মুজাহিদদের গোপনীয়তার অধিকার: গণতন্ত্র বনাম হেফাজতি দর্শন | ইসলাম ও মুসলিম সিরিজ

আল্লামা মামুনুল হকের এসব হরণ হয়েছে বলে যারা খুব চিন্তিত, দুঃখী, মরমে মরে যাচ্ছেন, তারা চলুন একটু সত্যের মুখোমুখি হই। আমি সচেতন ভাবে বলছি—আল্লামা মামুনুল হক নিজে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে নাক গলাতে আমাদের আমন্ত্রণ করেছেন। আমাদের মানে বাংলাদেশের সকল মুসলিমকে। এমনকি বিশ্বের সকল মুসলিমকেও। শুধু আমন্ত্রণ করেননি, বাধ্য করেছেন।

কীভাবে?

হেফাজতে ইসলামের মুজাহিদ Allama Mamunul Haque, আল্লামা মামুনুল হক
হেফাজতে-ইসলামের মুজাহিদ Allama Mamunul Haque, আল্লামা মামুনুল হক

 

আল্লামা মামুনুল হকরা যে আন্দোলন করছেন, তার চূড়ান্ত পরিসমাপ্তি “ইসলামিক রাষ্ট্র”, “খেলাফত”, “শরিয়াহ আইন”-এর প্রতিষ্ঠা। সেই আইন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তারা চায়—আপনার-আমার ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে এবং তাদের নির্ধারিত শরিয়াহ অনুযায়ী ঠিক করে দিতে।

আপনি কী খাবেন বা পান করবেন, কী বলবেন, কী পড়বেন, কোথায় শোবেন, কার সাথে গমন করবেন—ইত্যাদি। এমনকি আপনি কী চিন্তা করবেন সেটাও। সব কিছু তারা দেখে, শুনে, পড়ে, টিপে, শুঁকে, চেটে—তাদের শরিয়াহ নিক্তিতে মেপে আপনার জন্য হারাম বা হালাল করবেন।

যারা শরিয়াহ রাষ্ট্র কায়েম করতে চান, তাদের জন্য ‘আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার’ (সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) একটি প্রধান স্তম্ভ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন:

“তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের আবির্ভূত করা হয়েছে; তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করো…” (সূরা আল-ইমরান: ১১০)

অর্থাৎ, তাদের আদর্শ অনুযায়ী সমাজের কারো ব্যক্তিগত কাজে ‘নাক গলানো’ বা নজরদারি করা একটি ধর্মীয় দায়িত্ব। সুতরাং, যারা অন্যের উপর এই নজরদারি কায়েম করতে চান, তাদের নিজেদের জীবনও যে একইভাবে কাঁচের ঘরের মতো উন্মুক্ত থাকবে—সেটাই তো স্বাভাবিক।

প্রসঙ্গত বলি, তাদের মোরাল পুলিশ যদি আপনার স্ত্রীকে চিনতে না পারে, যদি মনে করে আপনি অন্য কাউকে নিয়ে কোথাও গমন করছেন, তখন তারা লোক নিয়ে আপনার রুমের মধ্যে ঢুকে দেখতে পারবে। আপনি রুমের মধ্যে কী করছেন, সেটার বিস্তারিত তাদের শরিয়াহ নাফিজ করার স্বার্থেই দেখতে হবে। কারণ শরিয়াহ অনুযায়ী “জেনা” বা ব্যভিচার প্রমাণ করতে হলে অন্তত ৪ জন পুরুষকে স্বচক্ষে সাক্ষী হতে হবে। পবিত্র কুরআনে ইরান করা হয়েছে:

“আর যারা সতী-সাধ্বী নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারপর চারজন সাক্ষী উপস্থিত না করে, তবে তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত করো…” (সূরা আন-নূর: ৪)

ঘরে না ঢুকে বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন না করে এই চারজন সাক্ষী কীভাবে নিশ্চিত হবে? সুতরাং, শরিয়াহর কঠোর প্রয়োগ যারা চান, তাদের দর্শনে ‘ব্যক্তিগত গোপনীয়তা’র চেয়ে ‘পাপমুক্ত সমাজ’ বড়।

দেখুন—আল্লামা মামুনুল হক হেফাজতে ইসলামের “শো-বয়” বা “পোস্টার বয়”। সে হিসেবে হেফাজতের কল্পিত ইসলামিক রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ “আমির-উল-মোমেনিন”। তিনিই হবেন সেই শরিয়াহর আদর্শের অন্যতম উদাহরণ। তাঁকে দেখেই তো আমরা শিখব শরিয়াহ রাষ্ট্রের খলিফা এবং নাগরিক কেমন হবে। আর সেটা বোঝার জন্য তাঁকে সর্বক্ষেত্রে ছায়ার মতো অনুসরণ করার কি কোনো বিকল্প আছে? সেই হিসেবে ওনার উপরে কোনো অন্যায় হয়নি। বরং যতটুকু Privacy Invaded হয়েছে, সেটা কম!

ইসলামে নেতৃত্ব কেবল ক্ষমতা নয়, বরং তা একটি আমানত। হাদিসে এসেছে:

“তোমাদের প্রত্যেকেই একেকজন রাখাল (রক্ষণাবেক্ষণকারী) এবং প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে।” (সহিহ বুখারি: ৭১৩৮, সহিহ মুসলিম: ১৮২৯)

যেহেতু তিনি নিজেকে নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, তাই তার ব্যক্তিগত জীবনের স্বচ্ছতা যাচাই করার অধিকার জনগণের রয়েছে। তাই যেসব বুদ্ধিজীবী গণতান্ত্রিক মানবাধিকারের নিক্তিতে আল্লামা মামুনুল হকের “হক বা অধিকার” মাপছেন, তারা মাপটা সঠিক জানেন না। তুলনা “অ্যাপেল-টু-অ্যাপেল” হচ্ছে না। শরিয়াহ হুকুমতের “privacy rights” আর গণতন্ত্রের “privacy rights” এক নয়। এজন্যই আপনারা জেনে রাখুন—যেই “privacy rights” সে deserve করে, সেই অনুযায়ীই তার সাথে আচরণ করা হয়েছে।

সেই সাথে একজন মুসলিম হিসেবে আমি দেশের সকল ফেলো মুসলিম ভাইবোনদের অনুরোধ করব—আল্লামা মামুনুল হুজুরের মতো যারা শরিয়াহ আইন চায়, আপনারা সর্বক্ষণ তাদের ফলো করুন, সর্বক্ষেত্রে ফলো করুন। ৫০১ থেকে শুরু করে সর্বত্র। শরিয়াহ বহির্ভূত কিছু করলে জনসমক্ষে নিয়ে আসুন। কারণ মুনাফেকি সম্পর্কে আল্লাহ সতর্ক করেছেন:

“মানুষের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে যারা বলে, ‘আমরা আল্লাহ ও পরকালে ঈমান এনেছি’, অথচ তারা মুমিন নয়। তারা আল্লাহ ও মুমিনদের ধোঁকা দিতে চায়…” (সূরা আল-বাকারা: ৮-৯)

যদি আমরা বুঝি তারা ভিতরে ও বাইরে একই রকম, তাহলে তাদের বিষয়ে আমরা পরবর্তীতে ভাবব। আর যদি কেউ মুখে শরিয়াহ আইনের কথা বলে “মামুনুল হক মডেল” ফলো করে (অর্থাৎ গোপনে অন্য কিছু করে), তবে তাদের কী করতে হবে আপনারা সেটা নিশ্চয়ই জানেন।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে শয়তানের ওয়াসওয়াসা এবং দ্বিমুখী আচরণ থেকে হেফাজত করুন। আমিন।

 

আরও দেখুন: