মোৎসার্ট-এর যে ১০টি রচনা অবশ্যই শুনবেন । শ্রবণ নির্দেশিকা । পশ্চিমা বা পাশ্চাত্য শাস্ত্রীয় সঙ্গীত | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

পাশ্চাত্য শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে ক্লাসিক্যাল যুগের (১৭৫০–১৮২০) সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং সর্বকালের অন্যতম সুর-প্রতিভা হলেন ভোলফগাং আমাদেউস মোৎসার্ট (Wolfgang Amadeus Mozart)। মাত্র ৩৫ বছরের স্বল্পায়ু জীবনে তিনি ৬০০-রও বেশি অমর সঙ্গীত সৃষ্টি করে গেছেন। বাখের সঙ্গীত যেখানে গাণিতিক স্থাপত্য ও সুসংহত কাঠামোর জন্য পরিচিত, মোৎসার্টের সঙ্গীত সেখানে তার প্রানবন্ত সারল্য, সুরের অপার্থিব মিষ্টিভাব এবং নিখুঁত ভারসাম্য (Symmetry)-র জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।

বাহ্যিকভাবে মোৎসার্টের সুর শুনলে মনে হয় তা অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল; কিন্তু সেই সহজ সুরের নিচেই লুকিয়ে থাকে গভীর মানবিক অনুভূতি, বিষাদ এবং জটিল নাটকীয়তা। প্রথমবার মোৎসার্টের সঙ্গীতের জগতে প্রবেশ করতে চাওয়া শ্রোতা এবং সঙ্গীতানুরাগীদের জন্য এই নিবন্ধটি একটি পূর্ণাঙ্গ শ্রবণ নির্দেশিকা হিসেবে তৈরি করা হয়েছে।

Table of Contents

একনজরে: মোৎসার্ট ও তাঁর সঙ্গীতের জগত

  • ঐতিহাসিক যুগ: ক্লাসিক্যাল যুগ (১৭৫০–১৮২০)।
  • সঙ্গীতের মূল পরিচয়: অপার্থিব মেলোডি, নিখুঁত কাঠামোগত ভারসাম্য, নাট্যময়তা এবং সুরের প্রানবন্ত চপলতা।
  • বিখ্যাত ক্যাটালগ নম্বর: ‘K.’ বা ‘KV’ (Köchel-Verzeichnis), যা লুদভিগ ভন ক্যোশেল কর্তৃক মোৎসার্টের কাজগুলোকে কালানুক্রমিকভাবে সাজানো ক্যাটালগ নম্বর।
  • প্রধান অবদান: সিমফনি, পিয়ানো কনসার্টো, ও পিয়ানো সোনাটাকে আধুনিক রূপ দান এবং ওপেরাকে বিনোদনের সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে যাওয়া।
  • নান্দনিক দর্শন: পরম দুঃখকেও সুরের সহজ আল্পনায় সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলার অলৌকিক ক্ষমতা।
  • প্রাচ্য ও বাঙালি সঙ্গীতে যোগসূত্র: মোৎসার্টের সুরের এই সহজিয়া মিষ্টিভাব ও ছন্দোময়তার সাথে আমাদের আধুনিক বাংলা গান, রবীন্দ্রনাথের সুরের গঠন ও সলিল চৌধুরীর মেলোডিক কাঠামোর গভীর তাত্ত্বিক মিল পাওয়া যায়।

১. কেন মোৎসার্টের সুর অনন্য?

মোৎসার্টের সঙ্গীতকে বলা হয় ‘ক্লিন অ্যান্ড ক্রিস্টাল কিয়ার’ (স্বচ্ছ ও স্ফটিকের মতো পরিষ্কার)। তিনি যখন কোনো সুর বাঁধেন, তাতে অপ্রয়োজনীয় কোনো স্বরের বোঝা থাকে না।
অস্ট্রিয়ান সুরকার যোসেফ হাইডন একবার মোৎসার্টের বাবাকে বলেছিলেন, “ঈশ্বরের শপথ করে বলছি, আপনার ছেলেই আমার দেখা সেরা সুরকার।” মোৎসার্টের অনন্যতা হলো—তিনি গভীরতম শোক বা ট্র্যাজেডিকেও এমন এক হালকা ও মিষ্টি মেলোডিতে রূপ দিতে পারতেন, যা শুনলে একই সাথে মন ভালো হয়ে যায় এবং ভেতরের কোনো এক গভীর অনুভূতির তার জেগে ওঠে।

২. মোৎসার্টের ১০টি কালজয়ী রচনা ও শ্রবণ নির্দেশিকা

মোৎসার্টের সুবিশাল ক্যাটালগ থেকে ১০টি সবচেয়ে জনপ্রিয়, গভীর ও ঐতিহাসিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ রচনা নিচে ক্রমানুসারে আলোচনা করা হলো:

১. সিমফনি নম্বর ৪০ ইন জি মাইনর, K. ৫৫০ (Symphony No. 40 in G minor)

  • বাদ্যযন্ত্রের আয়োজন: ক্লাসিক্যাল অর্কেস্ট্রা (স্ট্রিংস, উডউইন্ডস ও হরন)।
  • কেন শুনবেন: ক্লাসিক্যাল যুগের সবচেয়ে পরিচিত ও শোকাতুর সিমফনি। মোৎসার্ট তাঁর পুরো জীবনে মাত্র দুটি সিমফনি মাইনর স্কেলে লিখেছিলেন, যার মধ্যে এটি সর্বশ্রেষ্ঠ।
  • কী শুনবেন: একদম শুরুর সুপরিচিত থিমটি (যা বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রেও নানাভাবে অনুপ্রাণিত করেছে)। অ্যাল্টো ভায়োলার ধীর ছন্দের ওপর ভায়োলিনের যে দ্রুত, ব্যাকুল সুর ভেসে ওঠে, তা সুরকারের ব্যক্তিগত সংকট ও ট্র্যাজেডিকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তোলে।

২. আইনে ক্লাইনে নাখটমুজিক, K. ৫২৫ (Eine kleine Nachtmusik – Serenade No. 13)

  • বাদ্যযন্ত্র: স্ট্রিং কোয়ার্টেট (ভায়োলিন, ভিওলা, সেলো) বা স্ট্রিং অর্কেস্ট্রা।
  • কেন শুনবেন: বিশ্বসঙ্গীতের সবচেয়ে পরিচিত ও প্রানবন্ত সুরগুলোর একটি। ‘আইনে ক্লাইনে নাখটমুজিক’ শব্দের অর্থ ‘একটি ছোট রাতের গান’।
  • কী শুনবেন: প্রথম পর্বের (Allegro) সূচনা নোটগুলো। মাত্র কয়েকটি নোটে জীবনের যে আনন্দ ও ইতিবাচক শক্তি মোৎসার্ট ফুটিয়ে তুলেছেন, তা এক নিমেষেই শ্রোতার মন ভালো করে দেয়।

৩. রেকুইয়েম ইন ডি মাইনর, K. ৬২৬ (Requiem in D minor)

  • বাদ্যযন্ত্র: সোলো গায়ক, সমবেত কোরাস এবং অর্কেস্ট্রা।
  • কেন শুনবেন: মোৎসার্টের মৃত্যুর ঠিক পূর্বে লেখা তাঁর জীবনের শেষ অসম্পূর্ণ কাজ। এটি মূলত এক রহস্যময় ব্যক্তির অর্ডারে লেখা মৃত্যুর প্রার্থনা সঙ্গীত ছিল। পরবর্তীতে তাঁর ছাত্র ফ্রাঞ্জ জেভার জুসমায়ার এটি সম্পন্ন করেন।
  • কী শুনবেন: বিষাদময় ‘Lacrimosa’ অংশটি। গানটির মাত্র ৮ বার লেখার পর মোৎসার্ট মৃত্যুবরণ করেন। গায়কদলের করুণ কান্না আর অর্কেস্ট্রার ধীর সুরের পদচারণা মৃত্যুকে এক অপার্থিব সৌন্দর্যে রূপ দেয়।

৪. দ্য ম্যারেজ অব ফিগারো: ওভারচার ও ওপেরা, K. ৪৯২ (Le nozze di Figaro)

  • বাদ্যযন্ত্র: পূর্ণাঙ্গ ওপেরা অর্কেস্ট্রা ও গায়কদল।
  • কেন শুনবেন: অপেরা ধারার ইতিহাসের সর্বকালের সেরা কমেডি মাস্টারপিস। আভিজাত্য বনাম সাধারণ মানুষের বুদ্ধির লড়াই নিয়ে লেখা এই ওপেরা সুর ও নাট্যাংশের এক অতুলনীয় মেলবন্ধন।
  • কী শুনবেন: ওপেরার শুরুতেই বাজানো ৪ মিনিটের ‘ওভারচার’ (Overture) অংশটি। দ্রুতগতির অর্কেস্ট্রার এই বাজনা শুনে মনে হবে সুরগুলো যেন একটার পেছনে আরেকটা খিলখিল করে হেসে দৌড়াচ্ছে।

৫. পিয়ানো কনসার্টো নম্বর ২১ ইন সি মেজর, K. ৪৬৭ (Piano Concerto No. 21)

  • বাদ্যযন্ত্র: সোলো পিয়ানো এবং অর্কেস্ট্রা।
  • কেন শুনবেন: সোলো পিয়ানো ও অর্কেস্ট্রার সুসংগত সংলাপে তৈরি ক্লাসিক্যাল কনসার্টোর সেরা উদাহরণ। এর ২য় পর্বটি চলচ্চিত্র ও পপ সঙ্গীতে প্রচুর ব্যবহৃত হয়েছে।
  • কী শুনবেন: ২য় পর্ব (Andante)। শান্ত পিয়ানোর সুর যখন অর্কেস্ট্রার নরম ব্যাকগ্রাউন্ডের ওপর ভেসে চলে, তখন মনে হয় কোনো শান্ত নদীর বুকে ডিঙ্গি নৌকা ভেসে যাচ্ছে।

৬. দ্য ম্যাজিক ফ্লুট: কুইন অব দ্য নাইট এরিয়া, K. ৬২০ (Die Zauberflöte)

  • বাদ্যযন্ত্র: সোপ্রানো কণ্ঠ এবং অর্কেস্ট্রা।
  • কেন শুনবেন: মোৎসার্টের বিখ্যাত জাদুকরী ও রূপকথার ওপেরা ‘দ্য ম্যাজিক ফ্লুট’-এর সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ও বিখ্যাত একক গান (‘Der Hölle Rache’)।
  • কী শুনবেন: রাতের রানীর রাগের প্রকাশ হিসেবে গাওয়া উচ্চগ্রামের স্টাকাতো (Staccato) নোটগুলো। গায়িকাকে অত্যন্ত দ্রুত ও নিখুঁতভাবে হাই-সি (High C) ও এফ (F6) স্কেলে নোটগুলো গাইতে হয়, যা মানবকণ্ঠের চরম কারিগরি ক্ষমতার পরিচয় দেয়।

৭. ক্ল্যারিনেট কনসার্টো ইন এ মেজর, K. ৬২২ (Clarinet Concerto in A major)

  • বাদ্যযন্ত্র: সোলো ক্ল্যারিনেট এবং অর্কেস্ট্রা।
  • কেন শুনবেন: মৃত্যুর মাত্র কয়েক মাস আগে মোৎসার্ট এটি লেখেন। কাঠ নির্মিত উডউইন্ড যন্ত্র ‘ক্ল্যারিনেট’-এর মিষ্টি ও গভীর সুরকে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছিল এই রচনাটি।
  • কী শুনবেন: ২য় পর্বের (Adagio) শান্ত সুরটি। কোনো জটিলতা ছাড়াই ক্ল্যারিনেটের করুণ ও শান্ত সুর হৃদয়ের গভীরে এক প্রশান্তি তৈরি করে।

৮. সিমফনি নম্বর ৪১ ইন সি মেজর ‘জুপাইটার’, K. ৫৫১ (Symphony No. 41 ‘Jupiter’)

  • বাদ্যযন্ত্র: পূর্ণাঙ্গ ক্লাসিক্যাল অর্কেস্ট্রা।
  • কেন শুনবেন: মোৎসার্টের জীবনের শেষ সিমফনি। রোমান দেবতা জুপাইটারের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছিল কারণ এর গঠন অত্যন্ত রাজকীয় ও শক্তিশালী।
  • কী শুনবেন: শেষ পর্ব বা ৪র্থ মুভমেন্ট (Molto allegro)। এই অংশে মোৎসার্ট একই সাথে ৫টি ভিন্ন সুরকে বাখের ‘ফিউগ’ নিয়মে একসাথে বাজিয়ে ক্লাসিক্যাল ও বারোক শৈলীর ঐতিহাসিক মিলন ঘটিয়েছিলেন।

৯. পিয়ানো সোনাটা নম্বর ১১ ইন এ মেজর – ‘তুর্কি মার্চ’, K. ৩৩১ (Piano Sonata No. 11)

  • বাদ্যযন্ত্র: একক পিয়ানো।
  • কেন শুনবেন: সাধারণ শ্রোতাদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় পিয়ানো সোনাটা। এর শেষ অংশটি ‘রন্ডো আল্লা তুর্কা’ (Rondo alla Turca) বা ‘টার্কিশ মার্চ’ নামে পরিচিত।
  • কী শুনবেন: ৩য় পর্বের দ্রুত ছন্দের গানটি। তৎকালীন ইউরোপে অটোমান তুর্কি সামরিক ব্যান্ডের যে ছন্দ জনপ্রিয় ছিল, মোৎসার্ট পিয়ানোর চাবিতে সেই ছন্দ চটপটেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

১০. ডন জিওভান্নি, K. ৫২৭ (Don Giovanni)

  • বাদ্যযন্ত্র: সোলো গায়ক, সমবেত কোরাস এবং অর্কেস্ট্রা।
  • কেন শুনবেন: কমেডি ও ট্র্যাজেডির এক দারুণ সংমিশ্রণ। এক অহংকারী চরিত্র ডন জিওভান্নির পতন নিয়ে লেখা এই কাজটিকে অনেক সুরকার ও দার্শনিক ‘সর্বকালের সেরা ওপেরা’ বলে মনে করেন।
  • কী শুনবেন: ওপেরার শেষ দৃশ্য (Commendatore scene), যেখানে পাথরের মূর্তি হেঁটে এসে ডন জিওভান্নিকে নরকে টেনে নিয়ে যায়। অর্কেস্ট্রার ব্রাস যন্ত্রের ভয়াল গর্জন ও নাটকীয়তা শ্রোতাকে শিহরিত করে।

৩. ক্লাসিক্যাল সামঞ্জস্য ও সুরের গাণিতিক পরিচ্ছন্নতা

মোৎসার্টের সঙ্গীতকে বিশ্লেষণ করলে একটি বিশেষ নিয়ম দেখা যায়, যাকে সঙ্গীতবিজ্ঞানীরা বলেন ‘পিরিয়ডিক ফ্রেজিং’ (Periodic Phrasing)।
বাখের সঙ্গীত যেমন ছিল একটি জটিল গাণিতিক গোলকধাঁধা, মোৎসার্টের সুরের গাণিতিক নিয়মটি হলো সুষম রূপকথা। সাধারণত তাঁর রচনার ৪ বার বা ৮ বার পরপর সুনির্দিষ্ট দাড়ি বা কমা (Cadence) থাকে। প্রথম অংশ প্রশ্ন করলে দ্বিতীয় অংশ যেন তার উত্তর দেয়। এই প্রশ্ন-উত্তর সম্বলিত সুরের মিলের কারণেই মোৎসার্টের গান একবার শুনলেই মানুষের মাথায় সহজে গেঁথে যায়।

৪. এআই (AI) বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি ও অ্যালগরিদমিক পর্যবেক্ষণ

ডিজিটাল মিউজিকোলজি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অডিও প্রসেসিংয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে ভোলফগাং আমাদেউস মোৎসার্টের স্বরলিপি বিশ্লেষণ করলে কিছু চমকপ্রদ ডেটা প্যাটার্ন পাওয়া যায়। তথ্যপ্রযুক্তি জগতে ‘মোৎসার্ট ইফেক্ট’ এবং অ্যালগরিদমিক মিউজিক মডেলিংয়ে মোৎসার্টের কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কম্পিউটেশনাল ডেটা ও অ্যালগরিদমিক বৈশিষ্ট্য

  • মারকভ চেইন ও ট্রানজিশন সম্ভাবনা (Markov Chain Transition Probability): এআই ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বা অডিও মডেলগুলো যখন ক্লাসিক্যাল সুরের ওপর পূর্বাভাস (Predictive Modeling) তৈরি করে, তখন দেখা যায় মোৎসার্টের মেলোডিতে একটি নোট থেকে পরবর্তী নোটে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই প্রাঞ্জল ও মসৃণ। গাণিতিকভাবে এতে আকস্মিক কোনো অসংলগ্ন সুরের বিচ্ছিন্নতা নেই, যাকে এআই পরিভাষায় ‘লো মেমোরি কস্ট ট্রানজিশন’ বলা হয়।
  • স্পেকট্রাল ব্যালেন্স ও রিল্যাক্সেশন ফ্রিকোয়েন্সি: মোৎসার্টের সাউন্ড ফ্রিকোয়েন্সি স্পেকট্রোগ্রামে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এতে অতিরিক্ত শব্দ বা ট্রানজিয়েন্ট পিক (Transient Spikes) থাকে না। সাউন্ড ওয়েভের মধ্যে হারমোনিক কনসোনেন্স (পরম মিল) এত বেশি যে, তা মানুষের মস্তিষ্কের আলফা তরঙ্গের সাথে দ্রুত সামঞ্জস্য তৈরি করে। অ্যালগরিদমে এর ‘সিগন্যাল টু নয়েজ রেশিও’ অত্যন্ত সুসংহত।
  • তথ্য-ঘনত্ব বনাম সারল্য (Information Density vs Simplicity): ডিপ লার্নিং অডিও মডেলে বাখের মিউজিক ব্যাকগ্রাউন্ডে প্রচুর তথ্য সমন্বয় করে (High Information Entropy), কিন্তু মোৎসার্টের মিউজিক ডেটা সিগন্যালে সুরের জটিলতা কম রেখে কাঠামোগত পুনরাবৃত্তি বজায় রাখে। ফলে এআই ভিত্তিক মিউজিক জেনারেটরগুলো মোৎসার্টের শৈলীতে নতুন গান তৈরি করতে অন্য যেকোনো সুরকারের চেয়ে দ্রুত নিখুঁত ফল দেয়।

৫. প্রাচ্য ও বাঙালি সঙ্গীতে মোৎসার্টের ছায়া

  • বাংলা আধুনিক গান ও মেলোডিক সারল্য:
    বাংলা আধুনিক গানে বিশেষ করে সলিল চৌধুরী কিংবা শচীন দেববর্মণের সুরে সহজ অথচ গভীর যে স্পর্শ পাওয়া যায়, তার সাথে মোৎসার্টের মেলোডিক গঠনের সরাসরি সাদৃশ্য রয়েছে। সলিল চৌধুরী মোৎসার্টের সিমফনি নম্বর ৪০-এর প্রারম্ভিক থিম দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন।
  • রবীন্দ্রনাথের গান ও মোৎসার্ট:
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইউরোপীয় সঙ্গীতের সহজ ও প্রানবন্ত প্রকাশভঙ্গিকে পছন্দ করতেন। রবীন্দ্রসংগীতের ‘প্রকৃতি পর্যায়’ বা ‘প্রেম পর্যায়ের’ অনেক গানে সহজ সুসংহত বাণী ও সুরের যে মসৃণ প্রবাহ দেখা যায়, তা মোৎসার্টের ক্লাসিক্যাল সামঞ্জস্যের কাছাকাছি।

৬. প্রচলিত ভুল ধারণা ও বাস্তব সত্য

  • ভুল ধারণা ১: মোৎসার্ট কোনো ভুল না করে এক টানে পাণ্ডুলিপি লিখে ফেলতেন এবং তিনি কখনোই খসড়া করতেন না।
  • বাস্তব সত্য: বিখ্যাত ‘আমাদেউস’ সিনেমার কারণে এই ভুল ধারণাটি ছড়ায়। মোৎসার্ট চরম প্রতিভাবান হলেও তিনি প্রচুর স্কেচবুক ও খসড়া ব্যবহার করতেন। বিশেষ করে তাঁর স্ট্রিং কোয়ার্টেটগুলো লেখার সময় তিনি দীর্ঘদিন ধরে সুর সংশোধন করেছিলেন।
  • ভুল ধারণা ২: মোৎসার্টের গান শুনলে শিশুদের বুদ্ধিমত্তা রাতারাতি বেড়ে যায় (‘মোৎসার্ট ইফেক্ট’)।
  • বাস্তব সত্য: ১৯৯৩ সালের একটি গবেষণার পর এই রটনা তৈরি হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, মোৎসার্টের সঙ্গীত শোনার পর মস্তিষ্কে সাময়িক ভালো লাগা বা সচেতনতা তৈরি হতে পারে, তবে এটি মানুষকে চিরতরে বা রাতারাতি জিনিয়াস বানিয়ে দেয় না।
  • ভুল ধারণা ৩: মোৎসার্ট চরম দারিদ্র্যে মারা যান এবং তাঁকে নিঃস্বদের মতো গণকবরে পুঁতে ফেলা হয়।
  • বাস্তব সত্য: মোৎসার্ট তাঁর ক্যারিয়ারের শেষদিকে কিছুটা আর্থিক সংকটে থাকলেও চরম নিঃস্ব ছিলেন না। তৎকালীন ভিয়েনার সাধারণ মধ্যবিত্ত রীতি অনুযায়ী তাঁকে কোনো বিশেষ ব্যক্তিগত চিহ্ন ছাড়া একটি সাধারণ সম্মিলিত কবরে (Common Grave) সমাহিত করা হয়েছিল, যা তখন একটি সাধারণ সামাজিক নিয়ম ছিল।

৭. প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলি (FAQ)

১. মোৎসার্টের গানের পাশে ‘K.’ বা ‘KV’ লেখা থাকে কেন?
উত্তর: এটি লুদভিগ ভন ক্যোশেল (Ludwig von Köchel)-এর নামের আদ্যক্ষর। তিনি ১৮৬২ সালে মোৎসার্টের সমস্ত ৬২৬টি গানকে প্রথমবার সময়ানুযায়ী গুছিয়ে ক্যাটালগ নম্বর দিয়ে সাজিয়েছিলেন।
২. প্রথমবার মোৎসার্ট শোনার জন্য কোনটি সেরা?
উত্তর: ‘Eine kleine Nachtmusik’ (K. 525) এবং ‘Symphony No. 40 in G minor’ (K. 550) শোনার মাধ্যমে শুরু করা সবচেয়ে ভালো। এগুলো দ্রুত শ্রোতাকে মোৎসার্টের জগতে নিয়ে যায়।
৩. মোৎসার্ট এবং বিথোভেনের প্রধান তফাত কী?
উত্তর: মোৎসার্টের সুরের মূল বৈশিষ্ট্য হলো আভিজাত্য, সহজ সৌন্দর্য ও সুষম ভারসাম্য। আর বিথোভেনের সুরের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বিপ্লব, বিষাদ, নাটকীয়তা ও কাঠামোগত বিদ্রোহ।

তথ্যসূত্র ও গ্রন্থপঞ্জি

  1. Solomon, Maynard. Mozart: A Life. HarperCollins, 1995.
  2. Einstein, Alfred. Mozart: His Character, His Work. Oxford University Press, 1945.
  3. Gutman, Robert W. Mozart: A Cultural Biography. Harcourt Brace, 1999.
  4. Taruskin, Richard. The Oxford History of Western Music. Oxford University Press, 2005.