রাগ গন্ধারী ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি অত্যন্ত সুক্ষ্ম এবং গম্ভীর প্রকৃতির রাগ। এটি আসাবরী ঠাটের অন্তর্গত একটি অপ্রচলিত কিন্তু উচ্চাঙ্গ সংগীতের রসিকদের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত রাগ।
রাগ গন্ধারী
রাগ গন্ধারী: পরিচয় ও বিশেষত্ব
রাগ গন্ধারী মূলত আসাবরী ঠাটের একটি প্রকার। এই রাগের চলনে রাগ আসাবরী এবং রাগ জৌনপুরীর স্পষ্ট প্রভাব লক্ষ্য করা যায়, তবে এর নিজস্ব স্বকীয়তা রয়েছে। রাগটির নামকরণ প্রাচীন গান্ধার দেশ (বর্তমান আফগানিস্তান ও পাকিস্তান সীমান্ত অঞ্চল) থেকে হয়েছে বলে মনে করা হয়। এর বিশেষত্ব হলো এটি অত্যন্ত করুণ এবং গম্ভীর রসের সৃষ্টি করে। এই রাগে ‘গান্ধার’ (গ) স্বরের প্রয়োগ অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং এটি প্রায়শই আন্দোলিত অবস্থায় ব্যবহৃত হয়, যা শ্রোতার মনে এক ধরণের আধ্যাত্মিক ব্যাকুলতা তৈরি করে। এটি মূলত দিনের রাগের অন্তর্গত এবং ভক্তিরস প্রধান।
রাগের শাস্ত্র
রাগ গন্ধারী-এর শাস্ত্রীয় বৈশিষ্ট্য ও নিয়মাবলী নিচে দেওয়া হলো:
- ঠাট: আসাবরী।
- জাতি: শাড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহে ৬টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- আরোহ: সা রে ম প ধ নি সঁ (এখানে ধ ও নি কোমল)। তবে অনেক মতে আরোহে ‘নি’ বর্জিত হয়ে ‘সা রে ম প ধ সঁ’ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
- অবরোহ: সঁ নি ধ প ম গ রে সা (এখানে গ, ধ, নি — তিনটি স্বরই কোমল)।
- বাদী স্বর: ধৈবত (ধ) — (কোমল)।
- সমবাদী স্বর: গান্ধার (গ) — (কোমল)।
- বর্জিত স্বর: আরোহে সাধারণত ‘গান্ধার’ (গ) বর্জিত থাকে।
- ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ (রে), মধ্যম (ম) ও পঞ্চম (প) শুদ্ধ; কিন্তু গান্ধার (গ), ধৈবত (ধ) ও নিষাদ (নি) কোমল।
- সময়: দিনের দ্বিতীয় প্রহর (সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা)।
- প্রকৃতি: গম্ভীর ও করুণ রস প্রধান।
সম্পর্কিত রাগের তালিকা
গন্ধারী রাগের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ রাগগুলোর তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
- রাগ আসাবরী: গন্ধারী রাগের মূল ভিত্তি আসাবরী; তবে গন্ধারীর চলনে জৌনপুরীর মতো নিষাদের সামান্য ছোঁয়া থাকে যা একে আসাবরী থেকে আলাদা করে।
- রাগ জৌনপুরী: জৌনপুরীর সাথে এর গভীর মিল রয়েছে, তবে আরোহ এবং অবরোহে স্বরের স্থায়িত্বের পার্থক্যের কারণে গন্ধারী পৃথক মেজাজ তৈরি করে।
- রাগ দেবগান্ধার: নামের মিল থাকলেও দেবগান্ধার রাগটি মূলত আশাবরী ঠাটের হলেও এর চলন ও মেজাজ গন্ধারী থেকে ভিন্ন এবং এটি আরও বেশি গম্ভীর।
- রাগ জৌনপুরী-আসাবরী: এই মিশ্র রাগের চলনের সাথে অনেক সময় গন্ধারী রাগটি গুলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
রাগ গন্ধারী তার ধীর লয় এবং সূক্ষ্ম স্বর প্রক্ষেপণের জন্য সংগীত সাধকদের কাছে একটি চ্যালেঞ্জিং রাগ হিসেবে পরিচিত। এর ভক্তি ও করুণ রসের সংমিশ্রণ মানুষের মনকে শান্ত করে এবং এক প্রকার অপার্থিব প্রশান্তি দান করে। যদিও এটি সাধারণ জলসায় খুব বেশি গাওয়া হয় না, তবুও শুদ্ধ শাস্ত্রীয় সংগীতের বিকাশে এবং আসাবরী ঠাটের বৈচিত্র্য বুঝতে এই রাগের গুরুত্ব অপরিসীম।
তথ্যসূত্র (Sources)
এই নিবন্ধের তথ্যগুলো নিম্নলিখিত প্রামাণ্য শাস্ত্র ও সূত্র থেকে যাচাই করা হয়েছে:
১. ক্রামিক পুস্তক মালিকা (খণ্ড ৪) – পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখন্ডে।
২. রাগ বিজ্ঞান – পণ্ডিত বিনায়ক রাও পট্টবর্ধন।
৩. সংগীত বিশারদ – বসন্ত।
৪. রাগ পরিচয় – পণ্ডিত হরিশ্চন্দ্র শ্রীবাস্তব।
আরও দেখুন: