আমার পরিচিত এক ছোট ভাই সদ্য স্নাতক শেষ করে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ব্যবসায় নেমেছে। তার পণ্যটি বেশ মানসম্মত এবং বাজারে প্রচলিত অন্য পণ্যের তুলনায় কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য (Unique Features) থাকায় সে বেশ আত্মবিশ্বাসী। তবে বর্তমানের বিশাল ও প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে হলে কেবল ভালো পণ্যই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ‘ব্র্যান্ড পারসোনা’। সে আমাকে ইনবক্সে একটি মৌলিক প্রশ্ন করেছিল— “মার্কেটিংয়ের ঠিক কোথায় সবচেয়ে বেশি ফোকাস করা উচিত?”
উদ্যোক্তা সিরিজ- মার্কেটিংয়ে ভিশন
আমি মার্কেটিংয়ের প্রথাগত ছাত্র নই, তবে দীর্ঘ কর্মজীবন এবং ব্যবসার ময়দানে বাস্তব অভিজ্ঞতার ‘ধাক্কা-গুঁতো’ খেয়ে যা শিখেছি, তা থেকেই আজ কিছু কথা পাবলিকলি শেয়ার করছি। আশা করি, নতুন উদ্যোক্তাদের এটি পথ দেখাবে।
১. পণ্য বনাম ভ্যালু: দেহ ও প্রাণের রসায়ন
আমরা প্রথাগতভাবে পড়ে এসেছি: Product = Commodity + Value। এখানে ‘কমোডিটি’ বা পণ্যটি হলো দেহ, আর তার ‘ভ্যালু’ বা উপযোগিতা হলো প্রাণ। কিন্তু আধুনিক মার্কেটিংয়ের ট্রেন্ড বলছে—এখনকার লড়াই আর কেবল ‘ভ্যালু’তে আটকে নেই। মার্কেটিং এখন পণ্য (Product) থেকে সরে গিয়ে গ্রাহকের ‘মিশন’ বা ‘ভিশন’ (Consumer’s Mission)-এর দিকে মোড় নিয়েছে।
২. বিপণন কৌশলের বিবর্তন: বিজ্ঞাপণ থেকে মোটিভেশন
গত শতাব্দীতে মার্কেটিং ছিল অনেকটা ‘ইনফরমেশন ড্রাইভেন’—আপনার পণ্যের খবর বিভিন্ন মাধ্যমে জানিয়ে দিন, যার প্রয়োজন সে খুঁজে নেবে। তখন বিকল্প কম ছিল, প্রচারের মাধ্যমও ছিল সীমিত। ক্রেতার হাতে যথেষ্ট সময় ছিল পণ্য টিপে-শুঁকে, তুলনা করে কেনার।
কিন্তু আজকের চিত্র ভিন্ন। এখন বিকল্প পণ্যের পাহাড় আর বিজ্ঞাপনের বন্যায় গ্রাহক দিশেহারা। আপনার দারুণ পণ্যের খবরটি মুহূর্তে অন্য কারো বিজ্ঞাপনের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে। তাই আধুনিক মার্কেটিং থিওরি এখন আর ‘বিক্রয়’ (Selling)-এর ওপর দাঁড়িয়ে নেই; বরং এটি দাঁড়িয়ে আছে ‘ব্র্যান্ড পজিশনিং’ (Brand Positioning)-এর ওপর। বর্তমানের সফল মার্কেটিং হলো—গ্রাহককে বোঝানো যে, “আপনার সমস্যা বা স্বপ্নের সাথে আমরা একমত, এবং আপনার সেই যাত্রায় আমাদের পণ্যটি কেবল একটি টুল বা সহযোগী।”
৩. উদাহরণের আয়নায় ‘মার্কেটিং ভিশন’
একটু খেয়াল করুন, একটি এয়ারলাইনসের মূল সার্ভিস কী? আকাশপথে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাত্রী পৌঁছে দেওয়া। এর সাথে ভ্যালু-অ্যাডেড সার্ভিস (VAS) হিসেবে আছে আরামদায়ক সিট, স্মার্ট ক্রু কিংবা সুস্বাদু খাবার।
কিন্তু আপনি যদি বিশ্বের সেরা ১০টি এয়ারলাইনসের ওয়েবসাইট দেখেন, তবে অবাক হয়ে লক্ষ্য করবেন যে—তারা তাদের বিমান বা সিটের ছবির চেয়ে গন্তব্যের চমৎকার সব ট্যুরিস্ট স্পট, ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের ওপর বেশি ফোকাস করে। কেন? কারণ একজন যাত্রীর আল্টিমেট ‘ভিশন’ হলো সেই গন্তব্য বা অভিজ্ঞতা; বিমানটি কেবল সেই ভিশন পূরণের মাধ্যম মাত্র। তারা আপনাকে বিমান বিক্রি করছে না, তারা আপনাকে আপনার ‘স্বপ্নের ভ্রমণ’ বিক্রি করছে।
একইভাবে, নব্বইয়ের দশকে টুথপেস্টের বিজ্ঞাপনে বলা হতো—তাতে কী কী কেমিক্যাল আছে এবং তা কীভাবে দাঁত রক্ষা করবে। কিন্তু আজকের ‘ক্লোজআপ’ উপাদান নিয়ে কথা না বলে শোনায় “কাছে আসার গল্প”, আর ‘সেনসোডাইন’ সরাসরি আপনার ব্যক্তিগত ডেন্টিস্টের আস্থা জয় করতে চায়। তারা জানে, কাস্টমার এখন অনেক সচেতন; এখন তাদের প্রয়োজন ইমোশনাল কানেকশন।
৪. মার্কেটিং মায়োপিয়া (Marketing Myopia) থেকে সাবধান
বিখ্যাত মার্কেটিং প্রফেসর থিওডোর লেভিট একটি শব্দ ব্যবহার করেছিলেন—’মায়োপিয়া’ বা দৃষ্টিক্ষীণতা। যখন কোনো উদ্যোক্তা কেবল নিজের পণ্যের প্রেমে পড়ে যান কিন্তু গ্রাহকের পরিবর্তনশীল মানসিকতা বা বৃহত্তর চাহিদা দেখতে পান না, তখনই তিনি মায়োপিয়াতে আক্রান্ত হন।
রেলওয়ে কোম্পানিগুলো একসময় মার খেয়েছিল কারণ তারা ভেবেছিল তারা ‘রেল ব্যবসায়’ আছে, অথচ তারা ছিল আসলে ‘পরিবহন ব্যবসায়’। আমাদের তরুণ উদ্যোক্তারা যেন এই ভুল না করে। আপনার পণ্যটি কী, তার চেয়ে বড় কথা হলো আপনার পণ্যটি গ্রাহকের জীবনের কোন ‘শূন্যস্থান’ পূরণ করছে বা কোন ‘স্বপ্ন’ ছুঁতে সাহায্য করছে।
৫. নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আমার পরামর্শ
আপনি যদি সফল হতে চান, তবে পণ্যের ফিচারের চেয়ে গ্রাহকের ‘আকাঙ্ক্ষা’ (Aspiration)-কে বেশি গুরুত্ব দিন।
গ্রাহকের সমস্যার সাথে সহমত পোষণ করুন।
তাদের মিশনের অংশীদার হোন।
এবং আপনার পণ্যটিকে সেই মিশনের একটি পরিপূরক সমাধান হিসেবে ‘অ্যালাইন’ করুন।
সময়ের চাহিদার সাথে যারা এই ফোকাস বদলাতে পারে না, তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। আমাদের তরুণরা যেন তাদের নতুন দৃষ্টি দিয়ে সেই ভবিষ্যৎ দেখতে পায়, যা আমরা অনেক ভুল করে শিখেছি।
সবার উদ্যোক্তা মিশন সফল হোক।
আরও পড়ুন:
