রাগমালা পেইন্টিং । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীতের সুর যখন চিত্রশিল্পের রূপ ধারণ করে, তখন তাকে বলা হয় ‘রাগমালা’। এটি বিশ্বের শিল্প ইতিহাসে এক বিরল উদাহরণ, যেখানে একটি বিমূর্ত বিষয় (সংগীত) দৃশ্যমান শিল্পের (পেইন্টিং) মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। রাগমালা চিত্রকর্ম মূলত কবিতা, সংগীত এবং চিত্রকলার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ।

হিন্দোল রাগ। মালওয়া, সময়কাল আনুমানিক ১৬৫০ খ্রিস্টাব্দ। ভারত কলা ভবন।
হিন্দোল রাগ। মালওয়া, সময়কাল আনুমানিক ১৬৫০ খ্রিস্টাব্দ। ভারত কলা ভবন।

Table of Contents

১. রাগমালা পেইন্টিংয়ের ইতিহাস ও পটভূমি

রাগমালা চিত্রকলা হলো ভারতীয় সংস্কৃতির এক অনন্য বিমূর্ত প্রকাশ, যেখানে সুরের লহরী তুলির আঁচড়ে রূপ লাভ করেছে। এর উদ্ভব ও বিবর্তনের ইতিহাস মূলত একটি দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যাত্রার ফসল।

উৎপত্তি ও কালানুক্রম:

রাগমালা চিত্রকলার প্রাথমিক অঙ্কুরোদগম ঘটেছিল মধ্যযুগীয় ভারতে, আনুমানিক ১৫শ শতাব্দীর শেষভাগে। তবে এর স্বর্ণযুগ বলা হয় ১৬শ থেকে ১৯শ শতাব্দীকে। এই চারশ বছর ধরে ভারতের বিভিন্ন রাজদরবারে এটি বিকশিত হয়েছে। মূলত বিজাপুরি ও রাজস্থানি ঘরানা থেকে এর প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলেও পরবর্তীকালে এটি পাহাড়ি এবং মুঘল শৈলীর সংমিশ্রণে এক বিশ্বজনীন রূপ লাভ করে।

দার্শনিক ও তাত্ত্বিক ভিত্তি:

রাগমালা পেইন্টিংয়ের মূল ভিত্তি নিহিত রয়েছে প্রাচীন ভারতীয় সংগীতশাস্ত্র ও রসতত্ত্বের ওপর। ভারতীয় সংগীতে বিশ্বাস করা হয় যে, প্রতিটি রাগের একটি সুনির্দিষ্ট ‘ব্যক্তিত্ব’ বা ‘দেবত্ব’ রয়েছে। প্রতিটি রাগের জন্য নির্ধারিত ছিল নির্দিষ্ট সময় (প্রহর), ঋতু এবং মানসিক অবস্থা বা ‘মেজাজ’ (Mood)।

ধ্যান-মন্ত্র ও কবিতা:

১০ম থেকে ১৩শ শতাব্দীর মধ্যে সংগীত রত্নাকর বা পরবর্তী সময়ে দামোদর পণ্ডিতের মতো সংগীতজ্ঞরা রাগের গুণাবলি বর্ণনা করার জন্য ‘ধ্যান’ (Description) বা স্তোত্র রচনা করেন। এই ধ্যানে রাগকে একজন মানুষ বা দেবীর রূপে কল্পনা করা হতো। উদাহরণস্বরূপ, রাগিণী তোড়িকে কল্পনা করা হতো এক সুন্দরী নারী হিসেবে, যিনি নির্জন বনে হরিণদের সুর শোনাচ্ছেন। এই কবিতা বা ধ্যানগুলোই ছিল চিত্রশিল্পীদের জন্য ‘ব্লু-প্রিন্ট’ বা চিত্রনাট্য, যা তারা তুলিতে ফুটিয়ে তুলতেন।

বিবর্তন ও শৈলীগত রূপান্তর:

আদি পর্যায়:

শুরুর দিকে পশ্চিম ভারতীয় বা জৈন পুঁথিচিত্রের প্রভাবে এই চিত্রকলা ছিল কিছুটা রৈখিক ও দ্বিমাত্রিক। মেওয়ার ও মালব অঞ্চলে এই আদি শৈলীর চরম বিকাশ ঘটে।

মুঘল ও ডেকানি প্রভাব:

১৬শ শতাব্দীতে মুঘল সম্রাটদের পৃষ্ঠপোষকতায় এই শিল্পে পারস্যীয় সূক্ষ্মতা, রঙের বৈচিত্র্য এবং রাজকীয় আভিজাত্য যুক্ত হয়। সম্রাট আকবরের সময় থেকে মুঘল স্টাইলে রাগমালা আঁকা শুরু হয়, যেখানে রাগের পৌরাণিক বর্ণনার চেয়ে তার মানবিক আবেগ ও চারপাশকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো।

আঞ্চলিক বিস্তৃতি:

১৭শ শতাব্দী থেকে এটি ডেকানি (দাক্ষিণাত্য) সুলতানদের দরবারে এবং পরবর্তীতে পাহাড়ি অঞ্চলে (যেমন কাংড়া ও বাসোহলি) ছড়িয়ে পড়ে। পাহাড়ি রাগমালাগুলোতে বিশেষ করে রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলার মাধ্যমে রাগের ভক্তি ও শৃঙ্গার রসকে তুলে ধরা হতো।

রাগ ভৈরব-এর বিভিন্ন শৈল্পিক চিত্রায়ন (বাম থেকে ডানে) - এলাহাবাদ মিউজিয়াম থেকে বিকানির শৈলী; ইয়েল ইউনিভার্সিটি কালেকশন থেকে মুঘল শৈলী; ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়াম (লন্ডন) থেকে হায়দ্রাবাদ শৈলী।
রাগ ভৈরব-এর বিভিন্ন শৈল্পিক চিত্রায়ন (বাম থেকে ডানে) – এলাহাবাদ মিউজিয়াম থেকে বিকানির শৈলী; ইয়েল ইউনিভার্সিটি কালেকশন থেকে মুঘল শৈলী; ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়াম (লন্ডন) থেকে হায়দ্রাবাদ শৈলী।

২. রাগমালা পেইন্টিং এর ঘরানা:

রাগমালা চিত্রকলার বিবর্তন কেবল সময়ের সাথে নয়, বরং ভারতের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক পটভূমি অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন ‘স্কুল’ বা ঘরানায় বিকশিত হয়েছিল। প্রতিটি ঘরানার নিজস্ব রং, রেখা এবং আবেগের প্রকাশভঙ্গি ছিল অনন্য।

রাজস্থানি ঘরানা (Rajasthan School): সুর ও বীরত্বের সংমিশ্রণ:

রাজস্থানি রাগমালা ছিল এই শিল্পের আদি এবং সবচেয়ে শক্তিশালী কেন্দ্র। মেওয়াড়, বুন্দি, কোটা, মারওয়াড় এবং জয়পুরের রাজপুত রাজারা ছিলেন এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক। এই ঘরানায় উজ্জ্বল ও গাঢ় রঙের (যেমন লাল, হলুদ ও নীল) প্রাধান্য দেখা যায়। এতে রাগের আধ্যাত্মিক ও মানবিক উভয় রূপই ফুটে উঠত। এই ঘরানায়  হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী, বিশেষ করে শিব-পার্বতী এবং শাশ্বত প্রেমের আবহ প্রবল। এদের কাজে রাজপুত সংস্কৃতির বীরত্ব ও আভিজাত্য এই চিত্রগুলোতে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠত। বুন্দি ও কোটা শৈলীর চিত্রগুলোতে ঘন অরণ্য ও প্রকৃতির নিপুণ বর্ণনা পাওয়া যায়।

পাহাড়ি ঘরানা (Pahari School): লিরিক্যাল সৌন্দর্য ও আধ্যাত্মিকতা:

হিমালয়ের পাদদেশে কাংড়া, বাসোহলি, গুলের এবং কুলু অঞ্চলে ১৭শ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে এই শৈলী বিকশিত হয়। একে বলা হয় রাগমালা শিল্পের সবচেয়ে কাব্যিক ও সুকুমার প্রকাশ। পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ—নদী, পাহাড় এবং মেঘের বিচিত্র খেলা এই চিত্রে প্রধান উপজীব্য। বাসোহলি শৈলীতে রঙের তীব্রতা এবং কাংড়া শৈলীতে রেখার কোমলতা ও লাবণ্য নজর কাড়ে। পাহাড়ি রাগমালায় রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলার মাধ্যমে রাগের ‘শৃঙ্গার রস’ (Romance) এবং ‘ভক্তি রস’ ফুটিয়ে তোলা হতো। এখানে রাগের মানবিক রূপটি অনেক বেশি কোমল ও সংবেদনশীল।

মুঘল ও ডেকানি ঘরানা (Mughal & Deccani School): রাজকীয় জাঁকজমক ও সূক্ষ্মতা:

সম্রাট আকবরের সময় থেকে মুঘল রাজদরবারে রাগমালা আঁকার চল শুরু হয়। অন্যদিকে দাক্ষিণাত্যের বিজাপুর, গোলকোন্ডা ও আহমেদনগর সুলতানদের অধীনে ডেকানি শৈলী বিকশিত হয়। এতে পারস্যীয় অলঙ্করণ ও ভারতীয় বিষয়ের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটে। মুঘল রাগমালাগুলোতে অলঙ্কৃত বর্ডার (Margin) এবং সোনার রঙের সূক্ষ্ম কাজ দেখা যায়। এখানে রাগের মেজাজ বোঝাতে দরবারী পরিবেশ, শিকারের দৃশ্য বা বাগানকে বেছে নেওয়া হতো। দাক্ষিণাত্যের এই চিত্রগুলোতে রঙের এক বিশেষ গভীরতা এবং কিছুটা রহস্যময় আবহ থাকত। বিজাপুরি রাগমালাগুলোতে পারস্য ও ইউরোপীয় প্রভাবের সংমিশ্রণে এক স্বতন্ত্র আভিজাত্য ফুটে উঠত।

ঘরানাগুলোর তুলনামূলক পার্থক্য:

বৈশিষ্ট্যরাজস্থানি ঘরানাপাহাড়ি ঘরানামুঘল ও ডেকানি ঘরানা
প্রধান রংউজ্জ্বল লাল, হলুদ ও নীলপ্যাস্টেল ও প্রাকৃতিক রংসোনা, রূপা ও গাঢ় পারস্য নীল
আবহলোকজ ও বীরত্বপূর্ণকাব্যিক ও রোমান্টিকরাজকীয় ও আভিজাত্যপূর্ণ
প্রকৃতিপ্রতীকী অরণ্য ও প্রাণীবিস্তারিত পাহাড় ও মেঘজ্যামিতিক বাগান ও প্রাসাদ

 

ললিত রাগিনী, সাহিবদিন অঙ্কিত রাগামালা থেকে নেওয়া একটি ফোলিও। মেওয়ার, ১৬২৮ খ্রিস্টাব্দ। ন্যাশনাল মিউজিয়াম, নিউ দিল্লি।
ললিত রাগিনী, সাহিবদিন অঙ্কিত রাগামালা থেকে নেওয়া একটি ফোলিও। মেওয়ার, ১৬২৮ খ্রিস্টাব্দ। ন্যাশনাল মিউজিয়াম, নিউ দিল্লি।

 

৩. বিষয়বস্তু: কোন কোন রাগের ওপর চিত্রায়ন হতো?

রাগমালা পেইন্টিংয়ের প্রাণ হলো এর ‘রাগ-রাগিণী’ শ্রেণীবিন্যাস। প্রাচীন ভারতীয় সংগীততত্ত্ব অনুযায়ী, রাগগুলোকে কেবল সুর হিসেবে নয়, বরং একটি ‘পরিবার’ হিসেবে কল্পনা করা হতো। এই পারিবারিক কাঠামোটিই চিত্রশিল্পীরা তাঁদের ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলতেন।

রাগমালা পদ্ধতিতে সাধারণত ৩৬টি বা ৪২টি চিত্র নিয়ে একটি ‘মালা’ বা সিরিজ তৈরি করা হতো। এই পদ্ধতিতে ৬টি প্রধান ‘রাগ’ এবং তাদের সাথে সম্পর্কিত ‘রাগিণী’দের চিত্রিত করা হতো। নিচে রাগমালা চিত্রের সেই ৩৬টি রাগের (৬টি রাগ ও ৩০টি রাগিণী) শ্রেণীবিন্যাস ও তাদের চিত্রায়নের বৈশিষ্ট্য দেওয়া হলো:

রাগ-রাগিণী পদ্ধতি: সুরের পারিবারিক কাঠামো

রাগমালা চিত্রে সাধারণত ৬টি প্রধান পুরুষ ‘রাগ’ কল্পনা করা হয় এবং প্রতিটি রাগের অধীনে ৫টি করে স্ত্রী ‘রাগিণী’ নির্দিষ্ট থাকে। এই মোট ৩৬টি চিত্র নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘রাগমালা’ সিরিজ গঠিত হয় (তবে কোনো কোনো পদ্ধতিতে ৬টি রাগিণীর হিসেবে মোট ৪২টি চিত্রও দেখা যায়)।

১. রাগ ভৈরব (ভোরের সুর)

ভৈরবকে আদি রাগ এবং মহাদেবের স্বরূপ মনে করা হয়।

  • চিত্রায়ন: শিবের বেশে যোগী, শ্মশানে উপবিষ্ট বা নন্দীর ওপর সওয়ার। শরীরে ভস্ম মাখা এবং গলায় সাপের মালা।
  • পাঁচ রাগিণী: ভৈরবী, নট, মালশ্রী, পটমঞ্জরী ও ললিত।
  • বৈশিষ্ট্য: ভৈরবী রাগিণীর চিত্রে সাধারণত দেখা যায় এক তরুণী শিবলিঙ্গের সামনে ধ্যানে মগ্ন বা পূজা করছেন।

২. রাগ মালকোশ (গভীর রাতের সুর)

একে বীর ও গম্ভীর প্রকৃতির রাগ হিসেবে দেখা হয়।

  • চিত্রায়ন: একজন সুঠামদেহী রাজপুত্র বা বীর যোদ্ধা, যিনি সিংহাসনে বসে আছেন এবং চারপাশে পরিচারিকারা চামর ঢুলাচ্ছে। অনেক সময় তাঁর হাতে একটি খোলা তলোয়ার বা পানপাত্র দেখা যায়।
  • পাঁচ রাগিণী: গৌরী, খাম্বাবতী, মালবী, রামকলি ও গুণকলি।
  • বৈশিষ্ট্য: রাগিণী খাম্বাবতীর চিত্রে দেখা যায় এক নারী ব্রহ্মার পূজা করছেন।

৩. রাগ হিন্দোল (বসন্তের সুর)

এটি আনন্দ ও প্রেমের প্রতীক।

  • চিত্রায়ন: দোলনায় (হিন্দোল) বসে থাকা কামদেব বা কৃষ্ণ। চারপাশে গোপিনীরা তাঁকে আবির বা ফাগুন দিয়ে দোলা দিচ্ছে। বসন্তের ফুলে ভরা বাগান এই চিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
  • পাঁচ রাগিণী: বিলাবল, তোড়ি, দেশাখ, দেবগিরি ও বরাটী।
  • বৈশিষ্ট্য: রাগিণী তোড়ির চিত্রটি বিশ্ববিখ্যাত। এতে এক বিরহী নারী নির্জন বনে বীণা বাজাচ্ছেন এবং একটি হরিণ তাঁর সুরের মোহে কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।

৪. রাগ দীপক (গ্রীষ্মের সুর)

তেজ এবং অগ্নির প্রতীক।

  • চিত্রায়ন: একজন যুবক বা দেবতুল্য পুরুষ যার মাথায় বা হাতে প্রদীপ জ্বলছে। ঘরের চারপাশ আলোকোজ্জ্বল। লোকগাথা অনুযায়ী, এই রাগ গাইলে প্রদীপ নিজে থেকেই জ্বলে ওঠে—চিত্রে সেই উত্তাপ ফুটিয়ে তোলা হয়।
  • পাঁচ রাগিণী: ধানাশ্রী, বসন্ত, কামোদ, গুজরী ও কানাড়া।
  • বৈশিষ্ট্য: রাগিণী ধানাশ্রীর চিত্রে বিরহী নারী তাঁর প্রেমিকের ছবি আঁকছেন বা চিঠি লিখছেন এমন দৃশ্য দেখা যায়।

৫. রাগ শ্রী (গোধূলি বেলার সুর)

এটি রাজকীয় ঐশ্বর্য ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীক।

  • চিত্রায়ন: সিংহাসনে বসা এক ঋষিকল্প রাজা বা নারায়ণ। তাঁর সামনে কিন্নররা গান গাইছে। গোধূলির সোনালি আভা এই চিত্রের প্রধান রং।
  • পাঁচ রাগিণী: পঞ্চমী, আসাবরী, গৌড়ী, কেদারী ও সিন্ধবী।
  • বৈশিষ্ট্য: রাগিণী আসাবরীর চিত্রে দেখা যায় চন্দন পাহাড়ে এক নারী বসে আছেন এবং তাঁর সুর শুনে সাপেরা চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে।

৬. রাগ মেঘ বা মেঘমল্লার (বর্ষার সুর)

বৃষ্টি, মেঘ এবং প্রকৃতির পুনর্জীবনের প্রতীক।

  • চিত্রায়ন: আকাশে কালো মেঘ, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। কৃষ্ণ নীল বর্ণে বাঁশি বাজাচ্ছেন অথবা ময়ূর পেখম মেলে নাচছে। বৃষ্টির ধারায় ধুয়ে যাওয়া প্রকৃতি এই ছবির মূল বৈশিষ্ট্য।
  • পাঁচ রাগিণী: টঙ্ক, মালারী, গুর্জরী, ভূূপালী ও দেশকার।
  • বৈশিষ্ট্য: রাগিণী মধুর মেজাজে বৃষ্টির আনন্দ উদযাপন বা বিরহ কাতরতা—দুই রূপেই দেখা যায়।

রাগমালা শ্রেণীবিন্যাসের তুলনামূলক তালিকা

প্রধান রাগঋতু/সময়প্রধান ভাব (Mood)উল্লেখযোগ্য চিত্রকল্প
ভৈরবভোরভক্তি ও বৈরাগ্যশিব, ভস্ম, ধ্যান
মালকোশমধ্যরাতবীরত্ব ও বিলাসিতারাজদরবার, তলোয়ার
হিন্দোলবসন্তপ্রেম ও উল্লাসদোলনা, আবির, হরিণ
দীপকগ্রীষ্মতেজ ও দহনপ্রদীপ, আগুন, আলো
শ্রীগোধূলিঐশ্বর্য ও শান্তিরাজকীয়তা, সোনালি আভা
মেঘবর্ষাআনন্দ ও পুনর্মিলনমেঘ, ময়ূর, কৃষ্ণ

এই চিত্রগুলো দেখলে বোঝা যায়, কেন নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট রাগ গাওয়ার বিধান ছিল। এটি সুরের অতীন্দ্রিয় জগতকে সাধারণ মানুষের চোখের সামনে এক মূর্ত এবং রঙিন পৃথিবীতে পরিণত করেছিল।

মধুমধবী রাগিণী, জয় কৃষ্ণ অঙ্কিত। মালপুরা, সময়কাল আনুমানিক ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দ। রিটবার্গ মিউজিয়াম।
মধুমধবী রাগিণী, জয় কৃষ্ণ অঙ্কিত। মালপুরা, সময়কাল আনুমানিক ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দ। রিটবার্গ মিউজিয়াম।

৪. রাগমালার  ‘আইকনোগ্রাফি’ বা দৃশ্যকল্প:

ভারতীয় সংগীতশাস্ত্রে রাগের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আরও বেশ কিছু রাগিণীর নির্দিষ্ট ‘আইকনোগ্রাফি’ বা দৃশ্যকল্প রয়েছে।

১. রাগিণী আসাবরী: সর্পবেষ্টিত চন্দন বৃক্ষের নারী

এটি আসাবরী রাগের চিরচেনা রূপ।

দৃশ্যকল্প: চন্দন পাহাড়ে এক শ্যামবর্ণা নারী (অনেক সময় আদিবাসী বেশে) বসে আছেন। চন্দন গাছের শীতলতার টানে সাপেরা চারপাশ থেকে নেমে আসছে এবং ওই নারীর সুরের মোহে তাকে ঘিরে ধরছে। এটি মূলত বিচ্ছেদ ও আকুলতার প্রতীক।

২. রাগিণী তোড়ি: হরিণবেষ্টিত বীণাধারিণী

আসাবরীর পর এটিই সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সুন্দর চিত্রকল্প।

দৃশ্যকল্প: জনমানবহীন প্রান্তরে এক সুন্দরী নারী রুদ্রবীণা বা সেতার বাজাচ্ছেন। তাঁর সুরের মায়ায় মুগ্ধ হয়ে একঝাঁক হরিণ (কখনও একটি দম্পতি হরিণ) তাঁর হাতের কাছে এসে মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে আছে। এটি প্রকৃতির সঙ্গে সুরের নিবিড় বন্ধন বোঝায়।

৩. রাগিণী গুণকলি: একাকী বিরহী ও পুষ্পপাত্র

এটি মূলত বিরহ ও অপেক্ষার ছবি।

দৃশ্যকল্প: একজন নারী একটি ফাঁকা বারান্দায় বা বাগানে বসে আছেন। তাঁর সামনে দণ্ডায়মান একটি পুষ্পপাত্র বা ফুলদানি। তিনি বিরহকাতর চোখে কোনো একটি নির্দিষ্ট ফুলের দিকে তাকিয়ে আছেন, যা তাঁর অনুপস্থিত প্রেমিকের স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে।

৪. রাগিণী খাম্বাবতী: চতুরানন ব্রহ্মার উপাসনা

এটি আধ্যাত্মিক ও ভক্তি রসের চিত্র।

দৃশ্যকল্প: এক রাজকীয় নারী চার মাথা বিশিষ্ট ব্রহ্মা বা অগ্নিকুণ্ডের সামনে বসে পূজা দিচ্ছেন। পাশে সখীরা পূজার থালা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এটি ভক্তি ও শুদ্ধতার প্রতীক।

৫. রাগিণী বসন্ত: আবির ও ফাগুনের দোলনা

বসন্ত ঋতুর আনন্দ ও উল্লাসের বহিঃপ্রকাশ।

দৃশ্যকল্প: ভগবান কৃষ্ণ বা একজন নায়ক দোলনায় বসে আছেন। চারপাশে সখীরা আবির খেলছে, পিচকারি দিয়ে রঙ দিচ্ছে এবং কেউ বা মৃদঙ্গ ও করতাল বাজাচ্ছে। পলাশ ও আম্রকুঞ্জ এই ছবির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

৬. রাগিণী ধানাশ্রী: বিরহী প্রেমিকার চিত্রাঙ্কন

এটি বিরহী হৃদয়ের সৃজনশীলতার প্রকাশ।

দৃশ্যকল্প: একজন নারী তাঁর অনুপস্থিত প্রেমিকের ছবি একটি ক্যানভাসে বা পটে আঁকছেন। পাশে তাঁর সখীরা তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। এটি প্রেমিকের প্রতি তাঁর একাগ্রতা ও ধ্যানের প্রতীক।

৭. রাগিণী কামোদ: বিরহী যোগিনী ও কুটির

এটি ত্যাগের প্রতীক।

দৃশ্যকল্প: একজন নারী বনবাসিনী বা যোগিনীর বেশে নদীর তীরে একটি কুটিরের সামনে বসে আছেন। তাঁর চোখে এক গভীর শূন্যতা এবং তিনি হয়তো শিবের আরাধনা বা প্রেমিকের ফেরার অপেক্ষা করছেন।

৮. রাগিণী ললিত: শায়িত নায়েক ও মালাধারী নায়েিকা

ভোরের স্নিগ্ধ প্রেম ও মিলনের দৃশ্য।

দৃশ্যকল্প: ভোরের আলো ফুটছে, নায়ক তখনও শয্যায় সুপ্ত। নায়িকা তাঁর হাতে একটি ফুলের মালা নিয়ে আলতো করে নায়কের কাছে আসছেন। এটি প্রেমের মাধুর্য ও ভোরের প্রশান্তি নির্দেশ করে।

 

৯. রাগিণী মালশ্রী: পুষ্প চয়নকারী নারী

এটিও ভোরের এক অত্যন্ত সুন্দর চিত্রকল্প।

দৃশ্যকল্প: একটি ফুলে ভরা বাগানে সুন্দরী নারী একা ফুল তুলছেন। তাঁর হাতে একটি সাজি বা ঝুড়ি। এটি নতুন আশা ও দিনের শুরুর প্রতীক।

 

পেইন্টিংগুলোর একটি তুলনামূলক সারাংশ

রাগিণীপ্রধান মোটিফ (Motif)রসের প্রকৃতি
আসাবরীসাপ ও চন্দন গাছকরুণ ও রহস্যময়
তোড়িহরিণ ও বীণাশান্ত ও প্রাকৃতিক
বসন্তফাগুন ও দোলনাশৃঙ্গার ও আনন্দ
ধানাশ্রীচিত্রপট ও তুলিবিরহ ও স্মৃতি
খাম্বাবতীপূজা ও ব্রহ্মাভক্তি ও সমর্পণ

এই প্রতিটি চিত্রকল্প বা ‘আইকনোগ্রাফি’ তৈরি করা হয়েছে যাতে একজন সাধারণ মানুষ ছবি দেখেই বুঝতে পারেন এটি কোন রাগ বা রাগিণী। রাগমালা পেইন্টিং এভাবেই সংগীতকে সাহিত্যের গল্পে এবং রঙের মাধুর্যে রূপান্তর করেছে।

 

ভৈরবী রাগিনী - সম্ভবত মেওয়ার, সময়কাল আনুমানিক ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দ। ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়াম।
ভৈরবী রাগিনী – সম্ভবত মেওয়ার, সময়কাল আনুমানিক ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দ। ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়াম।

 

৫. এখন কোথায় এবং কীভাবে পাওয়া যায়?

বর্তমানে রাগমালা পেইন্টিংয়ের মূল কপিগুলো ব্যক্তিগত সংগ্রহের চেয়ে মিউজিয়ামেই বেশি দেখা যায়:

  • ভারত: দিল্লির ন্যাশনাল মিউজিয়াম, কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল এবং রাজস্থানের সিটি প্যালেস মিউজিয়ামে বিশাল সংগ্রহ রয়েছে।

  • বিদেশের সংগ্রহশালা: লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়াম (V&A), ব্রিটিশ মিউজিয়াম এবং আমেরিকার মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্ট-এ অনেক দুর্লভ রাগমালা সংরক্ষিত আছে।

  • সংগ্রহ করা: এখন হস্তশিল্প মেলায় বা রাজস্থানের স্থানীয় শিল্পীদের কাছে এর রেপ্লিকা পাওয়া যায়। এছাড়া ইন্টারনেটে ডিজিটাল আর্কাইভ এবং নিলামকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন ক্রিস্টিজ বা সদবি) ওয়েবসাইটে এগুলো দেখা যায়।

 

রাগমালা গ্যালারি: