একটি জাতির প্রাণশক্তি হলো তার যুবসমাজ এবং এই যুবশক্তিকে দক্ষ ও সুশৃঙ্খল হিসেবে গড়ে তোলার প্রধান মাধ্যম হলো ক্রীড়া। “বাংলাদেশকে একটি উন্নত-সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে যুবকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে এবং ক্রীড়াঙ্গনে বিশ্বজয় করতে হবে”—এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এক দশকে বাংলাদেশের “যুব ও ক্রীড়া” খাতে অভূতপূর্ব বিপ্লব সাধিত হয়েছে। গত দশ বছরে বাংলাদেশ কেবল বৈশ্বিক ক্রীড়া আসরের সফল আয়োজক হিসেবেই নয়, বরং মাঠপর্যায়ে একের পর এক সাফল্য অর্জনের মাধ্যমে বিশ্ব ক্রীড়া মানচিত্রে এক শক্তিশালী নাম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
ক্রীড়াক্ষেত্রে গত ১০ বছরের সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ২০১১ সালের আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ এবং ২০১৪ সালের ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টি সফলভাবে আয়োজন করা। এই সময়েই বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল ওয়ানডে স্ট্যাটাস অর্জন করে এক নতুন ইতিহাসের সূচনা করে। তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড় তুলে আনতে প্রতিটি উপজেলায় একটি করে মোট ৪৯০টি মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণের সাহসী প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামসহ দেশের প্রধান স্টেডিয়ামগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার মাধ্যমে বাংলাদেশের ক্রীড়া অবকাঠামো এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে।
যুব উন্নয়নে শেখ হাসিনার সরকারের সবচেয়ে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হলো ‘ন্যাশনাল সার্ভিস’ কর্মসূচি। “ঘরে ঘরে কর্মসংস্থান” সৃষ্টির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এই প্রকল্পের মাধ্যমে হাজার হাজার যুবক ও যুব মহিলাকে প্রশিক্ষিত করে জাতির উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এছাড়া জাতীয় যুবনীতি-২০১৭ প্রণয়ন এবং সাভারের যুব কেন্দ্রকে ‘শেখ হাসিনা জাতীয় যুব উন্নয়ন ইনস্টিটিউট’-এ রূপান্তর করার মাধ্যমে যুবদের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি মজবুত করা হয়েছে।
বর্তমান আলোচনায় গত ১০ বছরে যুবসমাজের ক্ষমতায়ন, আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্রীড়া অবকাঠামোর আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের গৌরবময় অর্জনসমূহ বিস্তারিতভাবে উপস্থাপিত হলো।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে “যুব ও ক্রীড়া” খাতে অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির দশ বছর (২০০৯-২০১৮)

- ক্রীড়াক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি উজ্জ্বল নাম। বর্তমান সরকারের আমলে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে যে সফলতা বয়ে এসেছে তা ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে।
- বঙ্গবন্ধু সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশীপ ২০০৯, সাউথ এশিয়ান গেমস ২০১০, আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০১১, আইসিসি মহিলা বিশ্বকাপ ক্রিকেট বাছাই পর্ব- ২০১১, এশিয়া কাপ ক্রিকেট ২০১২, এশিয়া কাপ ক্রিকেট ২০১৪, ওয়ার্ল্ড টি টুয়েন্টি বাংলাদেশ ২০১৪, ৪র্থ রোলবল বিশ্বকাপ ২০১৭ ইসলামিক সলিডারিটি আর্চারী চ্যাম্পিয়নশীপ ২০১৭, ১০ম পুরূষ এশিয়া কাপ হকি টুর্নামেন্ট ২০১৭ ও সাফ অনুর্ধ্ব ১৫ মহিলা চ্যাম্পিয়নশীপ ২০১৭ সফলভাবে আয়োজন করে বাংলাদেশ। এসব আয়োজন বর্ণাঢ্যময় ও আকর্ষণীয় হওয়ায় বিশ্বব্যাপী প্রসংশিত হয়েছে এবং দেশে ও বিদেশে বাংলাদেশের সুনাম ও গৌরব বৃদ্ধি পেয়েছে।
- বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত আইসিসি মহিলা বিশ্বকাপ ক্রিকেট বাছাই পর্ব-২০১১ এ বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেট দল জাপান, আয়ারল্যান্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রকে হারিয়ে ওয়ানডে স্ট্যাটাস অর্জন করে জাতির জন্য নতুন এক ইতিহাস সৃষ্টি করে। হকি, শুটিং, জিমন্যাস্টিকস, আর্চারি, ভারোত্তোলন, সুইমিং ও রোলবল ইত্যাদি ডিসিপ্লিনে ভালো ফলাফল অর্জন করেছে বাংলাদেশ।
- মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দেশের তৃনমূল পর্যায় থেকে মেধা সম্পন্ন খেলোয়াড়দের জাতীয় পর্যায়ে তুলে আনার অভিপ্রায়ে প্রতিটি উপজেলায় একটি করে মোট ৪৯০টি মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ১৩১টি মিনি স্টেডিয়ামের অবকাঠামো নির্মাণের প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ শুরু হয়েছে। সম্প্রতি ঢাকার অদূরে পূর্বাচলে ৭০ হাজার দর্শক ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন ক্রিকেট স্টেডিয়াম ও ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণ এবং কক্সবাজার ও মানিকগঞ্জে আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন স্টেডিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

- জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার নীতিমালার খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার নীতিমালার আওতায় খেলোয়াড় হিসেবে বাংলাদেশী নাগরিকগণ জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার প্রাপ্তির জন্য বিবেচিত হবেন। জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার নীতিমালার আলোকে ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালের জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার প্রদানের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে।
- ক্রীড়াক্ষেত্রে গৌরব অর্জনের পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়নেও ব্যাপক সাফল্য অর্জিত হয়েছে। বিশ্বকাপ ক্রিকেট উপলক্ষে প্রায় ৩০৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম, শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম, চট্টগ্রাম জহুর আহম্মেদ স্টেডিয়াম, খুলনা শেখ আবু নাসের স্টেডিয়াম ও নারায়ণগঞ্জের খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামকে আন্তর্জাতিকমানের স্টেডিয়ামে উন্নীত করা হয়েছে। যার ফলে ভবিষ্যতে যে কোন ধরনের বিশ্ব মর্যদার ক্রিকেট খেলা বাংলাদেশে আয়োজন সম্ভব। সাউথ এশিয়ান গেমসের সময় প্রায় ১২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ক্রীড়াক্ষেত্রে নতুন নতুন স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। প্রায় সাড়ে ৮৭ কোটি টাকা ব্যয়ে সিলেট বিভাগীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামকে আন্তর্জাতিকমানের স্টেডিয়ামে উন্নীত করা হয়েছে।
- ৬ এপ্রিলকে জাতীয় ক্রীড়া দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সে অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রথমবারের মত উৎসবমুখর পরিবেশে ৬ এপ্রিল ২০১৭ পালিত হল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস ২০১৭। প্রথমবারের মত ১৬ এপ্রিল ২০১৭ গণভবনে ক্রীড়াবিদদের সংবর্ধিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ক্রীড়া পরিদপ্তরের আওতাধীন ৬টি সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজ স্নাতক ডিগ্রীধারী যুবক ও যুব মহিলাদের নিবিড় প্রশিক্ষণ প্রদানপূর্বক ব্যাচেলর অব ফিজিক্যাল এডুকেশন (বিপিএড) শিক্ষণ প্রদান করছে। ঢাকা শারীরিক শিক্ষা কলেজে মাস্টার্স অব ফিজিক্যাল এডুকেশন (এমপিএড) কোর্স চালু করা হয়েছে।

যুৱক্ষেত্ৰ
- আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই যুবশক্তি। এই যুব শক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে দ্রুত গতিতে দেশের উন্নয়ন সম্ভব। এই যুব গোষ্ঠিকে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত করার উদ্দেশ্যে ২০০৮ সালের নির্বাচনের পূর্বে শেখ হাসিনা ঘোষণা করেছিলেন প্রত্যেক ঘরে ঘরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার। তারই লক্ষ্যে ন্যাশনাল সার্ভিস প্রবর্তিত হয়েছিল এবং তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে।
- ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি বর্তমান সরকারের একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মসূচি। এ কর্মসূচির আওতায় প্রথম পর্ব থেকে চতুর্থ পর্ব পর্যন্ত ২৮টি জেলার ৬৪টি উপজেলা ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বর্তমানে পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম পর্বে আরও ৬৪টি উপজেলায় ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে।
- যুবদের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা এবং তাদের আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত করার লক্ষ্যে উৎপাদনমুখী ও দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ দিয়ে অত্যন্ত সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করা হচ্ছে। দেশের ৬৪টি জেলা ও ৪৮৩টি উপজেলায় আবাসিক ও অনাবাসিকভাবে ৭৪টি ট্রেডে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
- যুব সংগঠনসমূহের কার্যক্রম সমন্বয় ও আর গতিশীল করার লক্ষ্যে প্রণীত যুব সংগঠন (নিবন্ধন ও পরিচালনা) আইন ২০১৫-এর আলোকে যুব সংগঠন (নিবন্ধন ও পরিচালনা) বিধিমালা- ২০১৭ প্রণয়ন করা হয়েছে, যার ভিত্তিতে যুব সংগঠন নিবন্ধনের কাজ জুলাই ২০১৭ হতে মাঠ পর্যায়ে শুরু করা হয়েছে। যুবকল্যাণ তহবিল অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ রহিত করে যুবকল্যাণ তহবিল আইন, ২০১৬ প্রণয়ন করা হয়েছে। ২০০৩ সালের জাতীয় যুবনীতির স্থলে একটি যুগোপযোগী জাতীয় যুবনীতি-২০১৭ প্রণয়ন করা হয়েছে। সাভারস্থ শেখ হাসিনা জাতীয় যুব কেন্দ্রকে ইনন্সিটিউটে রূপান্তর করার লক্ষ্যে শেখ হাসিনা জাতীয় যুব উন্নয়ন ইনন্সিটিউট করা হয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার নেতৃত্বের এই এক দশক ছিল বাংলাদেশের যুবসমাজের ক্ষমতায়ন এবং ক্রীড়াঙ্গনের স্বর্ণযুগ। দেশের এক-তৃতীয়াংশ যুবশক্তিকে দক্ষ জনসম্পদে রূপান্তর করতে ‘ন্যাশনাল সার্ভিস’ কর্মসূচির মাধ্যমে ঘরে ঘরে কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা জাতীয় অর্থনীতিতে গতির সঞ্চার করেছে। সাভারের যুব কেন্দ্রকে একটি পূর্ণাঙ্গ ইনস্টিটিউটে রূপান্তর এবং যুগোপযোগী ‘জাতীয় যুবনীতি-২০১৭’ প্রণয়ন যুবকদের আত্মনির্ভরশীল ও আধুনিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার পথ প্রশস্ত করেছে।
ক্রীড়াক্ষেত্রে বাংলাদেশ আজ কেবল দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, বিশ্বমঞ্চে এক সমীহ জাগানিয়া নাম। ২০১১ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপ ও ২০১৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সফল আয়োজন এবং নারী ক্রিকেট দলের ওয়ানডে স্ট্যাটাস অর্জন বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিশ্বজুড়ে উজ্জ্বল করেছে। তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভা অন্বেষণের জন্য উপজেলা পর্যায়ে ৪৯০টি মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণের সাহসী উদ্যোগ দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে গ্রামপর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে। গত ১০ বছরের এই সমন্বিত উন্নয়ন ও আধুনিকায়নই প্রমাণ করে যে, তারুণ্যের উদ্দীপনা আর সঠিক নেতৃত্ব থাকলে একটি জাতি কত দ্রুত উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে পারে। এই পথ ধরেই বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ হিসেবে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
