যুদ্ধাপরাধীর বিচার নিয়ে নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ নেই

বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি সন্ধিক্ষণ। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বহন করা এক জাতীয় দায়, এক অমোচনীয় কলঙ্ক—যুদ্ধাপরাধীদের বিচার—অবশেষে বাস্তব রূপ নিতে শুরু করেছে। এই প্রক্রিয়া কেবল একটি আইনি কার্যক্রম নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয় পুনর্নির্মাণের সংগ্রাম।

এই মুহূর্তে একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা দরকার—
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে নিরপেক্ষ থাকার কোনো সুযোগ নেই।

কারণ এটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, যেখানে মতভেদ স্বাভাবিক। এটি একটি নৈতিক প্রশ্ন, একটি ঐতিহাসিক প্রশ্ন, একটি সভ্যতার প্রশ্ন—যেখানে ‘নিরপেক্ষতা’ আসলে অবস্থানহীনতা নয়, বরং একটি পক্ষকে পরোক্ষভাবে সমর্থন করা।

১৯৭১ সালে এই দেশের মাটিতে যে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, যে নারী নির্যাতন, যে বুদ্ধিজীবী হত্যা—সেগুলো কোনো বিতর্কিত ইতিহাস নয়। এগুলো প্রমাণিত, স্বীকৃত এবং জাতির সম্মিলিত স্মৃতির অংশ। সেই অপরাধের বিচার চাওয়া কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা নয়—এটি ন্যায়বিচারের ন্যূনতম দাবি।

তবুও আমরা দেখছি, এই বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর এক ধরনের কৃত্রিম নিরপেক্ষতার বয়ান তৈরি করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে—“সব পক্ষেরই ভুল আছে”, “রাজনীতি হচ্ছে”, “দুই পক্ষই সমান”—ইত্যাদি। এই ধরনের বক্তব্য বাস্তবতাকে আড়াল করে এবং বিচার প্রক্রিয়ার নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করার চেষ্টা করে।

প্রশ্ন হলো—গণহত্যার বিচার চাওয়া আর গণহত্যার দায় এড়িয়ে যাওয়ার রাজনীতিকে কীভাবে এক কাতারে ফেলা যায়?

যখন একজন মানুষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে দাঁড়ায়, তখন সে কেবল একটি সরকারের পক্ষে নয়—সে ইতিহাসের পক্ষে দাঁড়ায়, মানবতার পক্ষে দাঁড়ায়। আর যখন কেউ এই বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, বিলম্বিত করতে চায়, বা তা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে—তখন সে অজান্তেই সেই অপরাধের ভার লঘু করার প্রচেষ্টার অংশ হয়ে দাঁড়ায়।

২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলন এই বাস্তবতারই প্রতিফলন। তরুণ প্রজন্ম রাস্তায় নেমে বলেছে—এই বিচার শেষ করতে হবে, এই দায় এড়ানো যাবে না। এটি কোনো দলের আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল একটি প্রজন্মের নৈতিক অবস্থান।

অন্যদিকে, এই বিচারকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ, রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রম—এসবও আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। এটি প্রমাণ করে—এই বিচার কেবল আদালতের ভেতরের বিষয় নয়; এটি একটি আদর্শগত সংঘাত, যেখানে একপক্ষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অন্যপক্ষে সেই চেতনার অস্বীকার।

এই প্রেক্ষাপটে ‘নিরপেক্ষতা’ শব্দটি আসলে একটি বিভ্রান্তিকর আশ্রয়। কারণ এখানে নিরপেক্ষ থাকার মানে হলো— অন্যায়কে স্পষ্টভাবে অন্যায় বলতে অস্বীকার করা; ন্যায়বিচারের দাবিকে দুর্বল করা; ইতিহাসের দায় এড়িয়ে যাওয়া।

একটি রাষ্ট্র, যে রাষ্ট্র গণহত্যার মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে, সেখানে যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রশ্নে নিরপেক্ষ থাকা মানে নিজের জন্মকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা।

সুতরাং আজ প্রয়োজন স্পষ্ট অবস্থান—
আপনি বিচার চান, নাকি বিচার ঠেকাতে চান?
আপনি ইতিহাসের পক্ষে, নাকি ইতিহাস বিকৃতির পক্ষে?

মাঝামাঝি দাঁড়ানোর কোনো জায়গা এখানে নেই।

কারণ কিছু প্রশ্নে আপস চলে না। কিছু অপরাধের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা মানে অন্যায়ের পাশে দাঁড়ানো।

যুদ্ধাপরাধের বিচার সেই ধরনেরই একটি প্রশ্ন— যেখানে নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ নেই, থাকার অধিকারও নেই।

Leave a Comment