ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সুবিশাল কাননে রাগ গৌরী ভৈরব (Gauri Bhairav) একটি অত্যন্ত প্রাচীন, গম্ভীর এবং ভক্তি রসপ্রধান রাগ। এটি মূলত ‘ভৈরব’ এবং ‘গৌরী’—এই দুটি স্বতন্ত্র রাগের সংমিশ্রণে তৈরি একটি মিশ্র বা জোড় রাগ। শাস্ত্রীয় সংগীতে ভৈরবকে আদি পুরুষ এবং গৌরীকে আদ্যাশক্তি হিসেবে কল্পনা করা হয়; তাই এই দুই রাগের মিলন এক অপার্থিব আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি করে।
রাগ গৌরী ভৈরব
রাগ গৌরী ভৈরব-এর পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস
রাগ গৌরী ভৈরব মূলত ভৈরব ঠাটের অন্তর্ভুক্ত। এই রাগের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন এবং এটি মধ্যযুগীয় ভারতীয় মার্গ সংগীতে একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এই রাগের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর আরোহ ও অবরোহের বিশেষ স্বর প্রয়োগ। ভৈরব রাগের গম্ভীর মেজাজের সাথে যখন গৌরী রাগের করুণ ও মরমী সুর যুক্ত হয়, তখন তা এক অনন্য শৈল্পিক রূপ ধারণ করে।
এই রাগের চলনে আমরা দেখতে পাই যে, এর পূর্বাঙ্গ (সা থেকে পা) সাধারণত ভৈরব রাগের আদলে চলে এবং উত্তরাঙ্গ (পা থেকে সা) গৌরী রাগের চলন অনুসরণ করে। বিশেষ করে কোমল ঋষভ (রে) এবং কোমল ধৈবত (ধা)-এর আন্দোলন এই রাগের প্রাণ। এটি একটি ‘সন্ধিপ্রকাশ’ রাগ, যা প্রাতঃকালে সূর্যোদয়ের সময় গাওয়া হয়। এই রাগে শান্ত ও করুণ রসের এক অপূর্ব মেলবন্ধন লক্ষ্য করা যায়, যা শ্রোতাকে উচ্চমার্গের সাধনার স্তরে নিয়ে যায়। খেয়াল গায়কির পাশাপাশি ধ্রুপদ ও ধামার পরিবেশনায় এই রাগের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।
রাগের শাস্ত্র
- ঠাট: ভৈরব।
- জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহে ৭টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- আরোহ: স র গ ম প ধ ন স।
- অবরোহ: স ন ধ প ম গ র স।
- বাদী স্বর: ধ (কোমল ধৈবত)।
- সমবাদী স্বর: র (কোমল ঋষভ)।
- বর্জিত স্বর: কোনো স্বর বর্জিত নয়।
- ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ ও ধৈবত কোমল; বাকি সব স্বর (সা, গা, মা, পা, নি) শুদ্ধ।
- সময়: প্রাতঃকাল (ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত)।
- প্রকৃতি: গম্ভীর, শান্ত এবং ভক্তি রসপ্রধান।
সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ
- রাগ ভৈরব: গৌরী ভৈরবের মূল আধার এবং অঙ্গ রাগ; তবে এর চলন অনেক বেশি সরল।
- রাগ গৌরী: এই রাগের উত্তরাঙ্গের চলন গৌরী ভৈরবে বিশেষ বৈচিত্র্য নিয়ে আসে।
- রাগ রামকালী: রামকালীতে তীব্র মধ্যম থাকে, যা গৌরী ভৈরব থেকে একে আলাদা করে।
- রাগ কলিঙ্গড়া: কলিঙ্গড়াতে স্বরবিন্যাস একই হলেও এর গতির চঞ্চলতা গৌরী ভৈরবের গাম্ভীর্য থেকে ভিন্ন।
- রাগ ললিত ভৈরব: সময়ের দিক থেকে মিল থাকলেও ললিতের স্বর প্রয়োগ ও চলন সম্পূর্ণ ভিন্ন।
রাগ গৌরী ভৈরব হলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সেই কালজয়ী সুর যা ভোরের নিস্তব্ধতাকে এক অপূর্ব মরমী চেতনায় ভরিয়ে দেয়। ভৈরবের আভিজাত্য আর গৌরীর করুণ আবেদন—এই দুয়ের সার্থক মিলনই হলো এই রাগ। সঠিক আলাপ ও মীড়-গমকের ব্যবহারের মাধ্যমে এই রাগটি যখন গীত হয়, তখন তা কেবল গান থাকে না, তা এক ধরণের প্রার্থনায় পরিণত হয়। আধুনিক শাস্ত্রীয় সংগীতের আসরে গৌরী ভৈরব আজও তার প্রাচীন আভিজাত্য ও আধ্যাত্মিক মেজাজ নিয়ে স্বগৌরবে টিকে আছে।
তথ্যসূত্র:
১. পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — ‘হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতি’ (খণ্ড ২ ও ৩): ভৈরব অঙ্গের রাগসমূহের ব্যাকরণগত বিশ্লেষণের জন্য।
২. বসন্ত — ‘সংগীত বিশারদ’ (Sangeet Karyalaya): রাগের বাদী-সমবাদী এবং জাতি নির্ধারণের নির্ভরযোগ্য উৎস।
৩. বিমলকান্ত রায় চৌধুরী — ‘ভারতীয় সংগীতকোষ’: মিশ্র রাগসমূহের পরিচয় ও বিবর্তনের ঐতিহাসিক রেফারেন্স।
৪. Joep Bor — ‘The Raga Guide’: আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাগের তথ্যকোষ ও নোটেশন যাচাইয়ের জন্য।
৫. পণ্ডিত ওমকারনাথ ঠাকুর — ‘প্রণব ভারতী’: রাগের চলন ও সূক্ষ্ম স্বর প্রয়োগের তাত্ত্বিক আলোচনার জন্য।
আরও দেখুন: