রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি ও জাদুঘর | দর্শনিয় স্থান | কুমারখালী উপজেলা

কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নের খোরেশদপুর গ্রামে অবস্থিত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক বাড়িটি শিলাইদহ রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি (Rabindranath Tagore’s Shilaidaha Kuthibari) নামে সুপরিচিত। কুষ্টিয়া শহর থেকে এর দূরত্ব মাত্র ১৫ কিলোমিটার। প্রায় ৩৩ বিঘা আয়তনের এই কুঠিবাড়ির মূল ভবনটি আড়াই বিঘা জমিতে নির্মিত। তিনতলা বিশিষ্ট ভবনে মোট ১৮টি কক্ষ রয়েছে। এর তৃতীয় তলায় ছিল কবির লেখার ঘর, যেখানে বসে তিনি সৃষ্টির জগতে ডুব দিতেন। কুঠিবাড়ির ছাদ থেকে কবি উপভোগ করতেন সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত ও জ্যোৎস্নার অপরূপ দৃশ্য।

Table of Contents

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি ও জাদুঘর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি ও জাদুঘর
শিলাইদহ রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি

 

রবীন্দ্রনাথ ও শিলাইদহ

১৮০৭ সালে কবির পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর এ অঞ্চলের জমিদারি লাভ করেন। পরবর্তীতে ১৮৮৯ থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ নিয়মিত বিরতিতে এখানে অবস্থান করেন। জমিদারির কাজ পরিচালনার পাশাপাশি তিনি এখানেই রচনা করেন বাংলা সাহিত্যের বহু অমূল্য সম্পদ।
বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শিলাইদহে অবস্থানকালে রবীন্দ্রনাথ রচনা করেন—

  • ৩৮টি কবিতা

  • ১০টি নাটক

  • ২টি প্রবন্ধ

  • গীতাঞ্জলীর ৯টি গান

এখান থেকেই তিনি সোনার তরী, চিত্রা, চৈতালী প্রভৃতি গ্রন্থ লিখেন এবং গীতাঞ্জলীর ইংরেজি অনুবাদ শুরু করেন, যা পরবর্তীতে তাঁকে এনে দেয় সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার (১৯১৩)।

জাদুঘরের সংগ্রহ

আজ পুরো ভবনটিই জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষিত। নিচতলা ও দ্বিতীয় তলার ১৬টি কক্ষে প্রদর্শিত হচ্ছে—

  • বাল্যকাল থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কবির জীবনচিত্র

  • শিল্পকর্ম ও ফটোগ্রাফ

  • ব্যবহার্য আসবাবপত্র ও স্মারক

কবির ব্যবহার্য সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে—

  • চঞ্চলাচপলা নামের দুটি স্পিডবোট

  • ৮বেহারা পালকি, কাঠের চেয়ার, সোফাসেট, টি টেবিল

  • পালংক, আরামচেয়ারসহ নানান সামগ্রী

 

শিলাইদহে সাহিত্যকীর্তি

শিলাইদহে অবস্থানকালে রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টি করেছেন সাহিত্যের অমূল্য ভাণ্ডার। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

  • কুঠিবাড়ির পাশের বকুলতলার ঘাটে বসে লেখা “যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে”

  • গড়াই নদীতে নৌকায় বসে লেখা “সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর”

  • শিলাইদহে বসে রচিত “আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ”, “কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি” প্রভৃতি।

প্রায় ৩০ বছরের দীর্ঘ সময়ে (১৮৮৯–১৯২২) কবির অর্ধেকাধিক সাহিত্যকীর্তির জন্ম হয়েছিল শিলাইদহে। তাঁর প্রথম যৌবনের ছোটগল্প থেকে পৌঢ়কালীন রচনাসমূহ পর্যন্ত বহু সৃষ্টিই এই অঞ্চলকে ঘিরে।

রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিচারণ

কবি তাঁর শেষ জীবনে শিলাইদহ স্মরণ করে লিখেছিলেন:

“আমার যৌবন ও পৌঢ় বয়সের সাহিত্যরস-সাধনার তীর্থস্থান ছিল পদ্মা প্রবাহচুম্বিত শিলাইদহ পল্লীতে। সেখানে আমার যাত্রাপথ আজ সহজগম্য নয়, কিন্তু যেই পল্লীর স্নিগ্ধ আমন্ত্রণ সরস হয়ে আছে আজও আমার নিভৃত স্মৃতিলোকে, সেই আমন্ত্রণের প্রত্যুত্তর অশ্রুতিগম্য করুণ ধ্বনিতে আজও আমার মনে গুঞ্জরিত হয়ে উঠছে।”
(১৩৪৬ বঙ্গাব্দ, ১ চৈত্র; শিলাইদহ পল্লী-সাহিত্য সম্মেলন সম্পাদককে লেখা চিঠি)

আরেক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন—

“আগে পদ্মা কাছে ছিল—এখন নদী বহুদূরে সরে গেছে। … একদিন এই নদীর সঙ্গে আমার কত ভাব ছিল। শিলাইদহে যখন আসতুম, তখন দিনরাত্তির ঐ নদীর সঙ্গে আমার আলাপ চলতো।”
(২২ চৈত্র ১৩২৮, ভানুসিংহের পত্রাবলী)

শিলাইদহ কুঠিবাড়ি কেবল একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়, বরং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যসাধনার জীবন্ত সাক্ষ্য। গীতাঞ্জলির মতো অনন্যসাধারণ সৃষ্টি, নোবেল পুরস্কারের গৌরব এবং বাংলার মাটি-মানুষের প্রতি তাঁর অমোঘ টান—সবকিছুই এই কুঠিবাড়িকে করেছে জাতীয় ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ।

 

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি ও জাদুঘর
শিলাইদহ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ির ভিতরে

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ির বর্ণনা :

শিলাইদহ গ্রামের উত্তর প্রান্তে সবুজ শ্যামল পরিবেশে দাঁড়িয়ে আছে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নয়নাভিরাম কুঠিবাড়ি। প্রায় ৩৩ বিঘা জমির মধ্যে আড়াই বিঘা জমির উপর গড়ে ওঠা এই তিনতলা ভবনটির স্থাপত্যশৈলী এককথায় অতুলনীয়। বাড়িটির চারপাশ ঘিরে রয়েছে ঢেউ খেলানো পদ্মার মতো নকশা করা বাউন্ডারী প্রাচীর, যা দূর থেকে চোখে পড়ে বিশেষ সৌন্দর্য এনে দেয়।

কুঠিবাড়িতে মোট ১৮টি কক্ষ, ১৭টি দরজা এবং ৩০টি জানালা রয়েছে। তৃতীয় তলার একটি কক্ষই ছিল কবির লেখার ঘর। এখানেই তিনি গভীর মনোনিবেশে সাহিত্যসাধনা করতেন। ছাদে বসে কবি উপভোগ করতেন সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত ও জ্যোৎস্নাপ্লাবিত প্রকৃতির মোহময় দৃশ্য।

এই কুঠিবাড়ির জানালা দিয়ে রবীন্দ্রনাথ যে দৃশ্য দেখতেন, তা তাঁর কবিতায় ও লেখায় বহুবার ফুটে উঠেছে। আজ জানালা খুললে চোখে পড়ে শুধু পদ্মা নদী, কিন্তু তখন একই সঙ্গে পদ্মা ও গড়াই নদীর মনোরম দৃশ্য ধরা দিত। নীরব দুপুরে বা জ্যোৎস্না রাতে তিনি ঘরে বসেই শুনতেন নদীর কলকল, ছলছল স্রোতের ডাক। নদীর সেই সুর যেন তাঁকে বারবার আহ্বান করত, আর কবিও সুযোগ পেলেই ছুটে যেতেন পদ্মার বুকে কিংবা গড়াইয়ের ঢেউয়ের কাছে, খুঁজে নিতেন প্রকৃতির সান্নিধ্যে সৃষ্টির প্রেরণা।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ির আশপাশ :

শিলাইদহ কুঠিবাড়ির চারপাশে ঝাউ, শিশু ও শালবীথি ঘিরে রেখেছে এক স্বপ্নময় আবহ। কবিগুরুর এই পল্লী নিবাস বহুদূরের পথিককেও আকর্ষণ করে তার অপরূপ মনোমুগ্ধকর শোভায়। ঢেউ-আকৃতির প্রাচীর দিয়ে ঘেরা এই কুঠিবাড়ির পরিবেশ যেন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের মিলনের এক চিরন্তন উদাহরণ।

প্রাচীরের পূর্বদিকে রয়েছে বিশাল ফলবাগান—আম, কাঁঠাল, লিচু, নারকেলসহ নানা ফলের গাছে ভরা। পাশে রয়েছে পূর্ব-পশ্চিমমুখী একটি দীর্ঘ দীঘি, যা বাড়িটির সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দেয়। কুঠিবাড়ির পশ্চিম পাশে রয়েছে আরেকটি শান বাঁধানো বড় পুকুর।

এই পুকুরঘাটের প্রবেশপথের দু’ধারে কবি স্বহস্তে দুটি বকুল গাছ রোপণ করেছিলেন। আজও সেই বকুলগাছের নিবিড় ছায়া আর মৃদুমন্দ সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়ায়। বলা হয়, এই গাছের নিচে বসেই কবিগুরু আপন মনে গান গাইতেন এবং সাহিত্যচর্চায় নিমগ্ন হতেন।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি তৈরীর উপাদান :

শিলাইদহ কুঠিবাড়ি শুধু কবিগুরুর স্মৃতিবিজড়িত স্থানই নয়, এটি এক অনন্য স্থাপত্যকীর্তি। কুঠিবাড়ির ছাদে ব্যবহার করা হয়েছে জাপান থেকে আমদানিকৃত উন্নতমানের টালি, যা সেই সময়ে ছিল এক অভিনব উদ্যোগ। তিনতলা ভবনের অভ্যন্তরে কাঠের তৈরি সিঁড়িটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

রবীন্দ্রনাথের দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর জার্মানি থেকে দক্ষ মিস্ত্রি এনে এক বিশেষ কৌশলে সিঁড়িটি নির্মাণ করান। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সিঁড়িটি কাঠ দিয়ে নির্মিত হলেও তাতে কোনও বীম বা লোহার সাপোর্ট ব্যবহার করা হয়নি। এটি সেই সময়ের স্থাপত্যকলার এক বিরল নিদর্শন।

ভবনের ভেতরের সিঁড়ির পাশাপাশি, তিন তলায় উঠার জন্য বাইরে বিশেষ নকশায় তৈরি একটি প্যাঁচানো লোহার সিঁড়ি স্থাপন করা হয়েছে। গোলাকার এই লোহার সিঁড়ি শুধু ব্যবহারিক প্রয়োজনই পূরণ করেনি, বরং কুঠিবাড়ির সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক মর্যাদাকেও বাড়িয়ে তুলেছে।

 

কি কি আছে বীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি ভিতর :

শিলাইদহ কুঠিবাড়ি কেবল একটি ঐতিহাসিক স্থাপত্য নয়, এটি এখন এক পূর্ণাঙ্গ জাদুঘর, যেখানে কবিগুরুর জীবন, সাহিত্য ও শিল্পকর্মের অমূল্য নিদর্শন সংরক্ষিত আছে। ভবনের ভেতরে প্রবেশ করলে দর্শনার্থীরা যেন সময়ের স্রোত বেয়ে কবির সঙ্গে অতীতে ফিরে যান।

ছবি ও নথিপত্র

  • কুঠিবাড়িতে কবির বাল্যকাল থেকে মৃত্যুশয্যা পর্যন্ত জীবনের নানা পর্যায়ের ছবি সযত্নে সংরক্ষিত আছে।

  • রয়েছে মহাত্মা গান্ধী, ডব্লিউ বি ইয়েটসসহ সমসাময়িক বহু মনীষীর সঙ্গে তোলা ছবি

  • কবির নিজ হাতে লেখা কবিতা, নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পর প্রকাশিত ছবি ও নোবেল সংক্রান্ত সনদপত্রও প্রদর্শিত হচ্ছে।

  • তিনি যেসব নাটকে অভিনয় করেছিলেন, সেসব নাটকের নাম ও ভূমিকার ছবিও সংরক্ষিত আছে।

আসবাবপত্র ও ব্যক্তিগত ব্যবহার্য বস্তু

  • দ্বিতীয় তলার শয়নকক্ষে আছে:

    • একটি পালং (শয্যা)

    • ছোট গোল টেবিল

    • কাঠের আলনা ও আলমারি

  • কবির ব্যবহৃত চঞ্চল ও চপলা নামের দু’টি স্পিডবোট

  • একটি পল্টুন

  • আট-বেহারা ও ১৬-বেহারা পালকি, হাত পালকি

  • কাঠের চেয়ার, আরাম চেয়ার, গদি চেয়ার (২টি), সোফাসেট (২টি), টেবিল (২টি)

  • ঘাস কাটার মেশিন

  • চীনা মাটির তৈরি একটি পুরোনো ওয়াটার ফিল্টার

শিল্পকর্ম ও চিত্রকলা

  • রবীন্দ্রনাথের নিজের হাতে আঁকা ছবি

  • তাঁর নিজের হাতের লেখা কবিতা

  • বিভিন্ন মনীষীর সঙ্গে তোলা গ্রুপ ফটো

এসব সংগ্রহশালা মূলত কুঠিবাড়ির একতলা থেকে দ্বিতীয় তলা পর্যন্ত ৯টি কক্ষে প্রদর্শিত হয়। প্রতিটি কক্ষে রবীন্দ্রনাথের জীবন, সাহিত্য, শিল্পকর্ম ও সমাজচিন্তার বিচিত্র দিক ফুটে উঠেছে।

 

বীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি সেই বকুল তলা:

শিলাইদহ কুঠিবাড়ি শুধু একটি স্থাপত্যকলা নয়, এটি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টির নন্দনভূমি। কুঠিবাড়ির চারপাশে রয়েছে স্নিগ্ধ ফুলের বাগান, উত্তর পাশে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন আমগাছের সারি। আর পশ্চিম পাশে রয়েছে কালের সাক্ষী বকুলতলার ঘাট, যা রবীন্দ্র-সাহিত্যের ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। এখানেই কবি নদীতে স্নান করতেন, বসতেন দীর্ঘ সময়, আর লিখতেন তাঁর অমর সৃষ্টি।

বকুলতলার ঘাটে কবির সৃষ্টিসম্ভার

বকুলতলার ছায়াতলে বসে রচিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের বহু বিখ্যাত গান ও কবিতা। যেমন—

  • “যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে” – কুঠিবাড়ির এই ঘাটে বসেই লেখা।

  • “হে মর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান, অপমান হতে হবে তাদের সবার সমান” – কয়ার দৃশ্যপটে রচিত।

  • “সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর” – গড়াই নদীতে বোটে বসে সৃষ্ট।

  • “আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ”

  • “কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি”

  • “হে নিরূপমা”

  • “হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে ময়ূরের মত নাচেরে”

  • “নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাই আর নাহি রে”

  • “গায়ে আমার পুলক লাগে”

এই সব সৃষ্টিই প্রমাণ করে যে, শিলাইদহের প্রকৃতি—গড়াই নদীর ঢেউ, পদ্মার বিস্তার, বকুলতলার শান্ত ছায়া—কবিগুরুর সৃষ্টিশীলতাকে অবিরাম উদ্বুদ্ধ করেছে।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি থেকে একটু আগালেই শিলাইদহ নৌকাঘাট :

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি থেকে অল্প কিছুটা এগোলেই চোখে পড়ে শিলাইদহ নৌকাঘাট। এটি শুধু একটি যাতায়াতের কেন্দ্রই নয়, বরং কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই অঞ্চলের বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও মানুষের মিলনস্থল হিসেবে।

একসময় এই নৌকাঘাটের মাধ্যমে কুষ্টিয়া শহর ও পাবনা শহরের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হতো। পদ্মার এই ঘাট দিয়ে চলত নিত্যযাত্রী, কৃষিজ পণ্য, ব্যবসা-বাণিজ্যের বহর। ফলে শিলাইদহ ধীরে ধীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে।

বর্তমানে শিলাইদহ নৌকাঘাট শুধুমাত্র ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র নয়, এটি পর্যটক ও দর্শনার্থীদের জন্যও এক বিশেষ আকর্ষণের স্থান। রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি দেখতে আসা ভ্রমণকারীরা এখান থেকেই পদ্মার ঢেউখেলানো বুকে নৌকাভ্রমণে বের হন। সন্ধ্যার জ্যোৎস্না কিংবা ভোরের সূর্যোদয়ে এই নৌকাঘাটের দৃশ্য এক অনন্য মাধুর্য ছড়িয়ে দেয়।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি ও জাদুঘর | দর্শনিয় স্থান | কুমারখালী উপজেলা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ির গীতাঞ্জলি ভবন, শিলাইদহ

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি ও জাদুঘরে ঢোকার সময়সূচী ও প্রবেশ টিকেটের মূল্য :

শিলাইদহে অবস্থিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি ও জাদুঘর দর্শনার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে উন্মুক্ত থাকে। এখানে প্রবেশের সময়সূচী ও টিকেটের মূল্য নিচে তুলে ধরা হলো—

খোলার সময়সূচী

  • গ্রীষ্মকালীন সময় (এপ্রিল–সেপ্টেম্বর): প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত।

  • শীতকালীন সময় (অক্টোবর–মার্চ): প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত।

  • মধ্যাহ্ন বিরতি: প্রতিদিন দুপুর ১টা থেকে ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত জাদুঘর বন্ধ থাকে।

  • সাপ্তাহিক ছুটি: রবিবার পূর্ণদিন বন্ধ।

  • সোমবার: দুপুর ২টা থেকে খোলা হয়।

🎟️ প্রবেশ টিকেটের মূল্য

  • সাধারণ দর্শনার্থী: জনপ্রতি ১৫ টাকা

  • মাধ্যমিক পর্যায়ের ছাত্রছাত্রী: ৫ টাকা

  • সার্কভুক্ত দেশের পর্যটক: ৫০ টাকা

  • অন্যান্য বিদেশি পর্যটক: ১০০ টাকা

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়িতে মেলা:

২৫ বৈশাখ, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিনকে ঘিরে প্রতিবছর শিলাইদহের কুঠিবাড়ি সাজে এক বিশেষ উৎসবের আমেজে। এদিন কুঠিবাড়ি প্রাঙ্গণ কেবল একটি ঐতিহাসিক স্মৃতিসৌধ নয়, রূপ নেয় এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায়।

মেলার পরিবেশ
এই দিনে কুঠিবাড়িকে ঘিরে বসে বিশাল গ্রামীণ মেলা। চারপাশে মানুষের ঢল নামে—কুষ্টিয়া ও আশপাশের গ্রাম থেকে শুরু করে দেশের নানা প্রান্ত এমনকি বিদেশ থেকেও আসেন কবিপ্রেমী, সাহিত্যিক ও স্বনামধন্য ব্যক্তিবর্গ। হাজারো দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো কুঠিবাড়ি চত্বর।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
কুঠিবাড়ির ভেতরে স্থায়ীভাবে তৈরি দুটি মঞ্চে চলে নানা আয়োজন। কবিগুরুর জন্মবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে টানা তিনদিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা অনুষ্ঠিত হয়। এখানে থাকে রবীন্দ্রসঙ্গীত, আবৃত্তি, আলোচনা সভা, নাটক, নৃত্য ও শিল্প প্রদর্শনী। দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক ও গুণীজন অংশগ্রহণ করেন এই উৎসবে।

কুঠিবাড়ির সাজসজ্জা
মেলার আগেই ফ্যাকাসে দেয়ালে পড়ে চুনকাম, সজ্জিত হয় পুরো প্রাঙ্গণ। চারদিকে রঙিন আলোকসজ্জা ও শোভাযাত্রায় আলোকোজ্জ্বল হয়ে ওঠে শিলাইদহ। পদ্মা তীরবর্তী কুঠিবাড়ি যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায়।

মানুষের মিলনমেলা
এই অনুষ্ঠান কেবল সাংস্কৃতিক নয়, সামাজিক এক মহোৎসব। এখানে এসে সাধারণ মানুষ ও কবিপ্রেমীরা একসঙ্গে মিশে যান আনন্দ-উচ্ছ্বাসে। কুঠিবাড়ির জন্মোৎসবকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতিও নব রূপে জেগে ওঠে।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি যাওয়ার উপায় :

কুষ্টিয়া শহর থেকে শিলাইদহ রবীন্দ্র কুঠিবাড়ির দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার। খুব সহজেই যাতায়াতের সুযোগ রয়েছে।

🚙 স্থানীয় পরিবহন

  • কুষ্টিয়া শহর থেকে অটোরিকশা, সিএনজি, ইজিবাইক, ভ্যান ও টেম্পোতে যাত্রা করা যায়।

  • ভাড়া তুলনামূলক সাশ্রয়ী এবং নিয়মিত যাতায়াত ব্যবস্থা থাকায় ভ্রমণকারীদের জন্য বেশ সুবিধাজনক।

🚌 দূরপাল্লার যাত্রীদের জন্য

  • ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা কিংবা দেশের অন্য যেকোনো জেলা থেকে বাসযোগে প্রথমে কুষ্টিয়া শহরে পৌঁছাতে হবে।

  • সেখান থেকে উপরোক্ত স্থানীয় পরিবহনে সরাসরি শিলাইদহ কুঠিবাড়ি যাওয়া যায়।

🚤 নদীপথ (ঐতিহাসিক রুট)

  • একসময় নদীপথে পদ্মা ও গড়াই নদী পাড়ি দিয়ে কুঠিবাড়িতে পৌঁছানো হতো। এখনো ইচ্ছা করলে স্থানীয় নৌকা বা ট্রলারে ভ্রমণ করে কুঠিবাড়ির পথে গ্রামীণ প্রকৃতি ও নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি ও জাদুঘর নিয়ে গুরুকুল লাইভ এর প্রতিবেদন:

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ির ইতিহাস :

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পারিবারিক ইতিহাস, জমিদারী পরিচালনা এবং শিলাইদহ কুঠিবাড়ির বিকাশকে ঘিরে এক সমৃদ্ধ কাহিনি জড়িয়ে আছে।

ঠাকুর পরিবারের জমিদারী উত্তরাধিকার

রবীন্দ্রনাথের পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ভারতের উড়িষ্যায় তিনটি এবং তৎকালীন পূর্ববাংলায় তিনটি জমিদারী রেখে মৃত্যুবরণ করেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—

  • নদিয়া (বর্তমান কুষ্টিয়া) জেলার বিরাহিমপুর পরগণা (সদর শিলাইদহ),

  • পাবনা জেলার শাহজাদপুর পরগণা (বর্তমানে সিরাজগঞ্জ জেলা),

  • রাজশাহী জেলার কালীগ্রাম পরগণা (সদর পতিসর; বর্তমান নওগাঁ জেলা)।

দ্বারকানাথ ঠাকুর ১৮৩৩ সালে নাটোরের রাজার কাছ থেকে বিরাহিমপুর পরগণা ক্রয় করেন। পরবর্তীতে পরিবারের মধ্যে জমিদারী পরিচালনার দায়িত্ব বণ্টন করা হলে শিলাইদহের কাছারিতে বসে এর দেখাশোনার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি ও জাদুঘর | দর্শনিয় স্থান | কুমারখালী উপজেলা
শিলাইদহ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি প্রাঙ্গনে সরোবর
রবীন্দ্রনাথের জমিদারী কার্যক্রমের সূচনা

কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর উল্লেখ করেছেন—

“আমার পিতার উপর আদেশ হল যে তাঁকেই জমিদারী পরিচালনা করতে হবে এবং কলকাতা ছেড়ে বিরাহিমপুরের কাছারি শিলাইদহে গিয়ে বাস করতে হবে।”

কিশোর বয়সেই রবীন্দ্রনাথ প্রথমবার পিতামহের সাথে শিলাইদহে আসেন। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি জমিদারীর কাজে যোগ দেন ২ আষাঢ় ১২৯৬ বঙ্গাব্দ (১৫ জুন ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দ)। তখন থেকে তিনি জমিদারীর হিসাব-নিকাশ ও মাঠপর্যায়ের তদারকি শুরু করেন। একই বছরের অগ্রহায়ণে জমিদারী পরিদর্শনের পূর্ণ দায়িত্ব তাঁর উপর অর্পিত হয়।

১৮৯৬ সালের ৮ আগস্ট, পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে সমগ্র সম্পত্তির সর্বময় কর্তৃত্ব রবীন্দ্রনাথের হাতে তুলে দেন। এভাবেই ১৮৮৯ সালে শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে জমিদার হিসাবে তাঁর আনুষ্ঠানিক অভিষেক হয়।

জমিদারীর পরবর্তী ভাগাভাগি ও শেষ সফর

পরবর্তীতে ঠাকুর পরিবারের জমিদারী ভাগ হলে বিরাহিমপুর (শিলাইদহসহ) অংশটি রবীন্দ্রনাথের ভাতুষ্পুত্র সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর পান। তাঁর অনুরোধেই রবীন্দ্রনাথ শেষবারের মতো ১৯২৩ সালে শিলাইদহে আসেন। একই বছর তিনি সপরিবারে কুঠিবাড়ি ছেড়ে যান।

নীলকুঠি থেকে কুঠিবাড়ি

দ্বারকানাথ যখন জমিদারী কেনেন তখন বাংলায় নীলকরদের দাপট চলছিল। শিলাইদহে মিস্টার শেলী নামে এক নীলকর বাস করতেন। তাঁর মৃত্যুর পর বাসভবনটি দ্বারকানাথের দখলে আসে। কিন্তু পদ্মার খামখেয়ালী ভাঙনে পুরোনো নীলকুঠি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার শঙ্কা দেখা দেয়। ফলে সেটি ভেঙে ফেলে দূরে নতুন করে কাছারি ও কুঠিবাড়ি নির্মাণ করা হয়, যা আজকের শিলাইদহ কুঠিবাড়ি

রথীন্দ্রনাথ তাঁর স্মৃতিচারণায় লিখেছেন—

“বাবা যখন আমাদের নিয়ে শিলাইদহে গেলেন তখন এই নীলকুঠি নেই—তার ধ্বংসাবশেষই দেখতুম নদীর ধারে বেড়াতে গেলে। পদ্মা খেয়ালী হয়ে পাড় ভাঙছিল, তাই আগেই বাড়িটি ভেঙে ফেলা হয়। আশ্চর্য এই যে, পুরনো কুঠিটা ভাঙা হলো বটে, কিন্তু নদী আর গেট পর্যন্ত আসেনি। যতদিন আমরা শিলাইদহে ছিলাম, সেই ভগ্নাবশেষ অটুট ছিল।”

 

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি ও জাদুঘর | দর্শনিয় স্থান | কুমারখালী উপজেলা - কুঠিবাড়ির সামনের সড়কে পর্যটকদের জন্য উপহারের দোকান
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ির সামনের সড়কে পর্যটকদের জন্য উপহারের দোকান

 

বর্তমান শিলাইদহ কুঠিবাড়ির নির্মাণ

বর্তমান শিলাইদহ কুঠিবাড়ির নির্মাণকাল ১৮৯২ সাল। এর দায়িত্ব ছিল কবির জ্যেষ্ঠভ্রাতা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের তৃতীয় পুত্র নীতীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপর। পরবর্তীতে কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর সংস্কার করে ভবনটিকে বর্তমান রূপে পরিণত করেন।

রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে অবস্থানকালে অধিকাংশ সময় কাটাতেন তাঁর প্রিয় বজরায় পদ্মার বুকে। সেখানেই তিনি নিভৃতে সাহিত্য সাধনা করতেন। কুঠিবাড়ির দোতলায় পূর্বদিকের বড় কামরাটিতে ছিল তাঁর শয়নকক্ষ। আর স্ত্রীবিয়োগের পর তৃতলায় একটি প্রকোষ্ঠ ও স্নানঘর নির্মাণ করা হয়। সেই ঘরেই কবি সাহিত্য সাধনা চালিয়ে যান এবং এখানেই জন্ম নেয় ইংরেজি গীতাঞ্জলীর অনুবাদ, যা তাঁকে এনে দেয় নোবেল পুরস্কার।

 

কুঠিবাড়ির সাথে জড়িত নানা স্মৃতি

কবি শুধু সাহিত্যচর্চাই করেননি, তাঁর কর্মকাণ্ডে স্থানীয় অর্থনীতি ও কৃষি পুনর্জাগরণের ইতিহাসও যুক্ত। নীলচাষের আগুনে ধ্বংসপ্রাপ্ত কুষ্টিয়ার প্রাচীন রেশমচাষ ও বয়নশিল্পকে তিনি পুনরুজ্জীবিত করেন। রাজশাহীর বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ের সহযোগিতায় কুঠিবাড়ির একটি ঘরে পরীক্ষামূলকভাবে রেশম গুটির চাষ শুরু করেন।

রসিক ভঙ্গিতে তিনি লিখেছিলেন:

“শ্রীযুক্ত অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় মহাশয় কুক্ষণে ২০টি রেশমের গুটি আমার ঘরে ফেলিয়া গিয়াছিলেন। আজ দুই লক্ষ ক্ষুধিত কীটকে দিবারাত্রি আহার এবং আশ্রয় দিতে ব্যতিব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছি— দশ বারোজন লোক অহর্নিশি তাহাদের ডালা সাফ করা ও গ্রাম-গ্রামান্তর হইতে পাতা আনার কার্যে নিযুক্ত রহিয়াছে। লরেন্স জ্ঞান-আহার-নিদ্রা পরিত্যাগ করিয়া কীট সেবায় নিযুক্ত। আমাকে সে দিনের মধ্যে দশবার করিয়া টানাটানি করিয়া প্রায় পাগল করিয়া তুলিল।”

আধুনিক কৃষি প্রবর্তনের কেন্দ্র

শিলাইদহে বসেই কবি প্রথম আলুচাষ প্রবর্তন করেন এবং উন্নত জাতের ধান ও ভুট্টা চাষের উদ্যোগ নেন। কৃষির আধুনিকায়ন নিয়ে তাঁর আশা-হতাশা মিশ্রিত বক্তব্য পাওয়া যায় তাঁর লেখায়:

“আমার চাষ-বাসের কাজও মন্দ চলিতেছে না। আমেরিকান ভুট্টার বীঝ আনাইয়াছিলাম— তাহার গাছপালা দ্রুত বাড়িয়া উঠিতেছে। মাদ্রাজী সরু ধান রোপন করাইয়াছি, তাহাতেও কোনো অংশে নিরাশ হইবার কারণ দেখিতেছি না।”
(চিঠিপত্র, ৫ম খণ্ড)

শান্তিনিকেতনের সাথে যোগসূত্র

কুঠিবাড়ির ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো শান্তিনিকেতনের শিক্ষা কার্যক্রমের স্থানান্তর। সে সময় শান্তিনিকেতনের এক অধ্যাপক বসন্ত রোগে মৃত্যুবরণ করলে আবাসিক ছাত্রদের সেখানে রাখা নিরাপদ মনে হয়নি। ফলে ১৩১০ বঙ্গাব্দে (প্রায় ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে) রবীন্দ্রনাথ অল্প সময়ের জন্য শিক্ষার্থীদের শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে নিয়ে আসেন। প্রায় এক বছর ধরে (১৩১১ সালের বৈশাখ পর্যন্ত) শিলাইদহে শান্তিনিকেতনের পাঠদান চলেছিল।

 

 

কুঠিবাড়ির সরোবরে রক্ষিত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক ব্যবহৃত বজরার অনুকৃতি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ির সরোবরে রক্ষিত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক ব্যবহৃত বজরার অনুকৃতি

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু সাহিত্য ও শিল্পের সাধকই নন, তিনি ছিলেন একজন প্রজা-হিতৈষী জমিদার। জমিদারী তত্ত্বাবধানকালে প্রজাদের শিক্ষা, চিকিৎসা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতি তিনি বিশেষ মনোযোগী ছিলেন।

চিকিৎসা উদ্যোগ

প্রথমে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলাইদহ জমিদারীর প্রজাদের চিকিৎসার জন্য কাচারি বাড়িতে আটচালা বিশিষ্ট একটি দাতব্য কবিরাজি চিকিৎসালয় স্থাপন করেছিলেন। বরিশালের খোসালে চন্দ্র মজুমদার ছিলেন এর প্রথম কবিরাজ। পরে এটি হোমিও চিকিৎসালয় রূপে প্রজা-সাধারণকে সেবা দিতে থাকে।

১৮৮৯ সালে জমিদার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পারেন, আধুনিক চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা। তাই ১৯০৮ সালে তিনি চিকিৎসালয়টি কাচারি বাড়ি থেকে স্থানান্তর করে একটি পাকা ভবনে অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। কুঠিবাড়ি থেকে প্রায় আধ কিলোমিটার দূরে প্রতিষ্ঠিত এ হাসপাতালের নামকরণ হয় ‘দি মহর্ষি চ্যারিটেবল ডিসপেন্সারি’।

অর্থসংগ্রহ ও প্রজাদের অংশগ্রহণ

চিকিৎসাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় তিনি আর্থিক সংকটে পড়েন। এজন্য তিনি প্রজাদের কাছ থেকে স্বেচ্ছাচাঁদা সংগ্রহের ব্যবস্থা করেন। এটি বাধ্যতামূলক ছিল না। যে প্রজা ২৫ টাকা চাঁদা দিত, তার বার্ষিক খাজনা থেকে সমপরিমাণ মওকুফ করা হতো। এভাবে প্রজাদের সক্রিয় অংশগ্রহণে চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে ওঠে।

চিকিৎসক নিয়োগ

সে সময় এমবিবিএস ডাক্তার মফস্বল এলাকায় পাওয়া ছিল দুরূহ ব্যাপার। সাধারণত এলএমএফ (Licentiate of Medical Faculty) ডিগ্রিধারী চিকিৎসকরাই সেবা দিতেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রতিষ্ঠিত ডিসপেন্সারিতে ডাক্তার আগর লাল মজুমদার (এলএমএফ)-কে চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ দেন।

কবির অনুভূতি

রবীন্দ্রনাথ নিজেই লিখেছিলেন:

“এই ডাক্তারখানা আমাদের জমিদারি এবং তার চতুর্পাশ্বের লোকের বিশেষ উপকার হয়েছে। এই কথা যখন শুনতে পাই তখন সকল অভাবের দুঃখের উপর ঐ সুখটাই বড়ো হয়ে ওঠে। বিরাহিমপুর প্রজাহিতের এই একটিমাত্র কার্যে সফল হয়েছি। … আমাদের যা কিছু দেনা হয়েছে তা যদি আমাদের জমিদারির এইরকম কাজের জন্য হতো, আমি এক মুহূর্তের জন্য শোক করতুম না।”