মিয়া মমিন বা হাকিম মোমিন খান মোমিন এর শের -শায়েরি -গজল । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

উর্দু শায়েরির সোনালী যুগ। দিল্লির আকাশে তখন জ্বলজ্বল করছেন মির্জা গালিব। পাশে আছেন ইব্রাহিম জওক। ঠিক সেই সময়েই আরেকজন শায়ের রাজত্ব করতেন। তাঁর নাম হাকিম মোমিন খান মোমিন। ইতিহাসে তিনি ‘মিয়া মোমিন’ বা ‘হাকিম খান’ নামেও পরিচিত। ফারাজের মতোই তাঁর শায়েরিতে ছিল এক অদ্ভুত টান।

মিয়া মমিন বা হাকিম মোমিন খান মোমিন

উর্দু শায়েরিতে ‘মোমিন’ শব্দের অর্থ বিশ্বাসী বা ধার্মিক মুসলমান। মোমিন খান যখন তাঁর ছদ্মনাম বা ‘তকাল্লুস’ বেছে নেন ‘মোমিন’, তখন এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তিনি যখন কোনো গজলে লিখতেন, “মোমিন তো আজ কাফের হয়ে গেল,” তখন সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হতো। তারা বুঝতে পারত না তিনি নিজের কথা বলছেন নাকি একজন সাধারণ মুসলমানের কাফের হওয়ার কথা বলছেন। শব্দের এই দ্ব্যর্থবোধক (Double meaning) ব্যবহার করে তিনি শায়েরিতে এক নতুন ধাঁধার জন্ম দিয়েছিলেন।

মিয়া মমিন বা হাকিম মোমিন খান মোমিন
মিয়া মমিন বা হাকিম মোমিন খান মোমিন

জন্ম বৃত্তান্ত ও রাজকীয় শৈশব

মোমিনের জন্ম সচ্ছল এবং সম্ভ্রান্ত পরিবারে। ১৮০০ সালে দিল্লির এক নামী চিকিৎসক পরিবারে তিনি জন্ম নেন। তাঁর বাবা হাকিম গুলাম নবী খান ছিলেন মোগল রাজদরবারের চিকিৎসক। মোমিনের জন্মের পর তাঁর নাম রেখেছিলেন বিখ্যাত সুফি সাধক শাহ আব্দুল আজিজ।

সচ্ছল ঘরের সন্তান হওয়ায় মোমিনের বড় হওয়া ছিল রাজকীয়। তিনি শুধু ইউনানি চিকিৎসাবিদ্যাই শেখেননি। সাথে আরবি, ফারসি, গণিত এবং জ্যোতির্বিদ্যায় গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। তরুণ বয়সে তিনি দেখতে অত্যন্ত সুদর্শন ছিলেন। তিনি জীবনযাপনও করতেন রাজকীয় চলনে।

মিয়া মমিন বা হাকিম মোমিন খান মোমিন
মিয়া মমিন বা হাকিম মোমিন খান মোমিন

স্বাধীনচেতা কবি ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রত্যাখ্যান

তাঁর কবি হয়ে ওঠার পেছনে দিল্লির সাহিত্যিক পরিবেশ বড় ভূমিকা রেখেছিল। শাহ নাসির ছিলেন তাঁর কবিতার প্রথম ওস্তাদ। তবে মোমিন খুব দ্রুত নিজের একটি অনন্য ঘরানা তৈরি করেন। তাঁর শায়েরির মূল বিষয় ছিল—অভিজাত প্রেম, তীব্র অন্তর্দহন এবং এক মনস্তাত্ত্বিক টান।

সমকালীন কবিরা যেখানে টিকে থাকার জন্য রাজদরবারের অনুগ্রহ খুঁজতে বাধ্য হতেন, মোমিন সেখানে ছিলেন সম্পূর্ণ স্বাধীনচেতা। মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর তাঁকে রাজদরবারের শায়ের হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু মোমিন সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। এমনকি দিল্লির ব্রিটিশ রেসিডেন্টের দেওয়া বার্ষিক বৃত্তির প্রস্তাবও তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

তিনি কোনো দিন কোনো রাজা বা নবাবের পৃষ্ঠপোষকতা নেননি। কোনো কাসিদা বা প্রশস্তিমূলক কবিতা লেখেননি। নিজের চিকিৎসাপেশা এবং পৈত্রিক সম্পত্তি থেকেই তাঁর জীবন চলত। রাজদরবারের চাকুরির চাপ না থাকায় তিনি তাঁর শায়েরি রাখতে পেরেছিলেন মুক্ত এবং আত্মমর্যাদাপূর্ণ।

মিয়া মোমিন এতটাই আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ ছিলেন যে, তিনি কখনো কোনো রাজা বা নবাবের প্রশংসা করে ‘কাসিদা’ লেখেননি। তবে এর একটি ব্যতিক্রম ছিল। তিনি টোঙ্কের নবাব ওয়াজির-উদ-দৌলার জন্য একটি কাসিদা লিখেছিলেন। কিন্তু সেটি ফরমায়েশি ছিল না। নবাবের ধর্মপরায়ণতার প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি নিজে খুশি হয়ে লিখেছিলেন। নবাব খুশি হয়ে তাঁকে প্রচুর উপহার দিতে চেয়েছিলেন। মোমিন তা বিনীতভাবে প্রত্যাখ্যান করেন।

বহুমুখী প্রতিভা ও গালিবের স্বীকৃতি

মোমিন শুধু কবি ছিলেন না। তিনি ছিলেন একাধারে ডাক্তার, জ্যোতিষী এবং দাবাড়ু। মোমিনের রোমান্টিক গজলে এক গভীর বিষাদ লুকিয়ে থাকত। তাঁর একটি শের উর্দু সাহিত্যের ইতিহাসে অমর হয়ে আছে:

Tum mere paas hote ho goya / Jab koi doosra nahin hota

বাংলা অর্থ: তুমি ঠিক তখনই আমার পাশে থাকো (আমার ভাবনায়), যখন আমার পাশে অন্য কেউ থাকে না।

এই একটি শেরের গভীরতা দেখে মির্জা গালিব চমকে গিয়েছিলেন। গালিব বলেছিলেন, “কেউ যদি আমাকে মোমিনের এই শেরটি দেয়, আমি তাকে বিনিময়ে আমার পুরো দীউয়ান বা কাব্যগ্রন্থ দিয়ে দেব।” একজন সমসাময়িক কবির জন্য গালিবের এই স্বীকৃতি অসাধারণ বিষয় ছিল।

মির্জা গালিবের সাথে মোমিনের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত মধুর এবং শ্রদ্ধাপূর্ণ। সমসাময়িক কবিদের মধ্যে তীব্র হিংসা-বিদ্বেষ থাকলেও গালিব ও মোমিন একে অপরকে অনেক উঁচুদরের কবি মনে করতেন। মোমিনের গজলের যে অন্তর্মুখী প্রেম এবং মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা ছিল, গালিব প্রায়ই ব্যক্তিগত আড্ডায় তার প্রশংসা করতেন।

মোমিনের আরেকটি বিখ্যাত গজল আমরা প্রায়ই শুনি। গোলাম আলী কিংবা বেগম আখতারের কণ্ঠে এটি আজো মানুষের চোখে জল আনে:

Woh jo hum mein tum mein qaraar tha, tumhein yaad ho ke na yaad ho / Wahi yaani waada nibah ka, tumhein yaad ho ke na yaad ho

বাংলা অর্থ: আমাদের মধ্যে যে একটা মধুর বোঝাপড়া ছিল, তোমার তা মনে আছে কি নেই? সেই যে একসাথে চলার প্রতিজ্ঞা, তোমার তা মনে আছে কি নেই?

https://youtu.be/DsL5ymMboro?si=1TY09um_BDZ0W9Ox

গোপন প্রেম ও রাজনৈতিক ডায়েরি

মোমিনের গজলে যে তীব্র বিরহ এবং বাস্তব প্রেমের ছোঁয়া পাওয়া যায়, তার পেছনে ছিলেন একজন রক্তমাংসের নারীও ছিলেন। ইতিহাসবিদদের মতে, দিল্লির এক বিখ্যাত তবায়েফ বা বাঈজী ‘সাহেব জান’ এর প্রেমে মোমিন গভীরভাবে মগ্ন ছিলেন। সাহেব জান রূপ ও গুণে অনন্য ছিলেন। মোমিনের একটি বিশাল গজল-সিরিজ আছে যাকে ‘মাসনভি-এ-মোমিন’ বলা হয়। সেখানে তিনি তাঁদের গোপন প্রেম, তীব্র আকর্ষণ, সমাজের ভয় এবং মান-অভিমানের গল্পগুলো অত্যন্ত খোলামেলাভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। এটি তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে বেশ শোরগোল ফেলেছিল।

মোমিনের আরেকটি বড় গুণ ছিল তিনি প্রতিদিনের রোজনামচা লিখতেন। একই সাথে দিল্লির তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি গোপন ডায়েরি লিখতেন। তাঁর মৃত্যুর পর সেই ডায়েরির অনেক পাতা উদ্ধার করা হয়। সেটা থেকে ১৯ শতকের প্রথমার্ধের দিল্লির অভিজাত সমাজ, মহামারী এবং ইউনানি চিকিৎসাপদ্ধতির অনেক মূল্যবান ঐতিহাসিক উপাত্ত গবেষকেরা খুঁজে পেয়েছেন।

ব্রিটিশ ক্ষোভ এবং মৃত্যুর নিখুঁত ভবিষ্যদ্বাণী

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের ঠিক ৫ বছর আগে (১৮৫২ সালে) মোমিন মারা যান। কিন্তু তাঁর শেষ জীবনের কবিতায় ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ছিল। তিনি সরাসরি যুদ্ধে না গেলেও তাঁর লেখনীর মাধ্যমে দিল্লির তরুণদের ভেতরে স্বাধীনতার স্পৃহা জাগিয়ে তুলতেন। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, তিনি যদি ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত বেঁচে থাকতেন, তবে হয়তো বাহাদুর শাহ জাফরের সাথে তিনিও ব্রিটিশদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতেন।

জ্যোতির্বিদ্যা বা ইলম-ই-নজুম (Astrology)-এ মোমিনের জ্ঞান ছিল অলৌকিক পর্যায়ের। তিনি নিজেই তাঁর মৃত্যুর সময় গণনা করেছিলেন। ১৮৫২ সালে মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনি ফারসি ভাষায় একটি ‘কাত’আ’ বা চার লাইনের কবিতা লিখে যান। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে তাঁর হাত-পা ভেঙে যাবে এবং তিনি মারা যাবেন। কাকতালীয়ভাবে, নিজের কোঠাবাড়ির ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে ঠিক সেভাবেই হাত-পা ভেঙে তাঁর মৃত্যু হয়।

মোমিনের জীবনের শেষটা ছিল তাঁর কবিতার মতোই ট্রাজিক। ১৮৫২ সালের এই দুর্ঘটনার কিছুদিন পরেই মাত্র ৫২ বছর বয়সে তিনি মারা যান। দিল্লির মেহদিয়ান কবরস্থানে আজো ঘুমিয়ে আছেন এই মহান শায়ের। গালিবের দার্শনিকতা আর ফারাজের রোমান্টিকতার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ ছিলেন মিয়া মোমিন। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর ভেজা গজলগুলো আজো প্রেমিকের হৃদয়ে কড়া নাড়ে।

মিয়া মমিন বা হাকিম মোমিন খান মোমিন
মিয়া মমিন বা হাকিম মোমিন খান মোমিন

চলুন তার কিছু সৃষ্টি দেখে নেই:

তাঁর ১০টি শের তুলে দিলাম:

১.

اردو: تم میرے پاس ہوتے ہو گویا جب کوئی دوسرا نہیں ہوتا

Roman: Tum mere paas hote ho goya / Jab koi doosra nahin hota

বাংলা অর্থ: তুমি ঠিক তখনই আমার পাশে থাকো (আমার ভাবনায়), যখন আমার পাশে অন্য কেউ থাকে না।

২.

اردو: وہ جو ہم میں تم میں قرار تھا تمہیں یاد ہو کہ نہ یاد ہو

Roman: Woh jo hum mein tum mein qaraar tha tumhein yaad ho ke na yaad ho / Wahi yaani waada nibah ka tumhein yaad ہو کہ نہ یاد ہو

বাংলা অর্থ: আমাদের মধ্যে যে একটা মধুর বোঝাপড়া ছিল, তোমার তা মনে আছে কি নেই? সেই যে একসাথে চলার প্রতিজ্ঞা, তোমার তা মনে আছে কি নেই?

৩.

اردو: عمر ساری تو کٹی عشقِ بتاں میں مومنؔ آخری وقت میں کیا خاک مسلماں ہوں گے

Roman: Umr saari to kati ishq-e-butaan mein Momin / Aakhri waqt mein kya khaak musalmaan honge

বাংলা অর্থ: সারাটা জীবন তো মূর্তিসম সুন্দরীদের প্রেমে মত্ত হয়েই কেটে গেল হে মোমিন! এখন জীবনের এই শেষ মুহূর্তে এসে আমি আর কেমন খাঁটি মুসলমান হব!

৪.

اردو: روئیے اس کی بے وفائی پر یا کریں شکوہ اپنی قسمت کا

Roman: Roiye us ki be-wafaai par / Ya karein shikwa apni qismat ka

বাংলা অর্থ: আমি কি এখন তাঁর এই নিষ্ঠুর বিশ্বাসঘাতকতার জন্য বসে বসে কাঁদব, নাকি নিজের কপাল আর ভাগ্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ করব?

৫.

اردو: غیر کے دل میں گر جگہ پائی آپ نے تو مری قضا پائی

Roman: Ghair ke dil mein gar jagah paai / Aap ne to mri qaza paai

বাংলা অর্থ: আপনি যদি কোনো পরপুরুষের (অন্য কারও) হৃদয়ে নিজের জায়গা করে নিয়ে থাকেন, তবে জেনে রাখুন—আপনি আসলে আমার মৃত্যুই ডেকে এনেছেন!

৬.

اردو: ناؤک انداز جگر تک گئی لہر اب کے جی بچا لائے تو جانیں گے

Roman: Naawak andaz jigar tak gayi lahar ab ke / Jee bacha laaye to jaaneinge

বাংলা অর্থ: তাঁর বাঁকা চোখের চাউনির তিরটি এবার সরাসরি কলিজা গিয়ে বিধেছে, এই তীব্র আঘাত সামলে যদি এবার জীবনটা বাঁচিয়ে ফিরতে পারি, তবেই নিজেকে বাহাদুর মানব!

৭.

اردو: تم چلو تو قیامت اٹھے گی تم رکو تو زمانہ رکے گا

Roman: Tum chalo to qiyamat uthegi / Tum ruko to zamana rukega

বাংলা অর্থ: তুমি যখন পা বাড়িয়ে হাঁটা শুরু করো, তখন যেন চারদিকে কেয়ামত (মহাপ্রলয়) নেমে আসে; আর তুমি যখন থমকে দাঁড়াও, তখন যেন থমকে যায় গোটা দুনিয়া!

৮.

اردو: اثر اس کو ذرا نہیں ہوتا رنج راحت فزا نہیں ہوتا

Roman: Asar us ko zara nahin hota / Ranj raahat-faza nahin hota

বাংলা অর্থ: আমার কোনো আকুতিই তাঁর মনে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলে না; আর এই গভীর দুঃখ কোনোভাবেই আমার জন্য স্বস্তিদায়ক হচ্ছে না।

৯.

اردو: قاصد آیا ہے وہاں سے تو کوئی بات تو کہہ کچھ تو معلوم ہو اس شوخ کا احوال ہمیں

Roman: Qasid aaya hai wahan se to koi baat to keh / Kuch to maaloem ho us shokh ka ahwaal humein

বাংলা অর্থ: হে বার্তাবাহক! তুমি যখন তাঁর ওখান থেকে ফিরেই এসেছ, তখন অন্তত মুখ ফুটে একটি কথা তো বলো! সেই চঞ্চল প্রিয়তমার কোনো একটা খবর তো আমাদের জানাও!

১০.

اردو: ذکرِ اغیار سے کیا فائدہ مومنؔ دیکھو اپنے احوال پہ کچھ رحم کرو

Roman: Zikr-e-aghyar se kya faayda Momin dekho / Apne ahwaal pe kuch rehm karo

বাংলা অর্থ: প্রতিদ্বন্দী আর পরজনদের গল্প করে এখন আর কী লাভ হে মোমিন? তার চেয়ে বরং নিজের এই জীর্ণ অবস্থার দিকে তাকাও আর নিজের ওপর একটু দয়া করো!

আরও দেখুন: