রাগ খোকার । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ভাণ্ডারে রাগ খোকার (অনেক সময় ‘খোকর’ নামেও পরিচিত) একটি অত্যন্ত বিরল এবং অপ্রচলিত (অপ্রসিদ্ধ) রাগ। এটি মূলত খামাজ ঠাটের অন্তর্গত একটি রাগ। শাস্ত্রীয় সংগীতের মূলধারার বড় বড় রাগগুলোর ভিড়ে এই রাগটি অনেকটা অন্তরালে থাকলেও এর বিশেষ স্বর বিন্যাস এবং গায়নশৈলী একে একটি স্বতন্ত্র আভিজাত্য দান করেছে।

রাগ খোকার-এর পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস

রাগ খোকার মূলত একটি মিশ্র প্রকৃতির রাগ। এর চলনে আমরা রাগ তিলক কামোদ, দেশ এবং খামাজ—এই তিনটি রাগের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ লক্ষ্য করি। এই রাগের ইতিহাস সম্পর্কে খুব বেশি প্রাচীন তথ্য পাওয়া না গেলেও এটি মূলত মধ্যযুগীয় উত্তর ভারতীয় সংগীত ঘরানার একটি অংশ হিসেবে পরিচিত। ওস্তাদ এবং পণ্ডিতদের মতে, এটি একটি ‘মনোরঞ্জন’ প্রধান রাগ, যা শ্রোতার মনে এক ধরনের চঞ্চলতা ও কৌতূহল জাগিয়ে তোলে।

এই রাগের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর আরোহ ও অবরোহের বক্র গতি। এটি গাওয়ার সময় স্বরগুলো সরাসরি না লেগে কিছুটা ঘুরে ফিরে আসে, যা একে তিলক কামোদের কাছাকাছি নিয়ে যায়। তবে এতে ব্যবহৃত স্বরের বিন্যাস এবং বাদী-সমবাদী স্বরের অবস্থান একে তিলক কামোদ বা দেশ থেকে আলাদা করে রাখে। এটি মূলত শৃঙ্গার রস এবং কিছুটা বীর রসের মিশ্রণে তৈরি এক অনন্য সুরমূর্তি। বিরল রাগ হওয়ার কারণে এটি সাধারণত অভিজ্ঞ শিল্পীদের কণ্ঠে বিশেষ আসরেই বেশি শোনা যায়।

রাগের শাস্ত্র

  • ঠাটে: খামাজ।
  • জাতি: ষাড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহে ৬টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ: স র গ স, প ম গ, ন স (সা রে গা সা, পা মা গা, নি সা)।
  • অবরোহ: স ন ধ প, ম গ, র গ স (সা নি ধা পা, মা গা, রে গা সা — এখানে কোমল নিষাদ ব্যবহার করা হয়)।
  • বাদী স্বর: র (ঋষভ)।
  • সমবাদী স্বর: প (পঞ্চম)।
  • বর্জিত স্বর: আরোহে ‘ধ’ (ধৈবত) বর্জিত।
  • ব্যবহৃত স্বর: আরোহে সব শুদ্ধ স্বর ব্যবহৃত হয়; অবরোহে কোমল নিষাদ ($n$) এবং বাকি সব শুদ্ধ স্বর ব্যবহৃত হয়।
  • সময়: রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর (রাত ৯টা থেকে ১২টা)।
  • প্রকৃতি: চঞ্চল ও শৃঙ্গার রসপ্রধান।

সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ

  • রাগ তিলক কামোদ: এই রাগের আরোহ-অবরোহের সাথে খোকার রাগের গভীর মিল রয়েছে; তবে খোকারে কোমল নিষাদের প্রয়োগ ভিন্ন।
  • রাগ দেশ: অবরোহের চলনে এবং কোমল নিষাদের ব্যবহারে দেশ রাগের সাথে এর সাদৃশ্য পাওয়া যায়।
  • রাগ খামাজ: খামাজ ঠাটের মূল রাগ হওয়ার কারণে স্বর বিন্যাসের মূল কাঠামোটি খামাজের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
  • রাগ ঝিনঝোটি: কিছু বিশেষ স্বর প্রয়োগে ঝিনঝোটির আভাস পাওয়া যেতে পারে।
  • রাগ সোরথ: আরোহের কিছু অংশে সোরথ রাগের মতো মনে হতে পারে।

রাগ খোকার হলো শাস্ত্রীয় সংগীতের সেই রত্ন যা খুব বেশি পরিচিত না হলেও এর মাধুর্য কোনো অংশেই কম নয়। এর বক্র চলন এবং তিলক কামোদ ও দেশের সংমিশ্রণ একে এক অনন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দান করেছে। যারা শাস্ত্রীয় সংগীতের গতানুগতিক রাগের বাইরে একটু ভিন্ন স্বাদের সুরের সন্ধান করেন, তাদের কাছে রাগ খোকার এক পরম তৃপ্তির নাম। এই রাগের সঠিক পরিবেশনা যেমন কঠিন, তেমনই এর শ্রবণসুখ অত্যন্ত গভীর। সঠিক তাল ও লয়ের মাধ্যমে যখন এই রাগের রূপ ফুটে ওঠে, তখন তা শ্রোতাকে এক মায়াবী সুরের জগতে নিয়ে যায়।

তথ্যসূত্র:

১/ রাগ পরিচয় (১ম-৪র্থ খণ্ড) – পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে: হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের সবচেয়ে প্রামাণ্য এবং নির্ভরযোগ্য ব্যাকরণ গ্রন্থ।

২/ সংগীত বিশারদ – বসন্ত: বিরল ও অপ্রচলিত রাগসমূহের তাত্ত্বিক কাঠামো আলোচনার জন্য নির্ভরযোগ্য উৎস।

৩/ The Raga Guide: A Survey of 74 Hindustani Ragas – Joep Bor: আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাগের তথ্যকোষ (যদিও এখানে অতি বিরল রাগগুলো সংক্ষিপ্ত আকারে থাকে)।

৪/ ভারতীয় সংগীতের রাগ-রাগিনী – স্বামী প্রজ্ঞানন্দ: রাগের বিবর্তন ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ওপর গবেষণা।

৫/ Enzyclopedia of Indian Music: যেখানে বিভিন্ন ঘরানার অপ্রচলিত রাগের বর্ণনা পাওয়া যায়।

(বি.দ্র.: রাগ খোকার অত্যন্ত বিরল হওয়ায় বিভিন্ন ঘরানায় এর আরোহ-অবরোহ বা বাদী-সমবাদী স্বরে সামান্য মতভেদ থাকতে পারে, তবে উপরের তথ্যগুলো ভাতখণ্ডে পদ্ধতি অনুসরণ করে দেওয়া হয়েছে।)