উর্দু শায়েরির ইতিহাসে মীর তকি মীর এক অবিসংবাদিত সম্রাট, যাঁকে ভালোবেসে ‘খুদা-এ-সুখান’ বা শায়েরির ঈশ্বর বলা হয়। মির্জা গালিবের মতো মহীরুহ কবিও মীরের শ্রেষ্ঠত্ব অকপটে স্বীকার করে লিখেছিলেন যে, শুধু গালিবই উর্দু শায়েরির উস্তাদ নন, পুরোনো দিনে মীর নামেও একজন ছিলেন। মীরের জীবন ছিল চরম দুঃখ, দারিদ্র্য এবং দিল্লি শহরের একের পর এক ধ্বংসলীলা দেখার এক করুণ মহাকাব্য। তাঁর শায়েরির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘সোজ-ও-গদাজ’ (তীব্র দহন ও বেদনা) এবং ভাষার চরম সারল্য। তিনি সাধারণ মানুষের মুখের সহজ ভাষায় হৃদয়ের গভীরতম ক্ষতগুলোকে এমনভাবে তুলে ধরতেন, যা সরাসরি পাঠকের আত্মাকে নাড়া দেয়।
আমার বড় ভাই মেহেদি হাসান সাহেবের গাওয়া মীর তকি মীর এর একটি গজল আমাকে শুনিয়েছিলেন। যেখান থেকেই সম্ভবত আমার মীর এর প্রতি প্রেম বাড়া শুরু করেছিল।
গজলটা অনুবাদ সহ দিলাম।
dekh to dil ki jaañ se uThtā hai /
ye dhuāñ sā kahāñ se uThtā haiতাকিয়ে দেখ, এ তো মনের একেবারে গভীর (প্রাণ) থেকে উঠছে! / এই যে ধোঁয়ার মতো একটা কিছু উঠছে, তা আর কোথা থেকে উঠবে! (বিরহ-বেদনার গভীরতাকে আগুনের ধোঁয়ার সাথে তুলনা করা হয়েছে)
gor kis diljale kī hai ye falak /
shola ik sub.h yaañ se uThtā haiহে আকাশ! এটি কোন ভাগ্যহত পোড়া-হৃদয় মানুষের কবর? / যেখান থেকে প্রতিদিন সকালে আগুনের একটি শিখা বা স্ফুলিঙ্গ জেগে ওঠে!
ḳhāna-e-dil se zīnhār na jā /
koī aise makāñ se uThtā haiআমার এই মন-ঘর ছেড়ে কক্ষনও যেয়ো না; / কেউ কি এমন সুন্দর (ভালোবাসায় ভরা) বাসস্থান ছেড়ে কখনো চলে যায়?
naala sar khīñchtā hai jab merā /
shor ik āsmāñ se uThtā haiআমার ভেতরের আর্তনাদ যখনই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, / তখনই পুরো আকাশ জুড়ে এক তীব্র হাহাকার আর শোরগোল সৃষ্টি হয়।
laḌtī hai us kī chashm-e-shoḳh jahāñ /
ek āshob vaañ se uThtā haiতার ওই চপল ও চঞ্চল চোখ যেখানেই গিয়ে নজর মেলায়, / ঠিক সেখানেই একটি প্রলয় বা কেয়ামত নেমে আসে!
sudh le ghar kī bhī shola-e-āvāz /
duud kuchh āshiyāñ se uThtā haiহে আগুনের মতো তীব্র কণ্ঠস্বর, নিজের ঘরের দিকেও একটু নজর দাও! / দেখ, নিজের বাসা বা নীড় থেকেও কিন্তু কিছুটা ধোঁয়া উঠছে।
baiThne kaun de hai phir us ko /
jo tire āstāñ se uThtā haiযে ব্যক্তি একবার তোমার দরজা বা চৌকাঠ ছেড়ে উঠে যায়, / এই পুরো পৃথিবীতে তাকে আর শান্তিতে বসার জায়গা কে-ই বা দেয়!
yuuñ uThe aah us galī se ham /
jaise koī jahāñ se uThtā haiহায়! তোমার ওই গলি থেকে আমি ঠিক এভাবে বিদায় নিয়ে চলে এলাম, / মানুষ যেভাবে চিরতরে এই পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নেয় (মৃত্যুবরণ করে)।
ishq ik ‘mīr’ bhārī patthar hai /
kab ye tujh nā-tavāñ se uThtā haiহে ‘মীর’! প্রেম তো এক মস্ত ভারী পাথর; / তোমার মতো এমন দুর্বল, শক্তিহীন মানুষের পক্ষে কি এই ভারী পাথর তোলা সম্ভব?
মীরের জন্ম ১৭২৩ সালে, আকবরাবাদে (বর্তমান আগ্রা)। মোগল সাম্রাজ্যের সূর্য তখন ডুবুডুবু। তাঁর বাবা মীর আলী মুত্তাকী ছিলেন একজন দরবেশ ও সুফি সাধক, দুনিয়াদারির সাথে যাঁর কোনো সম্পর্ক ছিল না। মীর যখন একদম ছোট, তখন তাঁর বাবা তাঁকে একটি মূল্যবান কথা বলেছিলেন— “বেটা, ইশকো এখতিয়ার করো” (বাবা, প্রেমকে আপন করো)। মীর সারা জীবন এই ‘ইশক’ বা প্রেমকেই যাপনে পরিণত করেছিলেন, তবে সেই প্রেম বিলাসিতা ছিল না, ছিল এক চরম আত্মদহন। মীরের বয়স যখন মাত্র এগারো বছর, তখন তাঁর বাবা মারা যান এবং ওখানেই তাঁর শৈশবের সমাপ্তি ঘটে।
মীর তকি মীর

বাবার মৃত্যুর পর মীরের জীবনে সৎ ভাইদের অত্যাচার শুরু হয় এবং পৈতৃক সম্পত্তি থেকে তাঁকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করা হয়। মাত্র এক জোড়া কাপড় আর পকেটে কয়েকটা আনা নিয়ে কিশোর মীর বেঁচে থাকার একটা অবলম্বন খুঁজতে দিল্লির পথ ধরেন। দিল্লিতে মীরের ভাগ্য কিছুটা খোলে, কারণ মোগল দরবারের প্রভাবশালী আমির সামসাম-উদ-দৌলা মীরের বাবার ভক্ত ছিলেন এবং তিনি মীরের জন্য দৈনিক এক রুপি করে ভাতার ব্যবস্থা করে দেন। কিন্তু ১৭৩৯ সালে, যখন মীরের বয়স ১৬, পারস্যের শাসক নাদির শাহ দিল্লি আক্রমণ করে নির্বিচারে গণহত্যা চালান। এই যুদ্ধে সামসাম-উদ-দৌলা নিহত হলে মীরের ভাতার রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। দিল্লি প্রথমবার মীরের চোখের সামনে ধ্বংস হয় এবং তিনি আবার নিঃস্ব হয়ে আগ্রায় ফিরে যান।
আগ্রায় ফিরে মীর তাঁর দূর সম্পর্কের মামা খাঁন-ই-আরজুর আশ্রয়ে আসেন, যিনি নিজে একজন বড় কবি ও পণ্ডিত ছিলেন। এই সময়ে মীর তাঁর এক আত্মীয়ের প্রেমে পড়েন, কিন্তু রক্ষণশীল সমাজে এই প্রেম মেনে নেওয়া হয়নি। চারদিক থেকে ধিক্কার আর লোকনিন্দার ঝড় ওটে। সৎ ভাইদের শত্রুতা, মামার অবহেলা আর প্রেমের ব্যর্থতা—সব মিলে মীরের মস্তিষ্কে আঘাত করে এবং তিনি তীব্র মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভোগেন। মাসের পর মাস তিনি অন্ধকার ঘরে বন্দী ছিলেন, চাঁদের আলো দেখলে আতঙ্কিত হয়ে উঠতেন এবং ভূত-প্রেতের হ্যালুসিনেশন হতো তাঁর। এই মানসিক উন্মাদনা থেকে সুস্থ হওয়ার পর মীরের ভেতর থেকে জন্ম নেয় এক অন্য মানুষ; তাঁর সমস্ত ট্রমা, একাকীত্ব আর প্রেম রূপান্তরিত হয় কালজয়ী শায়েরিতে।
সুস্থ হয়ে মীর আবার স্থায়ীভাবে দিল্লিতে আসেন এবং ততদিনে কবি হিসেবে তাঁর নাম ছড়াতে শুরু করায় বিভিন্ন আমিরের দরবারে তিনি আশ্রয় পান। কিন্তু ১৭৪৮ থেকে ১৭৬১ সালের মধ্যে দিল্লির ওপর নেমে আসে আসল নরক। আহমদ শাহ আবদালি একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে দিল্লিকে শ্মশানে পরিণত করেন। মীর মোগল সাম্রাজ্যের পতন, রক্তগঙ্গা, নিজের বাড়ি ভাঙা এবং বন্ধুদের সপরিবারে খুন হতে দেখেছেন। এই ধ্বংসলীলা দেখে তিনি ব্যথিত হৃদয়ে লিখেছিলেন, দিল্লি যা একসময় পৃথিবীর সেরা শহর ছিল, তিনি এখন সেই ধ্বংসস্তূপেরই এক বাসিন্দা।
দিল্লির বুকে যখন আর কোনো সম্মান, অর্থ বা মাথা গোঁজার ঠাঁই অবশিষ্ট ছিল না, তখন মীরের জীবনের পরবর্তী অধ্যায় শুরু হয় নবাবদের শহর লখনউতে। নিচে মীরের লখনউ যাত্রা, তাঁর স্বভাবের জটিলতা এবং গালিবসহ অন্য কবিদের মূল্যায়নের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:
লখনউ যাত্রা এবং একবির আত্মসম্মান
১৭৮২ সালে, দিল্লির চরম দুর্দশা থেকে বাঁচতে মীর লখনউয়ের নবাব আসিফ-উদ-দৌলার আমন্ত্রণে লখনউ যাত্রা করেন। লখনউ তখন শিল্প, সাহিত্য ও অর্থের দিক থেকে রমরমা। কিন্তু মীর যখন লখনউ পৌঁছান, তাঁর পরনে ছিল দিল্লির পুরনো ফ্যাশনের জরাজীর্ণ পোশাক। লখনউয়ের নতুন ধনী ও বিলাসী যুবকেরা এক মুশায়রায় (কবি সম্মেলন) মীরের এই অদ্ভুত পোশাক দেখে হাসাহাসি শুরু করে। মীর অপমানিত বোধ করেন এবং তৎক্ষণাৎ মঞ্চে দাঁড়িয়ে একটি বিখ্যাত শায়েরি পড়েন, যার অর্থ ছিল: “তোমরা আমার এই সাধারণ পোশাক দেখে হাসছ? আমি সেই দিল্লির বাসিন্দা, যা একসময় পৃথিবীর স্বর্গ ছিল এবং যাকে লুটেরা মিলে শ্মশান বানিয়েছে। আমি সেই উজড়ে যাওয়া শহরেরই এক ভগ্নাবশেষ।” মীরের পরিচয় পেয়ে পুরো মুশায়রা স্তব্ধ হয়ে যায় এবং নবাব নিজে এসে তাঁকে সম্মান জানান।
নবাব আসিফ-উদ-দৌলা মীরকে দরবারে উচ্চ মর্যাদা দেন এবং মাসিক দুই থেকে তিনশত টাকা ভাতার ব্যবস্থা করেন, যা সেই আমলে ছিল বিপুল অর্থ। কিন্তু মীরের স্বভাব ছিল অত্যন্ত আত্মসম্মানী, খিটখিটে এবং একগুঁয়ে। তিনি কারও তোষামোদ করতে পারতেন না, এমনকি স্বয়ং নবাবেরও না। একবার নবাব আসিফ-উদ-দৌলা মীরকে তাঁর নতুন শায়েরি শোনাতে বলেন। মীর যখন কবিতা পড়ছিলেন, নবাব তখন পাশে তাঁর পোষা মাছের খেলা দেখছিলেন এবং মীরের দিকে পূর্ণ মনোযোগ দিচ্ছিলেন না। মীর কবিতা পড়া বন্ধ করে বসে পড়েন। নবাব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করায় মীর সোজা সাপটা মুখে বলে দেন, “হুজুর, আপনি যখন মাছের খেলা দেখছেন, তখন মন দিয়ে মাছেরই খেলা দেখুন। শায়েরি শোনার জন্য একাগ্র মন লাগে, যা এই মুহূর্তে আপনার নেই।” এই চরম আত্বসম্মানের কারণে নবাবের সাথে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয় এবং শেষ জীবনে তিনি দরবার ছেড়ে আবার চরম দারিদ্র্যে পতিত হন।
স্বভাবের জটিলতা এবং সমসাময়িক কবিদের সাথে দ্বন্দ্ব
মীর তকি মীর কেবল নিজের আত্মসম্মান নিয়েই চলতেন না, সমসাময়িক অন্য কবিদের তিনি পাত্তাই দিতে চাইতেন না। তাঁর মতে, সমগ্র হিন্দুস্তানে মাত্র আড়াই জন খাঁটি উর্দু কবি আছেন। প্রথম জন স্বয়ং মীর, দ্বিতীয় জন মির্জা রফি সওদা, আর অর্ধেক হলেন খাজা মীর দর্দ। বাকি সবাই তাঁর চোখে ছিল কেবলই ছড়াকার। লখনউয়ের আরেক বিখ্যাত কবি ইনশাআল্লাহ খাঁ ইনশার সাথে মীরের আজীবন তুমুল ঝগড়া ও কাদা ছোড়াছুড়ি চলেছে। মীর কাউকেই তাঁর সমকক্ষ মনে করতেন না। নিজের এই অহংকার ও খিটখিটে মেজাজকে তিনি নিজেই এক শের-এ স্বীকার করেছেন— “মুঝকো শায়ের না কহো মীর, কে ম্যায়নে / দর্দ-ও-গম কিতনে কিয়ে জমা তো দিওয়ান কিয়া” (আমাকে শুধু কবি বলো না মীর, আমি জীবনের কত কষ্ট আর বেদনা জমা করে তবেই এই কাব্যগ্রন্থ তৈরি করেছি)।
জীবনের শেষ দিনগুলো: শোক ও একাকীত্ব
লখনউ মীরকে টাকা-পয়সা আর খ্যাতি দিলেও তাঁর মন পড়ে ছিল দিল্লির সেই ধ্বংসস্তূপেই। লখনউয়ের জাঁকজমক তাঁর বিষণ্ণ আত্মাকে শান্তি দিতে পারেনি। জীবনের শেষভাগে তিনি চরম পারিবারিক ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হন। তাঁর প্রিয় স্ত্রী, কন্যা এবং একমাত্র পুত্র মীর ফয়েজ আলী একে একে তাঁর চোখের সামনে মারা যান। একের পর এক স্বজন হারানোর তীব্র শোক মীরকে একদম নিঃসঙ্গ করে তোলে। ১৮১০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর, ৮৭ বছর বয়সে লখনউয়ের এক অন্ধকার ও জরাজীর্ণ ঘরে এই মহান কবির জীবনাবসান ঘটে। লখনউয়ের যে কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়েছিল, পরবর্তীতে রেললাইন তৈরির জন্য তাঁর সেই কবরটিও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। মীর বেঁচে থাকতেও যেমন ঘরছাড়া ছিলেন, মৃত্যুর পরও তাঁর নিজের একটুকরো কবর স্থায়ী হয়নি।
গালিব ও অন্যান্যদের চোখে মীরের মূল্যায়ন
মীর তকি মীর বেঁচে থাকতে যতটা উপেক্ষিত বা বিতর্কিত ছিলেন, মৃত্যুর পর উর্দু সাহিত্যের প্রতিটি মহীরুহ তাঁকে নিজের ‘উস্তাদ’ বা গুরু বলে স্বীকার করেছেন। মির্জা আসাদুল্লাহ খাঁ গালিব ছিলেন অত্যন্ত অহংকারী কবি, যিনি সহজে কারও প্রশংসা করতেন না। সেই গালিব মীরের সামনে নিজের মাথা নত করে লিখেছিলেন:
“রেখতা কে তুমহী উস্তাদ নহী হো গালিব,
কহতে হ্যায় আগলে জামানে মে কোই মীর ভী থা।”
(অর্থাৎ: হে গালিব, তুমিই যে কেবল উর্দু ভাষার একমাত্র উস্তাদ তা নও; লোকে বলে, গত জমানায় মীর নামেও একজন অসামান্য কবি ছিলেন।)
গালিবের সমসাময়িক আরেক কিংবদন্তি কবি, মোগল দরবারের শেষ রাজকবি শেখ ইব্রাহিম জওকও মীরের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়ে বলেছিলেন, “নাহ হুয়া পর নাহ হুয়া মীর কা আন্দাজ নসিব… জওক ইয়ারো নে বহুত দিদাহ-এ-রেখতা ধোয়ে” (মীরের মতো লেখার সেই জাদুকরী শৈলী আর কারও ভাগ্যে জুটল না, যদিও বন্ধুরা মীরের স্টাইল নকল করতে গিয়ে চোখের জল ঝরিয়ে নিজেদের খাতা ভিজিয়ে ফেলেছে)।
এমনকি বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কবি আল্লামা ইকবালও মীরের কবিতার ভাষার সারল্য ও সুরের জাদুতে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে উর্দুর সর্বশ্রেষ্ঠ রূপকার হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। মীর বড় বড় ফারসি শব্দের জটিলতায় না গিয়ে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাকে সাহিত্যের সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে গেছেন। আর এই কারণেই শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও, যখনই উর্দু শায়েরিতে তীব্র বেদনা ও প্রেমের কথা আসে, তখনই মীর তকি মীর ‘খুদা-এ-সুখান’ বা শায়েরির ঈশ্বর হিসেবে সবার ওপরে বিরাজ করেন।
চলুন তার সৃষ্টিগুলো একটু দেখি:
১.
اردو: الٹی ہو گئیں سب تدبیریں کچھ نہ دوا نے کام کیا
دیکھا اس بیماریِ دل نے آخر کام تمام کیا
Roman: Ulti ho gayeen sab tadbeerein kuch na dawa ne kaam kiya / Dekha is beemaari-e-dil ne aakhir kaam tamaam kiya
বাংলা তরজমা: সব পরিকল্পনা উল্টে গেল, কোনো ওষুধই কাজে এলো না! / দেখলে তো, এই হৃদয়ের অসুখটাই শেষপর্যন্ত আমায় শেষ করে দিল!
(এটি মীরের দিওয়ানে আউয়ালের সবচেয়ে বিখ্যাত গজল)
২.
اردو: پتا پتا بوٹا بوٹا حال ہمارا جانے ہے
جانے نہ جانے گل ہی نہ جانے باغ تو سارا جانے ہے
Roman: Patta patta boota boota haal humara jaane hai / Jaane na jaane gul hi na jaane baagh to saara jaane hai
বাংলা তরজমা: গাছের প্রতিটি পাতা আর প্রতিটি কণা আমার অবস্থা জানে! / শুধু সেই ফুলটাই জানল না (বুঝল না), অথচ পুরো বাগানই তো আমার গল্প জানে!
৩.
اردو: نازکی اس کے لب کی کیا کہیے
پنکھڑی اک گلاب کی سی ہے
Roman: Naazuki us ke lab ki kya kahiye / Pankhadi ik gulaab ki si hai
বাংলা তরজমা: তাঁর ঠোঁটের কোমলতার আর কী প্রশংসা করব! / তা যেন লাল গোলাপের একটি নরম পাপড়ি!
৪.
اردو: میرؔ صاحب زمانَہ نازک ہے
دونوں ہاتھوں سے ثامیے دستار
Roman: Mir sahab zamana naazuk hai / Dono haathon se thaamiye dastaar
বাংলা তরজমা: হে মীর সাহেব! যুগ বড় কঠিন আর নাজুক! / দুই হাত দিয়ে নিজের পাগড়ি (সম্মান) শক্ত করে ধরে রাখুন।
৫.
اردو: لے سانس بھی آہستہ کہ نازک ہے بہت کام
آفاق کی اس کارگہِ شیشہ گری کا
Roman: Le saans bhi aahista ke naazuk hai bahut kaam / Aafaaq ki is kargah-e-sheesha-gari ka
বাংলা তরজমা: নিঃশ্বাসটাও খুব ধীরে নাও, কারণ বড় নাজুক এই কাজ! / এই মহাবিশ্ব তো আসলে কাঁচের এক ভঙ্গুর কারখানা।
৬.
اردو: بار بار اس کے در پہ جاتا ہوں
حالت اب اضطراب کی سی ہے
Roman: Baar baar us ke dar pe jaata hoon / Haalat اب iztiraab ki si hai
বাংলা তরজমা: বারবার আমি তাঁর দরজায় গিয়ে কড়া নাড়ি! / অবস্থা এখন চরম ছটফটানি আর অস্থিরতার মতো।
৭.
اردو: چلتے ہو تو چمن کو چلیے کہتے ہیں کہ بہار ہے
پات ہرے ہیں پھول کھلے ہیں کم کم باد و بار ہے
Roman: Chalte ho to chaman ko chaliye kehte hain ke bahaar hai / Paat hare hain phool khile hain kam kam baad-o-baar hai
বাংলা তরজমা: যদি চলো তো বাগানে চলো, সবাই বলছে বসন্ত এসেছে! / পাতাগুলো সবুজ, ফুল ফুটেছে আর মৃদু হাওয়া বইছে।
৮.
اردو: سرہانے مِیرؔ کے کوئی نہ بولو
ابھی ٹک روتے روتے سو گیا ہے
Roman: Sirhaane Mir ke koi na bolo / Abhi tuk rote rote so gaya hai
বাংলা তরজমা: মীরের শিয়রে এসে কেউ কোনো কথা বোলো না! / এই তো সবেমাত্র একটু কেঁদে কেঁদে সে ঘুমিয়ে পড়েছে।
৯.
اردو: جب نام ترا لیجیے تب آنکھ بھر آوے
اس زندگی کرنے کو کہاں سے جگر آوے
Roman: Jab naam tera lijiye tab aankh bhar aawe / Is zindagi karne ko kahan se jigar aawe
বাংলা তরজমা: যখনই তোমার নাম মুখে নিই, তখনই চোখ জলে ভরে ওঠে! / এমন কষ্টের জীবন পার করার মতো সাহস আর ধৈর্য মানুষ কোথায় পাবে?
১০.
اردو: دیکھائی دیئے یوں کہ بے خود کیا
ہمیں آپ سے بھی جدا کر چلے
Roman: Dikhaai diye yun ke be-khud kiya / Humein aap se bhi juda kar chale
বাংলা তরজমা: তুমি এমনভাবে ধরা দিলে যে আমায় আত্মহারা করে দিলে! / নিজের অজান্তেই তুমি আমাকে আমার নিজের সত্তা থেকেও আলাদা করে দিয়ে চলে গেলে।
১১.
اردو: کھلنا کم کم کلی نے سیکھا ہے
اس کی آنکھوں کی نیم خوابی سے
Roman: Khulna kam kam kali ne seekha hai / Us ki aankhon ki neem-khwaabi se
বাংলা তরজমা: বাগানের কুঁড়িগুলো অল্প অল্প ফুটে ওঠা কোত্থেকে শিখেছে জানো? / তা শিখেছে ঘুম জড়ানো সেই মিষ্টি চোখের আলতো মেলানো চোখের পাতা দেখে!
১২.
اردو: دیکھ تو دل کہ جاں سے اٹھتا ہے
یہ دھواں سا کہاں سے اٹھتا ہے
Roman: Dekh to dil ke jaan se uthta hai / Yeh dhuwan sa kahan se uthta ہے
বাংলা তরজমা: একটু তাকিয়ে দেখো তো, হৃদয় থেকে নাকি জীবন থেকে বের হচ্ছে— / এই পোড়া ধোঁয়ার কুণ্ডলীটি ঠিক কোত্থেকে উঠছে?
১৩.
اردو: کل پاؤں ایک کاسہء سر پر جو آ گیا
یکسر وہ استخوان شکستوں سے چور تھا
کہنے لگا کہ دیکھ کے چل راہ بے خبر!
میں بھی کبھی کسی کا سرِ پر غرور تھا
Roman: Kal paaon ek kaasa-e-sar par jo aa gaya / Yaksar woh ustakhwaan shikaston se choor tha / Kehne laga ke dekh ke chal raah be-khabar! / Main bhi kabhi kisi ka sar-e-pur ghuroor tha
বাংলা তরজমা: কাল চলার পথে অসাবধানতাবশত আমার পা একটি পুরনো মাথার খুলির ওপর পড়ল, যা একেবারে ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছিল! / তখন যেন সেই কঙ্কালটি আমায় বলে উঠল— “হে উদাসীন পথিক! দেখে পথ চলো, আমিও একসময় কারও অহংকারে ভরা মস্তক ছিলাম!”
১৪.
اردو: کیا بود و باش پوچھو ہو پورب کے ساکنو!
ہم کو غریب جان کے ہنس ہنس پکار کے
دلّی جو ایک شہر تھا عالم میں انتخاب
رہتے تھے منتخب ہی جہاں روزگار کے
جس کو فلک نے لوٹ کے ویران کر دیا
ہم رہنے والے ہیں اسی اجڑے دیار کے
Roman: Kya bood-o-baash poochho ho poorab ke saakino! / Hum ko ghareeb jaan ke hans hans pukaar ke / Dilli jo ek shehr tha aalam mein intekhaab / Rehte the muntakhab hi jahan rozgaar ke / Jis ko falak ne loot ke veeraan کر diya / Hum rehne waale hain usi ujde dayaar ke
বাংলা তরজমা: হে পূবের বাসিন্দারা! অবহেলা করে হেসে হেসেই আমার ঠিকানা কেন জানতে চাইছ? / দিল্লি নামে যে এক শহর ছিল পৃথিবীতে অনন্য, যেখানে জ্ঞান ও আভিজাত্যের সেরা মানুষগুলো বসবাস করত! / নিয়তি যাকে লুটপাট করে শ্মশান বানিয়ে ছেড়েছে, আমি সেই ধ্বংস হয়ে যাওয়া জনপদেরই এক নিঃস্ব বাসিন্দা!
১৫.
اردو: اشک آنکھوں میں کب نہیں آتا
لہو آتا ہے جب نہیں آتا
Roman: Ashk aankhon mein kab nahin aata / Lahoo aata hai jab nahin آتا
বাংলা তরজমা: আমার চোখে কি কখনো অশ্রু আসে না? সবসময়ই আসে! / তবে যখন চোখের জল ফুরিয়ে যায়, তখন তার জায়গায় রক্ত ঝরে পড়ে।
১৬.
اردو: بے خودی لے گئی کہاں ہم کو
دیر سے انتظار ہے اپنا
Roman: Be-khudi le gayi kahan hum ko / Der se intezaar hai apna
বাংলা তরজমা: এই আত্মহারা ভাব আমায় ঠিক কোন জগতে নিয়ে গেল! / আমি নিজেই যেন অনেকক্ষণ ধরে নিজের ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করছি।
১৭.
اردو: گل کو محبوب ہم نے کر دیکھا
بے وفا تھا ولے معطر تھا
Roman: Gul ko mehboob hum ne kar dekha / Be-wafa تھا wale mu’attar tha
বাংলা তরজমা: ফুলকে ভালোবেসে আমি প্রিয়া বানিয়ে দেখেছিলাম! / সেও তো এক নিদারুণ অবিশ্বস্ত (ক্ষণস্থায়ী) ছিল, তবে হ্যাঁ— বدد সুগন্ধি ছিল!
আরও দেখুন:
