মুসলিম নামের সঙ্গে – ( রা. / হ. / হা / দা.বা. /মা.জি.আ. ) – ইত্যাদি শব্দ মানে কি? | ইসলাম ও মুসলিম সিরিজ

ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্টে, ওয়াজের ব্যানারে কিংবা ইসলামি বইপত্র পড়ার সময় আমরা প্রায়ই একটা জিনিস খেয়াল করি। অনেকের নামের শেষে ব্র্যাকেটে ছোট করে লেখা থাকে— (রা.), (রহ.), (হা.), (দা.বা.) কিংবা (মা.জি.আ.)। ইদানীং তো নির্বাচনী বা সামাজিক পোস্টারেও নামের পাশে এগুলো জুড়ে দেওয়ার একটা ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে।

এইসব দেখে অনেকের মনেই খটকা লাগে—এগুলো আসলে কী? চোধুরী, সৈয়দ বা শেখের মতো কোনো পারিবারিক বংশগত পদবি? নাকি মাদ্রাসার কোনো বড় বড় একাডেমিক ডিগ্রি বা বিশেষ কোনো অর্জনের মেডেল? এগুলো কি শুধু বড় বড় হুজুর বা আলেমদের নামের সাথেই বসানো যায়, নাকি আমাদের মতো সাধারণ আম-জনতার নামের পাশেও লেখা চলে?

ব্যক্তিগতভাবে আমাকেও এর আগে দু-তিনজন চেনা মানুষ এই প্রশ্নটা করেছিলেন। আর আজ যখন হুট করে আরেকজন একই জিনিস জানতে চাইলেন, তখন ভাবলাম এই সিরিজের অংশ হিসেবে বিষয়টা একটু খোলসা করে দেওয়া দরকার।

শুরুতেই একটা বড় ভুল ভেঙে নেওয়া ভালো—এগুলো কোনো পদবি, ডিগ্রি, মেডেল বা বংশের উপাধি নয়। এর কোনোটিই কোনো জাগতিক অর্জনের প্রতীকও না। খুব সহজ কথায়, এগুলোর প্রতিটিই হলো এক একটি চমৎকার ‘দুয়া’ বা কল্যাণ প্রার্থনা। আর ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী, দুয়া কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের জন্য একচেটিয়া বা ‘খাস’ কিছু নয়। যেকোনো মুসলিমের জন্যই এই ভালো ইচ্ছাগুলো প্রকাশ করা যায়।

চলুন, এই ছোট ছোট শব্দগুলোর পেছনের আসল মানে আর ব্যবহারটা একটু আড্ডার ছলে বুঝে নেওয়া যাক:

১. যারা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন (মৃত মুসলিমদের জন্য দুয়া)

কোনো চেনা বা জানা মানুষ মারা গেলে, তাঁর প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা থেকে নামের শেষে আমরা এগুলো ব্যবহার করি:

  • রহ. / রহমা. (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি): এর আসল আরবিটা হলো ‘রَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ’। এর সহজ মানে হলো—”তাঁর ওপর আল্লাহর রহমত বা দয়া বর্ষিত হোক।”
  • রাহিমাহুল্লাহ: আরবিতে ‘رَحِمَهُ الله’। এর অর্থ—”আল্লাহ তাঁকে দয়া করুন।”

ছোট্ট একটা নোট: মৃত যেকোনো মুসলিম নারী বা পুরুষের জন্যই এটা বলা যায়। তবে ব্যাকরণের খুঁটিনাটি ধরলে, কোনো নারীর ক্ষেত্রে ‘রাহিমাহুল্লাহ’ না বলে ‘রাহিমাহাল্লাহ’ (رَحِمَهَا الله) বলাটা বেশি সঠিক।

২. যারা এখনও আমাদের মাঝে আছেন (জীবিতদের জন্য দুয়া)

কোনো জীবিত মানুষকে সম্মান জানাতে কিংবা তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে আমরা এই শব্দগুলো বলি:

  • হা. / হাফি. (হাফিজাহুল্লাহ): মূল আরবি ‘حَفِظَهُ الله’। এর সোজা সাপটা মানে—”আল্লাহ তাঁকে সুস্থ ও নিরাপদে রাখুন (হেফাজত করুন)।” আপনার জীবিত বাবা, মা বা প্রিয় শিক্ষকের নামের পাশে এটি চোখ বন্ধ করে লিখতে পারেন।
  • দা.বা. (দামাত বারাকাতুহুম): আরবি রূপ ‘دَامَتْ بَرَكَاتُهُمْ’। এর মানে হলো—”তাঁর বরকত বা কল্যাণ যেন দীর্ঘস্থায়ী হয়।”
  • মা.জি.আ. (মাদ্দা জিল্লুহুল আলি): একটু গাম্ভীর্যপূর্ণ আরবি ‘مَدَّ ظِلُّهُ الْعَالِي’। এর আক্ষরিক অর্থ—”তাঁর মহান মায়াবী ছায়া আমাদের ওপর দীর্ঘজীবী হোক।” মূলত কারো অভিভাবকত্ব বা নেতৃত্ব দীর্ঘায়িত হওয়ার কামনা থেকে এটি বলা হয়।
  • মু. আ. (মুদ্দা জিল্লুহু): ওপরেরটারই ছোট সংস্করণ ‘مُدَّ ظِلُّهُ’। মানে—”তাঁর ছায়া দীর্ঘ হোক।”

দিনশেষে এই পুরো বিষয়টাই হলো একে অপরের প্রতি শুভকামনা জানানোর একটা সুন্দর তরিকা। এখানে কোনো বিভ্রান্তি বা জটিলতার কিছু নেই।

তাই এই সুন্দর দুয়াগুলোকে শুধু মাদ্রাসার আলেম-ওলামা বা সুনির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আজ থেকে নিজের বাবা, মা, স্কুলের শিক্ষক কিংবা যেকোনো প্রিয় মানুষের নাম মুখে নেওয়ার সময় বা লেখার সময় এই কল্যাণকর অভ্যাসটি গড়ে তুলুন।

আসুন, আমরা যেন স্রেফ লোকদেখানো উপাধি হিসেবে না দেখে, মন থেকে একে অপরের জন্য মঙ্গল কামনা করতে পারি। আল্লাহ আমাদের সেই তৌফিক দিন। আমিন।

আরও দেখুন: