রাগ কিরওয়ানি । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

শ্রোতা সহায়িকা নোট সিরিজে আজকের রাগ – রাগ কিরওয়ানি।  এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আপডেট পেতে আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।

রাগ কিরওয়ানি

রাগ কিরওয়ানি

কিরওয়ানি অপেক্ষাকৃত নতুন রাগ। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের এক মায়াবী এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় রাগের নাম রাগ কিরওয়ানি (Kirwani)। এই রাগটি মূলত দক্ষিণ ভারতীয় বা কর্ণাটকী সংগীত পদ্ধতি থেকে হিন্দুস্তানি সংগীতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এর সুরের মধ্যে যেমন এক ধরণের বিষণ্ণতা আছে, তেমনই আছে এক গভীর মরমী আকর্ষণ। আধুনিক সময়ে এই রাগটি কেবল শাস্ত্রীয় সংগীতের আসরেই নয়, বরং চলচ্চিত্র সংগীত এবং গজল গায়কিতেও অত্যন্ত জনপ্রিয়।

রাগ কিরওয়ানির পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস

রাগ কিরওয়ানি মূলত কর্ণাটকী সংগীতের ২১তম মেলকর্তা রাগ। হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতিতে একে সাধারণত কাফী বা পিিলু ঠাটের কাছাকাছি মনে করা হলেও, এর স্বরবিন্যাস আসলে পাশ্চাত্য সংগীতের ‘হারমনিক মাইনর স্কেল’-এর (Harmonic Minor Scale) সাথে হুবহু মিলে যায়। এই কারণেই এই রাগটি বিশ্বজুড়ে সংগীতজ্ঞদের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত।

ঐতিহাসিকভাবে, গত শতাব্দীতে দক্ষিণ ভারত থেকে আসা মহান সংগীতজ্ঞদের মাধ্যমে উত্তর ভারতের হিন্দুস্তানি সংগীতে এর ব্যাপক প্রচলন ঘটে। এই রাগের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর স্বরের সরলতা এবং আবেগপ্রবণতা। এতে কোনো স্বরই বর্জিত নয়, ফলে এটি একটি সম্পূর্ণ জাতিভুক্ত রাগ। কিরওয়ানির চলনে এক ধরণের আর্তি এবং আধ্যাত্মিক আকুলতা লক্ষ্য করা যায়। এটি মূলত মধ্যরাত্রির রাগ হিসেবে পরিচিত হলেও, বর্তমান সময়ে এর জনপ্রিয়তার কারণে এটি যেকোনো সময়ের আসরেই সমানভাবে সমাদৃত।

রাগের শাস্ত্র

  • ঠাট: কর্ণাটকী পদ্ধতির ২১তম মেলকর্তা (হিন্দুস্তানি পদ্ধতিতে অনেকে একে কাফী ঠাটের অন্তর্ভুক্ত করেন)।
  • জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহে ৭টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ: সা রে জ্ঞা মা পা দা না র্সা
  • অবরোহ: র্সা না দা পা মা জ্ঞা রে সা
  • পকড় (মুখ্য চলন): না দা পা মা জ্ঞা রে সা , ন্ সা রে জ্ঞা
  • বাদী স্বর: রে (শুদ্ধ ঋষভ) বা পা (পঞ্চম)।
  • (মতভেদে অনেকে ঋষভকে বাদী এবং পঞ্চমকে সমবাদী মনে করেন)

  • সমবাদী স্বর: পা (পঞ্চম) বা রে (শুদ্ধ ঋষভ)।
  • বর্জিত স্বর: কোনো স্বর বর্জিত নয়।
  • ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ (রে), মধ্যম (মা), পঞ্চম (পা) এবং নিষাদ (না) শুদ্ধ; গান্ধার (জ্ঞা) এবং ধৈবত (দা) কোমল
  • (বিশেষত্ব: এই রাগের আরোহ ও অবরোহ উভয় ক্ষেত্রে শুদ্ধ নিষাদ ব্যবহৃত হয়, যা একে সাধারণ কাফী থেকে আলাদা করে)

  • সময়: মধ্যরাত্রি (রাত ১২টা থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত)।
  • প্রকৃতি: অত্যন্ত করুণ, রোমান্টিক এবং গভীর ভাবগম্ভীর।

সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ

  • রাগ পিলু: পিলু রাগের মিশ্র রূপের সাথে কিরওয়ানির অনেক স্বরের মিল পাওয়া যায়।
  • রাগ শিবরঞ্জনী: শিবরঞ্জনীতে ম ল ও নি বর্জিত থাকে, কিন্তু কিরওয়ানির সাথে এর করুণ রসের মিল আছে।
  • রাগ কাফী: কাফী রাগের সাথে স্বরের মিল থাকলেও কিরওয়ানির শুদ্ধ নিষাদ একে পৃথক করে।
  • রাগ দরবারী কানাড়া: গাম্ভীর্যের বিচারে দরবারীর সাথে এর কিছুটা মানসিক সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়।
  • রাগ চন্দ্রকোষ: কিছু বিশেষ তানে চন্দ্রকোষের ছায়া থাকলেও কিরওয়ানির ঋষভ ও পঞ্চম একে স্বাতন্ত্র্য দেয়।

রাগ কিরওয়ানি হলো সেই বিরল সুর যা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সুরের মাঝখানে এক সেতুবন্ধন তৈরি করেছে। এর স্বর বিন্যাস এতই নিখুঁত যে এটি মানুষের অবচেতন মনে এক ধরণের বিষাদমাখা আনন্দ দেয়। এর করুণ এবং মরমী সুর আমাদের হৃদয়ের গভীরতম কোণে এক অনির্বচনীয় প্রশান্তি এনে দেয়। কিরওয়ানি দারুণ আধুনিক একটু রাগ। আবার চট করে টেনে ধরতে পারবে একটি রাগ।

 

 

SufiFaruq.com Logo 252x68 3 রাগ কিরওয়ানি । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

 

 

চলুন, আরও রাগের তাত্ত্বিক আলোচনায় যাওয়ার আগে রাগ কিরওয়ানির ছাঁচে তৈরি কিছু গান-বাজনা শুনে নেওয়া যাক। কারণ নতুন কানে কেবল শাস্ত্রীয় ব্যাকরণ বা স্বরলিপি দিয়ে একটি রাগ চেনা প্রায় অসম্ভব। একটি রাগের মূল কাঠামো হৃদয়ে গেঁথে নেওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো সেই রাগের ওপর ভিত্তি করে তৈরি বিভিন্ন জনপ্রিয় গান ও সুর শোনা।

যখন আপনি নিয়মিত একই রাগের ওপর নির্মিত নানা কম্পোজিশন শুনবেন, তখন আপনার কান সেই রাগের বিশেষ চলন, স্বরের বিন্যাস এবং সূক্ষ্ম মোচড়গুলোর সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠবে। এই শ্রবণের অভ্যস্ততাই আপনাকে এমন এক সক্ষমতা দেবে, যাতে ভবিষ্যতে নতুন কোনো গান শোনার সময় যদি সেটি এই রাগের ওপর ভিত্তি করে হয়, তবে আপনি নিজে থেকেই তা চিনে নিতে পারবেন। শাস্ত্রের শুষ্ক নিয়মের চেয়ে সুরের এই ব্যবহারিক পরিচয়ই মূলত রাগের সাথে আমাদের আত্মিক সংযোগ তৈরি করে।

 

কন্ঠে কিরওয়ানি

কিরওয়ানির প্রভাব সহজে বুঝতে কিছু গান শুনতে পারেন। যেমন – একদিন পাখি উড়ে যাবে যে আকাশে – রাহুল দেব বর্মণের সৃষ্টি কিশোর কুমারের গাওয় এই গানটিও কিন্তু অনেকখানি কিরওয়ানি।

কাজী নজরুল ইসলামের গান ‘ফিরিয়া যদি সে আসে, আমারে খোঁজে ঝরা গোলাবে’।

একটু পুরনো গানবাজনা যারা শোনেন তারা হয়তো শুনেছে – বনে নয় মনে মোর পাখি আজ গান গায়। নচিকেতা ঘোষের সুরে, কথা লিখেছিলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, গেয়েছিলেন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়।
চোর চোর চোর – শিরনামে একটা গান বানিয়েছেন নচিকেতা চক্রবর্তী।

সুকুমার মিত্রের একটা ঠুমরী অনবদ্য কম্পোজিশন ‘যমুনা কি বলতে পারে কতবার কেঁদেছে রাধা … .’। খুব সুন্দর একটা কম্পোজিশন।

গজলে কিরওয়ানি পাবেন ওস্তাদ মেহেদি হাসান খানের “শোলা থা জ্বাল বুঝা হু” বা ওস্তাদ গোলাম আলীর “পারা পারা হুয়া প্যাহরান।

 

গজলে কিরওয়ানি:

গজল গায়কির ক্ষেত্রে রাগ কিরওয়ানি একটি অত্যন্ত প্রভাবশালি এবং জনপ্রিয় রাগ। এর কারণ হলো কিরওয়ানির সুরবিন্যাস (হারমনিক মাইনর স্কেল) বিরহ, আর্তি এবং রোমান্টিক আবেগকে খুব নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারে। প্রথিতযশা গজল শিল্পীরা এই রাগের ওপর ভিত্তি করে অসংখ্য কালজয়ী গজল গেয়েছেন। কিছু গজলগুলোর একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

১. শোলা থা জল বুঝা হুঁ (শিল্পী: মেহেদী হাসান, এটি কিরওয়ানি রাগের গাম্ভীর্য ও আর্তি প্রকাশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ)

২. বাত নিকলেগি তো ফির দূর তলক জায়েগি (শিল্পী: জগজিৎ সিং, কিরওয়ানি রাগের বিষণ্ণতা এই গজলের মূল প্রাণ)

৩. রঞ্জিশ হি সহি (শিল্পী: মেহেদী হাসান, মূলত এটি মিশ্র পিলু হলেও গায়কির প্রধান অংশ এবং তানে কিরওয়ানির ছায়া অত্যন্ত স্পষ্ট)

৪. দুনিয়া জিসে ক্যাহতে হ্যায় জাদুকর খিলোনা হ্যায় (শিল্পী: জগজিৎ সিং, শান্ত ও দার্শনিক মেজাজের কিরওয়ানি)

৫. প্যার কা পহেলা খত লিখনে মে ওয়াক্ত তো লাগতা হ্যায় (শিল্পী: জগজিৎ সিং, কিরওয়ানি রাগের একটি রোমান্টিক রূপ)

৬. ইয়াদ কিয়া দিল নে ক্যাহাঁ হো তুম (শিল্পী: তালাত মাহমুদ, তালাত মাহমুদের মখমলি কণ্ঠে কিরওয়ানির অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি কম্পোজিশন)

৭. তু নে মুঝসে প্যার কিয়া হ্যায় ইয়ে তো বহুত বড়ি বাত হ্যায় (শিল্পী: পঙ্কজ উদাস, সহজিয়া ভঙ্গিতে কিরওয়ানির চমৎকার প্রয়োগ)

৮. ফির হাত মে শরাব হ্যায় আভি উনকা গম ভি হ্যায় (শিল্পী: পঙ্কজ উদাস, কিরওয়ানি রাগের ওপর ভিত্তি করে বিরহী মেজাজের গজল)

৯. মুঝে তুমসে মহব্বত হ্যায় ইয়ে মেরা ফয়সালা হ্যায় (শিল্পী: হরিহরণ, আধুনিক গজল আঙ্গিকে কিরওয়ানির ব্যবহার)

১০. ক্যাহাঁ আকে রুকে থে রাস্তে (শিল্পী: জগজিৎ সিং, বিশুদ্ধ কিরওয়ানি রাগের ওপর তৈরি একটি গভীর বিষাদের গজল)

১১. সারে পিন্ড দি জান সি জহরা (শিল্পী: গুরুদাস মান, লোকজ আঙ্গিকে পাঞ্জাবি গজল যেখানে কিরওয়ানির কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে)

 

ভজনে রাগ কিরওয়ানি:

ভজন গায়কিতে রাগ কিরওয়ানি তার শান্ত, মরমী এবং সমর্পণের ভাবের জন্য অত্যন্ত সমাদৃত। এই রাগের শুদ্ধ ঋষভ ও কোমল গান্ধারের চলন ভক্তের মনের আকুলতাকে খুব সুন্দরভাবে প্রকাশ করে। প্রামাণ্য তথ্য এবং স্বরলিপি বিশ্লেষণ করে রাগ কিরওয়ানি-তে নিবদ্ধ বিখ্যাত ভজনগুলোর একটি চূড়ান্ত তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

১. পাও জি ম্যায়নে রাম রতন ধন পাও (শিল্পী: লতা মঙ্গেশকর; মীরাবাঈয়ের এই পদটি বিভিন্ন রাগে গাওয়া হলেও লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া সবচেয়ে জনপ্রিয় সংস্করণটি মূলত রাগ কিরওয়ানির কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি)

২. অচ্যুতম কেশবম কৃষ্ণ দামোদরম (শিল্পী: বিক্রম হাজরা; আধুনিক ভজন গায়কির অন্যতম জনপ্রিয় এই ভজনটি বিশুদ্ধ কিরওয়ানি রাগে নিবদ্ধ)

৩. নয়ন মে শ্যাম সমায়ো রে (শিল্পী: জগজিৎ সিং; ভক্তি রসের গভীরতা বোঝাতে জগজিৎ সিং এই ভজনে কিরওয়ানি রাগের কোমল ধৈবত ও শুদ্ধ নিষাদের চমৎকার প্রয়োগ করেছেন)

৪. শ্রী রামচন্দ্র কৃপালু ভজ মন (শিল্পী: বিভিন্ন; তুলসীদাসের এই স্তোত্রটি অনেক ক্ষেত্রে মিশ্র কিরওয়ানি বা কাফি রাগের আদলে গীত হয়)

৫. বোল রে পপিহরা (শিল্পী: বাণী জয়রাম; এটি একটি শাস্ত্রীয় চলচ্চিত্রের গান হলেও এর ভক্তিভাব ও রাগের শুদ্ধতার কারণে ভজন হিসেবে অনেক আসরে পরিবেশিত হয়)

৬. রাম নাম সুখদায়ী (শিল্পী: জগজিৎ সিং; এই ভজনটির অন্তরার চলন এবং তানে কিরওয়ানি রাগের স্পষ্ট ছাপ রয়েছে)

৭. হরে কৃষ্ণ হরে রাম (নাম-সংকীর্তন; আধুনিক ভক্তি সংগীতে এই কীর্তনটি কিরওয়ানি রাগের মেলকর্তা স্বরগুলো ব্যবহার করে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছে)

৮. বিঠঠলা বিঠঠলা পাণ্ডুরং বিঠঠলা (শিল্পী: বিভিন্ন; মারাঠি অভঙ্গ বা সংকীর্তনে কিরওয়ানি রাগের প্রয়োগ এক অনাবিল আধ্যাত্মিক প্রশান্তি তৈরি করে)

৯. ও পালনহারে (শিল্পী: লতা মঙ্গেশকর ও উদিত নারায়ণ; এটি একটি চলচ্চিত্র সংগীত হলেও এর কাব্যিক আবেদন ও সুরের কাঠামো বিশুদ্ধ কিরওয়ানি রাগের ভজন অঙ্গের একটি আধুনিক উদাহরণ)

 

ঠুমরিতে কিরওয়ানি:

ঠুমরি গায়কির ক্ষেত্রে রাগ কিরওয়ানি একটি অত্যন্ত রঞ্জক রাগ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ঠুমরি মূলত একটি ‘মিশ্র’ বা ‘উপ-শাস্ত্রীয়’ (Semi-classical) শৈলী হওয়ায়, এতে কিরওয়ানি রাগের বিশুদ্ধ কাঠামোর পাশাপাশি প্রায়শই রাগ পিলু বা রাগ কাফি-র অলংকরণ মিশিয়ে দেওয়া হয়। কিরওয়ানি রাগের করুণ ও শৃঙ্গার রস ঠুমরির আকুলতা ও মান-অভিমান প্রকাশের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।

প্রামাণ্য তথ্য এবং প্রথিতযশা শিল্পীদের গায়কি বিশ্লেষণ করে রাগ কিরওয়ানি-তে নিবদ্ধ ঠুমরির একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

১. ক্যায়সে বুঝাউঁ পি সিয়া মন কি আগ — এটি একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ঠুমরি যা অনেক শিল্পীই কিরওয়ানি রাগের চালে গেয়ে থাকেন।

২. বরজে নাহি মানে — পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী। (এই ঠুমরিটিতে কিরওয়ানি রাগের বিশুদ্ধ ও মিশ্র উভয় রূপই খুব নিপুণভাবে প্রদর্শিত হয়েছে)।

৩. আয়ে না বালম কা করু সজনি — উস্তাদ বড় গুলাম আলী খাঁ। (মূলত রাগ ভৈরবীতে জনপ্রিয় হলেও, অনেক ঘরানায় এটি কিরওয়ানি বা মিশ্র পিলু-কিরওয়ানি রাগেও পরিবেশন করা হয়)।

৪. না মানো তো কা করু — বিদুশী গিরিজা দেবী। (বেনারস ঘরানার এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী কিরওয়ানি রাগের স্পর্শ দিয়ে এই ঠুমরিটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন)।

৫. শ্যাম বিনা নেহি চয়েন — এটি একটি প্রচলিত দাদরা বা ঠুমরি যা কিরওয়ানি রাগের বিষণ্ণ সুরের ওপর ভিত্তি করে গীত হয়।

৬. পি বিন ক্যায়সে কাটুঁ রতিয়া — অনেক ঘরানায় এই বিরহী ঠুমরিটি কিরওয়ানি রাগের চলনে গাওয়া হয়।

৭. আব তো আজা রে সজন — আধুনিক ঠুমরি আঙ্গিকে কিরওয়ানি রাগের প্রয়োগের একটি সুন্দর উদাহরণ।

 

যন্ত্রে কিরওয়ানি:

সেতারে কিরওয়ানি:

সেতারের বাদনে রাগ কিরওয়ানি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং শ্রুতিমধুর। এই রাগের গায়নধর্মী (Gayaki Ang) এবং তন্ত্ৰকারী (Tantrakari)—উভয় প্রকার কাজই সেতারে খুব সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে। বিশেষ করে ইমদাদখানী ও মাইহার ঘরানার শিল্পীরা এই রাগের চলনে এক মায়াবী আবেশ তৈরি করেন।

১. উস্তাদ শহীদ পারভেজ খান (ইমদাদখানী ঘরানা): তাঁর সেতারে রাগ কিরওয়ানি এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। বিশেষ করে তাঁর ‘ঝালা’ এবং মন্দ্র সপ্তকের আলাপ এই রাগের গাম্ভীর্যকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলে।

২. পণ্ডিত রবিশঙ্কর (মাইহার ঘরানা): কিরওয়ানি রাগের প্রসারে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৫০-এর দশকে তাঁর বাজানো কিরওয়ানি এই রাগকে বিশ্ব দরবারে জনপ্রিয় করেছিল। বিশেষ করে তাঁর ‘গৎ’ এবং ‘তান’-এর বৈচিত্র্য এই রাগে এক নতুন মাত্রা যোগ করে।

৩. উস্তাদ বিলায়েত খান (ইমদাদখানী ঘরানা): তাঁর ‘গায়ন অঙ্গ’-এর বাজনায় কিরওয়ানি রাগের আর্তি ও প্রেমরস অত্যন্ত নিপুণভাবে প্রকাশ পায়। তাঁর আলাপে মানুষের কণ্ঠের মতো সূক্ষ্ম ‘মিড়’ ও ‘আন্দোলন’ লক্ষ্য করা যায়।

৪. পণ্ডিত নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় (মাইহার ঘরানা): তাঁর সেতারে কিরওয়ানি রাগের অত্যন্ত ধীর ও গম্ভীর আলাপ এবং ‘জোড়’-এর কাজ শাস্ত্রীয় সংগীত প্রেমীদের কাছে এক অমূল্য সম্পদ।

৫. উস্তাদ সুজাত খান (ইমদাদখানী ঘরানা): আধুনিক সময়ে তাঁর সেতারে কিরওয়ানি রাগের সাথে লোকজ সুরের সংমিশ্রণ এক ভিন্ন মাত্রার রঞ্জকতা তৈরি করে।

৬. পণ্ডিত বুধাদিত্য মুখোপাধ্যায় (ইমদাদখানী ঘরানা): তাঁর অতি দ্রুত গতির তান ও নিখুঁত তন্ত্ৰকারী কাজ কিরওয়ানি রাগের চপল ও উজ্জ্বল দিকটিকে তুলে ধরে।

৭. বিদুসী অনুষ্কা শঙ্কর (মাইহার ঘরানা): তাঁর সেতারে কিরওয়ানি রাগের আধুনিক ও ধ্রুপদী উভয় রূপই শুনতে পাওয়া যায়।

 

সরদে কিরওয়ানি:

সরদ বাদনে রাগ কিরওয়ানি এক অসামান্য গাম্ভীর্য ও আর্তি লাভ করে। সরদের গম্ভীর নাদ ও প্রতিধ্বনিত সুরের (Reverberation) কারণে এই রাগের বিরহী এবং মরমী চরিত্রটি অত্যন্ত জোরালোভাবে ফুটে ওঠে। বিশেষ করে মাইহার ও শাহজাহানপুর ঘরানার শিল্পীরা এই রাগে এক ধ্রুপদী আবেশ তৈরি করেছেন।

১. উস্তাদ আলী আকবর খান (মাইহার ঘরানা): তাঁর সরদে রাগ কিরওয়ানি এক আধ্যাত্মিক উচ্চতায় পৌঁছেছে। তাঁর অতি ধীর গতির ‘আলাপ’ এবং মন্দ্র সপ্তকের কাজ এই রাগের গাম্ভীর্যকে অতুলনীয় করে তোলে। (এটি তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ রেকর্ড করা রাগ)।

২. পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত (শাহজাহানপুর ঘরানা): তাঁর বাজনায় কিরওয়ানি রাগের গাণিতিক শুদ্ধতা এবং রাগের কাঠামোগত সৌন্দর্য খুব নিপুণভাবে প্রকাশ পায়। বিশেষ করে তাঁর ‘তন্ত্ৰকারী’ ও দ্রুত লয়ের ‘গৎ’ এই রাগে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।

৩. উস্তাদ আমজাদ আলী খান (সেনিয়া সেহরাওয়াত ঘরানা): তাঁর হাতের জাদুকরী স্পর্শে কিরওয়ানি রাগের ‘গায়ন অঙ্গ’ বা কণ্ঠের মতো মিড় ও মুড়কির কাজ অত্যন্ত শ্রুতিমধুর শোনায়। তাঁর দ্রুত গতির ‘একহারা তান’ এই রাগে উত্তেজনা তৈরি করে।

৪. পণ্ডিত আশীষ খান (মাইহার ঘরানা): উস্তাদ আলী আকবর খানের পুত্র হিসেবে তাঁর বাজনায় কিরওয়ানি রাগের সেই ঐতিহ্যবাহী গাম্ভীর্য ও আধুনিক অলংকরণ দুই-ই বিদ্যমান।

৫. উস্তাদ বাহাদুর খান (মাইহার ঘরানা): তাঁর সরদে কিরওয়ানি রাগের চলন অত্যন্ত সরল অথচ গভীর। তাঁর বাজনার স্নিগ্ধতা এই রাগের করুণ রসকে সার্থকভাবে ফুটিয়ে তোলে।

৬. পণ্ডিত তেজেন্দ্র নারায়ণ মজুমদার (শাহজাহানপুর ঘরানা): আধুনিক সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই সরদিয়া কিরওয়ানি রাগের সাথে অনেক সময় সূক্ষ্ম ‘মিশ্র’ কাজ মিশিয়ে এক নতুন রঞ্জকতা তৈরি করেন।

৭. আমান আলী খান ও অয়ান আলী খান: উস্তাদ আমজাদ আলী খানের সুযোগ্য দুই পুত্র তাঁদের যুগলবন্দীতে কিরওয়ানি রাগের এক নতুন ও চপল রূপ উপস্থাপন করেন।

 

বাঁশিতে কিরওয়ানি:

শোনার অভিজ্ঞতা এক অনন্য মাধুর্য তৈরি করে। বাঁশির কোমল এবং দীর্ঘ স্বর এই রাগের মরমী ও করুণ রসকে খুব স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। বিশেষ করে হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়ার বাঁশিতে এই রাগটি বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

১. পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া: তাঁর বাঁশিতে রাগ কিরওয়ানি এক অনবদ্য সৃষ্টি। বিশেষ করে তাঁর ‘আলাপ’ এবং মন্দ্র সপ্তকের কাজ এই রাগের গাম্ভীর্যকে অতুলনীয় করে তোলে। (অ্যালবাম: Live in India বা বিভিন্ন কনসার্ট রেকর্ডিং)।

২. পণ্ডিত পান্নালাল ঘোষ: বাঁশিতে রাগ কিরওয়ানির আদি ও ধ্রুপদী রূপটি তাঁর বাজনায় খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি এই রাগের শুদ্ধতা বজায় রেখে অত্যন্ত গম্ভীর ঢঙে এটি পরিবেশন করতেন।

৩. পণ্ডিত রনু মজুমদার: মাইহার ঘরানার এই শিল্পী কিরওয়ানি রাগে চমৎকার ‘গৎ’ এবং দ্রুত লয়ের কাজ করেন। তাঁর বাঁশিতে এই রাগের এক আধুনিক ও উজ্জ্বল রূপ প্রকাশ পায়।

৪. শশাঙ্ক সুব্রহ্মণ্যম: কর্ণাটকী বাঁশি বাদক হলেও তিনি হিন্দুস্তানি ঢঙে কিরওয়ানি বাজিয়ে অত্যন্ত প্রশংসিত হয়েছেন। তাঁর দ্রুত গতির তান ও গাণিতিক স্বরবিন্যাস এই রাগে এক নতুন মাত্রা যোগ করে।

৫. প্রবীণ গোডখিন্ডি: তাঁর বাঁশিতে কিরওয়ানি রাগের ফিউশন এবং শাস্ত্রীয়—উভয় রূপই অত্যন্ত জনপ্রিয়।

 

তথ্যসূত্র:

১. পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — ‘হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতি’ (খণ্ড ৪): কর্ণাটকী রাগসমূহের উত্তর ভারতীয় চলন বিশ্লেষণের জন্য।

২. বসন্ত — ‘সংগীত বিশারদ’ (সংগীত কার্যালয়, হাতরস): রাগের জাতি, স্বর বিন্যাস এবং বাদী-সমবাদী যাচাইয়ের জন্য।

৩. বিমলকান্ত রায় চৌধুরী — ‘ভারতীয় সংগীতকোষ’: রাগের ঐতিহাসিক বিবর্তন ও পাশ্চাত্য মাইনর স্কেলের সাথে তুলনা সংক্রান্ত তথ্যের জন্য।

৪. সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমী (SRA): রাগের সময়কাল এবং গায়নশৈলীর প্রামাণ্য রূপ নিশ্চিতকরণের জন্য।

৫. পণ্ডিত এন. রাজম — ‘সংগীত তত্ত্ব’: রাগের চলন ও স্বর প্রক্ষেপণ পদ্ধতি যাচাইয়ের জন্য।

 

আরও দেখুন: