যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা । ১৯৫৫ সালের ৫ জুন । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

১৯৫৪ সালের পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনকে সামনে রেখে তৎকালীন ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগকে ক্ষমতা থেকে হঠাতে বিরোধী দলগুলো মিলে যে একটা বিশাল নির্বাচনী মোর্চা গড়ে তুলেছিল, ইতিহাসে সেটাই ‘যুক্তফ্রন্ট’ নামে পরিচিত। পাকিস্তান রাষ্ট্রটা তৈরি হওয়ার পর থেকেই পূর্ব বাংলার মানুষ ভাষা, চাকরি, অর্থনীতি ও রাজনীতি—সবক্ষেত্রেই পশ্চিম পাকিস্তানের চরম বৈষম্য আর অবহেলার শিকার হচ্ছিল। এর ওপর ছিল মুসলিম লীগের দুঃশাসন, দুর্নীতি আর বাঙালিদের ওপর দমন-পীড়ন। এই সব কিছু মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মনের ভেতর যে তীব্র ক্ষোভ জমেছিল, তারই একটা সুসংগঠিত রাজনৈতিক রূপ ছিল এই যুক্তফ্রন্ট।

আনুষ্ঠানিকভাবে এই জোট গঠনের সিদ্ধান্ত হয় ১৯৫৩ সালের ১৪ই নভেম্বর এবং ওই বছরেরই ৪ঠা ডিসেম্বর এটি চূড়ান্ত রূপ পায়। পূর্ব বাংলার তৎকালীন বেশ কয়েকটি প্রধান বিরোধী দল নিজেদের ভেদাভেদ ভুলে এই জোটে হাত মিলিয়েছিল। এর মধ্যে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগ, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের কৃষক শ্রমিক পার্টি, মওলানা আতাহার আলীর নেজামে ইসলাম পার্টি এবং হাজী মোহাম্মদ দানেশ ও মাহমুদ আলী সিলেটির বামপন্থী গণতন্ত্রী দল অন্যতম। এই দলগুলোর একটাকাট্টা লক্ষ্যই ছিল আসন্ন নির্বাচনে মুসলিম লীগের বহু বছরের একচেটিয়া ক্ষমতার তাসের ঘর ভেঙে দেওয়া।

যুক্তফ্রন্টের এই পুরো আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন তিন প্রধান নেতা—মওলানা ভাসানী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। এই তিন দিকপালের যৌথ নেতৃত্বে জোটটি বাংলার মানুষের সামনে তাদের বিখ্যাত ‘২১ দফা’ নির্বাচনী ইশতেহার তুলে ধরে। এই ২১ দফা কেবল একটা প্রতিশ্রুতির তালিকা ছিল না, বরং এটি ছিল পূর্ব বাংলার মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং ভাষার অধিকার আদায়ের এক অকাট্য দলিল।

যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা [ Jukto front 21 Points ]

SufiFaruq.com Logo 252x68 2 যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা । ১৯৫৫ সালের ৫ জুন । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

 

১৯৫৪ সালের পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে বিরোধী জোটের প্রধান হাতিয়ার ছিল এই বিখ্যাত ‘২১ দফা’ ইশতেহার। তবে একে স্রেফ ভোটের আগে দেওয়া কিছু গালভরা প্রতিশ্রুতির তালিকা ভাবলে ভুল হবে। এই ২১ দফা আসলে ছিল বাংলার মানুষের ভাষা, অর্থনীতি, চাষবাস, পড়াশোনা, প্রশাসনিক সংস্কার আর পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন (Self-governance) আদায়ের একটা নিখুঁত এবং বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক নকশা। বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা শোষণ, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সেই জ্বলন্ত চেতনা আর মুসলিম লীগের অপশাসনের বিরুদ্ধে বাংলার মানুষের যে তীব্র ক্ষোভ—তারই একটা লিখিত দলিল ছিল এই ২১ দফা।

মজার বিষয় হলো, এই ইশতেহারের একেবারে শুরুতেই একটা নীতিগত ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। সেখানে পরিষ্কার বলা হয়—কোরআন ও সুন্নাহর মূল আইনের বাইরে গিয়ে কোনো আইন তৈরি করা হবে না এবং ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের ওপর ভিত্তি করেই নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যবস্থা করা হবে। এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, হুট করে একটা প্রগতিশীল রাজনৈতিক ইশতেহারে এই ধর্মীয় কার্ড কেন আনা হলো?

আসলে এর পেছনে ছিল তৎকালীন সময়ের এক চরম নোংরা রাজনৈতিক চাল। সেই আমলে বাংলার মানুষ যখনই নিজেদের অধিকার, ভাষা বা পেটের ভাতের দাবি তুলত—ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকার অমনি তাদের ‘ইসলাম বিরোধী’, ‘পাকিস্তান ভাঙার চক্রান্তকারী’ কিংবা ‘ভারতের দালাল’ বলে সস্তা ট্যাগ দিয়ে দিত। শাসকদের এই কুৎসিত অপপ্রচার আর ব্লেম-গেমকে এক তুড়িতে উড়িয়ে দিতেই যুক্তফ্রন্টের নেতারা এই কৌশলগত ধর্মীয় অবস্থানটা নিয়েছিলেন। এর ফলে মুসলিম লীগের মুখে যেমন চুনকালি পড়েছিল, তেমনি সাধারণ ধর্মীয় ভাবাবেগের মানুষগুলোর মনেও একটা ভরসা তৈরি হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত যুক্তফ্রন্টকে এক বিশাল ল্যান্ডস্লাইড বিজয় এনে দিতে সাহায্য করে।

যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা দাবি গুলো কি কি:

১. বাংলা রাষ্ট্রভাষা:বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা হইবে।

২. বিনা ক্ষতিপুরণে জমিদারী ও সমস্ত খাজনা আদায়কারী স্বত্ব উচ্ছেদ ও রহিত করিয়া ভূমিহীন কৃষকের মধ্যে উদ্বৃত্ত জমি বিতরণ করা হইবে এবং উচ্চ হারের খাজনা ন্যায়সঙ্গতভাবে হ্রাস করা হইবে এবং সার্টিফিকেটযোগে খাজনা আদায়ের প্রথা রহিত করা হইবে।

৩. পাট ব্যবসাকে জাতীয়করণ করার উদ্দেশ্যে তাকে পূর্ববঙ্গ সরকারের প্রত্যক্ষ পরিচালনাধীনে আনয়ন করিয়া পাটচাষীদের পাটের মূল্য দেওয়ার ব্যবস্থা করা হইবে এবং লীগ মন্ত্রিসভার আমলের পাট কেলেংকারি তদন্ত করিয়া সংশ্লিষ্ট সকলের শাস্তির ব্যবস্থা ও তাহাদের অসদুপায়ে অর্জিত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হইবে।

৪. কৃষি উন্নতির জন্য সমবায় কৃষি ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হইবে ও সরকারী সাহায্যে সকল প্রকার কুটির ও হস্তশিল্পের উন্নতি সাধন করা হইবে।

৫. পূর্ববঙ্গকে লবণ শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণ করিবার জন্য সমুদ্র উপকুলে কুটির-শিল্পের ও বৃহৎ শিল্পের লবন তৈয়ারির কারখানা স্থাপন করা হইবে এবং মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভার আমলের লবণের কেলেংকারী সম্পর্কে তদন্ত করিয়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শাস্তির ব্যবস্থা করা হইবে ও তাহাদের অসদুপায়ে অর্জিত যাবতীয় অর্থ বাজেয়াপ্ত করা হইবে।

৬. শিল্প ও কারিগরি শ্রেণীর গরীব মোহাজেরদের কাজের আশু ব্যবস্থা করিয়া তাহাদের পুনর্বসতির ব্যবস্থা করা হইবে।

৭. খাল খনন ও সেচের ব্যবস্থা করিয়া দেশকে বন্যা এবং দুর্ভিক্ষের কবল হইতে রক্ষা করিবার ব্যবস্থা করা হইবে।

৮. পূর্ববঙ্গকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে শিল্পায়িত করিয়া ও কৃষিকে আধুনিক যুগোপযোগী করিয়া শিল্প ও খাদ্যে দেশকে স্বাবলম্বী করা হইবে এবং আন্তর্জাতিক শ্রমসংঘের মূলনীতি অনুসারে শ্রমিকদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক এবং সকল প্রকার অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা হইবে।

৯. দেশের সর্বত্র একযোগে প্রাথমিক ও অবৈতনিক বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রবর্তন করা হইবে এবং শিক্ষকদের ন্যায়সঙ্গত বেতন ও ভাতার ব্যবস্থা করা হইবে।

১০. শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করিয়া শিক্ষাকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে কার্যকরী করিয়া কেবলমাত্র মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা হইবে এবং সরকারী ও বেসরকারী বিদ্যালয়সমূহের বর্তমান ভেদাভেদ উঠাইয়া দিয়া একই পর্যায়ভুক্ত করিয়া সকল বিদ্যালয়সমূহকে সরকারী সাহায্যপুষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হইবে এবং শিক্ষকদের উপযুক্ত বেতন ও ভাতার ব্যবস্থা করা হইবে।

১১. ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রভৃতি প্রতিক্রিয়াশীল কানুন বাতিল ও রহিত করিয়া বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করিয়া উচ্চশিক্ষাকে সস্তা ও সুবিধাজনক বন্দোবস্ত করা হইবে।

১২. শাসন ব্যয় সর্বাত্মকভাবে হ্রাস করা হইবে এবং তদুদ্দেশ্যে উচ্চ বেতনভোগীদের বেতন কমাইয়া ও নিম্ন বেতনভোগীদের বেতন বাড়াইয়া তাহাদের আয়ের একটি সুসংগত সামঞ্জস্য বিধান করা হইবে। যুক্তফ্রন্টের কোনো মন্ত্রী এক হাজারের বেশী টাকা বেতন গ্রহণ করিবেন না।

১৩. দুর্ণীতি ও স্বজনপ্রীতি, ঘুষ-রিশওয়াত বন্ধ করার কার্যকরী ব্যবস্থা করা হইবে এবং এতদুদ্দেশ্যে সমস্ত সরকারী ও বেসরকারী পদাধিকারী ব্যবসায়ীর ১৯৪০ সাল হইতে বর্তমান সময় পর্যন্ত সময়ের হিসাব-নিকাশ লওয়া হইবে এবং সন্তোষজনক কৈফিয়ৎ দিতে না পারিলে তাহাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হইবে।

১৪. জন নিরাপত্তা আইন ও অর্ডিন্যান্স প্রভৃতি কালাকানুন রদ ও রহিত করত বিনা বিচারে আটক বন্দীকে মুক্তি দেওয়া হইবে ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রকাশ্য আদালতে বিচার করা হইবে এবং সংবাদপত্র ও সভা-সমিতি করিবার অধিকার অবাধ ও নিরঙ্কুশ করা হইবে।

১৫. বিচার-বিভাগকে শাসন-বিভাগ হইতে পৃথক করা হইবে।

১৬. যুক্তফ্রন্টের প্রধানমন্ত্রী বর্ধমান হাউসের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত কম বিলাসের বাড়িতে বাসস্থান নিদিষ্ট করিবেন এবং বর্ধমান হাউসকে আপাতত ছাত্রাবাস ও পরে বাংলা ভাষার গবেষণাগারে পরিণত করা হইবে।

১৭. বাংলা রাষ্ট্রভাষার দাবীতে যাহারা মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভার গুলিতে শহীদ হইয়াছেন, তাহাদের পবিত্র স্মৃতিচি‎‎হ্নস্বরূপ ঘটনাস্থলে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করা হইবে এবং তাহাদের পরিবারবর্গকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হইবে।

১৮. ২১ শে ফেব্রুয়ারীকে শহীদ দিবস ঘোষণা করিয়া উহাকে সরকারী ছুটির দিন ঘোষণা করা হইবে।

১৯. লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ববঙ্গকে স্বায়ত্তশাসন প্রদান ও সার্বভৌমিক করা হইবে এবং দেশরক্ষা, পররাষ্ট্র ও মুদ্রা ব্যতীত আর সমস্ত বিষয় অবশিষ্টাত্মক ক্ষমতাসমূহ পূর্ববঙ্গ সরকারের হাতে আনয়ন করা হইবে এবং দেশরক্ষা বিভাগের স্থল-বাহিনীর হেডকোয়ার্টার পশ্চিম পাকিস্তান ও নৌবাহিনীর হেড-কোয়ার্টার পূর্ব পাকিস্তানে স্থাপন করা হইবে এবং পূর্ব পাকিস্তানে অস্ত্র নির্মাণের কারখানা নির্মাণ করত: পূর্ব পাকিস্থানকে আত্মরক্ষায় স্বয়ংসম্পূর্ণ করা হইবে। আনসার বাহিনীকে সশস্ত্র বাহিনীতে পরিণত করা হইবে।

২০. যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভা কোন অজুহাতেই আইন পরিষদের আয়ু বাড়াইবে না। আইন পরিষদের আয়ু শেষ হওয়ার ছয় মাস পূর্বেই মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করিয়া নির্বাচন কমিশনের মারফত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করিবেন।

২১. যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভার আমলে যখন যে আসন শূন্য হইবে, তিন মাসের মধ্যে তাহা পূরণের জন্য উপনির্বাচনের ব্যবস্থা করা হইবে এবং পর পর তিনটি উপনির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী পরাজিত হইলে মন্ত্রিসভা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করিবেন।

সূত্রঃ যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা [ Jukto front 21 Points ], যুক্তফ্রন্টের প্রচার দফতর। জানুয়ারি ১৯৫৪। ৫৬, সিমপসন রোড, ঢাকা।

 

১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের মাধ্যমে গঠিত পূর্ববঙ্গ মন্ত্রীসভা
১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের মাধ্যমে গঠিত পূর্ববঙ্গ মন্ত্রীসভা

 

যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার “প্রধান চারটি” দফা:

যুক্তফ্রন্টের পুরো ২১ দফার মধ্যে চারটা দফা ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত এবং রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে প্রভাবশালী। সত্যি বলতে, এই চারটা দাবিই কিন্তু পরবর্তীকালে বাঙালির স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের আসল ভিত তৈরি করে দিয়েছিল। যেকোনো নামী ইতিহাসবিদের চোখেই এই দফাগুলো ছিল সবচেয়ে বৈপ্লবিক। দফাগুলো একটু সহজভাবে বোঝা যাক:

১) বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেওয়া

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের রক্তঝরা ইতিহাসের পর এই দাবিটা স্রেফ একটা রাজনৈতিক ইস্যু ছিল না; এটা হয়ে উঠেছিল পূর্ব বাংলার মানুষের আত্মসম্মান, আবেগ আর বেঁচে থাকার লড়াইয়ের মূল কেন্দ্রবিন্দু। এই দফাটাই প্রথম বাঙালির মনের ভেতর ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-এর বীজ বুনে দেয়।

২) জমিদারি প্রথা বিলোপ ও কৃষকদের জমির অধিকার

পশ্চিম পাকিস্তানের শোষক জমিদারদের তুলনায় পূর্ব বাংলার কৃষক সমাজ ছিল চরম অবহেলিত। জমিদারি প্রথা পুরোপুরি বাতিল করে কৃষকদের হাতে জমির মালিকানা দেওয়ার এই প্রতিশ্রুতি গ্রামীণ ভোটব্যাংকে এক বিশাল সুনামি এনে দিয়েছিল। সাধারণ চাষাভুষো মানুষ দলে দলে মুসলিম লীগের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে যুক্তফ্রন্টের ছাতার নিচে এসে দাঁড়ায়।

৩) ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘শহীদ দিবস’ ঘোষণা ও শহীদ মিনার তৈরি

এই দফাটা যুক্তফ্রন্টকে তৎকালীন তরুণ ছাত্রসমাজ, সচেতন মধ্যবিত্ত আর শহুরে সাধারণ মানুষের মধ্যে রাতারাতি আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা এনে দেয়। বায়ান্নর শহীদি চেতনাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার এই প্রতিশ্রুতি যুবসমাজকে দারুণভাবে টেনেছিল।

৪) পূর্ণ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন (আঞ্চলিক ক্ষমতা)

এর সোজা মানে ছিল—কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকবে স্রেফ তিনটা জিনিস (দেশরক্ষা, পররাষ্ট্র আর মুদ্রা)। আর বাকি সবকিছুর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতা থাকবে পূর্ব বাংলা সরকারের হাতে। এই স্বায়ত্তশাসনের দাবিটাকেই মূলত পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেই ঐতিহাসিক ‘ছয় দফা’র আদি রূপ বা আসল বীজ বলা হয়।

একটা জিনিস খেয়াল করলে দেখা যাবে, যুক্তফ্রন্টের এই পুরো কর্মসূচিতে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের প্রভাব ছিল সবচেয়ে স্পষ্ট। পুরো ইশতেহারের মধ্যে সরাসরি ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করে ২টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দফা রাখা হয়েছিল—একদিকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া, আর অন্যদিকে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করে শহীদ মিনার তৈরি করা। এই দুই তুরুপের তাসের মাধ্যমেই যুক্তফ্রন্টের নেতারা ভাষা আন্দোলনকে একটা সাংস্কৃতিক মঞ্চ থেকে সরাসরি ভোটের মূল রাজনৈতিক ইস্যুতে রূপ দিতে পেরেছিলেন, যা মুসলিম লীগের ভরাডুবি নিশ্চিত করেছিল।

যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচির রচয়িতা:

যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচির মুখ্য রচয়িতা ছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদ। তিনি এই কর্মসূচির মূল কাঠামো ও অধিকাংশ দফা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

তবে এটি কোনো একক ব্যক্তির সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত রচনা ছিল না। ২১ দফা কর্মসূচির বিভিন্ন দাবি পূর্ব বাংলার দীর্ঘদিনের গণআন্দোলন ও জনগণের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা থেকে উদ্ভূত হয়েছিল। যুক্তফ্রন্ট গঠনের সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এসব দাবির ওপর আলোচনা, পরামর্শ ও সংশোধনী প্রদান করেন।

বিশেষ করে শের-ই-বাংলা এ.কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা ও সম্মিলিত নেতৃত্ব এই কর্মসূচি চূড়ান্তকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

 

যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার ফলাফল:

২১ দফা ইশতেহারের ওপর ভর করে ১৯৫৪ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট এক অবিশ্বাস্য ও নজিরবিহীন জয় ছিনিয়ে আনে। এই নির্বাচনের আসন সংখ্যার হিসাব নিয়ে একটু খটকা আছে। আমাদের দেশের অনেক জনপ্রিয় বা চেনা বইপত্রে বলা হয়, যুক্তফ্রন্ট ২২৮টি মুসলিম আসন জিতেছিল। কিন্তু আপনি যদি একদম নির্ভরযোগ্য ও মূল ঐতিহাসিক রেকর্ডগুলো ঘাটেন, তবে পরিষ্কার দেখতে পাবেন যে—সেবার মোট মুসলিম আসন সংখ্যা ছিল ২৩৭টি, যার মধ্যে যুক্তফ্রন্ট একাই পকেটে পুরেছিল ২২৩টি আসন।

এই ল্যান্ডস্লাইড বিজয়ের আসল রহস্য কিন্তু লুকিয়ে ছিল ওই ২১ দফার জনমুখী আবেদনের ভেতর। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের দগদগে চেতনা, মুসলিম লীগের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আর নিজেদের অধিকার আদায়ের জেদ—সবকিছুর একটা সরাসরি বিস্ফোরণ ঘটেছিল ব্যালট বক্সে। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা, শোষক জমিদারদের উচ্ছেদ, চাষাভুষো মানুষের ন্যায্য অধিকার, পড়াশোনার সংস্কার আর লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে নিজেদের অঞ্চলের ক্ষমতা নিজেদের হাতে রাখার মতো দাবিগুলো সাধারণ মানুষের মনে এক দারুণ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ফল যা হওয়ার তাই হয়েছিল—গ্রাম থেকে শহর, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া—সবখানেই তখন যুক্তফ্রন্টের পক্ষে এক বিশাল গণজোয়ার তৈরি হয়।

তবে এই নির্বাচনের সবচেয়ে চমকপ্রদ আর ঐতিহাসিক দিকটা ছিল ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের পতন। যে দলটি পাকিস্তান রাষ্ট্র বানানোর ক্রেডিট নিয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করছিল, তারা সেবার ২৩৭টি আসনের মধ্যে মাত্র ৯টি আসন পেয়ে স্রেফ খড়কুটোর মতো ভেসে যায়। লজ্জার চূড়ান্ত রূপটা দেখা যায় যখন স্বয়ং তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিন নিজের এলাকাতেই এক তরুণ প্রার্থীর কাছে বিপুল ভোটে হেরে বসেন। এই একটা নির্বাচন কার্যত পূর্ব বাংলার বুক থেকে মুসলিম লীগের দাপট আর অহংকার চিরতরে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল।

দিনশেষে বলা চলে, যুক্তফ্রন্টের এই ২১ দফার সাফল্য কেবল একটা ভোটের জয়-পরাজয় ছিল না; এটা ছিল নিজের ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক পাওনা আর গণতান্ত্রিক অধিকারের পক্ষে বাঙালির দেওয়া এক অকাট্য ঐতিহাসিক রায়। এই নির্বাচনই প্রথম প্রমাণ করেছিল যে, বুটের জোর আর ধর্মের ভুয়া দোহাই দিয়ে বাঙালিকে আর দাবিয়ে রাখা যাবে না। আর ঠিক এই বিজয়টাই পরবর্তীকালে আমাদের স্বাধিকার আন্দোলনের আসল এনার্জি জুগিয়েছিল, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ১৯৭১ সালের স্বাধীন বাংলাদেশ।

 

 

SufiFaruq.com Logo 252x68 1 যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা । ১৯৫৫ সালের ৫ জুন । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

 

বঙ্গবন্ধু ও চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট ও ২১ দফা:

পাকিস্তান রাষ্ট্রটা তৈরি হওয়ার পর সাত বছরও কাটেনি, এর মধ্যেই ১৯৫৪ সালের পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক ওলটপালট করা অধ্যায় লিখে দিয়েছিল। যে মুসলিম লীগ বুক ফুলিয়ে পাকিস্তান আন্দোলন করে দেশ স্বাধীন করল, তারা যে মাত্র কয়েক বছরেই বাংলার মানুষের চোখের বালি হয়ে এভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে—তা হয়তো খোদ জিন্নাহ সাহেবও ভাবেননি। আর এর বিপরীতে জন্ম নিয়েছিল ‘হক–ভাসানী–সোহরাওয়ার্দী’র সেই ঐতিহাসিক যুক্তফ্রন্ট।

শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক আর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী—দুজনই ছিলেন ব্রিটিশ আমলের অবিভক্ত বাংলার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী। এই দুই প্রবীণ ও ঝানু রাজনীতিকের সাথে যখন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর আপসহীন নেতৃত্ব যোগ হলো, তখন পূর্ব বাংলার বিরোধী রাজনীতিতে এক নতুন জোয়ার এলো।

মজার বিষয় হলো, এই পুরো রাজনৈতিক সমীকরণের সাথে আমাদের তরুণ শেখ মুজিবুর রহমানের সম্পর্কটা কিন্তু বহু পুরনো। ১৯৩৮ সালে ফজলুল হক আর সোহরাওয়ার্দী যখন গোপালগঞ্জ সফরে যান, তখন মাত্র ১৮ বছরের এক রোগা-পটকা স্কুলপড়ুয়া মুজিব তাঁদের স্বাগত জানান। সে সময়ই তাঁর অসাধারণ সাংগঠনিক ক্ষমতা দেখে এই দুই বাঘা নেতা মুগ্ধ হয়েছিলেন।

পরবর্তী সময়ে, ১৯৪৯ সালের ২৩শে জুন যখন আওয়ামী মুসলিম লীগ তৈরি হলো, মওলানা ভাসানী হলেন তার প্রথম সভাপতি। ভাসানী সাহেব টাঙ্গাইলের একটা উপ-নির্বাচনে জিতে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হলেও মুসলিম লীগ সরকার নানা নোংরা কূটকৌশল করে তাঁর মেম্বারশিপ বাতিল করে দেয়। এরপর ভাসানী সাহেব নিজে আর কোনোদিন ভোটে দাঁড়াননি ঠিকই, কিন্তু তাঁর মুখের একেকটি আগুন-ঝরা বক্তৃতা সাধারণ মানুষকে ঘর থেকে বের করে আনার জন্য একাই যথেষ্ট ছিল।

নির্বাচনের হাওয়া যখন গরম, তখন যুক্তফ্রন্টের শরিক দলগুলোর প্রার্থীদের একটাই আবদার ছিল—হক, ভাসানী আর সোহরাওয়ার্দী যেন অন্তত একবার হলেও তাদের এলাকায় নির্বাচনী প্রচারে যান। তবে এর পাশাপাশি মাত্র ৩৪ বছর বয়সী তরুণ শেখ মুজিবের চাহিদাও ছিল আকাশছোঁয়া। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পর মুসলিম লীগের পায়ের তলার মাটি তখন পুরোপুরি সরে গেছে। একুশের রক্তপাতের পর দলটি পরিণত হয়েছিল এক গণধিক্কৃত শক্তিতে। ঠিক এই সুযোগে শেখ মুজিব জেলা থেকে জেলা, মহকুমা থেকে মহকুমায় চষে বেড়িয়ে আওয়ামী লীগকে এক শক্তিশালী তৃণমূল সংগঠনে রূপ দেন।

তিনি শুধু বড়দের রাজনীতিতেই মন দেননি, পাশাপাশি ছাত্রলীগকে শক্তিশালী করতে জানপ্রাণ লড়েছেন। কারণ ভাষা আন্দোলনের পর বাংলার মানুষের কাছে ছাত্রসমাজের সম্মান ছিল আকাশচুম্বী। আর ৫৪-র নির্বাচনে এই ছাত্র সমাজই ছিল যুক্তফ্রন্টের সবচেয়ে বড় ভলান্টিয়ার ফোর্স। মুসলিম লীগের দুর্নীতি, পেটের ভাতের কষ্ট, আর বাঙালিদের দাস বানিয়ে রাখার মানসিকতার বিরুদ্ধে মানুষের যে তীব্র ক্ষোভ—তাই এক সুতোয় বেঁধে ১৯৫৩ সালের নভেম্বরে তৈরি হলো যুক্তফ্রন্ট। মূলত চারটা দল—আওয়ামী লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলাম আর গণতন্ত্রী দল মিলে এই জোট গঠন করে। লক্ষ্য একটাই—১৯৫৪ সালের মার্চের নির্বাচনে মুসলিম লীগকে হোয়াইটওয়াশ করা।

এই জোটের নির্বাচনী ইশতেহার ছিল সেই বিখ্যাত ‘২১ দফা’। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা, কালো আইন বাতিল, জমিদারি উচ্ছেদ, পাটের ন্যায্য মূল্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আর পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের মতো বৈপ্লবিক সব দাবি ছিল এতে। এটা কেবল ভোটের ইশতেহার ছিল না, এটা ছিল বাঙালির মুক্তির প্রথম লিখিত সনদ। বামপন্থী কর্মীদের সহায়তায় যুক্তফ্রন্টের নেতারা এই ২১ দফা নিয়ে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে যান।

তবে ইতিহাসের একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং অজানা বাস্তবতা হলো—আমাদের তরুণ শেখ মুজিব কিন্তু শুরুতে এই যুক্তফ্রন্ট বা নির্বাচনী জোট গঠনের ব্যাপারে একেবারেই রাজি ছিলেন না। তাঁর পরিষ্কার মূল্যায়ন ছিল, আওয়ামী লীগ একাই মুসলিম লীগকে হারিয়ে দেওয়ার মতো শক্তি অর্জন করেছে। তিনি মনে করতেন, এই জোট করতে গেলে কিছু মরা বা নামসর্বস্ব রাজনৈতিক দল অযথা লাইমলাইটে চলে আসবে এবং দলের আসল ত্যাগী কর্মীরা টিকিটের মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হবেন। তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ ক্ষুরধার ভাষায় মন্তব্য করেছিলেন—“দেশে আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো দল নেই; যুক্তফ্রন্ট করা মানে কিছু মরা লোককে বাঁচিয়ে রাখা।” মুজিবের এই আশঙ্কা কিন্তু পরে অক্ষরে অক্ষরে সত্যি হয়েছিল। যেখানে আওয়ামী লীগ অনায়াসে জিততে পারত, সেখানে শরিক দলগুলো জোরাজুরি করে আসন কেড়ে নেয়। এমনকি কয়েক মাস আগে মুসলিম লীগে থাকা সুবিধাবাদী লোকেরাও যুক্তফ্রন্টের টিকিট পেয়ে যায়। দলের কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ থাকা সত্ত্বেও বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে শেখ মুজিব নিজের আপত্তি পাশে সরিয়ে রেখে জানপ্রাণ দিয়ে যুক্তফ্রন্টের পক্ষে প্রচার চালান এবং এক অভূতপূর্ব বিজয় ছিনিয়ে আনেন।

কিন্তু ক্ষমতার নোংরা খেলা শুরু হলো জয়ের পরপরই। ১৯৫৪ সালের ৩রা এপ্রিল ফজলুল হককে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানানো হলে মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে শুরুতেই ক্যাচাল বেঁধে যায়। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আতাউর রহমান খান আর শেখ মুজিবের নাম মন্ত্রীর তালিকায় দেওয়া হলেও, বুড়ো হক সাহেব বেঁকে বসেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, শেখ মুজিবকে তিনি তাঁর ক্যাবিনেটে নেবেন না। সোহরাওয়ার্দী সাহেব তখন যুক্তি দেন যে, আওয়ামী লীগের কাকে মন্ত্রী করা হবে তা দলের নেতারাই ঠিক করবেন, হক সাহেব নন। কিন্তু এই কাদার ছড়াছড়ির মধ্যেও তরুণ শেখ মুজিব ক্ষমতার প্রতি এক অদ্ভুত অনাসক্তি দেখালেন। তিনি সোজা বলে দিলেন—“আমাকে নিয়ে গোলমাল করার প্রয়োজন নেই। আমি মন্ত্রী হতে চাই না।” একজন ৩৪ বছরের তরুণের মুখে ক্ষমতার এমন নির্মোহ প্রত্যাখ্যান সত্যিই বিরল! (যদিও পরে মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে তিনি কৃষি ও সমবায় মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন)।

শেখ মুজিবের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা কতটা নিখুঁত ছিল, তা প্রমাণ হতে মাত্র তিন মাস সময় লেগেছিল। শরিক দলগুলোর ভেতরের কোন্দল আর সমন্বয়হীনতার সুযোগ নিয়ে করাচির কেন্দ্রীয় সরকার চাল চালল। ১৯৫৪ সালের ৩০শে মে গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ ফজলুল হকের মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে পূর্ব বাংলায় সরাসরি ‘গভর্নর শাসন’ বা জরুরি অবস্থা জারি করেন। অর্থাৎ, যুক্তফ্রন্টের স্থায়িত্ব নিয়ে শেখ মুজিব শুরু থেকে যে শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, তা মাত্র ৯০ দিনের মাথায় বাস্তবে রূপ নিল।

তবুও এই ৫৪-র ধাক্কা আর ২১ দফার অভিজ্ঞতাই শেখ মুজিবের রাজনৈতিক মগজকে আরও পরিপক্ব করে তুলেছিল। এই ২১ দফায় যে ভাষার মর্যাদা আর আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি ছিল, তারই এক সুবিন্যস্ত ও চূড়ান্ত রূপ আমরা পরবর্তীকালে দেখতে পাই ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া সেই ঐতিহাসিক ‘ছয় দফা’র ভেতর।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের মূল কথাই ছিল—বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় আর দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। তিনি নিজেই লিখে গেছেন—“একজন মানুষ হিসাবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসাবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়।” ৫৪-র যুক্তফ্রন্টের এই পুরো অধ্যায়টি আসলে আমাদের সেই চিরচেনা আপসহীন, দূরদর্শী এবং দলীয় শৃঙ্খলায় বিশ্বাসী এক মহান নেতার জন্মলগ্নেরই গল্প।

 

আরও দেখুন:

Leave a Comment