ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের এক সুবিশাল এবং বর্ষাসিক্ত ভূখণ্ডের নাম মালহার পরিবার বা মল্লার অঙ্গ। মেঘের গুঞ্জন, বৃষ্টির রিনিঝিনি শব্দ আর প্রকৃতির সজীবতাকে সুরের জালে বন্দি করার নামই মল্লার। বাংলা অভিধান অনুযায়ী, ‘মল্লার’ হলো বর্ষার ভাবযুক্ত রাত্রিকালীন রাগবিশেষ। শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাসে এটি অন্যতম বৃহৎ ‘রাগমালিকা’ বা পরিবার, যার প্রতিটি শাখা বৃষ্টির ভিন্ন ভিন্ন রূপ ও মেজাজকে তুলে ধরে।
মালহার রাগের পরিবার
মালহার পরিবারের পরিচয় ও চরিত্র
মালহার মূলত বর্ষাকালের রাগ হলেও শাস্ত্রীয় মতে এটি মধ্যরাত্রির রাগ হিসেবে স্বীকৃত। তবে বর্ষাকালে এটি দিনের যেকোনো সময় গাওয়ার অনুমতি আছে। এই পরিবারের প্রতিটি রাগের হৃদয়ে থাকে এক ধরণের তৃষ্ণা এবং বৃষ্টির শীতলতা। লোকসুর থেকে শুরু করে দরবারী গাম্ভীর্য—সবই এই মল্লার অঙ্গের অন্তর্ভুক্ত। এর প্রতিটি রাগের নিজস্ব চরিত্র আছে যা মূলত সুরের সূক্ষ্ম কারুকার্য বা ‘অঙ্গ’ দিয়ে আলাদা করা হয়।
প্রধান ও প্রচলিত মালহারসমূহের সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও পার্থক্য
মালহার পরিবারে অসংখ্য রাগ থাকলেও কিছু রাগ তাদের স্বকীয়তায় উজ্জ্বল। নিচে প্রধান কয়েকটি রাগের চরিত্র ও তাদের মধ্যকার মূল পার্থক্য আলোচনা করা হলো:
- মিঞাঁ কি মালহার: এটি এই পরিবারের সম্রাট। সম্রাট আকবরের সভার সংগীতজ্ঞ মিঞাঁ তানসেন এর স্রষ্টা।
- চরিত্র: অত্যন্ত গম্ভীর ও আধ্যাত্মিক। এর বিশেষত্ব হলো এর ‘আন্দোলিত গান্ধার’ (জ্ঞা)।
- পার্থক্য: অন্য সব মল্লার থেকে এটি আলাদা এর অতি কোমল ও কম্পিত গান্ধারের কারণে। এতে দুই নিষাদ (ণি ও না) এবং শুদ্ধ ধৈবত (ধা) ব্যবহৃত হয়।
- মেঘ মালহার: এটি মালহার পরিবারের আদি ও প্রাচীন রূপ।
- চরিত্র: মেঘের ডাকের মতো গম্ভীর। এটি একটি ঔড়ব জাতির রাগ (সা রে মা পা ণি র্সা)।
- পার্থক্য: মিঞাঁ কি মালহারে গান্ধার ও ধৈবত থাকলেও মেঘ মালহারে এই দুটি স্বর সম্পূর্ণ বর্জিত। এর শুদ্ধতা ও সরলতাই এর পরিচয়।
- গৌড় মালহার: বৃষ্টির শান্ত ও স্নিগ্ধ রূপ।
- চরিত্র: এটি বিলাবল অঙ্গের কাছাকাছি। এতে শুদ্ধ গান্ধার (গা) ব্যবহৃত হয়।
- পার্থক্য: মিঞাঁ কি মল্লারে যেখানে কোমল গান্ধারের আন্দোলন প্রধান, গৌড় মল্লারে সেখানে শুদ্ধ গান্ধারের কাজ এবং ‘রে পা’ সংগতি প্রধান।
- সুর মালহার (সুরদাসী মালহার): ভক্তিবাদী ও আকুলতা প্রধান।
- চরিত্র: এতে গান্ধার বর্জিত থাকে (অনেকের মতে)। এটি সারং অঙ্গের কাছাকাছি।
- পার্থক্য: মিঞাঁ কি মল্লারের গাম্ভীর্যের বদলে এতে এক ধরণের সরল ভক্তিভাব কাজ করে।
মিশ্র মালহারসমূহ: বৈচিত্র্যের মেলা
সংগীত সাধকরা বিভিন্ন রাগের সাথে মল্লারকে মিশিয়ে নতুন নতুন রূপ দান করেছেন। আপনার দেওয়া তালিকায় থাকা কিছু গুরুত্বপূর্ণ মিশ্র রাগের চরিত্র নিচে দেওয়া হলো:
- বাহার মালহার: রাগ বাহার ও মল্লারের মিশ্রণ। এতে বসন্তের চপলতা ও বর্ষার সজীবতা দুই-ই আছে।
- বাসন্তী মালহার: রাগ বসন্ত ও গৌড় মালহারের মিশ্রণ। এটি মূলত বসন্তের শেষের বৃষ্টির অনুভূতি দেয়।
- বিলাওয়াল মালহার: রাগ আলহাইয়া বিলাওয়াল ও গৌড় মালহারের সংমিশ্রণ। এতে ভোরের স্নিগ্ধতা ও বর্ষার মেঘের ছায়া থাকে।
- কেদার মালহার: রাগ কেদার ও মল্লারের মিশ্রণ। এতে কেদারের ‘মা পা’ সংগতি এবং মল্লারের ‘রে পা’ সংগতির এক চমৎকার যুদ্ধ দেখা যায়।
- শিব মালহার: এটি একটি আধুনিক মিশ্রণ। শিবরঞ্জনীর করুণ রস ও মিঞাঁ কি মালহারের গাম্ভীর্য মিলে এক মরমী আবহের সৃষ্টি করে।
- মোদ মালহার: কামোদ ও মিঞাঁ কি মালহারের মিশ্রণ। এতে কামোদের বক্র চলন মল্লারের গাম্ভীর্যকে এক নতুন মাত্রা দেয়।
মালহার পরিবারের বিস্তৃত তালিকা (আপনার সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী)
মালহার পরিবারে প্রচলিত ও অপ্রচলিত মিলিয়ে প্রায় ৩৬টিরও বেশি রাগ রয়েছে। প্রতিটি রাগের স্বরবিন্যাস ভিন্ন হলেও তাদের ‘মল্লার অঙ্গ’ (সা রে মা পা সংগতি) এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে।
| ক্রম | রাগের নাম | প্রকৃতি/সম্পর্ক |
| ১ | আদানা মালহার | আডানা রাগের চপলতা ও মল্লারের মিশ্রণ। |
| ২ | অরুণ মালহার | ভোরের মেঘের সুর। |
| ৩ | বারওয়া মালহার | বারওয়া রাগের ছায়া যুক্ত। |
| ৪ | বিরজু কি মালহার | লোকসুর প্রভাবিত মল্লার। |
| ৫ | চাঁদনী মালহার | চাঁদের আলোয় বৃষ্টির রোমান্টিক আবহ। |
| ৬ | দেশ মালহার | রাগ দেশ ও মল্লারের মিশ্রণ (খুবই জনপ্রিয়)। |
| ৭ | ধুলিয়া মালহার | ধূলিধূসর প্রকৃতির ওপর প্রথম বৃষ্টির সুর। |
| ৮ | জয়ন্ত মালহার | রাগ জয়ন্তী ও মল্লারের মিশ্রণ। |
| ৯ | রামদাসী মালহার | দুই গান্ধারের ব্যবহার বিশিষ্ট মল্লার। |
| ১০ | শাহানা মালহার | কানাড়া অঙ্গ ও মল্লারের সংমিশ্রণ। |
(তালিকায় উল্লিখিত অন্যান্য রাগ যেমন—চরজু কি মালহার, মীরাবাই কি মালহার, নানক মালহার বা সুরদাসী মালহার মূলত বিভিন্ন সাধক বা ঘরানার নামে পরিচিত, যেগুলোর স্বর বিন্যাসে সামান্য রদবদল করে নতুন রসের সৃষ্টি করা হয়েছে।)
মালহার পরিবারের রাগগুলো কেবল সংগীত নয়, বরং বৃষ্টির নানা রূপের কাব্যিক প্রকাশ। মিঞাঁ কি মালহারের বজ্রগম্ভীর আওয়াজ থেকে শুরু করে গৌড় মালহারের ঝিরঝিরে বৃষ্টির প্রশান্তি—সবই এই পরিবারে বিদ্যমান। শাস্ত্রীয় সংগীতের এই শাখাটি আমাদের শেখায় কীভাবে প্রকৃতি ও মানুষের আবেগ সুরের মাধ্যমে একাকার হয়ে যেতে পারে। মালহারের যেকোনো একটি রাগ শেখা মানে কেবল সুর শেখা নয়, বরং বর্ষার আদিম সত্তাকে স্পর্শ করা।

এ পর্যণ্ত সব মিলিয়ে যত রকম মালহারের তালিখা পেয়েছি:
১. আদানা মালহার (বা আড়ানা মালহার)
২. অরুণ মালহার
৩. বাহার মালহার
৪. বারওয়া মালহার
৫. বাসন্তী মালহার
৬. বিলাওয়াল মালহার
৭. বিরজু কি মালহার
৮. চাঁদনী মালহার
৯. চরজু কি মালহার
১০. ছায়া মালহার
১১. দেশ মালহার
১২. ধুলিয়া মালহার
১৩. গান্ধী মালহার
১৪. গৌড় মালহার
১৫. গৌড়গিরি মালহার
১৬. জয়ন্ত মালহার
১৭. ঝিনঝোতি মালহার
১৮. কাফি মালহার
১৯. কেদার মালহার (বা সাভানি কেদার)
২০. মিঞাঁ কি মালহার (বা মিয়ান কি মালহার)
২১. মীরাবাই কি মালহার
২২. মেঘ মালহার
২৩. মোদ মালহার
২৪. নানক মালহার
২৫. নাট মালহার
২৬. প্যাট মালহার
২৭. রামদাসী মালহার
২৮. সারং মালহার (বা মিয়ান কি সারং)
২৯. সাওয়ানি মালহার (বা সাওয়ান গান্ধার)
৩০. শাহানা মালহার
৩১. শিব মালহার
৩২. শুদ্ধ মালহার
৩৩. সোরথ মালহার
৩৪. সুর মালহার
৩৫. সুরদাসী মালহার
৩৬. তিলক মালহার
৩৭. খাম্বাজ মালহার
৩৮. দেবগিরি মালহার
৩৯. ললিত মালহার
৪০. যোগ মালহার
৪১. যমন মালহার
৪২. হাম্বীর মালহার
৪৩. অহি মালহার
৪৪. মালহার কাফি
৪৫. শঙ্করা মালহার
৪৬. বিভাস মালহার

তথ্যসূত্র:
১. পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — ‘হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতি’: মল্লার পরিবারের রাগের তাত্ত্বিক বিভাজনের জন্য।
২. বিমলকান্ত রায় চৌধুরী — ‘ভারতীয় সংগীতকোষ’: বিভিন্ন অপ্রচলিত মল্লার রাগের ঐতিহাসিক তথ্যের জন্য।
৩. সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমী (SRA): মেঘ ও মিঞাঁ কি মালহারের মধ্যকার শাস্ত্রীয় পার্থক্য যাচাইয়ের জন্য।
৪. পণ্ডিত ওমকারনাথ ঠাকুর — ‘প্রণব ভারতী’: মল্লার অঙ্গের স্বর প্রক্ষেপণ পদ্ধতি নিশ্চিতকরণের জন্য।
![মালহার রাগের পরিবার Raga Malhar Family মালহার রাগের পরিবার । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ 1 মালহার রাগের পরিবার [ Raga Malhar Family ]](https://sufifaruq.com/wp-content/uploads/2023/07/মালহার-রাগের-পরিবার-Raga-Malhar-Family-.png)