সাআদাত হাসান মান্টো-র ‘মোযেল’ গল্পটি ধর্মীয় উগ্রতা, গোঁড়ামি এবং মানবতাবোধের এক ব্যতিক্রমী দলিল। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় বোম্বাই শহরের রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পটভূমিতে গল্পটি রচিত। তথাকথিত সমাজ যাকে ‘উচ্ছৃঙ্খল’ বা ‘বেপরোয়া’ বলে দূরে সরিয়ে রাখে, সংকটের মুখে তার ভেতরের নিঃস্বার্থ মানবিকতা কীভাবে ধর্ম ও জাতপাতের উর্ধ্বে উঠে দাঁড়ায়, মান্টো এই গল্পে তা দেখিয়েছেন অসামান্য দক্ষতায়।
‘মোযেল’ বিশ্লেষণ
গল্পের প্রধান চরিত্র মোযেল বোম্বাইয়ের এক ইহুদি তরুণী। প্রচলিত সামাজিক নিয়মকানুন বা ধর্মীয় সংস্কারের কোনো পরোয়াই সে করত না। বেশভূষায় বেপরোয়া, স্বাধীনচেতা এবং স্বভাবের দিক থেকে অত্যন্ত স্পষ্টভাষী মোযেলকে সমাজ সহজভাবে গ্রহণ করত না। অন্যদিকে ত্রিলোচন একজন ধার্মিক ও রক্ষণশীল শিখ যুবক। ত্রিলোচন একসময় মোযেলের প্রেমে ব্যাকুল ছিল, কিন্তু মোযেল তাকে নিয়ে তামাশা করত এবং তার ধর্মীয় গোঁড়ামি ও লম্বা দাড়ি-পাগড়ি নিয়ে খোঁচা দিত। পরবর্তীতে ত্রিলোচন তার নিজস্ব ধর্মীয় গণ্ডির ভেতরেই কিরপাল কৌর নামের এক শান্ত শিখ মেয়েকে ভালোবেসে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়।
গল্পের মোড় ঘোরে বোম্বাইয়ে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে। চারপাশে যখন হিন্দু, মুসলিম ও শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ একে অপরের রক্তে হাত রাঙাচ্ছিল, তখন ত্রিলোচনের বাগদত্তা কিরপাল কৌর এক বিপজ্জনক মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় পরিবারসহ আটকে পড়ে। প্রাণভয়ে কাতর ত্রিলোচন কিরপালকে বাঁচানোর কোনো পথ না পেয়ে শেষমেশ মোযেলের কাছে ছুটে যায়। যে মোযেলকে ত্রিলোচন ‘উচ্ছৃঙ্খল’ মনে করে দূরে ঠেলে দিয়েছিল, সেই মোযেল মুহূর্তের জন্য দ্বিধা না করে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ত্রিলোচনকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে।
দাঙ্গাবিধ্বস্ত শহরের নারকীয় পরিস্থিতির মধ্যে মোযেল ও ত্রিলোচন কিরপালের বাড়িতে পৌঁছায়। সেখানে উন্মত্ত জনতা থেকে কিরপালকে বাঁচাতে মোযেল এক অভাবনীয় ও দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নেয়। সে কিরপালের প্রাণ রক্ষার্থে নিজের গায়ের জামাকাপড় খুলে কিরপালকে পরিয়ে দেয় এবং দাঙ্গাবাজদের হাত থেকে তাদের বাঁচাতে নিজে উল্টো দিকে ছুটে গিয়ে দাঙ্গাবাজদের বিভ্রান্ত করে। এই দুঃসাহসিক আত্মত্যাগের মাধ্যমে কিরপাল বেঁচে যায়, কিন্তু মোযেল সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় পড়ে গিয়ে এবং আক্রমণের শিকার হয়ে মারাত্মকভাবে আহত হয়।
মুমূর্ষু অবস্থায় যখন ত্রিলোচন গভীর অনুশোচনায় তার খুলতে থাকা পাগড়ি দিয়ে রক্তভেজা মোযেলকে ঢাকতে চায়, তখন মোযেল সেই ধর্মীয় প্রতীক সংবলিত কাপড় সরিয়ে দেয়। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে সে ধর্ম ও জাতপাতের বাহ্যিক রূপকে প্রত্যাখ্যান করে নিজের অকৃত্রিম মানবিক অস্তিত্বকে উঁচুতে তুলে ধরে। মান্টো এই গল্পের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, বাহ্যিক ধর্মীয় পোশাক বা সামাজিক সংস্কার মানুষকে উন্নত করে না; মানুষের আসল পরিচয় প্রকাশ পায় চরম সংকটে তার নিঃস্বার্থ ভালোবাসায়।
‘মোযেল’ (গল্পের বাংলা অনুবাদ)
মূল: সাআদাত হাসান মান্টো
ত্রিলোচনের জীবনের এক বিশাল সময় জুড়ে ছিল মোযেল। বোম্বাইয়ের এক ইহুদি মেয়ে, যাকে বুঝতে পারা ত্রিলোচনের মতো সাধারণ শিখ যুবকের পক্ষে সহজ ছিল না। মোযেল কোনো নিয়মকানুন মানত না। ছোট করে ছাঁটা চুল, পায়ে কাঠের খড়ম আর গায়ে অদ্ভুত সব পোশাক পরে সে শহরের রাস্তায় ঘুরে বেড়াত। ত্রিলোচন তখন তার প্রেমে অন্ধ। সে মোযেলের পেছনে পেছনে ঘুরত, তাকে রেস্তোরাঁয় নিয়ে যেত, উপহার কিনত। কিন্তু মোযেল কেবল তাকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করত। বিশেষ করে ত্রিলোচনের লম্বা দাড়ি আর মাথার বড় পাগড়ি দেখলে সে বলত, “আগে এই জঙ্গল সাফ করো, পাগড়ি খোলো, তারপর ভালোবাসার কথা বোলো।”
ত্রিলোচন ধর্মপ্রাণ শিখ, দাড়ি বা চুল কাটা তার পক্ষে অসম্ভব ছিল। শেষ পর্যন্ত মোযেলের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে সে পিছিয়ে আসে। কিছুদিন পর তার জীবনে আসে কিরপাল কৌর। সুশ্রী, শান্ত এবং সপরিবার শিখ সম্প্রদায়ের মেয়ে। দুই পরিবারের সম্মতিতে তাদের বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হয়ে যায়। ত্রিলোচন ভেবেছিল মোযেলের চ্যাপ্টার তার জীবনে চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে।
কিন্তু শহরের আকাশ হঠাৎ কালচে ধোঁয়ায় ঢেকে গেল। ১৯৪৭ সালের দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ল বোম্বাইয়ের অলিগলিতে। হিন্দু, মুসলিম আর শিখদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে পুরো শহর নরকপুরীতে পরিণত হলো। মানুষ মানুষকে কেটে ফেলছিল কেবল ধর্মের পরিচয় দেখে।
ঠিক এমন সময় ত্রিলোচনের খবর এলো, কিরপাল কৌর আর তার পরিবার আটকে পড়েছে পার্সি গলির এক মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায়। উন্মত্ত দাঙ্গাবাজেরা যেকোনো মুহূর্তে তাদের বাড়িতে হামলা চালাতে পারে। ত্রিলোচন একা সেখানে যাওয়ার কথা চিন্তাও করতে পারছিল না। মাথার পাগড়ি আর লম্বা দাড়ি নিয়ে ওই গলিতে পা রাখা মানে নিজের মৃত্যুর পরোয়ানা সই করা।
দিশেহারা হয়ে ত্রিলোচনের মনে পড়ল মোযেলের কথা। মোযেল ইহুদি, তাছাড়া ভয় ডর বলে তার কিছু নেই। আর এই দাঙ্গায় ইহুদিদের ওপর কারো সরাসরি ক্ষোভ ছিল না। ত্রিলোচন ছুটতে ছুটতে মোযেলের ফ্ল্যাটে গিয়ে হাজির হলো।
মোযেল তখন ঘরে হাতকাটা পোশাক পরে আরাম করছিল। ত্রিলোচনকে অতটা আতঙ্কিত দেখে সে শান্তভাবে সব শুনল। ত্রিলোচন যখন কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “মোযেল, কিরপালকে বাঁচাও, ওরা ওকে মেরে ফেলবে,” মোযেল এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না। সে কোনো খোঁচা দিল না, কোনো শর্ত দিল না। সোজা ত্রিলোচনের হাত ধরে বলল, “চল।”
মোযেল ত্রিলোচনের লম্বা দাড়িটা কোনোমতে কাপড়ে চেপে ধরে এবং পাগড়িটা যতটা সম্ভব ঢেকে তাকে নিয়ে সোজা বের হয়ে গেল ভয়ানক সেই দাঙ্গাকবলিত এলাকায়। চারপাশে ঘরবাড়ি জ্বলছে, বাতাসে রক্তের গন্ধ। মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে বেঁচে তারা কোনোমতে কিরপালদের ভবনে এসে পৌঁছাল।
ভবনের ভেতর কিরপাল আর তার পরিবার ভয়ে থরথর করে কাঁপছিল। কিন্তু সমস্যা হলো, কিরপালকে বাইরে বের করে আনা অসম্ভব। তার পরনে শিখ মেয়েদের ঐতিহ্যবাহী সালোয়ার-কামিজ, যা দেখে দাঙ্গাবাজেরা মুহূর্তে চিনে ফেলবে।
মোযেল এতটুকু দ্বিধা না করে নিজের গায়ের কুর্তা আর পোশাক খুলে কিরপালকে পরিয়ে দিল। নিজের পরনে কেবল ভেতরের সামান্য জামা রেখে সে কিরপালকে বলল ত্রিলোচনের সাথে দ্রুত পিছনের রাস্তা দিয়ে পালিয়ে যেতে। আর নিজে দাঙ্গাবাজদের নজর ঘোরাতে উল্টো দিকের সিঁড়ি দিয়ে চিৎকার করতে করতে নিচে নেমে গেল।
উন্মত্ত দাঙ্গাবাজেরা এক অর্ধনগ্ন মেয়েকে ছুটতে দেখে সেদিকে তেড়ে গেল। অন্ধকারের ভেতর তাড়াহুড়ো করে দৌড়াতে গিয়ে মোযেল উঁচু সিঁড়ি থেকে ছিটকে নিচে পড়ে গেল। তার শরীরটা সিঁড়ির পাথরে আছড়ে পড়ল, রক্তে ভেসে গেল চারপাশ।
ত্রিলোচন কিরপালকে নিরাপদে সরিয়ে দিয়ে দৌড়ে ফিরে এলো সিঁড়ির গোড়ায়। সে দেখল মোযেল রক্তে ভেসে যাচ্ছে, তার জীবনপ্রদীপ নিভে আসছে। ত্রিলোচন কান্নায় ভেঙে পড়ে নিজের মাথার পাগড়ি খুলতে লাগল মোযেলের অনাবৃত ও ক্ষতবিক্ষত শরীর ঢেকে দেওয়ার জন্য।
রক্তে রাঙা মোযেল শেষ শক্তিতে তার হাতটা বাড়িয়ে দিল। সে ত্রিলোচনের ধর্মীয় পাগড়িটা ঠেলে সরিয়ে দিয়ে নিচু স্বরে বলল, “সরিয়ে নাও এটা… তোমার এই পাগড়ি আর ধর্ম আমার গায়ে চাপাতে এসো না। তোমার কিরপালকে নিয়ে এখান থেকে ভাগো।”
কথাগুলো বলেই মোযেলের শরীরটা একদম নিস্তেজ হয়ে গেল। তার খোলা চোখ দুটো চেয়ে রইল সেই ধোঁয়াটে আকাশের দিকে, যেখানে কোনো ধর্ম বা জাতের বিভাজন ছিল না।
