মুঘল-ই-আজম-এর সেই বিখ্যাত প্লেব্যাকের নেপথ্যের অবিশ্বাস্য সত্য ঘটনা!

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আভিজাত্য আর রাজকীয় মেজাজ নিয়ে ওস্তাদ বড় গোলাম আলী খাঁ সাহেব ছিলেন ভীষণ সচেতন। চলচ্চিত্রের সস্তা বিনোদনে প্লেব্যাক করার প্রতি তাঁর চরম অনীহা ছিল। কিন্তু ১৯৫০-এর দশকে পরিচালক কে. আসিফ যখন তাঁর মহাকাব্যিক ছবি ‘মুঘল-ই-আজম’ (১৯৬০) বানাচ্ছেন, তখন ছবিতে সম্রাট আকবরের দরবারে তানসেনের কণ্ঠ দেওয়ার জন্য খাঁ সাহেব ছাড়া আর কাউকেই তাঁর মনে ধরছিল না।

এই অসম্ভবকে সম্ভব করার পেছনে এবং খাঁ সাহেবকে ছবিতে তানসেনের কণ্ঠ হিসেবে নেওয়ার মূল পরামর্শদাতা ছিলেন ছবির সঙ্গীত পরিচালক স্বয়ং নওশাদ আলী। নওশাদ নিজে খাঁ সাহেবের অন্ধ ভক্ত এবং অত্যন্ত স্নেহধন্য ছিলেন। খাঁ সাহেব যখন নওশাদকে জানালেন যে তিনি কোনোভাবেই সিনেমায় গাইবেন না এবং এই আপদ থেকে বাঁচার উপায় খুঁজছেন, তখন খোদ নওশাদই খাঁ সাহেবকে এক মোক্ষম ফন্দি দিলেন! তিনি বুদ্ধি দিলেন—এমন এক অবিশ্বাস্য পারিশ্রমিক চেয়ে বসুন, যা শুনে পরিচালক কে. আসিফ ভয়ে লেজ গুটিয়ে পালাবেন!

নওশাদের বুদ্ধিমতো খাঁ সাহেব সেই জমানায় এক একটি গানের জন্য অবিশ্বাস্য রকমের ২৫ হাজার রুপি পারিশ্রমিক চেয়ে বসলেন! তুলনা করলে বোঝা যাবে—সে সময় লতা মঙ্গেশকর বা মোহাম্মদ রফির মতো শীর্ষস্থানীয় প্লেব্যাক শিল্পীরা একটি গানের জন্য পেতেন মাত্র ৩০০ থেকে ৫০০ রুপি! খাঁ সাহেব ভেবেছিলেন, এত বিপুল পরিমাণ টাকার অঙ্ক শুনে এই সিনেমাওয়ালারা চিরতরে পিঠটান দেবে।

কিন্তু খাঁ সাহেব বা নওশাদ আলী কেউই বোধহয় পরিচালক কে. আসিফের পাগলামি আন্দাজ করতে পারেননি। ২৫ হাজার রুপির অঙ্ক শুনে কে. আসিফ বিন্দুমাত্র ঘাবড়ালেন না। বরং তিনি মৃদু হেসে পকেট থেকে তৎক্ষণাৎ অগ্রিম টাকা বের করে খাঁ সাহেবের হাতে তুলে দিয়ে বললেন—

“ব্যাস খাঁ সাহেব!!! আপনি তো অমূল্য!” কথাটা কে. আসিফ এমন এক তৃপ্তির সুরে বললেন, যেন তিনি আরও অনেক বেশি টাকা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন এবং খাঁ সাহেব তাঁর প্রত্যাশার চেয়েও অনেক কম চেয়ে ফেলেছেন! পরিচালকের এই নিখাদ শিল্পপ্রেম আর রাজকীয় মেজাজের কাছে শেষমেশ হার মানলেন খাঁ সাহেব।

টাকা যখন দেওয়াই হয়ে গেছে, খাঁ সাহেবও আর কার্পণ্য করলেন না। মুঘল দরবারের সেই হারানো রাজকীয় আবহ তৈরি করতে তিনি দরদ দিয়ে গাইলেন রাগ সোহিনী এবং রাগ কেদারে দুটি অবিস্মরণীয় গান—‘প্রেম যোগান বান কে’ এবং ‘শুভ দিন আয়ো’। সিনেমার পর্দায় যখন তানসেনের ঠোঁটে খাঁ সাহেবের কণ্ঠের সেই সুরের গমক বেজে উঠল, বিশ শতকের প্রেক্ষাগৃহটি নিমেষেই চারশো বছর পিছিয়ে গিয়ে সরাসরি সম্রাট আকবরের জলসাঘরে পরিণত হলো। আভিজাত্য রক্ষার এক অদ্ভুত ফন্দি থেকে জন্ম নেওয়া এই সত্য গল্পটি আজও সঙ্গীত ও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক কিংবদন্তি হয়ে টিকে আছে।