রাগ কৌশি ভৈরব । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের জগতে রাগ কৌশি ভৈরব (Kaushi Bhairav) একটি অত্যন্ত গম্ভীর, জটিল এবং উচ্চাঙ্গের মিশ্র রাগ। নাম থেকেই স্পষ্ট যে এটি দুটি অত্যন্ত প্রভাবশালী রাগের সংমিশ্রণ—’কৌশিকী’ (বা মালকোষ) এবং ‘ভৈরব’। এই দুই রাগের মিলনে এমন এক সুরের সৃষ্টি হয় যা একই সাথে ভৈরব রাগের আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্য এবং মালকোষ রাগের মরমী গভীরতাকে ধারণ করে।

রাগ কৌশি ভৈরব

রাগ কৌশি ভৈরব-এর পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস

রাগ কৌশি ভৈরব মূলত ভৈরব ঠাটের একটি সংকর রাগ। এটি একটি ‘জোড় রাগ’ বা ‘মিশ্র রাগ’ হিসেবে পরিচিত। এই রাগের উদ্ভাবন এবং জনপ্রিয়তার পেছনে বিভিন্ন ঘরানার ওস্তাদ ও পণ্ডিতদের অবদান রয়েছে, তবে এটি মূলত বিংশ শতাব্দীতে বেশি প্রচলিত হয়। এই রাগের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর চলনে ভৈরব এবং মালকোষের এক অপূর্ব শৈল্পিক দ্বন্দ্ব ও মিলন।

গায়কির ক্ষেত্রে দেখা যায়, পূর্বাঙ্গ (সা থেকে পা) সাধারণত ভৈরব রাগের আদলে চলে এবং উত্তরাঙ্গ (পা থেকে সা) মালকোষ বা কৌশিকীর চলন অনুসরণ করে। বিশেষ করে মালকোষের মতো গান্ধার (গা), ধৈবত (ধা) এবং নিষাদ (নি)—এই তিনটি স্বরই যখন কোমল হিসেবে ভৈরবের প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হয়, তখন এক অদ্ভুত বিষাদময় অথচ ভক্তিপূর্ণ আবহ তৈরি হয়। এটি একটি ‘সন্ধিপ্রকাশ’ রাগ, যা প্রাতঃকালে সূর্যোদয়ের সময় গাওয়া হয়। এর বিস্তার মন্দ্র ও মধ্য সপ্তকে অত্যন্ত চমৎকার শোনায় এবং এটি গাওয়ার জন্য কণ্ঠের ওপর অসামান্য নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।

রাগের শাস্ত্র

  • ঠাট: ভৈরব (যেহেতু ভৈরব অঙ্গ প্রধান)।
  • জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহে ৭টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ: স র গ ম প ধ ন স।
  • অবরোহ: স ন ধ প ম গ র স।
  • বাদী স্বর: ম (মধ্যম)।
  • সমবাদী স্বর: স (ষড়জ)।
  • বর্জিত স্বর: কোনো স্বর বর্জিত নয়।
  • ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ R, গান্ধার G, ধৈবত D এবং নিষাদ n — এই চারটি স্বরই কোমল ব্যবহৃত হয়। বাকি সব স্বর (সা, মা, পা) শুদ্ধ
  • সময়: প্রাতঃকাল (ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত বা দিনের প্রথম প্রহর)।
  • প্রকৃতি: অত্যন্ত গম্ভীর, মরমী এবং ভক্তি রসপ্রধান।

 

 

সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ

  • রাগ ভৈরব: কৌশি ভৈরবের মূল আধার এবং অঙ্গ রাগ; ভৈরব থেকে এতে কোমল গান্ধার ও কোমল নিষাদ ভিন্নভাবে আসে।
  • রাগ মালকোষ: এই রাগের কৌশিকী অঙ্গটি কৌশি ভৈরবের উত্তরাঙ্গে অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে অনুভূত হয়।
  • রাগ আহির ভৈরব: উভয় রাগে ভৈরব অঙ্গ থাকলেও আহির ভৈরবে গান্ধার শুদ্ধ থাকে, কিন্তু কৌশি ভৈরবে গান্ধার কোমল।
  • রাগ ভৈরব বাহার: বাহারের চঞ্চলতার বিপরীতে কৌশি ভৈরব অনেক বেশি গম্ভীর ও অন্তর্মুখী।
  • রাগ বসন্ত মুখরি: স্বর বিন্যাসের দিক থেকে কিছুটা মিল থাকলেও এর চলন ও মেজাজ সম্পূর্ণ আলাদা।

রাগ কৌশি ভৈরব হলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সেই বিশেষ সুর যা মানুষের আত্মার গভীরতম ব্যাকুলতাকে স্পর্শ করে। ভৈরবের আভিজাত্য আর মালকোষের আধ্যাত্মিকতা—এই দুয়ের সার্থক মিলনই হলো এই রাগ। এটি গাওয়া বা শোনা কেবল বিনোদনের জন্য নয়, বরং এক ধরণের ধ্যানের অভিজ্ঞতা। যদিও বর্তমান সময়ের আসরগুলোতে এই রাগের চর্চা অত্যন্ত সীমিত এবং এটি পরিবেশন করা অত্যন্ত কঠিন, তবুও এর শৈল্পিক ও তাত্ত্বিক গুরুত্ব সংগীতের গবেষক ও সাধকদের কাছে অপরিসীম।

তথ্যসূত্র:

১. পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — ‘হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতি’ (Kramik Pustak Malika, খণ্ড ৪): বিরল এবং জটিল মিশ্র রাগসমূহের ব্যাকরণগত বিশ্লেষণের জন্য।

২. বসন্ত — ‘সংগীত বিশারদ’ (Sangeet Karyalaya, Hathras): রাগের বাদী-সমবাদী এবং জাতি নির্ধারণের নির্ভরযোগ্য উৎস।

৩. বিমলকান্ত রায় চৌধুরী — ‘ভারতীয় সংগীতকোষ’: মিশ্র রাগসমূহের পরিচয় ও নামকরণের ঐতিহাসিক রেফারেন্স।

৪. Joep Bor — ‘The Raga Guide’: আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাগের তথ্যকোষ ও স্বর বিন্যাস যাচাইয়ের জন্য।

৫. পণ্ডিত ওমকারনাথ ঠাকুর — ‘প্রণব ভারতী’: রাগের দার্শনিক ও রসতাত্ত্বিক আলোচনার প্রামাণ্য গ্রন্থ।

আরও দেখুন: