হিন্দুস্থানি সঙ্গীতের রাগের নোট

রাগ জনসম্মোহিনী । শ্রোতা সহায়িকা নোট । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের জগতে আধুনিক এবং অত্যন্ত শ্রুতিমধুর একটি রাগ হলো রাগ জনসম্মোহিনী। নামটির মাঝেই এর সার্থকতা লুকিয়ে আছে—’জন’ অর্থাৎ মানুষ এবং ‘সম্মোহিনী’ অর্থাৎ যা মুগ্ধ বা মোহিত করে। এই রাগটি তার নামের মতোই শ্রোতাদের এক মায়াবী সুরের জালে আবদ্ধ করতে সক্ষম। এটি মূলত দক্ষিণ ভারতীয় বা কর্ণাটকী সংগীত পদ্ধতি থেকে হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

রাগ জনসম্মোহিনী

রাগ জনসম্মোহিনীর পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস

রাগ জনসম্মোহিনী মূলত খামাজ ঠাটের একটি রাগ। এই রাগের উদ্ভাবক হিসেবে আধুনিক সংগীতের কিংবদন্তি পণ্ডিত রবিশঙ্করের নাম বিশেষভাবে উচ্চারিত হয়। তিনি কর্ণাটকী সংগীতের কাঠামোকে হিন্দুস্তানি শৈলীতে ঢেলে সাজিয়ে একে জনপ্রিয় করে তোলেন।

এই রাগের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর সীমিত স্বর বিন্যাস এবং রাগ কলাবতীর সাথে এর নিবিড় সাদৃশ্য। কলাবতী রাগের সাথে যখন ‘ঋষভ’ (রে) যুক্ত করা হয়, তখনই তা জনসম্মোহিনীর রূপ ধারণ করে। এতে মধ্যম (মা) বর্জিত থাকায় এর চলন অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং উজ্জ্বল। এই রাগটি গাওয়ার সময় ‘রে’ এবং ‘পা’ স্বরের সংগতি এবং কোমল নিষাদের প্রয়োগ এক অদ্ভুত প্রশান্তি ও ভক্তি রসের সৃষ্টি করে। এটি মূলত গভীর রাতের রাগ হলেও এর স্নিগ্ধতা দিনের যেকোনো ক্লান্তি দূর করতে সক্ষম।

রাগের শাস্ত্র

  • ঠাটে: খামাজ।
  • জাতি: ষাড়ব-ষাড়ব (আরোহে ৬টি এবং অবরোহে ৬টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ: স র গ প ধ ন স (সা রে গা পা ধা নি সা)।
  • অবরোহ: স ন ধ প গ র স (সা নি ধা পা গা রে সা)।
  • বাদী স্বর: প (পঞ্চম)।
  • সমবাদী স্বর: স (ষড়জ)।
  • বর্জিত স্বর: আরোহ ও অবরোহ উভয় ক্ষেত্রেই ‘ম’ (মধ্যম) বর্জিত।
  • ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ (র), গান্ধার (গ), পঞ্চম (প) এবং ধৈবত (ধ) শুদ্ধ; কেবল নিষাদ (ন) কোমল ব্যবহৃত হয়।
  • সময়: রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর (রাত ৯টা থেকে ১২টা)।
  • প্রকৃতি: শান্ত, ভক্তিপ্রধান এবং রঞ্জনাত্মক।

 

সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ

  • রাগ কলাবতী: জনসম্মোহিনী থেকে ‘রে’ বাদ দিলে তা কলাবতী রাগে পরিণত হয়; কলাবতী এর নিকটতম রাগ।
  • রাগ খামাজ: মূল ঠাট রাগ হওয়ায় স্বরের মিল আছে, তবে খামাজে মধ্যম ব্যবহৃত হয়।
  • রাগ বৈরাগী: আরোহ-অবরোহের কাঠামোতে মিল থাকলেও বৈরাগীর ঠাট আলাদা এবং এতে ঋষভ কোমল।
  • রাগ শিবরঞ্জনী: মধ্যম ও নিষাদ বর্জিত হলে শিবরঞ্জনীর আভাস পাওয়া যায়, তবে জনসম্মোহিনীতে কোমল নিষাদ অপরিহার্য।
  • রাগ তিলাং: তিলাং-এ ধৈবত ও ঋষভ বর্জিত থাকলেও কোমল নিষাদের প্রয়োগে জনসম্মোহিনীর সাথে মিল পাওয়া যায়।

রাগ জনসম্মোহিনী হলো শাস্ত্রীয় সংগীতের সেই বিশেষ সুর যা জটিল ব্যাকরণের মারপ্যাঁচ ছাপিয়ে সরাসরি মানুষের হৃদয়ে নাড়া দেয়। এর উদ্ভাবন আমাদের সংগীতের সমৃদ্ধিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিরল পাঁচটি বা ছয়টি স্বরের জাদুতে কীভাবে একটি সম্পূর্ণ পরিবেশকে সম্মোহিত করা যায়, জনসম্মোহিনী তার এক অনন্য নিদর্শন। ভজন, গজল বা যন্ত্রসংগীত—সব ক্ষেত্রেই এই রাগের আবেদন চিরন্তন। আধুনিক সংগীতের ধারায় এই রাগের চর্চা যেমন নবীনদের জন্য সহজ, তেমনই প্রবীণ শিল্পীদের জন্য এটি এক সৃজনশীল ক্যানভাস।

তথ্যসূত্র:

১/ পণ্ডিত রবিশঙ্করের সংগীত দর্শন: যেখানে তিনি জনসম্মোহিনী ও তিলক কামোদের মতো রাগগুলোর বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করেছেন।

২/ সংগীত বিশারদ – বসন্ত: রাগের তাত্ত্বিক কাঠামো এবং কর্ণাটকী প্রভাব নিরূপণের প্রামাণ্য গ্রন্থ।

৩/ The Raga Guide: A Survey of 74 Hindustani Ragas – Joep Bor: আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাগের তথ্যকোষ ও তুলনামূলক বিশ্লেষণ।

৪/ রাগ পরিচয় (১ম-৪র্থ খণ্ড) – পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে: খামাজ ঠাটের অন্তর্গত রাগসমূহের মূল ভিত্তি বোঝার জন্য।

৫/ শাস্ত্রীয় সংগীতের তত্ত্ব ও ইতিহাস – এ কে এম মনসুর: আধুনিক রাগের অন্তর্ভুক্তি ও প্রয়োগবিধি সংক্রান্ত বিবরণ।

শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp LinkedIn

প্রেস ডেস্ক, সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর অফিস

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর নিজের সকল লেখা, শুভেচ্ছা, স্মরণ ইত্যাদি এই ডেস্ক থেকে প্রকাশিত হয়।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ। ইতিহাস, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন নিয়ে লেখালেখি।

যোগাযোগ

কুমারখালী বাস স্ট্যান্ড, দুর্গাপুর, কুমারখালী।
+৮৮০ (১৭) ৬৩০৩৮,৬৩০৩৯।contact@sufifaruq.com

© ২০২৬ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।