ভারতীয় নাট্য, কাব্য ও অলঙ্কারশাস্ত্রে “রস” একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। সহজভাবে বললে, রস হলো সেই অনুভূতি বা সৌন্দর্যের অভিজ্ঞতা, যা কোনো শিল্প—যেমন গান, নাটক বা কবিতা—উপভোগ করার সময় আমাদের মনে সৃষ্টি হয়।

রাগের রস ভিত্তিক গ্রুপ [ Raga Group based on Rasa ]
আমরা যখন বাস্তব জীবনে কোনো ঘটনা দেখি বা অনুভব করি, তখন আমাদের ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সরাসরি আনন্দ, দুঃখ, ভয় বা রাগের মতো অনুভূতি জন্ম নেয়। এই অনুভূতিগুলো খুবই বাস্তব এবং তাৎক্ষণিক—যেমন, প্রিয় কাউকে কষ্ট পেতে দেখলে আমাদের মনে সঙ্গে সঙ্গে দুঃখ বা রাগ তৈরি হয়।
কিন্তু শিল্পের জগৎ একটু ভিন্ন। এখানে আমরা বাস্তবতা থেকে একটু দূরে সরে গিয়ে কল্পনার জগতে প্রবেশ করি। যেমন, কোনো নাটকে যদি দেখি একজনকে প্রহার করা হচ্ছে, আমরা জানি সেটি অভিনয়। তবুও যদি অভিনয়টি বাস্তবসম্মত হয়, তাহলে আমাদের মনে করুণার অনুভূতি জাগে, আবার অত্যাচারীর প্রতি রাগও তৈরি হতে পারে। এই অনুভূতিগুলো বাস্তব নয়, কিন্তু তবুও তা আমাদের গভীরভাবে স্পর্শ করে—এটাই হলো রসের অভিজ্ঞতা।
অন্যদিকে, যদি অভিনয়টি দুর্বল হয় বা বিশ্বাসযোগ্য না লাগে, তাহলে সেই অনুভূতি সৃষ্টি হয় না। বরং দর্শক বিরক্ত হন। অর্থাৎ, শিল্পের জগতে রস তৈরি হয় সত্যনিষ্ঠ উপস্থাপন ও অনুভূতির সামঞ্জস্যের মাধ্যমে।
এই রস আসলে আমাদের মনের গভীরে এক ধরনের নান্দনিক আনন্দ সৃষ্টি করে, যা বাস্তব অনুভূতির মতো হলেও আরও সূক্ষ্ম ও পরিশীলিত। এই কারণেই বলা হয়, রস হলো শিল্পের প্রাণ।
ভারতীয় শাস্ত্রে রসকে বিভিন্নভাবে ভাগ করা হয়েছে। যেমন—
নাট্যশাস্ত্র অনুযায়ী রস
নাট্যশাস্ত্র অনুযায়ী রসের সংখ্যা ৮টি। এগুলো হলো—
শৃঙ্গার (প্রেম), হাস্য (হাসি), করুণ (বেদনা), রৌদ্র (রাগ), বীর (বীরত্ব), ভয়ানক (ভয়), বীভৎস (ঘৃণা) এবং অদ্ভুত (বিস্ময়)।
এখানে “শান্ত” রসকে আলাদা করে ধরা হয়নি; অনেক ক্ষেত্রে এটি করুণ রসের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধরা হয়।
কাব্যশাস্ত্র অনুযায়ী রস
কাব্যশাস্ত্রে রসের সংখ্যা ৯টি ধরা হয়। এগুলো হলো—
শৃঙ্গার, বীর, করুণ, অদ্ভুত, হাস্য, ভয়ানক, বীভৎস, রৌদ্র এবং শান্ত।
কিছু পণ্ডিত আবার “বাৎসল্য” (মাতৃস্নেহ বা স্নেহ) রসকে যুক্ত করে রসের সংখ্যা ১০টি পর্যন্তও উল্লেখ করেছেন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, রস হলো সেই অনুভূতির জগৎ, যেখানে বাস্তব ও কল্পনা মিলেমিশে এক নতুন সৌন্দর্য সৃষ্টি করে। রাগসংগীতেও এই রসের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। প্রতিটি রাগের নিজস্ব আবেগ বা রস থাকে, যা শ্রোতার মনে নির্দিষ্ট অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। সেই রসের ভিত্তিতেই রাগগুলিকে বিভিন্নভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা যায়।

রাগের রস ভিত্তিক গ্রুপ [ Raga Group based on Rasa ] :
১. রাগের রস – শৃঙ্গার (Shringara Rasa, love):
শৃঙ্গ শব্দের অর্থ হলো কামেদেব। শৃঙ্গের আর (আগমন) হয় যাতে, তাই শৃঙ্গার। এর অপর নাম আদিরস। নরনারীর দৈহিক সম্ভোগের ইচ্ছায় যে অনুরাগের সৃষ্টি হয়, তাকেই শৃঙ্গার একেই বলা হয়। প্রেমপ্রকাশ কাব্যে এই রসের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
রাগের নাম: ইমন (ইয়ামন), খামাজ, তিলক কামোদ, দেশ, ঝিঁঝিট, পিলু, রাগেশ্বরী।
২. রাগের রস – বীর (Vira Rasa, heroism):
দয়া, ধর্ম, দান এবং যুদ্ধের নিমিত্তে এই রসের উদ্ভব হয়। এর প্রত্যেকটির ভিতরে জয় লাভের ভাব থাকে। যার দ্বারা প্রতিকুল পরিবেশকে পরাজিত করে জয়ী হওয়ার উদ্দীপনা প্রকাশ করা হয়। একই সাথে এতে থাকে বীরোচিত প্রতীজ্ঞা। ভায়নক, শান্ত রস বিরোধী। যেমন−
বারিদপ্রতিম স্বনে স্বনি উত্তরিলা
সুগ্রীব; “মরিব, নহে মারিব রাবণে,
এ প্রতিজ্ঞা শূরশ্রেষ্ঠ, তব পদতলে!
-মেঘনাদ বধ, সপ্তম সর্গ। মধুসূদন
রাগের নাম: আড়ানা, হামীর, শঙ্কর, ছায়ানট, হিন্দোল।
৩. রাগের রস – করুণ (Karuna Rasa, melancholia):
আকাঙ্ক্ষা নষ্ট হলে, অকল্যাণ হলে, প্রিয়জন বিয়োগ ইত্যাদিতে এই রসের সৃষ্টি হয়। মূলত শোকের ভাব এতে প্রকাশ পায়। শৃঙ্গার এবং হাস্যরস এর বিরোধী। যেমন−
কাঁদিলা রাক্ষসবধূ তিতি অশ্রুনীরে
শোকাকুলা। ভবতলে মূর্ত্তিমতী দয়া
সীতারূপে, পরদুঃখে কাতর সতত,
কহিলা− সজল আঁখি সখীরে;−
“কুক্ষণে জনম মম, সরমা রাক্ষসি!
-মেঘনাদ বধ, নবম সর্গ। মধুসূদন
৪. রাগের রস – রৌদ্র /রুদ্র (Raudra Rasa, fury) :
ক্রোধ রস থেকে এই রস উৎপন্ন হয়। ক্রোধের উগ্রতা এবং ভয়ঙ্কর রূপ হলো এই রস। এই কারণে ক্রোধকে এর স্থায়ীভাব হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অলঙ্কার শাস্ত্রে একে রক্তবর্ণ ও রুদ্রদৈবত নামে অভিহিত করা হয়েছে। যেমন−
“কি কহিলি, বাসন্তি? পর্ব্বত-গৃহ ছাড়ি,
বাহিরায় যবে নদী সিন্ধুর উদ্দেশে,
কার হেন সাধ্য যে সে রোধে তার গতি?
-মেঘনাদ বধ, তৃতীয় সর্গ। মধুসূদন
৫. রাগের রস – অদ্ভুত (Adbhuta Rasa, amazement) :
আশ্চর্যজনক কোনো বিষয় থেকে উদ্ভুত বিস্ময়কর ভাবই হলো অদ্ভুত রস। সাধারণ অলৌকিক কোনো বিষয়কে এই রসকে উজ্জীবিত করা হয়। যেমন−
“সবিস্ময়ে রঘুনাথ নদীর উপরে
হেরিলা অদ্ভুত সেতু, অগ্নিময় কভু,
কভু ঘন ধূমাবৃত, সুন্দর কভু বা
সুবর্ণে নির্ম্মিত যেন! ধাইছে সতত
সে সেতুর পানে প্রাণী লক্ষ লক্ষ কোটি
হাহাকার নাদে কেহ; কেহ বা উল্লাসে!
-মেঘনাদ বধ, অষ্টম সর্গ। মধুসূদন
৬. রাগের রস – ভয়ানক (Bhayanak Rasa, terror):
ভয় থেকে এই রসের উদ্ভব। বিপদজনক বা ভীতিপ্রত কোনো বিষয় থেকে মনে যে ভাবের সঞ্চার হয়, প্রকাশই ভয়ানক।
৭. রাগের রস – বীভৎস (Bhibatsa Rasa, disgust):
কোনো কুৎসিৎ বিষয়ের প্রতি ঘৃণা থেকে বিভৎস রসের সৃষ্টি হয়।
৮. রাগের রস – হাস্য (Hasya Rasa, comic):
কৌতুকজনক বাক্য বা আচরণ থেকে এই রসের উদ্ভব হয়।
৯. রাগের রস – শান্ত (Shanta Rasa, tranquility):
চিত্তকে প্রশান্ত দেয় এমন ভাব থেকে শান্ত রসের উদ্ভব হয়।
১০.রাগের রস – বাৎসল্য:
সন্তানের প্রতি স্নেহের যে ভাবের উদ্ভব ঘটে, তাই বাৎসল্য রস
রাগের রস ভিত্তিক গ্রুপ [ Raga Group based on Rasa ]
নবরস ও সংশ্লিষ্ট রাগের পূর্ণাঙ্গ তালিকা
| ক্রম | রসের নাম | মূল আবেগ (Emotion) | সংশ্লিষ্ট রাগসমূহ (Examples) |
| ১ | শৃঙ্গার | প্রেম, রোমান্টিকতা, সৌন্দর্য | ইমন, খামাজ, তিলক কামোদ, দেশ, ঝিঁঝিট, পিলু, রাগেশ্বরী, বিহার। |
| ২ | করুণ | শোক, বিরহ, বিষাদ | আসাবরী, জৌনপুরী, শিবরঞ্জিনী, গুর্জরী তোড়ি, আহীর ভৈরব, ললিত। |
| ৩ | শান্ত | প্রশান্তি, মুক্তি, আধ্যাত্মিকতা | ভৈরব, মালকোষ, ভূপালী, দরবারী কানাড়া, যোগ, শুদ্ধ কল্যাণ। |
| ৪ | বীর | তেজ, সাহস, শৌর্য | আড়ানা, হামীর, শঙ্কর, ছায়ানট, হিন্দোল, গৌড় মল্লার। |
| ৫ | হাস্য | আনন্দ, কৌতুক, উল্লাস | বাহার, বসন্ত, তিলং, কাফি (হোরি), দেশ (চপল চলনে)। |
| ৬ | রৌদ্র | ক্রোধ, তীব্র তেজ | রৌদ্র ভৈরব, মেঘ, গৌড় মালহার (গম্ভীর রূপ), দুর্গা (তেজস্বী রূপ)। |
| ৭ | অদ্ভুত | বিস্ময়, অলৌকিকতা | হংসধ্বনি, ললিত, কালাশ্রী, শিল্পীর নিজস্ব সৃজনশীল মিশ্র রাগ। |
| ৮ | ভয়ানক | আতঙ্ক, রহস্য, গা ছমছমে ভাব | মারওয়া (গোধূলির থমথমে মেজাজে), বিভৎস ভৈরব, শ্রী (বিশেষ প্রয়োগে)। |
| ৯ | বীভৎস | ঘৃণা, বিরক্তি, জুগুপ্সা | শুদ্ধ রাগে বিরল; সাধারণত নাটকীয় সংগীতে বিবাদী স্বরের কর্কশ ব্যবহারে সৃষ্ট। |
কখনো কখনো মনজগতের এই দ্বিতীয়তলে সৃষ্ট সৌন্দর্য শ্রোতা-দর্শকদের এতটাই গভীরে টেনে নেয়। সে তখন রসজগতে দ্রবীভূত হয়ে যায়। সে কারণে অভিনয় দেখে মানুষ কাঁদে, হাসে, ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। শোনা যায় ইতালি অভিযান শেষ নেপোলিয়ানের একদল সৈন্য, লিওনার্দো দ্যা ভিন্সি যে ঘরটিতে The Last Supper ছবিটি এঁকেছিলেন, সেই ঘরে আশ্রয় নিয়েছিল।
যিশুখ্রিষ্টের পরম ভক্তদের কেউ কেউ তখন, যিশুর সাথে প্রতারণাকারী জুডাথের উদ্দেশ্য জুতো ছুঁড়ে মারে। ফলে সে সময়ও ছবিটি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। মূলত এই সৈনিকরা প্রথমে মনোজগতের দ্বিতীয় স্তরে প্রবেশ করে একটি রৌদ্ররস দ্বারা দ্রবীভূত হয়েছিল। এরপর এরা ছবিটির বিষয়বস্তুটির সাথে এতটাই গভীরভাবে মিশে গিয়েছিল যে, তাদের কাছে ছবির জুডাথ মনের গভীরতলে বাস্তব হয়ে উঠেছিল।
এখানে ছবির সৌন্দর্য নিয়ে সৈনিকরা মাথা ঘামায় নি। ছবিটি নষ্ট হয়ে যাবে এই মমতাও তাদের ছিল না। এই ছবিটি ঘটনাক্রমে একদল মানুষের সুকুমার প্রবৃত্তিকে নষ্ট করে দিয়েছিল। এই কারণে এই ছবিটিকে সৌন্দর্যহীন বলা যাবে। একটি কারণে ছবিটি সৌন্দর্যের দাবিদার হয়ে উঠে। তা হলো এর সততা এবং তার সমন্বয়। ছবিটির এই সততা এবং সমন্বয় সৈনিকদের বাস্তব জগত থেকে ভুলিয়ে ঠেলে দিয়েছিল কল্পজগতে।
আরও পড়ুন:
![রাগের রস ভিত্তিক গ্রুপ Raga Group based on Rasa রাগের রস ভিত্তিক গ্রুপ সূচি । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ 1 রাগের রস ভিত্তিক গ্রুপ [ Raga Group based on Rasa ]](https://sufifaruq.com/wp-content/uploads/2023/07/রাগের-রস-ভিত্তিক-গ্রুপ-Raga-Group-based-on-Rasa-.png)