ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ভাণ্ডারে রাগ গুণকালী (বা গুণক্রী) হলো ভোরের এক অত্যন্ত শান্ত, ভক্তিপূর্ণ এবং বৈরাগ্য জাগানিয়া রাগ। এটি মূলত ভৈরব ঠাটের অন্তর্গত একটি অতি জনপ্রিয় রাগ। সূর্যোদয়ের প্রাক্কালে যখন প্রকৃতির বুকে এক ধরণের পবিত্র স্তব্ধতা বিরাজ করে, তখন গুণকালী রাগের সুরলহরী শ্রোতাকে এক আধ্যাত্মিক প্রশান্তিতে নিমগ্ন করে।
রাগ গুণকালী
রাগ গুণকালীর পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস
রাগ গুণকালী একটি ঔড়ব-ঔড়ব জাতির রাগ, অর্থাৎ এর আরোহ এবং অবরোহ উভয় ক্ষেত্রেই মাত্র পাঁচটি স্বর ব্যবহৃত হয়। এই রাগে গান্ধার (গা) এবং নিষাদ (নি) সম্পূর্ণ বর্জিত। এই রাগের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এর সীমিত স্বরের ব্যবহার সত্ত্বেও এর গাম্ভীর্য। এটি শুনতে অনেকটা রাগ ‘বিভাস’ বা ‘ভৈরব’-এর কাছাকাছি মনে হতে পারে, তবে মধ্যম (মা) স্বরের উপস্থিতি এবং গান্ধার-নিষাদের অনুপস্থিতি একে একটি অনন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দান করে।
ঐতিহাসিকভাবে, গুণকালী একটি অত্যন্ত প্রাচীন রাগ। বিভিন্ন প্রাচীন সংগীত গ্রন্থে ‘গুণক্রী’ নামে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। এটি মূলত ভক্তি ও করুণ রসপ্রধান রাগ। ধ্রুপদ গায়কির জন্য এই রাগটি অত্যন্ত উপযুক্ত বলে মনে করা হয়, কারণ এর স্বরগুলোর বিস্তার অত্যন্ত ধীর এবং গম্ভীর। বিশেষ করে কোমল ঋষভ (রে) এবং কোমল ধৈবত (ধা)-এর পরিমিত আন্দোলন এই রাগের প্রাণ। এটি গাওয়ার সময় মনে হয় যেন কোনো সাধক নিভৃতে তার ইষ্টদেবতাকে বন্দনা করছেন।
রাগের শাস্ত্র
- ঠাটে: ভৈরব।
- জাতি: ঔড়ব-ঔড়ব (আরোহে ৫টি এবং অবরোহে ৫টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- আরোহ: স র ম প ধ স।
- অবরোহ: স ধ প ম র স।
- বাদী স্বর: ধ (কোমল ধৈবত)।
- সমবাদী স্বর: র (কোমল ঋষভ)।
- বর্জিত স্বর: আরোহ ও অবরোহ উভয় ক্ষেত্রেই ‘গ’ (গান্ধার) এবং ‘ন’ (নিষাদ) বর্জিত।
- ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ R এবং ধৈবত D কোমল; বাকি স্বর—ষড়জ S, মধ্যম M এবং পঞ্চম P শুদ্ধ।
- সময়: প্রাতঃকাল (ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত বা দিনের প্রথম প্রহর)।
- প্রকৃতি: অত্যন্ত শান্ত, ভক্তি ও করুণ রসপ্রধান।
সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ
- রাগ ভৈরব: গুণকালীর আদি ঠাট রাগ; ভৈরবে সব স্বর থাকলেও গুণকালীতে গান্ধার ও নিষাদ বর্জিত।
- রাগ বিভাস: বিভাসের সাথে গুণকালীর গভীর মিল রয়েছে, তবে বিভাসে মধ্যম (মা) বর্জিত এবং গান্ধার (গা) ব্যবহৃত হয়।
- রাগ যোগিয়া: চলন ও মেজাজের দিক থেকে মিল থাকলেও যোগিয়াতে নিষাদ (নি) স্বরের অল্প ব্যবহার দেখা যায়।
- রাগ দুর্গা: বিলাবল ঠাটের এই রাগের স্বর বিন্যাস গুণকালীর সমান্তরাল, কিন্তু দুর্গায় ঋষভ ও ধৈবত শুদ্ধ।
- রাগ রেওয়া: পূর্বী ঠাটের এই রাগেও গান্ধার-নিষাদ বর্জিত হতে পারে, তবে এর চলন ও প্রকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
রাগ গুণকালী হলো সেই সুর যা অন্ধকারের বিদায় এবং আলোর আগমনকে এক মরমী বৈরাগ্যের সুরে বন্দনা করে। এর পাঁচটি স্বরের মিতব্যয়ী ব্যবহার প্রমাণ করে যে, সংগীতের শক্তি কেবল স্বরের সংখ্যায় নয়, বরং তার প্রয়োগের গভীরতায়। ভক্তি ও করুণ রসের এমন মেলবন্ধন খুব কম রাগে লক্ষ্য করা যায়। সঠিক আলাপ ও মীড়ের ব্যবহারের মাধ্যমে গুণকালী যখন গীত হয়, তখন তা কেবল গান থাকে না, তা এক ধরণের প্রার্থনায় পরিণত হয়। আধুনিক শাস্ত্রীয় সংগীতের আসরে গুণকালী আজও তার প্রাচীন আভিজাত্য ও আধ্যাত্মিক মেজাজ নিয়ে স্বগৌরবে টিকে আছে।
তথ্যসূত্র:
১. পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — ‘হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতি’ (Kramik Pustak Malika, খণ্ড ২ ও ৩): গুণকালী রাগের ঠাট, জাতি এবং স্বরলিপি নির্ধারণের প্রধান উৎস।
২. বসন্ত — ‘সংগীত বিশারদ’ (Sangeet Karyalaya): রাগের বাদী-সমবাদী এবং সময় নিরূপণের প্রামাণ্য গ্রন্থ।
৩. বিমলকান্ত রায় চৌধুরী — ‘ভারতীয় সংগীতকোষ’: রাগের ঐতিহাসিক বিবর্তন ও তুলনামূলক আলোচনার জন্য।
৪. Joep Bor — ‘The Raga Guide’: আরোহ-অবরোহের শুদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাগের তথ্যকোষ।
৫. শাস্ত্রীয় সংগীতের তত্ত্ব ও ইতিহাস — এ কে এম মনসুর: দেশীয় সংগীতশাস্ত্রে রাগের সঠিক প্রয়োগ ও গায়কি সংক্রান্ত বিবরণ।
আরও দেখুন: