যা রটে তার কিছুটাতো বটে! আমাদের খুব প্রিয় একটি উপভাষিক শব্দবন্ধ। বিশেষ করে, আমাদের আশপাশের যে কোনো ব্যক্তির নামে কিছু রটলে প্রথমেই আমরা এই শব্দবন্ধটি ব্যবহার করি। কথাটি বলে এক ধরনের অনাবিল বিনোদন অনুভব করি। ঘটনাটির কোনো ধরনের সত্যতা অনুসন্ধান করার চেষ্টা করি না। এরপর আরও একটু রং লাগিয়ে আরেক জনের কাছে বলে পুনরায় বিনোদিত হই। এ যেন নাগরিক দায়িত্ব পালন করা।
আমরা আমজনতা নিপীড়িত হতে হতে ক্রমশ ক্ষুদ্র ও সংকীর্ণ হয়ে গেছি। আমাদের সরাসরি স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা (অন্নদাতা বা অর্থদাতা) ছাড়া সকল বাংলাদেশিই আমাদের গণঅপছন্দের। যথার্থ কারণে কারও সমাজবিরোধী কাজ অপছন্দ করবই। আবার কারও উপযুক্ত উন্নতিতেও তাকে অপছন্দ করি। নিজের ব্যর্থতার কারণে অপেক্ষাকৃত সফলদের তো অপছন্দ না করে আর পারা যায় না। এছাড়া গণঅপছন্দের তালিকায় – বিপ্লবী, রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধিদের মতো “কেষ্ট” তো রয়েছেই।
মাঝেমধ্যে এসব অপছন্দের ব্যক্তির নামে নানা কারণে অপরাধ সংঘটনের খবর প্রকাশিত হয়। হতে পারে সেটা আইনভঙ্গ, দুর্নীতি, ইত্যাদি। আমরা তখন হঠাৎ হাতে নতুন কাজ পাই। আমরা মেতে উঠি – তার ব্যক্তিগত চরিত্র কেমন ছিল? প্রথমে আসে – কটা ঘর, কটা বাড়ি, কজন স্ত্রী, কয়টা রক্ষিতা ইত্যাদি। আর সব দুর্নীতির সাথে টাকার সম্পর্ক তো আছেই। তাই তারপরেই আসে – দেশ এবং বিদেশের ব্যাংকে কত টাকা, কত ডলার, কত পাচার ইত্যাদি।
দুর্নীতি কী হয়েছে সেটা গৌণ হয়ে যায়। ক্রমশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে – সেই টাকা নিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি কী করেছেন? তার আত্মীয়রা কী কী শখ পূরণ করেছেন? মেধা অনুযায়ী জল্পনা-কল্পনার সর্বশেষ সীমায় পর্যন্ত পৌঁছে যাই।
এসব করে ইন্দ্রিয়সুখ কিছুটা পাওয়া যায় বটে, কিন্তু তাতে কি কোনো প্রকৃত সমাধান ঘটে? অনেকের কাছে এই সাময়িক আনন্দই যেন চূড়ান্ত প্রাপ্তি—তারা মনে করেন, আলোচনা, সমালোচনা আর নিন্দার মধ্যেই যেন দায়িত্ব শেষ। কিন্তু তারা বুঝতে পারেন না, যেই বিষয়ে অভিযোগ উঠেছে, সেই বিষয়টিকে যদি নিরপেক্ষভাবে বিচার না করা হয়, তাহলে মূল অভিযোগটি ধীরে ধীরে নানা অপ্রাসঙ্গিক কথা, গুজব ও অতিরঞ্জনের ভিড়ে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। ফলত, প্রকৃত সমস্যাটি আড়ালেই থেকে যায় এবং প্রত্যাশিত ন্যায়বিচার আর সামনে আসে না।
বাস্তবে, একটি দুর্নীতির ঘটনাকে কখনোই একক ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা যায় না। সেখানে একজন দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি থাকলেও, তার সঙ্গে যুক্ত থাকে একাধিক স্তর, পরিস্থিতি এবং কাঠামোগত দুর্বলতা। বিশেষ করে যে প্রক্রিয়া বা ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই দুর্নীতি সংঘটিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, সেটিই সবচেয়ে বড় দায় বহন করে। সেই প্রক্রিয়াটি যদি ত্রুটিমুক্ত ও স্বচ্ছ হতো, তাহলে ব্যক্তির ইচ্ছা থাকলেও সে দুর্নীতি করতে পারত না।
কিন্তু আমরা সাধারণত সেই গভীর বিশ্লেষণের পথে হাঁটি না। আমরা ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে গল্প তৈরি করি, তার চরিত্র, জীবনযাপন বা পারিবারিক প্রসঙ্গ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। অথচ প্রয়োজন ছিল—সুনির্দিষ্টভাবে কী ধরনের দুর্নীতি ঘটেছে, কোন ধাপে তা সম্ভব হয়েছে, এবং কোন কোন ব্যবস্থাগত ত্রুটি সেই সুযোগ তৈরি করেছে—এসব বিষয় খুঁজে বের করা। এই বিষয়গুলোকে নিরপেক্ষভাবে বিচার করে সংশোধনের উদ্যোগ না নিলে, একই ধরনের দুর্নীতির পথ আগের মতোই খোলা থাকে।
ফলে যা ঘটে, তা হলো—দুর্নীতি থামে না, কেবল তার রূপ ও ব্যক্তি বদলায়। আমরা একদিকে ক্ষণিকের মানসিক তৃপ্তি পাই, অন্যদিকে বাস্তব পরিবর্তন থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাই। দিনশেষে দেখা যায়, এত আলোচনা, এত উত্তেজনা—সবকিছুর পরও কার্যকর কোনো পরিবর্তন ঘটেনি; থেকে গেছে শুধু ইন্দ্রিয়সুখের ক্ষণস্থায়ী অনুভূতি, কিন্তু সমস্যার মূলটি অক্ষতই রয়ে গেছে।
