর্মের ভেতরেই তৈরি হয় এক ধরনের নতুন “ধর্মীয় এলিটিজম”—যেখানে কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীই নিজেদের প্রকৃত মুসলিম বলে দাবি করতে পারে, আর বাকিরা হয়ে ওঠে সন্দেহভাজন বা অযোগ্য। এখান থেকেই শুরু হয় ধর্মের ভেতরে নতুন ধর্ম তৈরি করার প্রক্রিয়া, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন চরমপন্থী আন্দোলনের সাংগঠনিক ও মানসিক কাঠামোর আদর্শিক ভিত্তি হয়ে ওঠে।

 

ইসলাম বনাম জাহেলিয়াত — মওদুদীর দ্বিমাত্রিক বিশ্বদর্শন

মাওলানা মওদুদীর চিন্তাধারার সবচেয়ে মৌলিক ও প্রভাবশালী ভিত্তি ছিল ইতিহাস ও সমাজকে তিনি একটি কঠোর দ্বিমাত্রিক কাঠামোর মধ্যে ভাগ করে দেখা। তার মতে মানব ইতিহাস মূলত দুই ভাগে বিভক্ত—একটি হলো ইসলামের যুগ (Haq) এবং অন্যটি হলো জাহেলিয়াতের যুগ (Batil)। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে ইসলাম মানেই সত্য, ন্যায় ও সঠিক পথ; আর ইসলামের বাইরে যা কিছু আছে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অজ্ঞতা, ভ্রান্তি ও বিভ্রান্তির অংশ। মওদুদীর ব্যাখ্যায় পাশ্চাত্য সভ্যতা, হিন্দু ধর্ম, খ্রিস্টান ধর্ম, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ—সবই জাহেলিয়াতের প্রকাশ। এমনকি মুসলিম সমাজের দীর্ঘ ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও আচার-অনুশীলনের বড় অংশকেও তিনি এই “অজ্ঞতার যুগ”-এর অন্তর্ভুক্ত করেন।

কিন্তু এই তত্ত্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি আসে তখনই, যখন মওদুদী জাহেলিয়াতের পরিসরকে কেবল অমুসলিমদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন না। তিনি স্পষ্টভাবে দাবি করেন—যেসব মুসলিম তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী ইসলাম মানে না, বা তার রাজনৈতিক-ধর্মীয় দর্শনের সঙ্গে একমত নয়, তারাও প্রকৃত অর্থে জাহেলিয়াতের অংশ। অর্থাৎ মুসলিম পরিচয় আর জন্মসূত্রে বা বিশ্বাসের ভিত্তিতে নির্ধারিত নয়; বরং নির্ধারিত হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শের আনুগত্যের মাধ্যমে। এতে করে তিনি ধর্মীয় পরিচয়ের ভেতরেই নতুন এক বিভাজন তৈরি করেন—“সত্যিকারের মুসলিম” বনাম “ভ্রষ্ট মুসলিম”।

এই ধারণা থেকেই মওদুদী একটি সম্পূর্ণ দ্বিমুখী বিশ্বদর্শন নির্মাণ করেন—একদিকে “আমরা” বা হিজবুল্লাহ (আল্লাহর দল), আর অন্যদিকে “তারা” বা হিজবুশ শয়তান (শয়তানের দল)। এই কাঠামোয় কোনো মধ্যবর্তী অবস্থান নেই, কোনো গ্রে জোন নেই, কোনো মতভেদের প্রতি সহনশীলতা নেই। সমাজকে তিনি দেখেন একটি স্থায়ী সংঘর্ষের ময়দান হিসেবে, যেখানে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে অবিরাম যুদ্ধ চলছে এবং সেই যুদ্ধে নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ নেই। এই দ্বিমাত্রিক চিন্তাধারাই পরবর্তীতে সাইয়েদ কুতুবসহ মুসলিম ব্রাদারহুডের তাত্ত্বিকদের মাধ্যমে আরও র‍্যাডিকাল রূপ নেয় এবং আজকের ইসলামপন্থী চরমপন্থার বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তির অন্যতম প্রধান উৎস হয়ে ওঠে।

 

সুফিবাদ: মওদুদীর চোখে “ইসলামের সবচেয়ে বড় শত্রু”

মওলানা মওদুদীর চিন্তায় সবচেয়ে আশ্চর্য এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে আক্রমণাত্মক অবস্থান ছিল সুফিবাদের বিরুদ্ধে। তার কাছে ইসলামের প্রধান শত্রু পাশ্চাত্য সভ্যতা বা হিন্দু ধর্ম নয়, বরং ইসলামের ভেতরে গড়ে ওঠা আধ্যাত্মিক ধারাই ছিল সবচেয়ে বিপজ্জনক। তিনি সুফিবাদকে সরাসরি আখ্যা দেন “শিরক” বা বহুঈশ্বরবাদ হিসেবে, এবং একে এমন একটি ধর্মীয় আফিম বলে চিহ্নিত করেন যা মানুষকে সক্রিয় সামাজিক সংগ্রামের বদলে আত্মসমর্পণ ও ভাগ্যবাদে অভ্যস্ত করে তোলে। তার ভাষায়, সুফিবাদ মানুষের মধ্যে বিপ্লবী চেতনা নষ্ট করে এবং বাস্তব দুনিয়ার অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা কেড়ে নেয়।

মওদুদী মার্কসের ভাষা ও যুক্তি ধার করে বলেন—সুফিবাদ মানুষকে সংগ্রামের বদলে ধ্যান ও ধৈর্য শেখায়, যা তাকে শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে নয়, বরং শোষণ মেনে নিতে শেখায়। তার মতে দরগায় যাওয়া মানে মূর্তিপূজা, ওলী বা গাউসের প্রতি শ্রদ্ধা মানে মিথ্যা দেবতা তৈরি করা, আর কবর জিয়ারত মানে কার্যত বহুঈশ্বরবাদে লিপ্ত হওয়া। এমনকি তিনি দাবি করেন—যারা এসব আচার পালন করে তারা প্রকৃত মুসলিম নয়, বরং ভ্রষ্ট বিশ্বাসের অনুসারী।

এই অবস্থানেই মওদুদীর চিন্তা ঐতিহ্যবাহী ইসলামের সঙ্গে প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কারণ ঐতিহাসিকভাবে ইসলামের সবচেয়ে বড় সামাজিক বিস্তার ঘটেছে ঠিক সুফি তরিকার মাধ্যমেই—ভারত, বাংলা, আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া থেকে শুরু করে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত। সুফিবাদই ইসলামকে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করেছে, মানবিক করেছে এবং সহনশীলতার ভিত্তিতে গড়ে তুলেছে। মওদুদী এই পুরো ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে ইসলামকে আধ্যাত্মিক ও নৈতিক ধর্ম থেকে সরিয়ে এনে একটি কঠোর রাজনৈতিক মতাদর্শে রূপান্তর করেন, যেখানে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের চেয়ে ক্ষমতা ও শাসনের প্রশ্নটাই মুখ্য হয়ে ওঠে।

 

“কানেশুমারি মুসলিম” ও “জন্মসূত্রে মুসলিম”

মওলানা মওদুদীর সবচেয়ে বিতর্কিত ও বিপজ্জনক ধারণাগুলোর একটি হলো মুসলিম সমাজকে তিনি নিজেই বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করে ফেলেন। তার ভাষায়, অধিকাংশ মুসলিম আসলে কানেশুমারি মুসলিম—অর্থাৎ নামেমাত্র মুসলিম, যারা জন্মসূত্রে ইসলাম পেয়েছে কিন্তু ইসলামের প্রকৃত দর্শন বোঝে না। তিনি আবার অনেককে জন্মসূত্রে মুসলিম” (Born Muslim) বলে আখ্যা দেন, যাদের ইসলাম তার মতে কেবল পারিবারিক পরিচয়, বিশ্বাসের গভীরতা নয়। এই শ্রেণিবিন্যাসের মাধ্যমে তিনি কার্যত মুসলিম সমাজের বড় অংশের ধর্মীয় বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেন।

এই ধারণাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়ে মওদুদী দাবি করেন—জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিতে হলে নতুন করে কালিমা পাঠ করা আবশ্যক, কারণ সাধারণ মুসলিম সমাজে উচ্চারিত কালিমা তার দৃষ্টিতে যথেষ্ট বা গ্রহণযোগ্য নয়। এটি ইসলামের ইতিহাসে একটি ভয়ংকর দাবি, কারণ ইসলামী ধর্মতত্ত্ব অনুযায়ী কাউকে মুসলিম ঘোষণা করা বা অমুসলিম বানানোর ক্ষমতা কোনো ব্যক্তির নেই; এই বিচারাধিকার কেবল আল্লাহর। কিন্তু মওদুদী কার্যত সেই সীমা ভেঙে ফেলেন এবং নিজেকে এক ধরনের ধর্মীয় কর্তৃত্বের স্থানে বসান—যিনি ঠিক করে দেবেন কে প্রকৃত মুসলিম, আর কে নয়।

এর ফলে তৈরি হয় একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক মানসিক কাঠামো: জামায়াতের বাইরে থাকা মুসলিমরা হয়ে ওঠে সন্দেহভাজন বা অসম্পূর্ণ মুসলিম, আর জামায়াতের ভেতরের সদস্যরাই কেবল নিজেদের “সত্যিকারের মুসলিম” বলে দাবি করার নৈতিক অধিকার পায়। এই ধরনের ভাবনা ধর্মকে একটি সর্বজনীন বিশ্বাসব্যবস্থা থেকে সরিয়ে এনে একটি নির্দিষ্ট সংগঠনের মালিকানাধীন পরিচয়ে পরিণত করে।

এই একই মানসিকতা পরবর্তীতে দেখা যায় তালেবান, আইএস, আল-কায়েদা, বোকো হারামের মতো চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে। সবাই মূলত একই যুক্তি ব্যবহার করে—আমরাই প্রকৃত মুসলিম, বাকিরা ভ্রষ্ট। মওদুদী হয়তো সরাসরি সহিংসতার ডাক দেননি, কিন্তু এই ধরনের চিন্তাধারাই আধুনিক ধর্মীয় চরমপন্থার সবচেয়ে শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে।

 

গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা: “হারাম” রাষ্ট্রব্যবস্থা

মওলানা মওদুদীর রাজনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে স্পষ্ট ও চরম অবস্থান ছিল আধুনিক গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে। তার মতে, আধুনিক গণতন্ত্রের মূল ধারণা—মানুষ নিজেই নিজের জন্য আইন তৈরি করবে—এটাই ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের বিরুদ্ধে। তিনি লিখেছিলেন, মানুষের হাতে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা মানে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করা, যা সরাসরি “শিরক” বা আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার স্থাপন করার শামিল। এই যুক্তি থেকে তিনি ঘোষণা করেন যে ভোট দেওয়া হারাম, সংসদ সদস্য হওয়া হারাম, মানুষের তৈরি সংবিধান মানা কুফর এবং ইসলামি রাষ্ট্র ছাড়া অন্য যেকোনো রাষ্ট্রে সরকারি চাকরি করা ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ।

এই চিন্তাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়ে মওদুদী বলেন—একজন মুসলিমের পক্ষে এমন রাষ্ট্রে বসবাস করাও হারাম, যদি না সে সেখানে ইসলামী বিপ্লব ঘটানোর লক্ষ্যে সংগ্রাম করে। অর্থাৎ সাধারণ নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রে বসবাস, আইন মানা বা সামাজিক জীবনে অংশগ্রহণ তার কাছে বৈধ নয়; বৈধ একমাত্র তখনই, যখন সেটি রাষ্ট্রব্যবস্থাকে উচ্ছেদ করার প্রস্তুতি হিসেবে করা হচ্ছে। এই বক্তব্যের বাস্তব প্রভাবও দেখা যায়—জামায়াতের বহু সদস্য সরকারি চাকরি ছেড়ে দেন, আদালতে যাওয়া বন্ধ করেন, সন্তানদের আধুনিক স্কুলে পড়ানো বন্ধ করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে “শয়তানের কারখানা” বলে আখ্যা দেন। মওদুদীর মতে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় ছিল “বধশালা”, আধুনিক ডিগ্রি ছিল “মৃত্যু সনদ” এবং সহশিক্ষা ছিল “নৈতিক ধ্বংসের পথ”।

কিন্তু এই কঠোর আদর্শের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামির বাস্তব রাজনৈতিক আচরণের একটি বড় বৈপরিত্য সবসময়ই চোখে পড়ে। ১৯৫০-এর দশকের শুরু থেকেই জামায়াত পাকিস্তানের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে এবং কখনোই গণতন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা বন্ধ করেনি। অর্থাৎ তত্ত্বে গণতন্ত্র হারাম হলেও বাস্তবে গণতন্ত্রই তাদের প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার ছিল। এই দ্বিচারিতা ইসলামপন্থী রাজনীতির একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়—গণতন্ত্রকে তারা ব্যবহার করে, কিন্তু বিশ্বাস করে না।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় জামায়াত ও সামরিক শাসকদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব সামরিক শাসনামলেই জামায়াতের সঙ্গে শাসকদের এক ধরনের পারস্পরিক নির্ভরতা দেখা যায়। সামরিক শাসকদের গণতান্ত্রিক বৈধতা না থাকায় নিজেদের শাসনকে জায়েজ করার জন্য একটি শক্তিশালী আদর্শিক ভাষার প্রয়োজন হয়, আর সেই ভাষা হিসেবে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার ছিল “ইসলাম”। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী কখনোই গণভোটের মাধ্যমে এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার মতো জনসমর্থন অর্জন করতে পারেনি। তাই রাষ্ট্রক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়ার জন্য তারা সামরিক শাসকদের “শর্টকাট সিঁড়ি” হিসেবে ব্যবহার করে। একদিকে ইসলামী রাষ্ট্রের কথা বলা, অন্যদিকে অগণতান্ত্রিক সামরিক শক্তির সঙ্গে আপস—এই বৈপরিত্যই দেখায় যে মওদুদীর আদর্শ বাস্তবে নৈতিকতার চেয়ে ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গেই বেশি খাপ খায়।

 

শিক্ষা, সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন জীবনের ওপর নিষেধাজ্ঞা

মওলানা মওদুদীর রাষ্ট্রভাবনা কেবল রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, রুচি, অভ্যাস এবং দৈনন্দিন সংস্কৃতির ওপরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে চেয়েছিলেন। তার দৃষ্টিতে ইসলাম শুধু বিশ্বাস বা নৈতিকতা নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে মানুষের পোশাক, বিনোদন, শিক্ষা ও সামাজিক সম্পর্ক পর্যন্ত নির্দিষ্ট আদর্শের অধীন হতে হবে। এই চিন্তা থেকে তিনি ঘোষণা করেন—গান হারাম, সিনেমা হারাম, খেলাধুলা হারাম (যদি তা অস্ত্র প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত না হয়), পশ্চিমা পোশাক হারাম, নারীর শিক্ষা সীমিত এবং পুরুষ–নারীর স্বাভাবিক সামাজিক মেলামেশা পাপ।

মওদুদীর কল্পিত সমাজে মানুষের স্বাভাবিক আবেগ ও সৃজনশীলতার জন্য খুব কম জায়গা ছিল। তার আদর্শ সমাজে মানুষ হাসবে না, গান শুনবে না, প্রেম করবে না, শিল্পচর্চা করবে না, দর্শন বা মুক্তচিন্তা করবে না। বরং প্রত্যাশা করা হয়—মানুষ নিজেকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর ভেতরে ঢুকিয়ে দেবে, যেখানে সে হবে শাসনব্যবস্থার অনুগত, আদর্শ সৈনিকের মতো শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং ধর্মীয় নির্দেশ মানতে অভ্যস্ত এক ক্যাডার।

এই চিন্তার ভেতরে মানুষ আর একটি স্বাধীন সত্তা নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শ বাস্তবায়নের যন্ত্রে পরিণত হয়। ব্যক্তি এখানে নিজের জীবন উপভোগ করার অধিকার রাখে না; তার কাজ হলো একটি ধর্মীয় রাষ্ট্র গঠনের প্রকল্পে নিজেকে উৎসর্গ করা। ফলে ধর্ম মানবিক ও নৈতিক উন্নয়নের পথ না হয়ে দাঁড়ায় একটি কঠোর শাসনমূলক ব্যবস্থায়, যেখানে মানুষের অনুভূতি, কল্পনা ও ব্যক্তিস্বাধীনতা সবই সন্দেহজনক ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

ভারত দার-উল-কুফর(Darul Kufr) বনাম পাকিস্তান ইসলামী ল্যাবরেটরি

দেশভাগের পর মাওলানা মওদুদী পাকিস্তানে চলে যান এবং প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন— ভারত হলো Darul Kufr—অবিশ্বাসীদের দেশ।
তার ব্যাখ্যায় ভারতের সংবিধান ছিল কুফরি দলিল, ভারতীয় রাষ্ট্র ছিল তাগুত বা শয়তানি ব্যবস্থা, আর সেখানে মুসলিমদের বসবাস ধর্মীয়ভাবে অবৈধ—যদি না তারা সেই রাষ্ট্রব্যবস্থা উচ্ছেদ করে ইসলামী বিপ্লব ঘটানোর জন্য সেখানে অবস্থান করে। তিনি এমনকি এটাও বলেন যে পাকিস্তানের মুসলিমদের উচিত ভারতের মুসলিমদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক না রাখা, কারণ তারা কুফরের পরিবেশে বসবাস করে নৈতিকভাবে দূষিত হয়ে গেছে। এই বক্তব্যগুলো কেবল ধর্মীয় মতামত ছিল না; এগুলো ছিল একটি পরিকল্পিত মানসিক বিচ্ছিন্নতা তৈরির প্রচেষ্টা, যেখানে ভারতীয় মুসলিমদের নাগরিক পরিচয়কে অবৈধ ও সন্দেহজনক হিসেবে চিত্রিত করা হয়।

এই দৃষ্টিভঙ্গির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ছিল গভীর। এর ফলে ভারতীয় মুসলিমদের একটি অংশের মধ্যে তৈরি হয় নাগরিক পরিচয়ের সংকট, রাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাস, গণতন্ত্রের প্রতি সন্দেহ এবং “আমরা বনাম তারা” ধরনের দ্বিমুখী মানসিকতা। ধর্মীয় পরিচয়কে নাগরিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে বসানোর এই প্রবণতা পরবর্তীতে SIMI, ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন এবং এমনকি আইএস-অনুপ্রাণিত কিছু গোষ্ঠীর মনস্তত্ত্বের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি তৈরি করে, যেখানে রাষ্ট্রকে শত্রু এবং সমাজকে ভ্রষ্ট হিসেবে দেখা হয়।

অন্যদিকে পাকিস্তানকে মওদুদী দেখতেন একটি ইসলামী বিপ্লবের পরীক্ষাগার হিসেবে। তার বিশ্বাস ছিল পাকিস্তান খুব দ্রুত ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত হবে এবং তারপর সেই মডেল রপ্তানি হবে ভারতসহ পুরো বিশ্বে। তিনি বলতেন—“ইসলাম শুধু ধর্ম নয়, এটি একটি পূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা।” কিন্তু বাস্তব সমস্যা ছিল এই যে পাকিস্তান রাষ্ট্র নিজেই গড়ে উঠেছিল আধুনিক জাতীয়তাবাদী কাঠামোর ওপর—সংবিধান, সংসদ, আদালত, সেনাবাহিনী—সবই ছিল পাশ্চাত্য রাষ্ট্রচিন্তার অনুকরণ। এখানেই মওদুদীর আদর্শের সঙ্গে বাস্তবতার মৌলিক সংঘাত তৈরি হয়।

এই সংঘাতের ফলেই এক ধরনের দ্বৈত অবস্থান দেখা যায়। একদিকে তিনি পাকিস্তানকে সমর্থন করেন, অন্যদিকে আবার ঘোষণা করেন যে পাকিস্তান এখনো প্রকৃত ইসলামী রাষ্ট্র নয়, এটি এখনো কুফরি কাঠামোর ভেতরেই পরিচালিত হচ্ছে এবং তাই এখানেও বিপ্লব প্রয়োজন। অর্থাৎ যে রাষ্ট্রে তিনি নিজে বসবাস করতেন এবং যার নাগরিক ছিলেন, তাকেও তিনি আদর্শগতভাবে অবৈধ ঘোষণা করেন। এতে স্পষ্ট হয়—মওদুদীর চিন্তায় কোনো বিদ্যমান রাষ্ট্রই বৈধ নয়, যতক্ষণ না তা তার কল্পিত ধর্মতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়।

 

হিন্দুদের প্রতিইসলামী রাষ্ট্রের আমন্ত্রণ

মওলানা মওদুদীর চিন্তায় একটি অদ্ভুত কিন্তু গভীরভাবে বিপজ্জনক দিক হলো—তিনি কখনো কখনো হিন্দুদের উদ্দেশ্য করে দাবি করতেন যে ইসলামী রাষ্ট্র কেবল মুসলিমদের জন্য নয়, বরং হিন্দুদের জন্যও নাকি উপকারী হবে। তার ভাষায়, “ইসলামী রাষ্ট্র শুধু মুসলিমদের নয়, এটা হিন্দুদেরও উপকার করবে।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি হিন্দুদের আহ্বান জানান ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র পরিত্যাগ করতে, ইসলামী রাষ্ট্র মেনে নিতে এবং কুরআন পড়ে রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়ম শিখতে। তার যুক্তি ছিল—যদি কুরআনে আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার স্পষ্ট নির্দেশ না পাওয়া যায়, তবে সেটা মানুষের সীমাবদ্ধতা; কুরআনের কোনো ত্রুটি নয়।

কিন্তু এই আহ্বানের ভেতরে বাস্তবে লুকিয়ে ছিল এক ধরনের সুন্দর মোড়কে প্যাকেটজাত ধর্মীয় আধিপত্য। কারণ মওদুদীর কল্পিত ইসলামী রাষ্ট্রে আইন হবে শরিয়াভিত্তিক, সার্বভৌমত্ব থাকবে আল্লাহর নামে পরিচালিত এবং রাষ্ট্রের নৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি নির্ধারিত হবে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় ব্যাখ্যার মাধ্যমে। এর স্বাভাবিক ফল হলো—অমুসলিমরা সেখানে পূর্ণ নাগরিক নয়, বরং দ্বিতীয় শ্রেণির বাসিন্দায় পরিণত হবে। তাদের ভোটাধিকার থাকবে না, আইন প্রণয়নের ক্ষমতা থাকবে না এবং রাষ্ট্রের মৌলিক আদর্শ নির্ধারণে কোনো বাস্তব ভূমিকা থাকবে না। ফলে “হিন্দুদের জন্য উপকারী” রাষ্ট্রের যে ছবি মওদুদী আঁকেন, তা আসলে সমান নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি নয়, বরং ধর্মীয় কর্তৃত্বের অধীনে সীমিত অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার একটি প্রস্তাবমাত্র।

 

জামায়াতে ইসলামি: ক্যাডার রাজনীতির বাস্তব রূপ

জামায়াতে ইসলামি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক দল ছিল না; এটি মূলত গড়ে উঠেছিল একটি মতাদর্শিক ক্যাডার সংগঠন হিসেবে, যেখানে রাজনৈতিক সদস্যপদ মানে ছিল কেবল ভোটের রাজনীতিতে অংশ নেওয়া নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় দর্শনের প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্য ঘোষণা করা। সংগঠনটির কাঠামো ছিল অনেকটা বিপ্লবী পার্টির মতো—কিন্তু এখানে বিপ্লব ছিল ধর্মীয় এবং আনুগত্য ছিল আদর্শগত। নেতার সিদ্ধান্ত কার্যত আল্লাহর নির্দেশের কাছাকাছি মর্যাদা পেত, এবং সংগঠনের ভেতরে প্রশ্ন করা বা ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ ছিল প্রায় নেই বললেই চলে।

জামায়াতের সদস্যদের জন্য দৈনন্দিন জীবনের ওপরও ছিল কঠোর নিয়ন্ত্রণ। নির্দেশ ছিল—জামায়াতের বাইরে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না; জামায়াতের অনুমতি ছাড়া পড়াশোনা করা যাবে না, চাকরি করা যাবে না, বিয়ে করা যাবে না, এমনকি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত হওয়া যাবে না। অর্থাৎ ব্যক্তি তার ব্যক্তিগত জীবন থেকেও স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলে এবং পুরো অস্তিত্ব সংগঠনের আদর্শ বাস্তবায়নের যন্ত্রে পরিণত হয়।

এই কাঠামো আসলে ছিল এক ধরনের মাইক্রো থিওক্রেটিক সমাজ—ছোট আকারে ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অনুশীলন। এখানে রাষ্ট্র না থাকলেও রাষ্ট্রের মতো নিয়ন্ত্রণ ছিল, আইন না থাকলেও শাসনের মতো কর্তৃত্ব ছিল, আর নাগরিকত্ব না থাকলেও ছিল আনুগত্যের বাধ্যবাধকতা। এর মাধ্যমে জামায়াত সদস্যদের মধ্যে এমন একটি মানসিকতা তৈরি করা হয়, যেখানে সংগঠনের প্রতি আনুগত্যই হয়ে ওঠে ধর্মীয় কর্তব্যের সমার্থক, আর ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত বিবেচনা হয়ে যায় সন্দেহজনক ও অপ্রয়োজনীয় বিষয়।

 

গণতন্ত্রে অংশগ্রহণ: আদর্শ বনাম বাস্তবতা

মওলানা মওদুদী তত্ত্বগতভাবে গণতন্ত্রকে “হারাম” এবং “কুফরি ব্যবস্থা” ঘোষণা করলেও, বাস্তবে জামায়াতে ইসলামির রাজনৈতিক আচরণ ছিল তার ঠিক উল্টো। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ—উভয় দেশেই জামায়াত নিয়মিতভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে, সংসদে গেছে, এমনকি মন্ত্রিত্বও গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ যে ব্যবস্থাকে তারা আদর্শগতভাবে অবৈধ বলে চিহ্নিত করেছিল, সেই ব্যবস্থাকেই তারা ক্ষমতায় পৌঁছানোর সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে।

এখানেই তৈরি হয় তাদের রাজনীতির সবচেয়ে বড় দ্বিচারিতা। তত্ত্বে তারা বলে গণতন্ত্র মানে মানুষের হাতে আইন তৈরির ক্ষমতা, যা আল্লাহর সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে। কিন্তু বাস্তবে গণতন্ত্রই হয়ে ওঠে তাদের ক্ষমতা দখলের সিঁড়ি। তারা ভোটে অংশ নেয়, সংবিধানের শপথ নেয়, সংসদীয় নিয়ম মানে—কিন্তু একই সঙ্গে দাবি করে এই সবকিছুই মূলত অইসলামি কাঠামো, যা ভবিষ্যতে বাতিল করতে হবে।

এই দ্বিচারিতাই আধুনিক ইসলামপন্থী রাজনীতির একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়। তারা গণতন্ত্রকে ব্যবহার করে, কিন্তু গণতন্ত্রের নৈতিক ভিত্তিতে বিশ্বাস করে না। তারা সংবিধানের আশ্রয় নেয়, কিন্তু সংবিধানকে চূড়ান্ত কর্তৃত্ব হিসেবে মানতে চায় না। তাদের কাছে গণতন্ত্র কোনো মূল্যবোধ নয়, বরং একটি কৌশল—যার উদ্দেশ্য একসময় সেই গণতন্ত্রকেই অকার্যকর করে একটি ধর্মতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। এই প্রবণতাই ইসলামপন্থী রাজনীতির সবচেয়ে বড় বিপদ, কারণ এটি গণতন্ত্রের ভেতর থেকেই গণতন্ত্রকে দুর্বল করার একটি আদর্শিক পথ তৈরি করে।

 

সহিংসতা না করলেও চরমপন্থার বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি

মওলানা মওদুদী নিজে কখনো সরাসরি সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়াননি, অস্ত্র ধরেননি বা সন্ত্রাসী হামলার নির্দেশ দেননি—এই দিক থেকে তিনি ক্লাসিক অর্থে একজন “জঙ্গি নেতা” নন। কিন্তু তার প্রকৃত প্রভাব এখানেই সবচেয়ে গভীর ও বিপজ্জনক: তিনি এমন একটি আদর্শিক কাঠামো তৈরি করে গেছেন, যার ভেতরেই সহিংসতার নৈতিক অনুমোদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিহিত ছিল। তার চিন্তায় বিশ্বকে দেখা হয় এক চূড়ান্ত দ্বন্দ্বের ময়দান হিসেবে—যেখানে একদিকে সত্য ও ঈমানের শক্তি, অন্যদিকে মিথ্যা ও জাহেলিয়াতের শক্তি। এই দ্বন্দ্বে নিরপেক্ষ থাকার কোনো জায়গা নেই; সবাইকে পক্ষ নিতে হবে।

এই কাঠামোর ভেতরে রাষ্ট্রকে দেখা হয় অবৈধ শত্রু হিসেবে, সমাজকে দেখা হয় নৈতিকভাবে পচে যাওয়া কাঠামো হিসেবে, আইনকে দেখা হয় ঈশ্বরবিরোধী ব্যবস্থা হিসেবে, আর ধর্মীয় বিপ্লবকে দেখা হয় ফরজ দায়িত্ব হিসেবে। ফলে সহিংসতা আর “অপরাধ” থাকে না, বরং হয়ে ওঠে “প্রয়োজনীয় শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া”। যখন কেউ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে বর্তমান সমাজ সম্পূর্ণ ভ্রষ্ট এবং রাষ্ট্র শয়তানি কাঠামো, তখন সেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র তোলা সহজেই নৈতিক কর্তব্যে পরিণত হয়।

মওদুদী আসলে সহিংসতার নির্দেশ না দিয়েও সহিংসতার জন্য প্রয়োজনীয় সব মানসিক শর্ত তৈরি করে দিয়েছিলেন—শত্রু চিহ্নিত করা, সমাজকে অবৈধ ঘোষণা করা, ভিন্নমতকে কুফর হিসেবে চিত্রিত করা এবং বিপ্লবকে ধর্মীয় দায়িত্ব বানিয়ে তোলা। এই কারণেই আধুনিক চরমপন্থীরা তার লেখাকে সরাসরি “ম্যানিফেস্টো” হিসেবে ব্যবহার না করলেও, তাদের চিন্তার গভীরে মওদুদীর দর্শন স্পষ্টভাবে কাজ করে। বলা যায়, তিনি অস্ত্র ধরেননি, কিন্তু অস্ত্র ধরার নৈতিক যুক্তিটা আগেই বানিয়ে দিয়ে গেছেন।

 

ইসলামের ঐতিহাসিক বহুত্ব বনাম মওদুদীর একমাত্রিক ইসলাম

ইসলামের ইতিহাস কখনোই একরৈখিক বা একমাত্রিক ছিল না। বরং ইসলাম গড়ে উঠেছে দীর্ঘ শতাব্দীজুড়ে মতভেদ, ব্যাখ্যার পার্থক্য এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কের ভেতর দিয়ে। ফিকহি ক্ষেত্রে হানাফি, মালেকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি মাযহাব ইসলামী আইনের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে; ধর্মতাত্ত্বিক ক্ষেত্রে মুতাজিলা, আশারি ও মাতুরিদির মতো ধারাগুলো যুক্তি, বিশ্বাস ও ঈশ্বরতত্ত্ব নিয়ে আলাদা অবস্থান তৈরি করেছে; আর সবচেয়ে ব্যাপক ও মানবিক রূপে সুফিবাদ ইসলামকে নৈতিকতা, প্রেম ও আত্মশুদ্ধির ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই বহুত্বের মধ্য দিয়েই ইসলাম বিভিন্ন সভ্যতার সঙ্গে মিশেছে, স্থানীয় সংস্কৃতিকে আত্মস্থ করেছে এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।

কিন্তু মওলানা মওদুদী এই পুরো ঐতিহ্যকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেন। তার কাছে ইসলাম আর বহুমাত্রিক ধর্মীয় সভ্যতা নয়; বরং এটি কেবল একটি রাজনৈতিক আদর্শ, একটি রাষ্ট্রীয় প্রকল্প এবং একটি বিপ্লবী মতবাদ। তিনি ইসলামের আধ্যাত্মিক দিককে “নিষ্ক্রিয়তা”, নৈতিক দিককে “ব্যক্তিগত বিষয়” এবং সাংস্কৃতিক দিককে “ভ্রষ্টতা” হিসেবে দেখেন। এর ফলে ইসলাম মানুষের হৃদয়ের বিশ্বাস বা নৈতিক আত্মগঠনের পথ না হয়ে পরিণত হয় একটি ক্ষমতা-কেন্দ্রিক প্রকল্পে—যেখানে ধর্মের প্রধান কাজ মানুষের জীবন সুন্দর করা নয়, বরং রাষ্ট্র দখলের জন্য আদর্শিক বৈধতা সরবরাহ করা। এই একমাত্রিক পাঠই ইসলামের ঐতিহাসিক বহুত্ব ও মানবিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে মওদুদীর চিন্তার সবচেয়ে গভীর বিচ্ছেদ তৈরি করে।

 

ধর্মকে রাজনৈতিক অস্ত্রে রূপান্তরের বিপদ

মওলানা মওদুদীর সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক ক্ষতি হলো—তিনি ধর্মকে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক পথ থেকে সরিয়ে এনে একটি পূর্ণাঙ্গ আইডিওলজিতে (Ideology) রূপান্তর করেন। অর্থাৎ ধর্ম আর মানুষের ভেতরের আত্মশুদ্ধি, নৈতিক বিকাশ বা সহানুভূতির উৎস থাকে না; বরং পরিণত হয় একটি রাজনৈতিক প্রকল্পে, যার প্রধান লক্ষ্য ক্ষমতা দখল এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ। এই রূপান্তরের ফলে ধর্মের স্বাভাবিক মানবিক বৈশিষ্ট্যগুলো ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে যায়।

যখন ধর্ম আইডিওলজিতে পরিণত হয়, তখন সেখানে প্রশ্ন করার অধিকার থাকে না—কারণ প্রশ্ন মানেই “বিশ্বাসে সন্দেহ”। ভিন্নমত আর মতভেদ হিসেবে দেখা হয় না, বরং দেখা হয় বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে। মানবিক সহানুভূতি হয়ে ওঠে দুর্বলতা, আর সহিষ্ণুতা হয়ে দাঁড়ায় আদর্শ থেকে বিচ্যুতি। ধর্ম তখন নৈতিকতার মানদণ্ড না থেকে একটি কঠোর শাসনব্যবস্থার ভাষায় কথা বলতে শুরু করে।

এই মানসিকতা থেকেই জন্ম নেয় তাকফির সংস্কৃতি—অর্থাৎ নিজের মতের বাইরে থাকা মানুষকে কাফের ঘোষণা করার প্রবণতা। এর পরিণতি হিসেবে তৈরি হয় ধর্মীয় হিংসা, সামাজিক বিভাজন এবং “আমরা বনাম তারা” ধরনের চরম মেরুকরণ। শেষ পর্যন্ত ধর্ম আর শান্তি বা নৈতিকতার উৎস না থেকে হয়ে ওঠে সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদের নৈতিক বৈধতা দেওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।

 

মওদুদীর রাষ্ট্র কল্পনা কেন অচল

মওলানা মওদুদীর “ইসলামী রাষ্ট্র” ধারণা তাত্ত্বিকভাবে আকর্ষণীয় শোনালেও বাস্তবে এটি তিনটি মৌলিক সমস্যায় ভরা, যা একে আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে কার্যত অকার্যকর ও বিপজ্জনক করে তোলে।

. সার্বভৌমত্বের সমস্যা
মওদুদীর মতে সার্বভৌমত্ব মানুষের নয়, আল্লাহর। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো—আল্লাহর ইচ্ছা ব্যাখ্যা করবে কে? আলেম? মোল্লা? কোনো নির্দিষ্ট দল বা সংগঠন? ইতিহাসে দেখা গেছে, “আল্লাহর নামে শাসন” মানে আসলে কিছু নির্দিষ্ট মানুষের হাতে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব তুলে দেওয়া। ফলে তারা নিজেদের সিদ্ধান্তকে প্রশ্নাতীত করে তোলে, কারণ সেটি আর রাজনৈতিক মত নয়—“আল্লাহর আদেশ” হিসেবে উপস্থাপিত হয়। এই ধরনের ক্ষমতা কাঠামোতে জবাবদিহি থাকে না, সমালোচনার সুযোগ থাকে না, এবং বিরোধিতা সহজেই ধর্মদ্রোহে রূপ নেয়। ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে ভয়ংকর ক্ষমতার রূপ, কারণ এখানে শাসকের ভুলও পবিত্র হয়ে যায়।

. আইনের স্থবিরতা
মওদুদীর রাষ্ট্রে আইন আসবে কুরআন ও হাদিস থেকে। কিন্তু আধুনিক সমাজের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন—এখানে আছে সাইবার অপরাধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, জটিল বৈশ্বিক অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক আইন ও পরিবেশ সংকটের মতো সমস্যা। এই সবকিছুর সরাসরি সমাধান সপ্তম শতকের আইনি কাঠামো দিয়ে সম্ভব নয়। ধর্মীয় আইন নৈতিক নির্দেশনা বা মূল্যবোধ দিতে পারে, কিন্তু পরিবর্তনশীল বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর মতো পূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা হতে পারে না। একটি রাষ্ট্রের আইন যদি স্থির ও অপরিবর্তনীয় হয়, তবে সেটি সমাজের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে অক্ষম হয়ে পড়ে।

. সংখ্যালঘু নারীর অধিকার
মওদুদীর কল্পিত রাষ্ট্র কাঠামোতে অমুসলিমরা কার্যত দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক, নারীরা পুরুষের অধীন, ধর্মান্তর রাষ্ট্রীয় সমস্যা, আর মতপ্রকাশ সীমিত। অর্থাৎ এটি একটি মৌলিকভাবে অসম রাষ্ট্র (Inequal State), যেখানে নাগরিকদের অধিকার ধর্ম ও লিঙ্গের ভিত্তিতে বিভক্ত। আধুনিক বিশ্ব যেখানে মানবাধিকার, নাগরিক সমতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতাকে রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে দেখে, সেখানে মওদুদীর রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকে ধর্মীয় শ্রেণিবিন্যাসের ওপর। ফলে এটি কোনো সর্বজনীন রাষ্ট্র নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট বিশ্বাসের আধিপত্যমূলক কাঠামো।

সব মিলিয়ে বলা যায়, মওদুদীর রাষ্ট্র কল্পনা নৈতিকভাবে আকর্ষণীয় শোনালেও বাস্তবে এটি জবাবদিহিহীন ক্ষমতা, স্থবির আইন এবং কাঠামোগত বৈষম্যের সমন্বয়—যা আধুনিক সমাজের বাস্তবতা ও মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে মৌলিকভাবে অসঙ্গত।

 

কেন এই দর্শন টেকেনি (এবং টিকবে না)

বিশ শতকে মওলানা মওদুদীর চিন্তাধারা অনেক মুসলিম সমাজে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে। উপনিবেশিক শাসনের অপমান, পশ্চিমা আধিপত্যের মানসিক আঘাত এবং মুসলিম সমাজের গভীর আত্মবিশ্বাস সংকটের ভেতর তার বক্তব্য অনেকের কাছে “পুনরুত্থানের ভাষা” হিসেবে ধরা দিয়েছিল। ইসলামী রাষ্ট্রের ধারণা তখন অনেকের কাছে মনে হয়েছিল হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ার প্রতীক—যেখানে ধর্মই হবে সম্মানের ভিত্তি এবং রাজনীতিই হবে আত্মপরিচয়ের অস্ত্র।

কিন্তু একবিংশ শতকে বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আজ মুসলিমরা বিশ্বের প্রায় সব রাষ্ট্রে নাগরিক হিসেবে বসবাস করছে; বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ছাড়া কোনো সমাজ টিকে থাকতে পারে না; আধুনিক রাষ্ট্র কাঠামো পারস্পরিকভাবে অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও তথ্যপ্রবাহের মাধ্যমে আন্তঃনির্ভরশীল; আর একক ধর্মীয় শাসন বাস্তবে কার্যকর করাও প্রায় অসম্ভব। এমন বাস্তবতায় একটি স্থির, ধর্মতান্ত্রিক ও আদর্শনির্ভর রাষ্ট্র মডেল কেবল অবাস্তবই নয়, বরং অকার্যকরও।

এই কারণেই মওদুদীর দর্শন বাস্তবে কোনো টেকসই রাষ্ট্র গড়তে পারেনি, কোনো সমাজকে টেকসই উন্নয়নের পথে নিতে পারেনি। বরং এটি বিভাজন বাড়িয়েছে, নাগরিক পরিচয়ের সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ের সংঘাত তৈরি করেছে এবং সমাজকে “আমরা বনাম তারা” ধরনের স্থায়ী মেরুকরণের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ইতিহাস দেখিয়েছে—ধর্মকে যখন রাষ্ট্রীয় আইডিওলজিতে পরিণত করা হয়, তখন তা সমাজকে ঐক্যবদ্ধ না করে বরং দীর্ঘমেয়াদে ভেঙে দেয়।

 

ইসলামের ভবিষ্যৎ: একমাত্র টেকসই পথ

মওলানা মওদুদীর রাজনৈতিক ও আদর্শগত ইসলামের বিপরীতে যে ইসলাম বাস্তবে টিকে থাকতে পারে, তা হলো এমন এক ইসলাম যা রাষ্ট্র দখলের প্রকল্প নয়, বরং মানুষের জীবন গঠনের নৈতিক ও মানবিক পথ। প্রথমত, এটি হতে হবে আধ্যাত্মিক ইসলাম—যেখানে ধর্ম মানুষের হৃদয় ও বিবেক গড়ে, ক্ষমতার কাঠামো নয়। এখানে ঈমান মানে শাসন প্রতিষ্ঠা নয়, বরং আত্মশুদ্ধি, সহানুভূতি ও নৈতিক সংযম।

দ্বিতীয়ত, প্রয়োজন নৈতিক ইসলাম—যেখানে ধর্ম মানুষকে শক্তিশালী হওয়ার শিক্ষা দেয় না, বরং দায়িত্বশীল হওয়ার শিক্ষা দেয়। ক্ষমতা নয়, জবাবদিহি; আধিপত্য নয়, সেবা—এই হবে ধর্মীয় নৈতিকতার মূল ভাষা।

তৃতীয়ত, দরকার বহুত্ববাদী ইসলাম—যেখানে ভিন্ন মত, ভিন্ন ব্যাখ্যা ও ভিন্ন জীবনধারা পাপ নয়, বরং বাস্তবতার স্বাভাবিক অংশ। ইসলাম ঐতিহাসিকভাবে টিকে থেকেছে এই বহুত্বের মাধ্যমেই, একরূপতার মাধ্যমে নয়।

এবং সর্বশেষ, প্রয়োজন নাগরিক ইসলাম—যেখানে একজন মুসলিম প্রথমে একজন পূর্ণ নাগরিক, পরে তার ধর্মীয় পরিচয়। এখানে রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে সমান অধিকার ও আইনের শাসন, আর ধর্ম থাকবে ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও নৈতিক প্রেরণার জায়গায়। এই পথেই ইসলাম আধুনিক বিশ্বে শান্তিপূর্ণ, সম্মানজনক ও মানবিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকতে পারে।

 

তাহলে কি সিদ্ধান্ত নিলেন?

মওলানা মওদুদীর চিন্তাধারা একসময় মুসলিম সমাজে গভীর আলোড়ন তুলেছিল। উপনিবেশিক অপমান ও আত্মপরিচয়ের সংকটে তার বক্তব্য অনেকের কাছে শক্তি ও পুনর্জাগরণের ভাষা বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের দীর্ঘ পরীক্ষায় তার দর্শন আজ মূলত তিনটি পরিচয়ে ধরা দেয়—এটি এখন ইতিহাসের অংশ, একটি রাজনৈতিক ব্যর্থতার উদাহরণ এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক সতর্কবার্তা।

মওদুদী দেখিয়ে দিয়েছেন, ধর্মকে যখন রাষ্ট্রের কাঠামোয় রূপান্তর করা হয়, তখন তা নৈতিকতার উৎস না হয়ে ক্ষমতার হাতিয়ারে পরিণত হয়। ঈশ্বরের নামে শাসন মানে শেষ পর্যন্ত মানুষের হাতে প্রশ্নাতীত কর্তৃত্ব তুলে দেওয়া, যার ফল হয় বৈষম্য, দমননীতি ও স্থায়ী বিভাজন। তার চিন্তা বাস্তবে কোনো টেকসই রাষ্ট্র তৈরি করতে পারেনি, বরং সমাজে মেরুকরণ, অবিশ্বাস ও সংঘাতের বীজ বপন করেছে।

এক অর্থে মওদুদী নিজেই তার তত্ত্বের চূড়ান্ত সমালোচক হয়ে উঠেছেন—কারণ তার অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে গেছে, ধর্ম মানুষের নৈতিক ও আত্মিক জীবনের জন্য উপযোগী হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার একমাত্র ভিত্তি হিসেবে নয়। ইসলাম বাঁচবে ক্ষমতার রাজনীতি থেকে দূরে থাকলেই, আর মানবিক, বহুত্ববাদী ও নাগরিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত হলেই।

আমি আপনাকে ভাবনার খোরাক দিলাম।
সিদ্ধান্ত একান্তই আপনার।

 

তথ্যসূত্র:

মওদুদীর নিজের লেখা (Primary Sources)

  1. Abul A‘la Maududi – Islamic Law and Constitution
    (Lahore: Islamic Publications)
    → গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব, আল্লাহর আইন, সংসদবিরোধী বক্তব্য।

  2. Maududi – Political Theory of Islam
    → Political theology, sovereignty of God, anti-secularism।

  3. Maududi – Al-Jihad fil Islam
    → জিহাদ, বিপ্লব, ইসলামী রাষ্ট্রের ধারণা।

  4. Maududi – Risalah-e-Diniyat
    → ধর্ম বনাম আধুনিকতা।

  5. Maududi – Tafhimat (5 volumes)
    → “Haq vs Batil”, Jahiliyyah, Muslim parties criticism।

  6. Maududi – Khilafat aur Mulukiyat
    → রাষ্ট্র, শাসন, ইসলামী রাজনৈতিক ইতিহাস।

  7. Maududi – Rasa’il wa Masa’il
    → ভোট হারাম, সংসদ হারাম, secular democracy kufr।

অন্যান্য তথ্যসূত্র

  1. Voll, John O. – Islam: Continuity and Change in the Modern World
    → Maududi as founder of modern Islamist political theology.

  2. Nasr, Seyyed Vali Reza – Mawdudi and the Making of Islamic Revivalism
    (Oxford University Press)
    → আপনার লেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একক রেফারেন্স।

  3. Nasr – The Vanguard of the Islamic Revolution
    → Jamaat as ideological vanguard party.

  4. Irfan Ahmad – Islamism and Democracy in India
    (Princeton University Press)
    → Jamaat, SIMI, democracy contradiction।

  5. Barbara Metcalf – Islamic Revival in British India
    → Maududi’s early life, Congress, Khilafat.

  6. Charles J. Adams – “Maududi and the Islamic State”
    in Voices of Resurgent Islam
    → Islamic state critique.

  7. Wilfred Cantwell Smith – Islam in Modern History
    → Maududi vs modernity.

মার্কসবাদ ও কমিউনিস্ট সংযোগ

  1. Nasr – Mawdudi and the Making of Islamic Revivalism (Ch. 2)
    → Abdul Sattar Khairi, Marxist phase.

  2. Irfan Ahmad – Genealogy of the Islamic State
    → Dialectics → Islamic dualism.

  3. Ayesha Jalal – Self and Sovereignty
    → Marx, Hegel influence on Islamist thinkers.

গণতন্ত্র ও দ্বিচারিতা

  1. Olivier Roy – The Failure of Political Islam
    → Islamists use democracy but reject it.

  2. Gilles Kepel – Jihad: The Trail of Political Islam
    → Maududi → Qutb → Jihadist lineage.

  3. Bassam Tibi – Islamism and Islam
    → Political ideology vs spiritual religion.

সুফিবাদ বিরোধিতা

  1. Maududi – Tasawwuf aur Shariat
    → Direct anti-Sufi writing.

  2. Trimingham – The Sufi Orders in Islam
    → Sufism as spreader of Islam (refutes Maududi).

  3. Ernst – Sufism: An Introduction to the Mystical Tradition of Islam

Jahiliyyah → Qutb → Extremism Lineage

  1. Sayyid Qutb – Milestones
    → Direct borrowing of Maududi framework.

  2. Roxanne Euben – Enemy in the Mirror
    → Islamist revolutionary psychology.

  3. Fawaz Gerges – The Far Enemy
    → Ideological genealogy of jihadism.

India Darul Kufr, Pakistan Lab

  1. Maududi – Khutbat-e-Madras
    → India as Dar al-Kufr.

  2. Irfan Ahmad – Islamism and Democracy in India (Ch. 3)

  3. Ayesha Jalal – The State of Martial Rule
    → Jamaat + military alliance.

Jamaat as Cadre Party

  1. Hamid Enayat – Modern Islamic Political Thought
    → Jamaat as ideological vanguard.

  2. Nasr – The Vanguard of the Islamic Revolution
    → Cadre structure.

  3. Alfred Stepan – Religion, Democracy and the Twin Tolerations
    → Why Jamaat model fails in democracy.

ধর্মকে আইডিওলজিতে রূপান্তর

  1. Hannah Arendt – The Origins of Totalitarianism
    → Ideology destroys moral space.

  2. Karl Mannheim – Ideology and Utopia
    → Political religion framework.

  3. Eric Voegelin – Political Religions
    → Religion → authoritarian ideology.

কেন ব্যর্থ হয়েছে

  1. Olivier Roy – Globalized Islam

  2. Noah Feldman – The Fall and Rise of the Islamic State

  3. Amartya Sen – Identity and Violence