রাগ জয়জয়ন্তী । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

রাগ জয়জয়ন্তী (Raag Jaijaiwanti) ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অন্যতম প্রাচীন, পরম সুন্দর ও অত্যন্ত জটিল একটি রাগ। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই রাগটি মধ্যযুগে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং মোঘল দরবারেও এর বিশেষ কদর ছিল। এটি খাম্বাজ ঠাটের অন্তর্গত হলেও এতে কাফি ঠাটের ছায়া স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়।

রাগ জয়জয়ন্তী

এই রাগটির সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো—এতে রাগ বাগেশ্রী, রাগ দেশ এবং রাগ খাম্বাজের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটে। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতজ্ঞদের মতে, জয়জয়ন্তী গাওয়া অত্যন্ত কঠিন। কারণ এতে দুটি গান্ধার (শুদ্ধ ও কোমল) এবং দুটি নিখাদ (শুদ্ধ ও কোমল) অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ব্যবহৃত হয়। একটু অসাবধান হলেই এটি রাগ ‘দেশ’ কিংবা ‘বাগেশ্রী’র দিকে ঝুঁকে পড়ে।

জয়জয়ন্তীর প্রকৃতি একই সাথে রাজকীয় এবং অত্যন্ত রোমান্টিক ও বিরহাত্মক। এই রাগের পরিবেশনায় এক ধরনের মায়াবী গাম্ভীর্য ফুটে ওঠে যা শ্রোতার মনকে এক অপার্থিব প্রশান্তিতে ভরিয়ে দেয়।

রাগের শাস্ত্র (The Grammar of Raga Jaijaiwanti)

হিন্দুস্তানি মার্গ সঙ্গীতের ব্যাকরণ এবং ITCSRA-এর প্রামাণিক নিয়ম অনুযায়ী রাগ জয়জয়ন্তীর ব্যাকরণ নিচে দেওয়া হলো:

  • ঠাট: খাম্বাজ (তবে এতে কাফি ঠাটের চলনও রয়েছে)
  • জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহণে ৭টি এবং অবরোহণে ৭টি স্বরই ব্যবহৃত হয়)
  • আরোহ: সা রে গামা পা নীরেসা (বক্র চলন: রে জ্ঞা রে সা, নী ধা পা, রে মা পা নী র্সা)
  • অবরোহ: র্সা নী ধা পা, মা গা রে, জ্ঞা রে সা
  • বাদী স্বর: রে (ঋষভ)
  • সমবাদী স্বর: পা (পঞ্চম)
  • বর্জিত স্বর: কোনো স্বর বর্জিত নয় (সব স্বরই লাগে)
  • ব্যবহৃত স্বর: সা, শুদ্ধ রে, শুদ্ধ ও কোমল গান্ধার (গা এবং জ্ঞা), শুদ্ধ মধ্যম (মা), পা, শুদ্ধ ধৈবত (দা), শুদ্ধ ও কোমল নিখাদ (নী এবং নূ)।
  • সময়: রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর (রাত ৯টা থেকে মধ্যরাত)।
  • প্রকৃতি: গম্ভীর, রোমান্টিক, বিরহ ও শৃঙ্গার রসাত্মক।

 

রাগ জয়জয়ন্তী সম্পর্কিত অন্যান্য রাগ:

ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের প্রামাণ্য গ্রন্থ এবং চলন অনুযায়ী জয়জয়ন্তী রাগের সাথে সুরের মিল বা সামান্য বৈপরীত্য থাকা রাগগুলোর তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

  • রাগ দেশ: জয়জয়ন্তীর আরোহণের চলনে রাগ দেশের প্রবল প্রভাব দেখা যায়; তবে জয়জয়ন্তীতে কোমল গান্ধারের (জ্ঞা) প্রয়োগ এবং বক্র চলন একে রাগ দেশ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রূপ দেয়।

  • রাগ বাগেশ্রী: জয়জয়ন্তীর অবরোহণের অংশে কোমল গান্ধার (জ্ঞা) ও শুদ্ধ মধ্যমের (মা) চলনে রাগ বাগেশ্রীর ছায়া লক্ষ্য করা যায়।

  • রাগ গারা: জয়জয়ন্তীর মতোই রাগ গারা অত্যন্ত মিষ্টি একটি চপল রাগ, তবে গারা রাগে জয়জয়ন্তীর মতো ভারী ক্লাসিক্যাল চলন এবং বক্রতা থাকে না।

  • রাগ খাম্বাজ: জয়জয়ন্তীর উৎপত্তিস্থল বা মূল ঠাট; খাম্বাজে দুটি নিখাদের (শুদ্ধ ও কোমল) ব্যবহার থাকলেও জয়জয়ন্তীর মতো দুটি গান্ধারের ওজস্বী বক্র চলন খাম্বাজে থাকে না।

  • রাগ রাকেশ্বরী (রাগেশ্বরী): জয়জয়ন্তীর আরোহণে মধ্যম বর্জন করে কোমল গান্ধার ও নিখাদের কিছু কাজ করলে তা রাগেশ্বরীর রূপ ধারণ করতে পারে, যা জয়জয়ন্তীর পরিবেশনায় বড় এক সতর্কতার বিষয়।

 

রাগ জয়জয়ন্তী ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক অনুপম সৃষ্টি। একদিকে খাম্বাজ ঠাটের আভিজাত্য, অন্যদিকে কাফি ঠাটের মায়াবী আবেদন—এই দুইয়ের সার্থক মেলবন্ধন ঘটেছে জয়জয়ন্তীতে। দুটি গান্ধার ও দুটি নিখাদের সূক্ষ্ম ও নিখুঁত প্রয়োগের কারণে এটি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতশিল্পীদের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। রাজকীয় মেজাজ এবং গভীর বিরহ বা রোমান্টিকতার এক অপূর্ব দোলাচল এই রাগকে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের আসরে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

সূত্র:

১. ITC Sangeet Research Academy (ITCSRA) – Raga Guide & Archive: হিন্দুস্তানি মার্গ সঙ্গীতের প্রামাণ্য শাস্ত্রীয় ব্যাকরণের প্রধান নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল আর্কাইভ।

২. পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডের ‘ক্রমিক পুস্তক মালিকা’ (অংশ ৩ ও ৪): হিন্দুস্তানি সঙ্গীতের মূল ব্যাকরণ গ্রন্থ।

৩. The Raga Guide (Joep Bor): আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ভারতীয় শাস্ত্রীয় রাগের স্বরলিপি ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ।