ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সুবিশাল আকাশতলে রাগ জিলাফ (Zilaf) একটি অত্যন্ত বিরল, অপ্রচলিত কিন্তু অসম্ভব মায়াবী ও গাম্ভীর্যপূর্ণ রাগ। এটি মূলত ভৈরব ঠাটের অন্তর্ভুক্ত একটি রাগ। শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রধান রাগগুলোর মতো এটি সর্বত্র প্রচলিত না হলেও, এর বিশেষ স্বর বিন্যাস এবং গায়নশৈলী একে এক অনন্য আভিজাত্য দান করেছে।
রাগ জিলাফ
রাগ জিলাফ-এর পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস
রাগ জিলাফ মূলত একটি মিশ্র প্রকৃতির রাগ। অনেক সংগীতজ্ঞ মনে করেন, এটি প্রাচীন পারস্য বা মধ্যপ্রাচ্যের সংগীতের প্রভাবে ভারতীয় সংগীতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এর চলনে আমরা রাগ ভৈরব এবং রাগ টোড়ী—এই দুইয়ের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ লক্ষ্য করি। এই রাগের ইতিহাস সম্পর্কে খুব বেশি প্রাচীন তথ্য না পাওয়া গেলেও এটি মূলত মুঘল আমল পরবর্তী উত্তর ভারতীয় সংগীত ঘরানার একটি অংশ হিসেবে পরিচিত।
এই রাগের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর আরোহে ঋষভ (রে) এবং মধ্যম (মা) স্বরের বর্জন। জিলাফ রাগের প্রকৃতি অত্যন্ত গম্ভীর এবং বৈরাগ্যপূর্ণ। এটি গাওয়ার সময় শিল্পী এক ধরনের আধ্যাত্মিক প্রশান্তি অনুভব করেন। এই রাগে কোমল ঋষভ এবং কোমল ধৈবতের বিশেষ প্রয়োগ একে ভৈরব অঙ্গের রাগের মর্যাদা দেয়। তবে এর চলন ও স্বর বিন্যাস একে ভৈরব থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে রাখে। জিলাফ সাধারণত খেয়াল গায়কির জন্য ব্যবহৃত হয় এবং এটি ভোরের পরিবেশকে এক অলৌকিক শান্তিতে ভরিয়ে দেয়।
রাগের শাস্ত্র
- ঠাটে: ভৈরব।
- জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহে ৫টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- আরোহ: স গ প ধ ন স (সা গা পা ধা নি সা)।
- অবরোহ: স ন ধ প ম গ র স (সা নি ধা পা মা গা রে সা)।
- বাদী স্বর: ধ (কোমল ধৈবত)।
- সমবাদী স্বর: গ (গান্ধার)।
- বর্জিত স্বর: আরোহে ‘র’ (ঋষভ) এবং ‘ম’ (মধ্যম) বর্জিত।
- ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ (রে) এবং ধৈবত (ধা) কোমল; বাকি সব স্বর (সা, গা, মা, পা, নি) শুদ্ধ।
- সময়: প্রাতঃকাল (ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত)।
- প্রকৃতি: গম্ভীর, ভক্তি ও বৈরাগ্য রসপ্রধান।
সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ
- রাগ ভৈরব: জিলাফ-এর মূল ঠাট রাগ; আরোহের চলন ছাড়া অবরোহে ভৈরবের গভীর প্রভাব বিদ্যমান।
- রাগ গুণকালী: আরোহে ঋষভ ও মধ্যম বর্জিত হওয়ার দিক থেকে গুণকালীর সাথে এর মিল লক্ষ্য করা যায়।
- রাগ বিভাস: স্বর বিন্যাসের ক্ষেত্রে বিভাসের সাথে সাদৃশ্য থাকলেও জিলাফ-এ নিষাদ ও মধ্যমের প্রয়োগ একে আলাদা করে।
- রাগ যোগিয়া: ভোরের রাগ হিসেবে এবং ভৈরব অঙ্গের হওয়ার কারণে জোগিয়ার মেজাজের সাথে এর মিল অনুভূত হয়।
- রাগ ললিত: সময়ের দিক থেকে মিল থাকলেও ললিতের স্বর প্রয়োগ সম্পূর্ণ ভিন্ন ও জটিল।
রাগ জিলাফ হলো ভারতীয় সংগীতের সেই নিভৃত কোণে থাকা এক রত্ন, যার মাধুর্য কেবল নিবিড় সাধনার মাধ্যমেই উপলব্ধি করা সম্ভব। এর সীমিত আরোহ এবং সম্পূর্ণ অবরোহের বৈচিত্র্যময় চলন গায়ককে অবারিত সৃজনশীলতার সুযোগ দেয়। এটি এমন একটি রাগ যা ভোরের নিস্তব্ধতায় আত্মিক প্রশান্তি ও স্রষ্টার প্রতি সমর্পণের এক অপূর্ব আবহ তৈরি করে। আধুনিক শাস্ত্রীয় সংগীতে এই রাগের প্রচার কম হলেও এর আভিজাত্য ও আধ্যাত্মিক মেজাজ একে সংগীত গবেষকদের কাছে আজও এক পরম আকাঙ্ক্ষার সুর করে রেখেছে।
তথ্যসূত্র:
১/ পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — ‘হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতি’ (Kramik Pustak Malika, খণ্ড ৩ ও ৪): বিরল ও অপ্রচলিত রাগসমূহের ব্যাকরণ ও ঠাট নির্ধারণের প্রধান উৎস।
২/ বসন্ত — ‘সংগীত বিশারদ’ (Sangeet Karyalaya): রাগের বাদী-সমবাদী এবং জাতি নির্ধারণের নির্ভরযোগ্য আকর।
৩/ বিমলকান্ত রায় চৌধুরী — ‘ভারতীয় সংগীতকোষ’: রাগের ঐতিহাসিক বিবর্তন ও তুলনামূলক আলোচনার জন্য।
৪/ Joep Bor — ‘The Raga Guide’: আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাগের তথ্যকোষ যেখানে ভৈরব অঙ্গের রাগের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।
৫/ শাস্ত্রীয় সংগীতের তত্ত্ব ও ইতিহাস — এ কে এম মনসুর: দেশীয় সংগীতশাস্ত্রে জিলাফ রাগের প্রয়োগ ও গায়কি সংক্রান্ত বিবরণ।
আরও দেখুন: