রাগ খাম্বোজি । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ভাণ্ডারে রাগ খাম্বোজি (Khamboji) এক অত্যন্ত প্রাচীন এবং ঐতিহ্যবাহী রাগ। এটি মূলত দক্ষিণ ভারতীয় বা কর্ণাটকী সংগীত পদ্ধতির একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় রাগ, যা উত্তর ভারতীয় বা হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতিতেও নিজস্ব মহিমায় স্থান করে নিয়েছে। খাম্বোজি রাগের চলন এবং এর স্বর বিন্যাস শ্রোতার মনে এক রাজকীয় গাম্ভীর্য এবং একই সাথে ভক্তি রসের সঞ্চার করে।

রাগ খাম্বোজির পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস

রাগ খাম্বোজি মূলত খামাজ ঠাটের (কর্ণাটকী সংগীতে হরিখাম্ভোজী জনিত) অন্তর্গত একটি রাগ। এই রাগের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন; প্রাচীন সংগীত গ্রন্থগুলোতে ‘খাম্ভাবতী’ বা ‘খাম্বোজি’র উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে আধুনিক হিন্দুস্তানি সংগীতে খাম্বোজি এবং খাম্বাবতীকে দুটি আলাদা রাগ হিসেবে দেখা হয়। খাম্বোজির প্রধান বিশেষত্ব হলো এর আরোহে নিষাদ (নি) বর্জিত থাকা এবং অবরোহে কোমল নিষাদের প্রয়োগ।

এই রাগের গায়নশৈলী অত্যন্ত বিস্তৃতি সম্পন্ন। এটি এমন একটি রাগ যা বিলম্বিত এবং দ্রুত—উভয় লয়েই সমানভাবে মাধুর্য ছড়ায়। এই রাগের চলন অনেকটা ‘রাগ দেশ’ বা ‘খামাজ’-এর কাছাকাছি মনে হলেও এর শুদ্ধ ধৈবত (ধা) এবং আরোহের গঠন একে আলাদা আভিজাত্য দান করে। দক্ষিণ ভারতে এই রাগটি বিভিন্ন উৎসব ও মন্দিরের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বহুল ব্যবহৃত হয়। হিন্দুস্তানি সংগীতে এটি সাধারণত ঠুমরি বা হালকা শাস্ত্রীয় সংগীতের চেয়ে শুদ্ধ শাস্ত্রীয় রাগের রূপেই বেশি পরিবেশিত হয়।

রাগের শাস্ত্র

  • ঠাটে: খামাজ।
  • জাতি: ষাড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহে ৬টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ: স র গ ম প ধ স (সা রে গা মা পা ধা সা)।
  • অবরোহ: স ন ধ প ম গ র স (সা নি ধা পা মা গা রে সা — এখানে নিষাদ কোমল)।
  • বাদী স্বর: ধ (ধৈবত)।
  • সমবাদী স্বর: গ (গান্ধার)।
  • বর্জিত স্বর: আরোহে ‘ন’ (নিষাদ) বর্জিত।
  • ব্যবহৃত স্বর: আরোহে সব শুদ্ধ স্বর ব্যবহৃত হয়; অবরোহে কোমল নিষাদ (ণ) এবং বাকি সব শুদ্ধ স্বর ব্যবহৃত হয়।
  • সময়: রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর (রাত ৯টা থেকে ১২টা)।
  • প্রকৃতি: গম্ভীর, বীর ও শৃঙ্গার রসপ্রধান।

সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ

  • রাগ খামাজ: খাম্বোজির মূল ঠাট রাগ, তবে খামাজের আরোহে নিষাদ বর্জিত থাকে না।
  • রাগ খাম্বাবতী: নামের মিল থাকলেও খাম্বাবতীর বাদী-সমবাদী স্বর (সা-মা) এবং চলন খাম্বোজি থেকে ভিন্ন।
  • রাগ দেশ: অবরোহে কোমল নিষাদের ব্যবহারের কারণে দেশের সাথে সাদৃশ্য পাওয়া যায়।
  • রাগ তিলাং: তিলাং রাগের আরোহের সাথে খাম্বোজির আরোহের মিল থাকলেও তিলাং-এ ধৈবত বর্জিত।
  • রাগ কলাবতী: খাম্বোজির আরোহ থেকে ‘রে’ এবং ‘মা’ বাদ দিলে তা কলাবতী রাগের রূপ ধারণ করে।

রাগ খাম্বোজি হলো ভারতীয় সংগীতের সেই চিরন্তন সুর যা উত্তর ও দক্ষিণ—উভয় সংগীত পদ্ধতির সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। এর আরোহের সরলতা এবং অবরোহের বৈচিত্র্যময় স্বরপ্রয়োগ গায়ককে যেমন সৃজনশীলতার সুযোগ দেয়, তেমনই শ্রোতাকে এক গভীর আধ্যাত্মিক প্রশান্তিতে নিমগ্ন করে। এটি এমন একটি রাগ যা শুদ্ধ শাস্ত্রীয় সংগীতের গাম্ভীর্য ধরে রেখেও অত্যন্ত শ্রুতিমধুর। সঠিক আলাপ এবং তানের নিখুঁত প্রয়োগের মাধ্যমে খাম্বোজি যখন গীত হয়, তখন তা সংগীতের আসরে এক রাজকীয় আবহ তৈরি করে।

তথ্যসূত্র:

১/ রাগ পরিচয় (১ম-৪র্থ খণ্ড) – পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে: হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের সর্বাধিক প্রামাণ্য আকর গ্রন্থ।

২/ সংগীত বিশারদ – বসন্ত: রাগের তাত্ত্বিক কাঠামো ও কর্ণাটকী-হিন্দুস্তানি তুলনামূলক আলোচনার নির্ভরযোগ্য উৎস।

৩/ The Raga Guide: A Survey of 74 Hindustani Ragas – Joep Bor: আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাগের তথ্যকোষ ও তুলনামূলক বিশ্লেষণ।

৪/ South Indian Music (Book I-VI) – Prof. P. Sambamoorthy: খাম্বোজি রাগের দক্ষিণ ভারতীয় প্রভাব ও ইতিহাস সংক্রান্ত গবেষণা।

৫/ শাস্ত্রীয় সংগীতের তত্ত্ব ও ইতিহাস – এ কে এম মনসুর: দেশীয় সংগীতশাস্ত্রে রাগের সঠিক প্রয়োগ ও গায়কি সংক্রান্ত বিবরণ।