ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সুবিশাল ভৈরব পরিবারের একটি অত্যন্ত দুর্লভ এবং আধ্যাত্মিক ভাবোদ্দীপক রাগ হলো রাগ কবিরী ভৈরব (Kabiri Bhairav)। এটি মূলত একটি মিশ্র রাগ, যা তার গম্ভীর চলন এবং ভক্তি রসের জন্য বিদগ্ধ মহলে সমাদৃত। এই রাগটি মূলত সাধক কবি কবিরের নামের সাথে সম্পৃক্ত বলে মনে করা হয়, যার গানে নির্গুণ ভক্তি এবং বৈরাগ্যের সুর প্রধান ছিল।
রাগ কবিরী ভৈরব
রাগ কবিরী ভৈরব-এর পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস
রাগ কবিরী ভৈরব মূলত ভৈরব এবং আসাভরী—এই দুটি রাগের এক অপূর্ব শৈল্পিক সংমিশ্রণ। অনেক সংগীতজ্ঞের মতে, এতে ‘জৌনপুরী’ বা ‘দেশী’ রাগেরও সামান্য ছায়া লক্ষ্য করা যায়। এই রাগের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর চলনে ভৈরব রাগের কোমল ঋষভ (রে) এবং আসাভাবরী বা কবিরী অঙ্গের কোমল গান্ধার (গা), কোমল ধৈবত (ধা) ও কোমল নিষাদ (নি)-এর শৈল্পিক প্রয়োগ।
ঐতিহাসিকভাবে, এই রাগটি বিভিন্ন ঘরানার ওস্তাদ ও পণ্ডিতদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফসল। এটি মূলত নির্গুণ ভজন বা আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্য প্রকাশের জন্য সৃষ্ট। এই রাগের চলনে ভৈরবের মতো ঋষভ ও ধৈবতের ওপর আন্দোলন থাকলেও, কোমল গান্ধারের ব্যবহার একে এক বিশেষ মরমী রূপ দান করে। এটি একটি ‘সন্ধিপ্রকাশ’ রাগ, যা প্রাতঃকালে পরিবেশিত হয়। এই রাগে শান্ত, ভক্তি ও বৈরাগ্য রসের এক অনন্য মেলবন্ধন লক্ষ্য করা যায়, যা শ্রোতাকে এক ধ্যানমগ্ন স্তরে নিয়ে যায়।
রাগের শাস্ত্র
- ঠাট: ভৈরব।
- জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহে ৭টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- আরোহ: স র গ ম প ধ ন স।
- অবরোহ: স ন ধ প ম গ র স [এখানে গান্ধার, ধৈবত ও নিষাদ কোমল হওয়ায় কবিরী বা আসাভাবরী অঙ্গ স্পষ্ট হয়]।
- বাদী স্বর: ধ (কোমল ধৈবত)।
- সমবাদী স্বর: র (কোমল ঋষভ)।
- বর্জিত স্বর: কোনো স্বর বর্জিত নয়।
- ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ, গান্ধার, ধৈবত এবং নিষাদ — এই চারটি স্বরই কোমল ব্যবহৃত হয়। বাকি সব স্বর (সা, মা, পা) শুদ্ধ।
- সময়: প্রাতঃকাল (ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত)।
- প্রকৃতি: অত্যন্ত গম্ভীর, বৈরাগ্য ও ভক্তি রসপ্রধান।
সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ
- রাগ ভৈরব: কবিরী ভৈরবের মূল আধার এবং প্রধান অঙ্গ রাগ।
- রাগ আসাভাবরী: এই রাগের কোমল গান্ধার, ধৈবত ও নিষাদের চলন কবিরী ভৈরবে বিদ্যমান।
- রাগ বিরাট ভৈরব: স্বর বিন্যাসে মিল থাকলেও বিরাট ভৈরবের চলন ও গাম্ভীর্য অনেক বেশি বিস্তৃত।
- রাগ শিবমত ভৈরব: উভয় রাগে ভৈরব অঙ্গ থাকলেও শিবমত ভৈরবে শিবরঞ্জনীর প্রভাব থাকে।
- রাগ অহির্ ভৈরব: উভয় রাগে কোমল ঋষভ ও কোমল নিষাদ থাকলেও অহির্ ভৈরবে গান্ধার শুদ্ধ থাকে।
- রাগ জৌনপুরী: অবরোহের কিছু অংশে জৌনপুরীর মতো স্বরক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়।
রাগ কবিরী ভৈরব হলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সেই নিভৃত সুর যা মানুষের অন্তরাত্মার গভীর ব্যাকুলতাকে স্পর্শ করে। ভৈরবের আভিজাত্য আর কবিরী অঙ্গের বৈরাগ্য—এই দুয়ের সার্থক মিলনই হলো এই রাগ। সঠিক আলাপ ও মীড়-গমকের ব্যবহারের মাধ্যমে এই রাগটি যখন গীত হয়, তখন তা কেবল গান থাকে না, তা এক ধরণের আধ্যাত্মিক প্রার্থনায় পরিণত হয়। যদিও আধুনিক সংগীতের আসরগুলোতে এই রাগের চর্চা অত্যন্ত সীমিত, তবুও এর তাত্ত্বিক ও শৈল্পিক গভীরতা সংগীতের গবেষক ও প্রকৃত সাধকদের কাছে চিরকাল অম্লান থাকবে।
তথ্যসূত্র:
১. পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — ‘হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতি’ (খণ্ড ৪): বিরল এবং জটিল মিশ্র রাগসমূহের ব্যাকরণগত বিশ্লেষণের জন্য।
২. বসন্ত — ‘সংগীত বিশারদ’ (Sangeet Karyalaya): রাগের বাদী-সমবাদী এবং জাতি নির্ধারণের নির্ভরযোগ্য উৎস।
৩. বিমলকান্ত রায় চৌধুরী — ‘ভারতীয় সংগীতকোষ’: মিশ্র রাগসমূহের পরিচয় ও নামকরণের ঐতিহাসিক রেফারেন্স।
৪. Joep Bor — ‘The Raga Guide’: আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাগের তথ্যকোষ ও স্বর বিন্যাস যাচাইয়ের জন্য।
৫. পণ্ডিত ওমকারনাথ ঠাকুর — ‘প্রণব ভারতী’: রাগের রসতাত্ত্বিক ও গায়নশৈলী সংক্রান্ত তাত্ত্বিক আলোচনার প্রামাণ্য গ্রন্থ।
আরও দেখুন: