রাগ ইমন এবং ইমন কল্যাণ । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

বেশিরভাগ মানুষের প্রেমে পড়ার পর, সেই প্রেমের সঙ্গী হওয়া গানটি ছিল — রাগ ইমন এর উপরে বাঁধা। চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক প্রেমের গান তৈরি হয়েছে এই ইমন রাগে। গান-বাজনা শিখতে গেলে সবাই প্রথমেই শেখে ইমন রাগ। সারা জীবন ধরে শুনেও যে রাগটি কখনো পুরনো হয় না, তার নামও ইমন। আবার সারা জীবন সাধনা করেও যে রাগের শিক্ষা শেষ হয় না, সেই রাগটিও ইমন।

ইমন মূলত কল্যাণ ঠাটের রাগ। এর আরোহণ ও অবরোহণ—উভয় ক্ষেত্রেই সাতটি স্বর ব্যবহৃত হয় (সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ জাতি)। এই রাগের জাদুকরী বৈশিষ্ট্য হলো এর সব স্বর শুদ্ধ, শুধু মধ্যমটি কড়ি (ক্ষা)। এর বিস্তৃতি যেন দোলনা থেকে খাটিয়া পর্যন্ত—অর্থাৎ সাধারণ শ্রোতা থেকে শুরু করে দিকপাল পণ্ডিত বা ওস্তাদ, সবাই এই রাগের মাঝে এক অদ্ভুত পূর্ণতা খুঁজে পান।

রাগ ইমন এবং ইমন কল্যাণ

SufiFaruq.com Logo 252x68 2 রাগ ইমন এবং ইমন কল্যাণ । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

 

রাগ ইমনের গায়কী ও সময়:

ইমন হলো রাতের প্রথম প্রহরের রাগ। গোধূলি শেষ হওয়ার পর যখন আঁধার নামে, তখনই ইমনের প্রকৃত মাধুর্য ফুটে ওঠে। এই রাগের চলনে কয়েকটি জায়গায় বিশেষ জাদু আছে। যেমন— কড়ি মধ্যমের প্রয়োগ এবং ‘পা’ (পঞ্চম) থেকে মিড় নিয়ে ‘রে’ (রিশভ)-এ আসার দুলুনিটুকু শ্রোতার মনে গভীর আবেশ তৈরি করে।

রাগ ইমনের নাম ও ইতিহাস:

ইমনের নামকরণ নিয়ে মতভেদ আছে। অনেকের মতে এটি প্রাচীন ভারতীয় ‘কল্যাণ’ রাগ। পরবর্তীতে পারস্য প্রভাবে এর নাম হয় ‘ইমন’। ইংরেজিতে একে Yaman, Iman বা Aiman—বিভিন্ন বানানে লেখা হয়।

রাগ ইমন মূলত কল্যাণ ঠাটের অন্তর্গত একটি রাগ। একে অনেক সময় ‘কল্যাণ’ নামেও ডাকা হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, এই রাগের শিকড় অত্যন্ত প্রাচীন। কেউ কেউ মনে করেন পারস্যের প্রভাবে এই রাগের নাম ‘ইমন’ হয়েছে, আবার অনেকের মতে এটি বৈদিক আমলের ‘কল্যাণ’ রাগেরই আধুনিক রূপ। মধ্যযুগে আমির খসরু এই রাগের বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন বলে ধারণা করা হয়।

এই রাগের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর তীব্র মধ্যম (ক্ষা)-এর প্রয়োগ। এছাড়া বাকি সব স্বরই শুদ্ধ। ইমনের চলন মূলত মন্দ্র সপ্তকের নিষাদ (ন্) থেকে শুরু হয়, যা এই রাগকে এক অনন্য গাম্ভীর্য প্রদান করে। এটি একটি অত্যন্ত নমনীয় রাগ; এতে যেমন গভীর খেয়াল বা ধ্রুপদ গাওয়া যায়, তেমনই হালকা চালের গজল বা ভজনও অত্যন্ত শ্রুতিমধুর শোনায়। চলচ্চিত্রের গানেও এই রাগের প্রভাব অপরিসীম।

ইমন ও ইমন-কল্যাণ:

ইমনের সাথে সবচেয়ে সদৃশ রাগটি হলো ইমন-কল্যাণ। রাগ দুটির পার্থক্য খুবই সূক্ষ্ম। ইমনে কেবল কড়ি মধ্যম ব্যবহৃত হয়, কিন্তু ইমন-কল্যাণে কড়ি মধ্যমের আধিপত্যের মাঝে খুব সামান্য পরিমাণে শুদ্ধ মধ্যম ব্যবহার করা হয় (সাধারণত দুটি গান্ধারের মাঝখানে)। নতুন শ্রোতাদের জন্য এই পার্থক্য ধরা কিছুটা কঠিন হতে পারে, তাই শুরুতে কনফিউশনে না ভুগে রাগের রস আস্বাদন করাই শ্রেয়।

রাগ ইমনের শাস্ত্র:

  • ঠাট: কল্যাণ।
  • জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহে ৭টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ: ন্ রে গা ক্ষা পা ধা না র্সা
  • অবরোহ: র্সা না ধা পা ক্ষা গা রে সা
  • বাদী স্বর: গা (শুদ্ধ গান্ধার)।
  • সমবাদী স্বর: না (শুদ্ধ নিষাদ)।
  • বর্জিত স্বর: কোনো স্বর বর্জিত নয়।
  • ব্যবহৃত স্বর: মধ্যম তীব্র (ক্ষা); বাকি সব স্বর (সা, রে, গা, পা, ধা, না) শুদ্ধ
  • সময়: রাত্রির প্রথম প্রহর (সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত)।
  • প্রকৃতি: শান্ত, গম্ভীর, ভক্তি ও শৃঙ্গার রসপ্রধান।
  • কয়েকটি চলন: * ন্ রে গা, রে সা
    • পা মঁ গা, রে সা (তীব্র মধ্যম ব্যবহারের সময়)

    • ন্ রে গা ক্ষা পা, ধা না র্সা

 

কণ্ঠে ইমন

নজরুল সঙ্গীতে রাগ ইমন [ Raga Yaman in Nazrul Sangeet ]:

নজরুলের গানে বিশুদ্ধ ইমনের চেয়ে ‘মিশ্র ইমন’-এর আধিপত্য বেশি দেখা যায়। তিনি ইমনের শান্ত ও গম্ভীর প্রকৃতির সাথে চপল বা চঞ্চল তালের মিশ্রণ ঘটিয়ে গানগুলোকে প্রাণবন্ত করে তুলেছেন।

১. ছন্দের বন্য হরিণী অরণ্যা (মিশ্র ইমন, তালঃ কাহারবা)
২. যবে তুলসীতলায় প্রিয় সন্ধ্যাবেলায় (মিশ্র ইমন, তালঃ কাহারবা)
৩. বসিয়া বিজনে কেন একা মনে (মিশ্র ইমন, তালঃ কাহারবা)

৪. এলো এলো রে বৈশাখী ঝড় এলো এলো রে : (মিশ্র ইমন, তালঃ কাহারবা)

 

রবীন্দ্রসঙ্গীতে রাগ ইমন [ Raga Yaman in Rabindra Sangeet ]:

রবীন্দ্রনাথ ইমনের গম্ভীর শান্ত রূপটিকে প্রায়ই তাঁর পূজা এবং প্রকৃতি পর্যায়ের গানে ব্যবহার করেছেন। তবে অনেক ক্ষেত্রেই তিনি ইমনের কড়ি মধ্যমের পাশাপাশি শুদ্ধ মধ্যম বা অন্য স্বরের ছোঁয়া দিয়ে গানকে রাগের কাঠামো থেকে বের করে এনেছেন।

১. গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে দাঁড়িয়ে আছো তুমি আমার।

২.  এ মোহ-আবরণ খুলে দাও, দাও হে -তাল: আড়াঠেকা, রচনাকাল (১২৯১ বঙ্গাব্দ, ১৮৮৫ খৃষ্টাব্দ), স্বর-লিপিকার: ইন্দিরা দেবী।

৩. আলো আমার, আলো ওগো, আলো ভুবন-ভরা (রাগ: ইমন, তাল: দাদরা, রচনাকাল: বঙ্গাব্দ ১৩১৮ আষাঢ়, খৃষ্টাব্দ ১৯১১, রচনাস্থান: শিলাইদহ, স্বরলিপিকার: ভীমরাও শাস্ত্রী)।

৪. এই উদাসী হাওয়ার পথে পথে মুকুলগুলি ঝরে (রাগ: ইমন, তাল: দাদরা, রচনাকাল: বঙ্গাব্দ ১৩৪৫ ফাল্গুন, খৃষ্টাব্দ ১৯৩৯ মার্চ, স্বরলিপিকার: শৈলজারঞ্জন মজুমদার)

 

গজলে  ইমন রাগ [ Raga Yaman in Ghazals ]:

গজলের জগতে রাগ ইমনকে ধরা হয় সবচেয়ে শক্তিশালী এবং জনপ্রিয় রাগ হিসেবে। বিশেষ করে সন্ধ্যার আসরে গজল গায়কদের প্রথম পছন্দই থাকে ইমন।

১. ওস্তাদ মেহেদি হাসান (শাহেনশাহ-এ-গজল)

  • Ranjish Hi Sahi: এটি কেবল একটি গজল নয়, এটি একটি ইতিহাস। গজলের শুরুতে মেহেদি হাসান সাহেব যে দীর্ঘ ইমন আলাপ করেন, তা থেকে ইমনের চলন এবং শুদ্ধতা খুব সহজে বোঝা যায়। বিরহ এবং অভিমানের এই গানটি ইমনের শান্ত ও গম্ভীর রূপকে প্রকাশ করে।
  • Jal Bhi Chuke Parvane: ইমনের স্নিগ্ধতা এই গজলে এক অনন্য মাত্রা পেয়েছে। তাঁর সূক্ষ্ম তান এবং মূর্তকি এই গজলটিকে অমর করে রেখেছে।

২. জগজিৎ সিং (গজল সম্রাট)

  • Shola Hun Bhadakne Ki: জগজিৎ সিং ইমনের ধ্রুপদী কাঠামোর সাথে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের যে মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন, তা এই গজলে স্পষ্ট। ইমনের ‘নি রে গা’ স্বরবিন্যাস এখানে এক অদ্ভুত মাদকতা তৈরি করে।

৩. ওস্তাদ গোলাম আলী

  • Dilwalon Kya Dekh Rahe: গোলাম আলী সাহেবের গায়কিতে ইমনের চলন অনেকটা চপল ও অলঙ্কৃত। তাঁর বিশেষ ‘হরকত’ এবং ‘তান’ ইমনের এই গজলটিকে অত্যন্ত শ্রুতিমধুর করেছে।

  • Sochte Aur Jaagte Sanson Ka: ইমনের করুণ ও গভীর আবেদন এই গজলের প্রতিটি চরণে মিশে আছে। নিশীথ রাতের নির্জনতায় এই গজলের আবেদন অনন্য।

গজলে ইমনের পূর্ণাঙ্গ রূপ ফুটে ওঠে এর বিস্তারে। ওস্তাদরা প্রায়ই গজলের অন্তরা গাওয়ার আগে ইমনের বিস্তারে ‘পা’ থেকে ‘রে’ এর যে মিড় ব্যবহার করেন, তা শ্রোতাকে আবিষ্ট করে ফেলে। ইমনের কড়ি মধ্যম (ক্ষা) গজলের রোমান্টিক এবং বিষণ্ণতাকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলে। বর্তমান সময়ের গজল গায়ক যেমন পঙ্কজ উধাস বা রূপকুমার রাঠোরও তাঁদের অনেক জনপ্রিয় গজল ইমনের আদলে তৈরি করেছেন।

 

রাগ ইমনে আধুনিক গান [ Raga Yaman Modern Bangla Songs ] :

১. ওস্তাদ নিয়াজ মোহম্মদ চৌধুরীর – আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে। কম বয়সে এই গানটি আমার হৃদয় ডিটারজেন্ট পাউডারে ভিজিয়ে রেখে নির্দয়-ভাবে মুচড়ে কেঁচে দিয়েছিল। গানটি লিখেছিলেন গীতিকার কাওসার আহমেদ চৌধুরী। সুর দিয়েছিলেন আরেক জনপ্রিয় শিল্পী সুরকার: লাকী আখন্দ।

 

ফিল্মের গানে ইমন [ Raga Yaman in Film Playback ]:

বলিউডের স্বর্ণযুগে সুরকারদের অন্যতম প্রিয় রাগ ছিল ইমন। বিশেষ করে সন্ধ্যার রোমান্টিকতা কিংবা গভীর বিরহ ফুটিয়ে তুলতে এই রাগের কোনো বিকল্প নেই। প্রখ্যাত শিল্পী সুরেশ ওয়াদকার তাঁর একটি ভিডিওতে এই গানগুলোর চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন দেখুন এখানে

১. Jab Deep Jale Aana, Chitchor (১৯৭৬), শিল্পী: কে. জে. যেশুদাস ও হেমলতা, মন্তব্য: বিশুদ্ধ ইমনের পাঠ্যবইতুল্য উদাহরণ এবং শুরুতে যেশুদাসের চমৎকার আলাপ।

২. Bhooli Hui Yaadon, Sanjog (১৯৬১), শিল্পী: মুকেশ, মন্তব্য: মুকেশের বিষণ্ণ কণ্ঠে ইমনের শান্ত ও গম্ভীর রূপটি দারুণভাবে ফুটে উঠেছে।

৩. Abhi Na Jao Chhod Kar, Hum Dono (১৯৬১), শিল্পী: মোহাম্মদ রফি ও আশা ভোঁসলে, মন্তব্য: দাদরা তালে নিবদ্ধ এই গানটি ইমনের রোমান্টিক দিকটির শ্রেষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ।

৪. Mile Na Phool To Kaanton Se, Anokhee Raat (১৯৬৮), শিল্পী: মোহাম্মদ রফি, মন্তব্য: মূলত ইমন-কল্যাণ রাগের ওপর ভিত্তি করে তৈরি যাতে জীবনের গভীর দর্শন ফুটে উঠেছে।

৫. Zindagi Ka Safar, Safar (১৯৭০), শিল্পী: কিশোর কুমার, মন্তব্য: ইমনের গাম্ভীর্য ব্যবহার করে জীবনের অনিশ্চয়তাকে অনন্যভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

৬. Jhumka Gira Re, Mera Saaya (১৯৬৬), শিল্পী: আশা ভোঁসলে, মন্তব্য: শাস্ত্রীয় ইমনের একটি চঞ্চল ও লোকজ রূপ যা আইটেম বা ফোক স্টাইলে ব্যবহৃত হয়েছে।

৭. Dil Jo Na Keh Saka, Bheegi Raat (১৯৬৫), শিল্পী: মোহাম্মদ রফি ও লতা মঙ্গেশকর, মন্তব্য: ইমনের কড়ি মধ্যমের প্রয়োগে বিরহী রূপটি এখানে অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী।

৮. Inhi Logon Ne Le Lina, Pakeezah (১৯৭২), শিল্পী: লতা মঙ্গেশকর, মন্তব্য: মূলত রাগ ইমনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি ঐতিহাসিক ঠুমরি যা মুজরা বা কত্থক নাচের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

 

খেয়ালে ইমন রাগ:

রাগ ইমনের বিস্তৃতি এবং বিভিন্ন ঘরানার গায়কশৈলী বোঝার জন্য নিচে ১৫টি ঐতিহাসিক ও বিখ্যাত খেয়াল রেকর্ডিংয়ের তালিকা দেওয়া হলো।

১. ওস্তাদ আমির খাঁ (ইন্দোর ঘরানা): বন্দিশ – “কাহে সখী অ্যায়সে” (বিলম্বিত ঝুমরা তাল) এবং “জ্যায় জ্যায় মহাদেব” (দ্রুত তিতাল)। তাঁর অতি-বিলম্বিত গায়কী ইমনের গাম্ভীর্য বোঝার সেরা মাধ্যম।

২. পণ্ডিত ভীমসেন জোশী (কিরানা ঘরানা): বন্দিশ – “এরি আলি পিয়া বিন” (বিলম্বিত একতাল)। কিরানা ঘরানার তান এবং ইমনের স্বরবিস্তারের এটি একটি কালজয়ী উদাহরণ।

৩. বিদুষী কিশোরী আমোনকর (জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানা): বন্দিশ – “মেরি পালি পিয়াস”। জয়পুর ঘরানার সূক্ষ্ম অলঙ্কার এবং তাঁর আবেগঘন গায়কীতে ইমন এক অনন্য রূপ পায়।

৪. ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ (আগ্রা ঘরানা): বন্দিশ – “মোরি রে মনা”। আগ্রা ঘরানার ‘নোম-তোম’ আলাপ এবং জোরদার গায়কীতে ইমনের বীরত্বপূর্ণ রূপ ফুটে ওঠে।

৫. পণ্ডিত মল্লিকার্জুন মনসুর (জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানা): বন্দিশ – “পিয়া বিন নহি আব চ্যন”। তানের জটিল বুনোট এবং ইমনের শুদ্ধতা রক্ষায় এই রেকর্ডিংটি অতুলনীয়।

৬. ওস্তাদ বড় গুলাম আলী খাঁ (পাতিয়ালা ঘরানা): তাঁর গাওয়া ইমনের বিলম্বিত ও দ্রুত বন্দিশ। পাতিয়ালা ঘরানার বিশেষ ‘হরকত’ ও ‘মুর্কি’ ইমনে এক রাজকীয় আমেজ তৈরি করে।

৭. বিদুষী গাঙ্গুবাই হাঙ্গল (কিরানা ঘরানা): বন্দিশ – “এরি আলি পিয়া বিন”। তাঁর গম্ভীর ও ভরাট কণ্ঠে ইমনের শান্ত ও আধ্যাত্মিক রূপটি সার্থকভাবে ফুটেছে।

৮. পণ্ডিত কুমার গন্ধর্ব (স্বতন্ত্র শৈলী): তাঁর নিজস্ব ঢঙে গাওয়া ইমনের বন্দিশগুলো। প্রথাগত ইমনের বাইরে গিয়ে তিনি এই রাগের এক নতুন ‘মেজাজ’ তৈরি করেছিলেন।

৯. পণ্ডিত ওঙ্কারনাথ ঠাকুর (গোয়ালিয়র ঘরানা): তাঁর গায়কীতে ইমনের যে নাটকীয়তা এবং আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটে, তা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে বিরল।

১০. পণ্ডিত জসরাজ (মেওয়াতি ঘরানা): বন্দিশ – “মেরা লাল রে”। মেওয়াতি ঘরানার আধ্যাত্মিক ভাব এবং ভজন-অঙ্গ মিশ্রিত ইমনের এই রূপটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।

১১. ওস্তাদ রশিদ খাঁ (রামপুর-সাসওয়ান ঘরানা): বন্দিশ – “এরি আলি পিয়া বিন”। বর্তমান সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই ইমনের রূপটি শাস্ত্রীয় বিশুদ্ধতা এবং লালিত্যের মিশ্রণ।

১২. পণ্ডিত রাজন ও সাজন মিশ্র (বেনারস ঘরানা): দ্বৈত কণ্ঠে ইমনের বন্দিশ। বেনারস ঘরানার মিড় ও তানের চমৎকার যুগলবন্দী এখানে লক্ষ্য করা যায়।

১৩. ওস্তাদ আমানত আলী ও ফতেহ আলী খাঁ (পাতিয়ালা ঘরানা): তাঁদের গাওয়া ইমনের দ্রুত বন্দিশ এবং সারগাম পাতিয়ালা ঘরানার উচ্চাঙ্গ কৌশল প্রকাশ করে।

১৪. পণ্ডিত উলহাস কশলকর (গোয়ালিয়র/জয়পুর/আগ্রা সংমিশ্রণ): বিভিন্ন ঘরানার নির্যাস নিয়ে তাঁর গাওয়া ইমনের বিলম্বিত ও দ্রুত বন্দিশগুলো শুদ্ধ শাস্ত্রীয় গায়কীর প্রমাণ।

১৫. বিদুষী মোগুবাই কুরডিকর (জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানা): জয়পুর ঘরানার প্রবীণ এই শিল্পীর গাওয়া ইমনের বন্দিশগুলো রাগের কাঠামো এবং তালের নিখুঁত ভারসাম্যের জন্য বিখ্যাত।

আমার একটা পছন্দের ট্রাক:

 

ধ্রুপদে ইমন রাগ:

ইমন রাগের ধ্রুপদ গায়নশৈলী খেয়ালের চেয়ে অনেক বেশি গম্ভীর, মন্থর এবং আধ্যাত্মিক। ধ্রুপদ ধারায় ইমনকে তার আদি ও অকৃত্রিম রূপে পাওয়া যায়।

১. উস্তাদ ফহিমুদ্দিন ডাগর (ডাগর বাণী): * আলাপ ও ধামারি: ডাগর ঘরানার শুদ্ধতা এবং দীর্ঘ আলাপের জন্য এই রেকর্ডিংটি বিশ্ববিখ্যাত। ইমনের প্রতিটি স্বরকে তিনি যেভাবে দীর্ঘ সময় ধরে জীবন্ত করে তোলেন, তা ধ্রুপদ শিখিয়েদের জন্য একটি আকর গ্রন্থ।

২. ডাগর ব্রাদার্স – উস্তাদ নাসির মইনুদ্দিন ও উস্তাদ নাসির আমিনুদ্দিন ডাগর (ডাগর বাণী): বন্দিশ: “প্রীতম পরশ মণি”। দুই ভাইয়ের যুগলবন্দীতে ইমনের আলাপ এবং ধ্রুপদ গায়নশৈলী এই রাগের গাম্ভীর্যকে এক আধ্যাত্মিক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এটি ইমনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধ্রুপদ দলিল।

৩. পণ্ডিত সিয়া রাম তেওয়ারি (দারভাঙ্গা ঘরানা): দারভাঙ্গা ঘরানার নিজস্ব ঢঙে গাওয়া ইমনের ধ্রুপদ। তাঁর গায়কিতে লয়কারী এবং ছন্দের যে বিশেষ কাজ দেখা যায়, তা ডাগর বাণীর চেয়ে কিছুটা ভিন্ন এবং ওজস্বী।

৪. উস্তাদ সাঈদউদ্দীন ডাগর (ডাগর বাণী): আলাপ ও চৌতাল: ইমনের স্নিগ্ধতা এবং শান্ত রূপটি তাঁর কণ্ঠে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। ধ্রুপদের আদি গায়কিতে ইমনের কড়ি মধ্যমের প্রয়োগ তাঁর এই রেকর্ডিংয়ে দেখার মতো।

৫. গুন্ডেচা ব্রাদার্স – পণ্ডিত উমাকান্ত ও রমাকান্ত গুন্ডেচা (ডাগর বাণী):  “অন্তরজামী ভগবান”। আধুনিক সময়ে ধ্রুপদকে বিশ্বদরবারে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে তাঁদের এই ইমনের রেকর্ডিংটি অত্যন্ত প্রভাবশালী। দুই ভাইয়ের কণ্ঠের নিখুঁত টিউনিং ইমনের প্রশান্তিকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলে।

 

যন্ত্রে ইমন [ Raga Yaman on Instrument ]:

এবার শুনে আসব যন্ত্রসঙ্গীতে ইমন। বিভিন্ন শিল্পী বিভিন্ন যন্ত্রে বাজিয়েছেন এ রাগ। তার কিছু যুক্ত করলাম।

সুরবাহারে ইমন [ Raga Yaman on Surbahar ]:

ইমন রাগের গাম্ভীর্য এবং এর বিস্তৃতি বোঝার জন্য সুরবাহার একটি অতুলনীয় বাদ্যযন্ত্র। সেতারের চেয়ে এর গম্ভীর ধ্বনি এবং দীর্ঘ মিড় (Meend) ইমনের আলাপের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। নিচে বিভিন্ন ঘরানার ৫টি বিখ্যাত এবং ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সুরবাহার রেকর্ডিংয়ের তালিকা দেওয়া হলো:

১. ওস্তাদ এনায়েত খাঁ (ইমদাদখানি/এটাওয়া ঘরানা): বর্তমান সেতার ও সুরবাহার বাদনের আধুনিক রূপকার ওস্তাদ বিলায়েত খাঁ সাহেবের পিতা। তাঁর গাওয়া বা বাজানো ইমনের আলাপ এবং জোড় (Jor) সুরবাহারের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। তাঁর আঙুলের কাজে ইমনের কড়ি মধ্যমের স্নিগ্ধতা এক অনন্য মাত্রা পায়।

২. ওস্তাদ মুশতাক আলী খাঁ (জয়পুর-সেনিয়া ঘরানা): সেনিয়া ঘরানার বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন। তাঁর সুরবাহারে ইমনের আলাপ অত্যন্ত ধীরস্থির এবং প্রতিটি স্বরবিন্যাস শাস্ত্রীয় ব্যাকরণ মেনে করা। তাঁর বাজানো ইমনের বিলম্বিত অংশটি সুরবাহার শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আদর্শ উদাহরণ।

৩. বিদুষী অন্নপূর্ণা দেবী (মাইহার ঘরানা): বাবা আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের কন্যা এবং পণ্ডিত রবিশঙ্করের প্রথম স্ত্রী। তিনি জনসমক্ষে খুব কম বাজাতেন, তবে তাঁর ব্যক্তিগত রেকর্ডিংয়ে ইমনের যে রূপ পাওয়া যায়, তা অলোকসামান্য। সুরবাহারের গম্ভীর নাদ এবং তাঁর দীর্ঘ মিড়ের কাজ ইমনের আধ্যাত্মিক দিকটি ফুটিয়ে তোলে।

৪. ওস্তাদ ইমরত খাঁ (ইমদাদখানি/এটাওয়া ঘরানা): ওস্তাদ বিলায়েত খাঁ সাহেবের ছোট ভাই। তিনি সুরবাহারকে বিশ্বদরবারে নতুন করে চিনিয়েছেন। তাঁর বাজানো ‘রাগ যমন’ (ইমন)-এর দীর্ঘ আলাপ এবং ঝালা সুরবাহারের সক্ষমতাকে প্রমাণ করে। তাঁর রেকর্ডিংগুলোতে ইমনের আভিজাত্য স্পষ্ট।

৫. ওস্তাদ ইরশাদ খাঁ (ইমদাদখানি ঘরানা): ওস্তাদ ইমরত খাঁ সাহেবের পুত্র। সমসাময়িককালে সুরবাহার বাদনে তিনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ। তাঁর রেকর্ডিংয়ে ইমনের প্রাচীন ঐতিহ্যের সাথে আধুনিক সূক্ষ্ম কাজের মেলবন্ধন দেখা যায়। বিশেষ করে ইমনের ‘নি রে গা’ স্বরের প্রসারণ তাঁর বাজনায় অত্যন্ত শ্রুতিমধুর।

 

সেতারে ইমন [ Raga Yaman on Sitar ]:

১. পণ্ডিত রবি শঙ্কর (মাইহার ঘরানা): মাইহার ঘরানার বিশেষত্ব অনুযায়ী এতে ইমনের শান্ত ও গম্ভীর রূপ ফুটে ওঠে। তাঁর আলাপ এবং জোড়-এর কাজ ইমনের প্রতিটি স্বরকে অত্যন্ত নিপুণভাবে প্রকাশ করে। বিশেষ করে তাঁর মূর্তকি এবং তানের বুনোট বিশ্বজুড়ে সেতার প্রেমীদের কাছে আদর্শ।

২. ওস্তাদ বেলায়েত খাঁ (ইমদাদখানি বা ইটাওয়া ঘরানা): ইমদাদখানি ঘরানার সিগনেচার স্টাইল হচ্ছে ‘গায়কী অঙ্গ’। বেলায়েত খাঁ সাহেবের সেতারে ইমন শুনলে মনে হয় কোনো কণ্ঠশিল্পী গাইছেন। তাঁর ‘মিড়’ এবং ‘তানকারী’ ইমনের রোমান্টিক রূপটিকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়।

৩. ওস্তাদ নিখিল ব্যানার্জী (মাইহার ঘরানা): লাইভ ইন মিউনিখ বা অল ইন্ডিয়া রেডিও। তিনি রবি শঙ্করের মাইহার ঘরানা এবং ইটাওয়া ঘরানার গায়কী অঙ্গের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন। নিখিল ব্যানার্জীর ইমনে এক ধরনের আধ্যাত্মিক নির্জনতা পাওয়া যায়। তাঁর আলাপের গাম্ভীর্য এবং দ্রুত লয়ের নিখুঁত তান ইমনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।

৪. ওস্তাদ শাহিদ পারভেজ খাঁ (ইটাওয়া ঘরানা): বিভিন্ন কনসার্ট রেকর্ডিং।বর্তমান সময়ের সেতার বাদকদের মধ্যে তাঁর ঘরানাদার গায়কী ও বিদ্যুৎগতিসম্পন্ন তান অতুলনীয়। ইমনের শুদ্ধতা বজায় রেখে তিনি যেভাবে তালের ওপর কাজ করেন, তা ইটাওয়া ঘরানার আধুনিক ও শক্তিশালী রূপ প্রকাশ করে।

৫. পণ্ডিত নিখিল ঘোষ বা পণ্ডিত বুধাদিত্য মুখার্জী (ইমদাদখানি ঘরানা): পণ্ডিত বুধাদিত্য মুখার্জীর সেতারে ইমনের কাজগুলো অত্যন্ত সূক্ষ্ম। তাঁর দ্রুত গতির ঝালা এবং নিখুঁত স্বরক্ষেপণ ইমনের উজ্জ্বলতাকে বাড়িয়ে দেয়।

 

সারোদে ইমন:

রাগ ইমনের গাম্ভীর্য এবং এর বিস্তৃতি সারোদ যন্ত্রে এক অনন্য মাত্রা পায়। সারোদের ‘বাজ’ বা বাদনশৈলীর ভিন্নতা বুঝতে বিভিন্ন ঘরানার অগ্রজ শিল্পীদের রেকর্ডিং শোনা অত্যন্ত জরুরি।

১. ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ (মাইহার ঘরানা): মাইহার ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা এবং আধুনিক সারোদের রূপকার। তাঁর গাওয়া ও বাজানো ইমনের রেকর্ডিংয়ে ধ্রুপদী গাম্ভীর্য এবং ‘জোড়-আলাপ’-এর শুদ্ধ রূপ পাওয়া যায়। তিনি ইমনকে অত্যন্ত আধ্যাত্মিক এবং শৃঙ্খলিতভাবে উপস্থাপন করতেন।

২. ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ (মাইহার ঘরানা): তাঁর গাওয়া বা বাজানো ইমন (যমন) বিশ্ববিখ্যাত। বিশেষ করে তাঁর ‘যমন কল্যাণ’-এর রেকর্ডিংগুলো সারোদ বাদনের ইতিহাসে মাইলফলক। তাঁর মিড় এবং গিটকিরি কাজ ইমন রাগের করুণ ও রোমান্টিক রসকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

৩. ওস্তাদ হাফিজ আলী খাঁ (সেনিয়া-বঙ্গশ ঘরানা): গোয়ালিয়র ঘরানার এই দিকপাল শিল্পী এবং আমজাদ আলী খাঁ সাহেবের পিতা। তাঁর বাজানো ইমনে সেনিয়া ঘরানার প্রাচীন আভিজাত্য এবং ঠুমরি অঙ্গের লালিত্য পাওয়া যায়। তাঁর ‘একহারা তান’ এবং দরাজ হাতের কাজ ইমনে এক রাজকীয় আমেজ তৈরি করে।

৪. ওস্তাদ আমজাদ আলী খাঁ (সেনিয়া-বঙ্গশ ঘরানা): তাঁর ইমনের রেকর্ডিংগুলো (বিশেষ করে দ্রুত তিতাল) অত্যন্ত জনপ্রিয়। তিনি ইমনের চলনে গায়কী অঙ্গের (Vocal style) যে প্রয়োগ ঘটান, তা সারোদকে মানুষের হৃদয়ের খুব কাছে নিয়ে আসে। তাঁর ইমনে বীরত্ব এবং কোমলতার এক অদ্ভুত ভারসাম্য থাকে।

৫. পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত (শাহজাহানপুর ঘরানা): শাহজাহানপুর ঘরানার এই পণ্ডিতের ইমনের রেকর্ডিংগুলো শাস্ত্রীয় বিশুদ্ধতার জন্য পরিচিত। তাঁর বাজানোয় ইমনের ‘নি রে গা’ এবং ‘পা রে’ এর কাজগুলো খুব গাণিতিক এবং নিখুঁত। যারা ইমনের ব্যাকরণ শিখতে চান, তাঁদের জন্য তাঁর বাদন একটি শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

 

বীণাতে ইমন:

রাগ ইমনে কণ্ঠসঙ্গীতের পাশাপাশি যন্ত্রসঙ্গীত, বিশেষ করে ‘বীণা’ বাদন এক অনন্য উচ্চতা লাভ করেছে। বীণার গম্ভীর ও মন্দ্র ধ্বনি ইমনের শান্ত ও আধ্যাত্মিক রূপকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলে।

১. ওস্তাদ আসাদ আলী খাঁ (খাণ্ডারবানি ঘরানা – রুদ্র বীণা): রেকর্ডিং: আলাপ, জোড় ও ঝালা। ওস্তাদ আসাদ আলী খাঁ ছিলেন রুদ্র বীণার শেষ দিকপালদের একজন। তাঁর বাজানো ইমনে খাণ্ডারবানি ঘরানার বিশুদ্ধতা এবং মন্দ্র সপ্তকের কাজ অদ্ভুত এক গাম্ভীর্য তৈরি করে।

২. ওস্তাদ বাহাউদ্দিন ডাগর (ডাগরবাণী ঘরানা – রুদ্র বীণা): রেকর্ডিং: ধ্রুপদ অঙ্গ। তিনি বিখ্যাত বীণাকার ওস্তাদ জিয়া মহিউদ্দিন ডাগরের পুত্র। তাঁর বাজানো ইমনে ডাগরবাণী ঘরানার ধীরস্থির বিস্তার এবং সূক্ষ্ম শ্রুতিগুলোর ব্যবহার ইমনের এক ধ্যানমগ্ন রূপ প্রকাশ করে।

৩. ওস্তাদ জিয়া মহিউদ্দিন ডাগর (ডাগরবাণী ঘরানা – রুদ্র বীণা): রেকর্ডিং: পূর্ণাঙ্গ আলাপ। তিনি আধুনিক রুদ্র বীণাকে পুনর্জন্ম দিয়েছিলেন। তাঁর ইমনে অতি-বিলম্বিত লয়ের বিস্তার এবং দীর্ঘ মিড় (Glissando) ইমনের প্রতিটি স্বরকে জীবন্ত করে তোলে।

একটু কর্ণাটিক রুপ দেখুন:

১. জেয়ন্তী কুমারেশ (কর্ণাটকী শৈলী – সরস্বতী বীণা): রেকর্ডিং: রাগ কল্যাণী (কর্ণাটকী সঙ্গীতে ইমনের সমগোত্রীয় রাগ হলো কল্যাণী)। জয়ন্তী কুমারেশ বর্তমান সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সরস্বতী বীণা বাদক। কল্যাণী রাগে তাঁর পরিবেশনায় ইমনের উজ্জ্বল ও ভক্তি রস অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে ফুটে ওঠে।

২. এস. বালাসন্দর (কর্ণাটকী শৈলী – সরস্বতী বীণা): রেকর্ডিং: রাগ কল্যাণী – তনম ও কৃতি। দক্ষিণ ভারতীয় বীণা বাদনের কিংবদন্তি বালাসন্দরের বাজানো কল্যাণী (ইমন) রাগের গमक (Gamaka) এবং দ্রুত তানগুলো বীণা শাস্ত্রের এক অনন্য উদাহরণ।

 

সারেঙ্গীতে ইমন:

সারেঙ্গী বাদনে রাগ ইমনের গাম্ভীর্য এবং মানুষের কণ্ঠের মতো সূক্ষ্ম মিড় ও তান ফুটিয়ে তোলা এক অনন্য সাধনা।

১. ওস্তাদ সুলতান খাঁ (সিকার ঘরানা): তাঁর গাওয়া ও বাজানো এই ট্র্যাকে ইমনের কড়ি মধ্যমের স্নিগ্ধতা এবং রাজস্থানি লোকজ প্রভাবের এক অপূর্ব মেলবন্ধন লক্ষ্য করা যায়।

২. পণ্ডিত রাম নারায়ণ: ইমনের শুদ্ধতা বজায় রেখে সারেঙ্গীকে একক বাদ্যযন্ত্র হিসেবে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর এই ধ্রুপদী রেকর্ডিংটি একটি মাইলফলক।

৩. ওস্তাদ সাকুর খাঁ (কেরানা ঘরানা): তাঁর ইমনে কেরানা ঘরানার গায়কির অনুকরণে তৈরি দীর্ঘ মিড় এবং শান্ত বিস্তার সারেঙ্গী বাদ্যে এক আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি করে।

৪. ওস্তাদ সাবরি খাঁ (সৈনিয়া ঘরানা): ইমনের দ্রুত তানের কাজ এবং গিটকারির নিখুঁত প্রয়োগ তাঁর এই রেকর্ডিংটিকে সারেঙ্গী বাদনের একটি শক্তিশালী উদাহরণে পরিণত করেছে।

৫. ওস্তাদ বুন্দু খাঁ (দিল্লি ঘরানা): সারেঙ্গীর ছোট ছোট তান এবং রাগের সূক্ষ্ম গাণিতিক কারুকাজ ইমনের এই প্রাচীন ও দুর্লভ রেকর্ডিংটিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

 

বাঁশিতে ইমন:

বাঁশিতে রাগ ইমনের গাম্ভীর্য ও মাধুর্য ফুটিয়ে তোলা ছয়জন কিংবদন্তি বাদকের বিখ্যাত রেকর্ডিংয়ের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

১. পণ্ডিত পান্নালাল ঘোষ: বাঁশিতে বড় আকারের ‘বাঁশরী’ প্রবর্তন করে রাগ ইমনের শাস্ত্রীয় রূপ ও গাম্ভীর্য ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর এই রেকর্ডিংটি আদি ও অকৃত্রিম ভিত্তি হিসেবে গণ্য হয়।

২. পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া: তাঁর জাদুকরী ফুঁৎকারে ইমনের দীর্ঘ মিড় ও তানের বিস্তার এই রেকর্ডিংটিকে আধুনিক বাঁশি বাদনের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও মধুরতম উদাহরণে পরিণত করেছে।

৩. পণ্ডিত এন রমণী (ড. এন রমণী): দক্ষিণ ভারতীয় কর্ণাটকী বংশীবাদনের এই মহাগুরু তাঁর ‘বেণু’ বাঁশিতে ইমনের সমগোত্রীয় রাগ ‘কল্যাণী’র যে কাজ দেখিয়েছেন, তা শাস্ত্রীয় সংগীতে এক বিরল সংযোগ।

৪. পণ্ডিত বিজয় রাঘব রাও: পান্নালাল ঘোষের সুযোগ্য শিষ্য হিসেবে তাঁর বাজানো ইমনে বিশুদ্ধ শাস্ত্রীয় কাঠামোর পাশাপাশি চমৎকার গাণিতিক তানের বুনোট লক্ষ্য করা যায়।

৫. পণ্ডিত রঘুনাত শেঠ: বাঁশিতে নিজস্ব উদ্ভাবনী চাবি (key) ও কৌশলের মাধ্যমে ইমনের অতি সূক্ষ্ম শ্রুতিগুলোর প্রয়োগ তাঁর এই রেকর্ডিংকে এক অনন্য গায়কি প্রদান করেছে।

৬. পণ্ডিত ভেঙ্কটেশ গোডখিন্ডি: বাঁশিতে ইমনের দ্রুত গত্ এবং জটিল স্বরবিন্যাসের এই রেকর্ডিংটি তাঁর অসামান্য নিয়ন্ত্রণ ও আধুনিক কারিগরি দক্ষতার পরিচয় দেয়।

 

এস্রাজে ইমন:

এস্রাজ বাদ্যে রাগ ইমনের মরমী এবং গায়কি প্রধান রূপটি ফুটিয়ে তোলা পাঁচজন বিশিষ্ট শিল্পীর রেকর্ডিংয়ের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

১. পণ্ডিত বিশ্বনাথ আচার্য: শান্তিনিকেতন ঘরানার এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পীর এস্রাজ বাদনে রাগ ইমনের বিশুদ্ধ শাস্ত্রীয় কাঠামো এবং মিড়ের কাজ এস্রাজ বাদ্যের এক অনন্য ধ্রুপদী দলিল।

২. শুভায়ু সেন মজুমদার: বর্তমান সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই এস্রাজ বাদকের ইমনে রাগটির রোমান্টিকতা এবং রবীন্দ্র-ভাবধারার এক অপূর্ব আধুনিক ও সুমধুর প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়।

৩. পণ্ডিত রণবীর জৈন: এস্রাজে ইমনের অতি সূক্ষ্ম শ্রুতি ও গতির সংমিশ্রণে তাঁর এই রেকর্ডিংটি শাস্ত্রীয় গায়কির এক সার্থক প্রতিচ্ছবি।

৪. আরশাদ খাঁ (কাসুর-পাতিয়ালা): এস্রাজের আদি রূপ ‘দিলরুবা’ বাদ্যে ইমনের বিলম্বিত ও দ্রুত গতের এই বাজনাটি এই বাদ্যযন্ত্রের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও কারিগরি দক্ষতা তুলে ধরে।

৫. আবির হোসেন: বর্তমান প্রজন্মের এই দক্ষ শিল্পীর এস্রাজ বাদনে ইমনের রাগের বিস্তার এবং সরোদের মতো গাম্ভীর্যপূর্ণ অলঙ্কার প্রয়োগ এক আধুনিক ও শ্রুতিমধুর পরিবেশনা।

 

দিলরুবাতে ইমন:

দিলরুবা এবং এস্রাজ যন্ত্র দুটির গঠনগত সাদৃশ্য থাকলেও তাদের বাদনশৈলীতে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে।

১. ওস্তাদ পাণ্ডুরং গায়কওয়াড (দিলরুবা): দিলরুবায় রাগ ইমনের ধ্রুপদী রূপ প্রকাশে তাঁর রেকর্ডিংটি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে গায়ন ও বাদনশৈলীর এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে।

২. বিদুষী আর্শিয়া শেঠী (দিলরুবা): বর্তমান প্রজন্মের এই শিল্পীর দিলরুবায় ইমনের পরিবেশনা যন্ত্রটির সূক্ষ্ম আওয়াজ এবং রাগের রোমান্টিক আবেগকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলে।

৩. পণ্ডিত দাকশিনামূর্তি পিল্লাই (দিলরুবা/তবল-তরঙ্গ): পুরনো আমলের এই বিরল রেকর্ডিংটিতে দিলরুবায় ইমনের প্রাচীন ও গম্ভীর চলনটি শাস্ত্রীয় সংগীতের গবেষকদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান।

 

রাগ ইমনে যুগলবন্দী:

রাগ ইমনে দুই বা ততোধিক যন্ত্র বা কণ্ঠের মিলন অর্থাৎ যুগলবন্দী (Jugalbandi) এক অপূর্ব শোভাবর্ধন করে। নিচে বিভিন্ন ঘরানা ও বাদ্যযন্ত্রের সমন্বয়ে রাগ ইমনের বিখ্যাত কিছু যুগলবন্দী রেকর্ডিংয়ের তালিকা দেওয়া হলো:

১. পণ্ডিত রবিশঙ্কর (সেতার) ও ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ (সরোদ): উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের এই দুই মহারথীর ইমনে করা যুগলবন্দীটি রাগের ‘সওয়াল-জওয়াব’ এবং তানের বুনোটের এক ঐতিহাসিক দলিল।

২. পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া (বাঁশি) ও পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা (সন্তুর): ‘শিব-হরি’ জুটির এই ইমনে বাঁশির মিড় ও সন্তুরের ঝংকারের সমন্বয় সন্ধ্যার রোমান্টিক আবহকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

৩. ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ (সানাই) ও পণ্ডিত ভি. জি. জোগ (বেহালা): সানাইয়ের করুণ সুর ও বেহালার সূক্ষ্ম কাজের এই যুগলবন্দীটি ইমনের গায়ন-অঙ্গকে যন্ত্রসংগীতে সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

৪. ওস্তাদ আমানত আলী খাঁ ও ওস্তাদ ফতেহ আলী খাঁ (কণ্ঠ): পাটিয়ালা ঘরানার এই দুই ভাইয়ের গাওয়া ইমনের দ্রুত তান ও সারগামের যুগলবন্দীটি শাস্ত্রীয় গায়কীর ক্ষিপ্রতা ও শক্তির এক চূড়ান্ত নিদর্শন।

৫. পণ্ডিত রাজন মিশ্র ও পণ্ডিত সাজন মিশ্র (কণ্ঠ): বেনারস ঘরানার এই ভ্রাতৃদ্বয়ের ইমনে করা বিলম্বিত ও দ্রুত খেয়ালটি দুই কণ্ঠের অসাধারণ তালমিল ও আধ্যাত্মিক গভীরতার জন্য বিখ্যাত।

৬. পণ্ডিত এন. রাজম (বেহালা) ও ড. এন. রমণী (বাঁশি): উত্তর ও দক্ষিণ ভারতীয় শৈলীর সংমিশ্রণে ইমনের (কল্যাণী) এই যুগলবন্দীটি বেহালা ও বাঁশির সংলাপে এক অনন্য মাধুর্য তৈরি করেছে।

৭. ওস্তাদ সুলতান খাঁ (সারেঙ্গী) ও ওস্তাদ জাকির হোসেন (তবলা): যদিও তবলা মূলত সঙ্গতকারী, তবে এই রেকর্ডিংয়ে সারেঙ্গীর ইমনের সাথে তবলার যে ছন্দময় কথোপকথন ঘটেছে, তা একক বাদনের মতোই যুগলবন্দী হিসেবে সমাদৃত।

 

ঘোষনা:

শিল্পীদের নাম উল্লেখের ক্ষেত্রে আগে জ্যৈষ্ঠ-কনিষ্ঠ বা অন্য কোন ধরনের ক্রম অনুসরণ করা হয়নি। শিল্পীদের সেরা রেকর্ডটি নয়, বরং ইউটিউবে যেটি খুঁজে পাওয়া গেছে সেই ট্রাকটি যুক্ত করা হল। লেখায় উল্লেখিত বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত যেসব সোর্স থেকে সংগৃহীত সেগুলোর রেফারেন্স ব্লগের বিভিন্ন যায়গায় দেয়া আছে। শোনার/পড়ার সোর্সের কারণে তথ্যের কিছু ভিন্নতা থাকতে পারে। আর টাইপ করার ভুল হয়ত কিছু আছে। পাঠক এসব বিষয়ে উল্লেখে করে সাহায্য করলে কৃতজ্ঞ থাকবো।

*** এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান ……। আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।

 

শ্রোতা সহায়িকা নোট সিরিজে আজকের রাগ – রাগ ইমন এবং ইমন কল্যাণ [ Raga Yaman, Eman, Aiman, Yaman-Kalyan] ।  এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আপডেট পেতে আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।

 

আরও দেখুন:

Leave a Comment