আগেই বলেছি “দরবারী” দিয়েই আমার শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শোনার যাত্রা শুরু। পাতিয়ালা ঘরানার ওস্তাদ ফতেহ আলি খাঁ ও জাহিদা পারভীনের কণ্ঠে ১৯৫৭ সালের ‘ওয়াদা’ চলচ্চিত্রের সেই ঐতিহাসিক গান “নয়ন সে নয়ন মিলায়ে রাখনে কো”-র দরবারী বিস্তারই আমাকে টেনে এনে বসিয়েছিল এই সুরের ইন্দ্রলোকে।

রাগ দরবারী ও দরবারী-কানাড়া [ Raga Darbari Kanada ]
সেই সাথে আরেকটি তথ্য জানিয়ে রাখি—অনেকেই মনে করেন রাগ দরবারী ও দরবারী-কানাড়া আলাদা রাগ। বাস্তবে “রাগ দরবারী” এবং “রাগ দরবারী কানাড়া” দুটি ভিন্ন রাগ নয়, বরং একই রাগের দুটি নাম। প্রাচীন কর্ণাটকী বা দক্ষিণ ভারতীয় সঙ্গীতে “কানাড়া” (বা কানহাড়া) নামক একটি রাগের প্রচলন ছিল। মুঘল সম্রাট আকবরের রাজসভার প্রধান সঙ্গীতজ্ঞ মিয়া তানসেন এই প্রাচীন কানাড়া রাগের সাথে মালকোষের গাম্ভীর্য এবং অন্যান্য স্বরের সূক্ষ্ম কারুকার্য মিশিয়ে সম্রাট আকবরের “দরবারে” পরিবেশন করেন।
তানসেনের এই সৃষ্টির পর থেকে রাজদরবারে পরিবেশিত কানাড়া রাগের এই বিশেষ রূপটিকে “দরবারী কানাড়া” বলা হতে থাকে। চলিত ভাষায় বা সংক্ষেপে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতজ্ঞরা একে শুধু “দরবারী” বলেও ডাকেন। অতএব, তত্ত্বগতভাবে এদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। দরবারী হলো সংক্ষিপ্ত ডাকনাম এবং দরবারী কানাড়া হলো পূর্ণাঙ্গ শাস্ত্রীয় নাম।
দরবারী মূলত মধ্যরাতের রাগ। এই রাগ দুঃখ, শোক আর বিয়োগান্তক অনুভবের গম্ভীর প্রকাশ। কম্পোজ করেছিলেন মিয়া তানসেন, আকবর বাদশার দরবারে। সুরের গাম্ভীর্য, অনুভবের অতলে নিয়ে যাবার ক্ষমতা এবং আকার-প্রকারে আকবর বাদশার দরবারের মতো “গ্র্যান্ড” হবার কারণে এর নাম হয়েছিলো দরবারী। সম্ভবত আকবরই নামটা দিয়েছিলেন।
গাইয়ে-বাজিয়েরা সবাই এ রাগের শ্রেষ্ঠ নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম মানেন ওস্তাদ বিলায়েত খাঁ সাহেবের সেতারে বাজানো “দরবারী” রাগের ঐতিহাসিক রেকর্ডগুলোকে। এই বিলায়েত খাঁ সাহেবই এক সাক্ষাৎকারে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেছিলেন, আমি ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ সাহেবের দরবারী শুনে তাতে মুঘল সম্রাটের কান্না শুনতে পেয়েছি।
রাগ দরবারী কানাড়ার শাস্ত্র [Grammar of this Raga]
আসাবরী ঠাটের এই রাগের গান্ধার, ধৈবত ও নিখাদ কোমল; কিন্তু ঋষভ শুদ্ধ। এই কোমল স্বরগুলো সাধারণ কোমল নয়, এগুলোকে বলা হয় ‘অতি কোমল’ বা কাঁপানো সুর (আন্দোলিত)। আরোহ এবং অবরোহে সুর নামার সময় সুর দুটির চেহারা ভিন্ন। তাই সঠিক জায়গা থেকে এই সুর লাগানো এই রাগে একটা বড় চ্যালেঞ্জ, বিশেষ করে কোমল গান্ধারের আন্দোলন। আরোহ কালে গান্ধার ঋষভের দিকে এবং অবরোহ কালে গান্ধার মধ্যমের দিকে ঝুঁকে থাকে। ধৈবতেও অনেকখানি একই রকম চলন লক্ষ্য করা যায়।
- আরোহণ: স রে জ্ঞা, রে স, ম প, ধা নী র্স (বক্র চলন)
- অবরোহণ: র্স নী ধা প, ম জ্ঞা, রে স
- ঠাট: আসাবরী
- জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (চলনের কারণে অনেকে একে বক্র ষাড়ব-সম্পূর্ণ বলেন)
- বাদী স্বর: ঋষভ (রে)
- সমবাদী স্বর: পঞ্চম (পা)
- অঙ্গ: পূর্বাঙ্গ
- সময়: রাত্রি দ্বিতীয় প্রহর (মধ্যরাত)
- পকড় (মুখ্য চলন): জ্ঞা, রে রে স, দ্ ণ্ স রে স
আরোহ-আবরোহ এই লিঙ্ক গুলোতে গিয়ে শুনে নিতে পারেন । লিংক ১ ।
রাগ দরবারী কানাড়ার প্রাণ প্রতিষ্টা হয় কিভাবে:
১. অতি-কোমল গান্ধার ($g$) এবং ধৈবতের ($d$) আন্দোলন (The Soul)
দরবারী রাগের সবচেয়ে বড় প্রাণ হলো এর কোমল গান্ধার (জ্ঞা) এবং কোমল ধৈবতের (দা) বিশেষ প্রয়োগ। এই স্বর দুটি সাধারণ কোমল নয়, এগুলোকে বলা হয় অতি-কোমল। এই দুটি স্বর লাগানোর সময় সোজা লাগিয়ে ছেড়ে দেওয়া যায় না। এগুলোকে মন্দ্র (নিচু) ও মধ্য সপ্তকে খুব ধীর গতিতে কাঁপাতে হয় (যাকে শাস্ত্রীয় ভাষায় আন্দোলন বলে)। এই কাঁপুনিই দরবারীর কান্না ও গাম্ভীর্য তৈরি করে।
২. বক্র চলন (Crooked Movement)
দরবারী কানাড়া সোজা বা সরল রেখায় চলে না। এর আরোহণ এবং অবরোহণ পেঁচানো বা বক্র। যেমন— অবরোহণের সময় সরাসরি সরলভাবে ‘র্সানিধাপামাগারেসা’ না এসে স্বরগুলোকে পেঁচিয়ে নামতে হয়। এর চলনটি অনেকটা এরকম: র্সা নি ধা পা মা পা জ্ঞা রে রে সা। এই পেঁচানো বা বক্র চলনটিই রাগের রাজকীয় গাম্ভীর্য ধরে রাখে।
৩. মন্দ্র সপ্তকের বিস্তার (Bass/Lower Octave)
দরবারী কানাড়া হলো খাদের রাগ। এর আসল রূপ খোলে যখন গায়ক বা বাদক খাদের পর্দায় (নিচু স্বরে) খেলেন। তার সপ্তকে (High Pitch) এই রাগের গায়কি তেমন জমে না। খাদের স্বরে ধীর লয়ে বিস্তার করাই এই রাগের প্রাণ।
৪. ভারী মীড়ের কাজ (Heavy Glides)
এক স্বর থেকে অন্য স্বরে যাওয়ার সময় কোনো বিরতি না দিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়াকে মীড় বলে। দরবারী কানাড়ায় দ্রুত লাফিয়ে স্বর পরিবর্তন করা যায় না। এক স্বর থেকে অন্য স্বরে যাওয়ার সময় অত্যন্ত ভারী ও ওজস্বী মীড় ব্যবহার করতে হয়।
৫. প-র এবং র-প সংগতি (P-R & R-P Sangati)
পঞ্চম ($P$) এবং ঋষভের ($R$) মধ্যকার সরাসরি যোগাযোগ এই রাগের অন্যতম প্রধান চলন। পঞ্চম থেকে ঋষভ এবং ঋষভ থেকে পঞ্চমে যাওয়ার সময় দরবারীর গম্ভীর মেজাজটি চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে।
কান তৈরিতে শোনার কোন বিকল্প নেই। শুনতে হবে এই রাগের সব রকমের মিউজিক। শুরু করা যাক ..
কন্ঠসঙ্গীতে দরবারী-কানাড়া:
কাজী নজরুল ইসলামের গানে দরবারী-কানাড়া :
নজরুলের অনেক গানই রাগাশ্রয়ী। সুনির্দিষ্ট রাগের আশ্রয়ে যে গানগুলোতে সুর করা হয়েছে, সেগুলোর পুরো সুরে রাগের অবয়ব বজায় রাখার চেষ্টা থেকেছে; খুব বেশি রাগভ্রষ্ট হয়নি। তাই নজরুলের গানগুলো কান তৈরিতে বেশি উপযোগী বলে আমার কাছে মনে হয়।
নিচে রাগ দরবারী কানাড়ার প্রামাণিক গানগুলোর তালিকা দেওয়া হলো:
১. কেন মেঘের ছায়া আজি চাঁদের চোখে? — কণ্ঠ: পণ্ডিত জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামী। (এটি নজরুলের দরবারী কানাড়ার সবচেয়ে বড় মাস্টারপিস)।
২. ছায়ানট মোর বনের হরিণ কে বাঁধিল রে — কণ্ঠ: গিরীন চক্রবর্তী / ধীরেন্দ্র চন্দ্র মিত্র। (শুদ্ধ দরবারী কানাড়ার একটি গম্ভীর উদাহরণ)।
৩. আজি নিশীথে বরিষন হলো ঘনঘোর — (বর্ষার আবহে দরবারী কানাড়ার এক অপূর্ব প্রয়োগ)।
৪. দুলে চম্পা বনে নব মালতী লতা — (দরবারী কানাড়ার মায়াবী রূপ)।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের গানে দরবারী-কানাড়া :
কবিগুরু তাঁর অনেক কম্পোজিশনে প্রচলিত রাগের আশ্রয় নিলেও অনেক সময় রাগের কঠোর কাঠামোতে তিনি আটকে থাকতে চাননি। তাঁর সুরের পথ ভাবের টানে রাগের ব্যাকরণের বাইরে চলে গেছে প্রায়শই। তাই বিশুদ্ধ রাগাশ্রয়ী বা রাগের খাঁটি ব্যাকরণ শেখার ক্ষেত্রে তাঁর গান অনেক সময় সরাসরি উদাহরণ হিসেবে খাপ খায় না। তবে রাগের নির্যাসটুকু তিনি অপূর্বভাবে ধারণ করেছেন।
নিচে রবীন্দ্রসঙ্গীতে রাগ দরবারী কানাড়ার প্রামাণিক তালিকা দেওয়া হলো:
১. বিদায় করেছ যারে নয়ন জলে — (দরবারী কানাড়ার বিষাদকে বিদায়ের অশ্রুর সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে)।
২. হে সখা, মম হৃদয়ে রহো — (পূজা পর্যায়ের এই গানটিতে দরবারী কানাড়ার গম্ভীর ভক্তিভাব অত্যন্ত স্পষ্ট)।
৩. নিশীথশয়নে ভেবে রাখি মনে — (প্রেম পর্যায়ের গান, যেখানে রাতের নিস্তব্ধতায় দরবারীর ছায়া ব্যবহার করা হয়েছে)।
৪. জয় তব বিচিত্র আনন্দ — (পূজা পর্যায়ের গান, যেখানে দরবারী ও কানাড়া অঙ্গের রাজকীয় গম্ভীর সুর ব্যবহৃত হয়েছে)।
আধুনিক গানে দরবারী-কানাড়া:
বাংলা আধুনিক এবং ছায়াছবির গানের ক্ষেত্রেও রাগ দরবারী কানাড়ার প্রয়োগ অদ্ভুত এক গাম্ভীর্য সৃষ্টি করেছে। নিচে এর কয়েকটি প্রামাণিক উদাহরণ দেওয়া হলো:
১. আজি নিঝুম রাতে কে বাঁশি বাজায় — (রচনা ও সুর: তুলসী লাহিড়ী, কণ্ঠ: জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামী)। বাংলা আধুনিক গানে শুদ্ধ দরবারীর চলন ধরে রাখার এক অনবদ্য উদাহরণ।
২. এ বেদনা কেমনে সহি — (কণ্ঠ: কে এল সায়গল)। ছায়াছবির গানের এই বিরহের সুরে দরবারী কানাড়ার বিষাদ চমৎকারভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
গজলে দরবারী-কানাড়া:
গজলের মৃদু ও আবেগঘন গায়কির সাথে দরবারী কানাড়ার মন্দ্র (নিচু) স্বরের কম্পন ও মীড়ের কাজ এক অদ্ভুত বেদনা ও হাহাকার তৈরি করে। নিচে গজলে দরবারী কানাড়ার সবচেয়ে প্রামাণিক ও বিশুদ্ধ উদাহরণ দেওয়া হলো:
১. পেহলে তৌ বুত কদে মে (Pehle To But-Kade Mein) — অ্যালবাম: দস্তে জুনুন, কণ্ঠ: জগজিৎ সিং। (খাঁটি দরবারী কানাড়ার অতি-কোমল গান্ধারের আন্দোলন এই গজলে দারুণভাবে ধরা পড়েছে)।
২. নাজরে কারাম ফারমাও (Nazre Karam Farmao) — কণ্ঠ: জগজিৎ সিং। (আধ্যাত্মিক নিবেদনে দরবারী কানাড়ার রাজকীয় গাম্ভীর্যের অনবদ্য প্রয়োগ)।
৩. চোরি কাহি খিলে না নাসিমে বাহার কি (Chori Kaheen Khule Na) — কণ্ঠ: মুখতার বেগম। (পুরোনো দিনের ধ্রুপদী গজলে দরবারী কানাড়ার এক দুর্লভ ও খাঁটি রূপ)।
গজল, ঠুমরি কিংবা দাদরার মতো হালকা মেজাজের গানগুলো খাঁটি দরবারী কানাড়ায় তেমন একটা হয় না। কারণ, দরবারীর অতি-কোমল গান্ধার ও ধৈবতের দীর্ঘ আন্দোলন এবং ভারী মীড়ের কাজ অক্ষুণ্ণ রেখে চপল বা দ্রুত লয়ের গান বাঁধা প্রায় অসম্ভব। সুরকাররা যদি কানাড়া অঙ্গের হালকা গান তৈরি করতে চান, তবে দরবারীর বদলে আড়ানা, শাহানা কিংবা কৌশিক কানাড়ার আশ্রয় নেন। এজন্যই হালকা মেজাজের এই গানগুলোকে কান তৈরির আদর্শ উদাহরণ হিসেবে আপনার সামনে দিচ্ছি না। এর বদলে নিচে হিন্দি চলচ্চিত্রের কিছু কালজয়ী গান দেওয়া হলো, যেগুলোতে দরবারীর মূল ছাঁচ ও জনপ্রিয় চলনগুলোর নিখুঁত প্রয়োগ হয়েছে। এগুলো আপনার কানে রাগ দরবারীর একটি স্থায়ী কাঠামো তৈরি করতে সাহায্য করবে।
হিন্দি/উর্দু চলচ্চিত্রে রাগ দরবারী-কানাড়া:
চন্দ্রকান্তা আর্কাইভ (Chandrakantha.com) এবং ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতের রেকর্ড অনুযায়ী নিচে দরবারী কানাড়ার সবচেয়ে প্রামাণিক ও জনপ্রিয় হিন্দি চলচ্চিত্রের গানগুলোর তালিকা দেওয়া হলো:
১. তু পেয়ার কা সাগর হ্যায় (Tu Pyar Ka Sagar Hai) — ছায়াছবি: সীমাব (Seema, 1955), কণ্ঠ: মান্না দে, সুরকার: শঙ্কর-জয়কিষণ। এটি চলচ্চিত্রে দরবারী কানাড়ার একটি প্রশ্নাতীত ধ্রুপদী রূপ। খাদের স্বরে মান্না দে-র আর্তি দরবারীর গাম্ভীর্যকে পুরোপুরি ধারণ করেছে।
২. অ্যায় দিল-এ-নাদান (Aye Dil-e-Nadaan) — ছায়াছবি: রাজিয়া সুলতান (Razia Sultan, 1983), কণ্ঠ: লতা মঙ্গেশকর, সুরকার: খৈয়াম। মরুভূমির নিস্তব্ধতা এবং রাতের গভীরতায় দরবারী কানাড়ার কোমল গান্ধার ও ধৈবতের মায়াবী প্রয়োগ এই গানে ইতিহাস তৈরি করেছে।
৩. যব দীপ জ্বলে আনা (Jab Deep Jale Aana) — ছায়াছবি: চিতচোর (Chitchor, 1976), কণ্ঠ: যীশু দাস ও হেমলতা, সুরকার: রবীন্দ্র জৈন। হিন্দি ছায়াছবিতে দরবারী কানাড়ার চলনকে রোমান্টিক এবং সহজবোধ্য করার এটি একটি অনবদ্য উদাহরণ।
৪. সাত পার সমন্দর পার (Saat Samundar Paar) — ছায়াছবি: বিশ্বাত্মা (Vishwatma, 1992), কণ্ঠ: সাধনা সরগম, সুরকার: বিজু শাহ। একটি দ্রুত লয়ের পপ-ড্যান্স গান হওয়া সত্ত্বেও এর স্থায়ী এবং অন্তরার মূল মেলোডিটি দরবারী কানাড়ার স্বরকাঠামোর ওপর তৈরি। এটি আধুনিক কানে দরবারী খোঁজার একটি দারুণ উদাহরণ।
৫. পাগ ঘুঙরু বাঁধ মীরা নাচি থি (Pag Ghunghroo Baandh) — ছায়াছবি: নমক হালাল (Namak Halaal, 1982), কণ্ঠ: কিশোর কুমার, সুরকার: বাপ্পি লাহিড়ী। গানটির প্রথমের দিকে এবং শাস্ত্রীয় অংশের তান-গমকে সুরকার বাপ্পি লাহিড়ী দরবারী কানাড়ার আভিজাত্য খুব চমৎকারভাবে লুকিয়ে রেখেছিলেন।
খেয়ালে দরবারী-কানাড়া:
খেয়াল (Khayal) হলো রাগ দরবারী কানাড়ার আভিজাত্য প্রকাশের প্রধানতম মাধ্যম। খাদের স্বরে অতি ধীর লয়ে বিস্তার (বিলম্বিত) এবং তার সপ্তকে না গিয়ে মধ্য ও মন্দ্র সপ্তকেই এই রাগের আসল গাম্ভীর্য প্রকাশ পায়।
খেয়ালে দরবারী কানাড়ায় নিচের রেকর্ডিং গুলো শুনতে পারেন।
১. উস্তাদ আমীর খাঁ (Ustad Amir Khan) — ইন্দোর ঘরানা
ITCSRA এবং মার্গ সঙ্গীতের ইতিহাসে আমীর খাঁ সাহেবের দরবারী কানাড়াকে এই রাগের অবিসংবাদিত “বাইবেল” ধরা হয়। তাঁর অতি-ধীর গতির বিলম্বিত এবং খাদের অতি-কোমল গান্ধার ও ধৈবতের গুমরানি মীড়যুক্ত আন্দোলন দরবারীর আসল প্রাণ।
২. উস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খাঁ (Ustad Bade Ghulam Ali Khan) — পাটিয়ালা ঘরানা
পাটিয়ালা গায়কীর গমক, তান এবং দরবারীর রাজকীয় মেজাজের মেলবন্ধন। খাদের বিস্তারের পাশাপাশি তাঁর মধ্য ও দ্রুত তানের কারুকাজ দরবারীর ব্যাকরণ অক্ষুণ্ণ রেখেই অনন্য এক রূপ তৈরি করেছে।
৩. পণ্ডিত ভীমসেন জোশী (Pandit Bhimsen Joshi) — কিরানা ঘরানা
কিরানা ঘরানার মন্থর স্বরবিস্তার এবং পণ্ডিতজীর কণ্ঠের ওজস্বী গাম্ভীর্য দরবারী কানাড়াকে এক অনন্য আধ্যাত্মিক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তাঁর গাওয়া বিলম্বিত বন্দিশ এই রাগের একটি ধ্রুপদী রূপ।
৪. উস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ (Ustad Faiyaz Khan) — আগ্রা ঘরানা
আগ্রা ঘরানার নোম-তোম আলাপ এবং দরবারীর অতি-ভারী পুরুষালি মেজাজকে উস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ সাহেব যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে এক অনন্য দলিল।
৫. পণ্ডিত ওঙ্কারনাথ ঠাকুর (Pandit Omkarnath Thakur) — গোয়ালিয়র ঘরানা
গোয়ালিয়র ঘরানার প্রাচীন চলন এবং পণ্ডিতজীর আবেগঘন নাট্যধর্মী গায়কি দরবারী কানাড়ায় এক অদ্ভুত হাহাকার ও রোমাঞ্চের জন্ম দেয়।
৬. উস্তাদ সালামত আলী খাঁ ও নজাকত আলী খাঁ (Ustad Salamat Ali & Nazakat Ali Khan) — শামচৌরাসী ঘরানা
দুই ভাইয়ের যৌথ কণ্ঠে দরবারীর তান ও সওয়াল-জবাব উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের প্রামাণ্য রেকর্ডের অন্তর্ভুক্ত।
৭. পণ্ডিত জসরাজ (Pandit Jasraj) — মেওয়াতি ঘরানা
মেওয়াতি ঘরানার আধ্যাত্মিক ভাব এবং পণ্ডিত জসরাজের কণ্ঠে দরবারীর অতি-কোমল গান্ধারের সূক্ষ্ম কাজ ও ভক্তিভাব শ্রোতাকে এক পরম স্তব্ধতায় নিয়ে যায়।
৮. বিদুষী কিশোরী আমোনকর (Vidushi Kishori Amonkar) — জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানা
জয়পুর ঘরানার জটিল ও বক্র তানের চলন এবং কিশোরীজীর নিজস্ব দর্শনে দরবারী কানাড়ার বিষাদগ্রস্ত মেজাজ এই রেকর্ডিংয়ে এক অপূর্ব মনস্তাত্ত্বিক রূপ নিয়েছে।
৯. পণ্ডিত কুমার গন্ধর্ব (Pandit Kumar Gandharva) — ঘরানাবহির্ভূত মৌলিক গায়কি
কুমার গন্ধর্ব যখন প্রথা ভেঙে দরবারী গেয়েছেন, তখন তিনি রাগের চেনা কাঠামোকে অক্ষুণ্ণ রেখেও এক নতুন সজীবতা এনে দিয়েছেন, যা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের গবেষণায় বিশেষ স্থান রাখে।
১০. পণ্ডিত উল্লাস কশলকর (Pandit Ulhas Kashalkar) — গোয়ালিয়র/জয়পুর/আগ্রা ঘরানা (ITCSRA গুরু)
সমসাময়িক উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ধারক এবং ITCSRA-র প্রবীণ গুরু। তাঁর কণ্ঠে দরবারী কানাড়ার বিলম্বিত ও দ্রুত বন্দিশের নিখুঁত ব্যাকরণ এবং ত্রয়ী ঘরানার মেলবন্ধন আধুনিক কালের শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে প্রামাণিক শেখার মাধ্যম।
ধ্রুপদে দরবারী কানাড়া:
রাগ দরবারী কানাড়া (Raga Darbari Kanada) ধ্রুপদ (Dhrupad) গায়কির জন্য এক অনন্য এবং আদর্শ রাগ। সম্রাট আকবরের সভাগায়ক এবং ধ্রুপদ সঙ্গীতের জনক মিয়া তানসেন নিজে এই রাগের স্রষ্টা। ধ্রুপদ গায়কির মূল মেজাজ হলো অত্যন্ত গম্ভীর, ধীরস্থির এবং আধ্যাত্মিক—আর দরবারী কানাড়ার মন্দ্র সপ্তকের ওজস্বী বিস্তার এই ধ্রুপদ মেজাজের সাথে নিখুঁতভাবে মিলে যায়। নিচে কিছু রেকর্ডের রেফারেন্স দিলাম। শুনে নিন।
১. ওস্তাদ জহিরুদ্দিন ডাগর ও ওস্তাদ ফৈয়াজুদ্দিন ডাগর (Senior Dagar Brothers) — ডাগরবাণী ঘরানা
ধ্রুপদে দরবারী কানাড়া শোনার সবচেয়ে প্রামাণিক ও ঐতিহাসিক রেকর্ড। দুই ভাইয়ের যৌথ কণ্ঠে দরবারীর নোম-তোম আলাপ এবং ধ্রুপদ গায়কি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ইতিহাসে এক পরম প্রাপ্তি।
২. ওস্তাদ জিয়া ফরীদুদ্দিন ডাগর (Ustad Zia Fariduddin Dagar) — ডাগরবাণী ঘরানা
ITCSRA-র গুরু এবং ধ্রুপদের কিংবদন্তি। তাঁর কণ্ঠে দরবারী কানাড়ার গম্ভীর বিস্তার এবং স্বরের প্রক্ষেপণ শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যাকরণ শেখার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম।
৩. ওস্তাদ এন. জহিরুদ্দিন ডাগর ও ওস্তাদ ওয়াসিফউদ্দিন ডাগর (Dagar Brothers – Junior)
বংশপরম্পরায় ডাগর ঘরানার ধ্রুপদ ঐতিহ্যকে তাঁরা অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। পাখোয়াজের গম্ভীর তালের সাথে চৌতালের বন্দিশে দরবারীর রূপটি এখানে দারুণ প্রামাণিক।
৪. পণ্ডিত উদয় ভাওয়ালকর (Pandit Uday Bhawalkar)
সমসাময়িক ধ্রুপদ সঙ্গীতের প্রখ্যাত আচার্য। শুদ্ধ ব্যাকরণ এবং দরবারী কানাড়ার চলনে ওনার ধ্রুপদ পরিবেশন বর্তমান প্রজন্মের কাছে দারুণভাবে সমাদৃত।
৫. গুণ্ডেচা ব্রাদার্স (Gundecha Brothers — পণ্ডিত উমাকান্ত ও রমাকান্ত গুণ্ডেচা)
ডাগর ঘরানার ঐতিহ্যবাহী ধারায় দুই ভাইয়ের কণ্ঠে দরবারী কানাড়ার মেলবন্ধন এবং গম্ভীর গমকের কাজ ধ্রুপদের দুনিয়ায় অনন্য দলিল।
যন্ত্রসঙ্গীতে দরবারী-কানাড়া:
সুরবাহারে দরবারী-কানাড়া:
মনে হয় সুরবাহার (Surbahar) যন্ত্রটি যেন তৈরিই হয়েছিল রাগ দরবারী কানাড়ার জন্য! সেতারের চেয়ে বড় এবং অনেক গভীর আওয়াজযুক্ত এই বাদ্যযন্ত্রটিতে খাদের কাজ এবং দীর্ঘ ও ভারী মীড় টানা যায়, যা দরবারীর অতি-কোমল গান্ধার ও ধৈবতের আন্দোলনের জন্য নিখুঁত।
সুরবাহারে দরবারী কানাড়ার নিচের রেকর্ডিং গুলো শুনতে পারেন।
১. ওস্তাদ ইমরাত খাঁ (Ustad Imrat Khan) — রাগ দরবারী কানাড়া (আলাপ, জোড় ও ঝালা)
ইটাওয়া/ইমদাদখানি ঘরানার এই কিংবদন্তি সুরবাহারে দরবারীর যে রূপ তৈরি করেছেন, তাকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বাইবেল বলা হয়। তাঁর টানা মীড় এবং খাদের গুমরানি শুনলে শরীরে কাঁটা দেয়।
২. অন্নপূর্ণা দেবী (Annapurna Devi) — রাগ দরবারী কানাড়া (মাইহার ঘরানা – ঐতিহাসিক আর্কাইভ)
বাবা আলাউদ্দীন খাঁর কন্যা এবং ওস্তাদ আলী আকবর খাঁর বোন। তাঁর সুরবাহার বাজানো ছিল ঐশ্বরিক। তাঁর দরবারীর আলাপ শুনলে বোঝা যায় অতি-কোমল গান্ধারের আসল ক্রন্দন কী!
৩. ওস্তাদ ইরশাদ খাঁ (Ustad Irshad Khan) — রাগ দরবারী কানাড়া (লাইভ কনসার্ট / অ্যালবাম)
ওস্তাদ ইমরাত খাঁর সুযোগ্য পুত্র। পিতার ঐতিহ্য বজায় রেখে সুরবাহারে দরবারীর ধীরগতির আভিজাত্য তিনি খুব নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
৪. পণ্ডিত পুষ্করাশ গোডবোলে (Pt. Pushpraj Godbole) — রাগ দরবারী কানাড়া
আধুনিক প্রজন্মের একজন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান সুরবাহার বাদক। চন্দ্রকান্তা এবং শাস্ত্রীয় মহলে তাঁর দরবারীর চলন খুব প্রশংসিত।
৫. পণ্ডিত জয়নুল আবেদীন (Pt. Joynul Abedin) — রাগ দরবারী কানাড়া (বাংলাদেশ/ভারত আর্কাইভ)
সুরবাহারের খাদের তারে দরবারীর বক্র চলন এবং মীড়ের কাজ বোঝার জন্য ওনার রেকর্ডিং খুব সাহায্য করবে।
৬. ওস্তাদ ওয়াসিফউদ্দীন ডাগর (Dagar Gharana – Surbahar/Dhrupad Ang)
ডাগর ঘরানার ধ্রুপদ মেজাজে সুরবাহারে দরবারীর গম্ভীর ও মন্থর বিস্তার আভিজাত্যের চূড়ান্ত রূপ।
৭. ড. চন্দ্রকান্ত সরদেশপান্ডে (Dr. Chandrakant Sardeshmukh)
সুরবাহারের তাত্ত্বিক এবং প্রয়োগিক দুই দিকেই ওনার বাজানো দরবারীর আলাপ খাদের নিখুঁত কাজ শেখায়।
৮. পণ্ডিত শুভায়ু সেন মজুমদার (Pt. Shubhayu Sen Majumdar) — এস্রাজ ও সুরবাহার যুগলবন্দী/একক
সুরবাহারের খাদের তারের গভীরতা এবং দরবারীর গুমরে মরা কান্না আধুনিক রেকর্ডিংয়ে খুব সুন্দরভাবে ধরা পড়েছে।
সেতারে দরবারী-কানাড়া:
সেতারে রাগ দরবারী কানাড়ার গম্ভীর বিস্তার এবং দীর্ঘ মিঁড়ের কাজ এই রাগের আসল আভিজাত্যকে প্রকাশ করে। বিশেষ করে সেতারের নিচু তারে (মন্দ্র সপ্তক) দরবারীর অতি-কোমল গান্ধার ও ধৈবতের আন্দোলন এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক পরিবেশ সৃষ্টি করে।
সেতারে দরবারী-কানাড়ার নিচের রেকর্ডিং গুলো শুনতে পারেন।
১. ওস্তাদ বিলায়েত খাঁ (Ustad Vilayat Khan) — ইটাওয়া/ইমদাদখানি ঘরানা
বিলায়েত খাঁ সাহেবের গায়কি অঙ্গের সেতার দরবারী কানাড়াকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তাঁর দীর্ঘ আলাপের মীড় এবং অতি-কোমল গান্ধারের কম্পন শুনলে মনে হয় সেতার কাঁদছে। এটি সেতারের ইতিহাসে দরবারীর এক অবিসংবাদিত দলিল।
২. পণ্ডিত নিখিল ব্যানার্জী (Pandit Nikhil Banerjee) — মাইহার ঘরানা
নিখিল ব্যানার্জীর দরবারী মানেই এক অদ্ভুত প্রশান্তি ও স্তব্ধতা। বিশেষ করে তাঁর জোড় ও ঝালার কাজ এবং বিলম্বিত গৎ-এর বিস্তার দরবারীর আভিজাত্যকে নিখুঁত ব্যাকরণে ধারণ করে।
৩. পণ্ডিত রবিশঙ্কর (Pandit Ravi Shankar) — মাইহার ঘরানা
রবিশঙ্করের মন্দ্র সপ্তকের বিস্তার এবং খরজের তারের গম্ভীর প্রয়োগ দরবারী কানাড়াকে এক রাজকীয় রূপ দেয়। তাঁর লাইভ কনসার্টের দরবারীর রেকর্ডিংগুলো শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের শিক্ষার্থীদের জন্য অবশ্য পাঠ্য।
৪. ওস্তাদ ইমরাত খাঁ (Ustad Imrat Khan) — সুরবাহার ও সেতার
বিলায়েত খাঁ সাহেবের ছোট ভাই ইমরাত খাঁ সুরবাহার এবং সেতার—উভয় মাধ্যমেই দরবারীর গভীর খাদের কাজ দেখিয়েছেন। সুরবাহারে দরবারীর আলাপ শোনার পর সেতারে তাঁর গৎ-এর কাজ এক বিরল অভিজ্ঞতা।
৫. ওস্তাদ রইস খাঁ (Ustad Rais Khan) — মেওয়াতী ঘরানা
অত্যন্ত দ্রুত ও নিখুঁত তানের জন্য পরিচিত রইস খাঁ সাহেব দরবারীতে যখন ধীর লয়ে মীড় ও সুরের কাজ করেন, তখন তা সরাসরি হৃদয়ে আঘাত করে। তাঁর মীড়ের সূক্ষ্মতা এই রেকর্ডিংয়ের প্রাণ।
৬. ওস্তাদ শাহিদ পারভেজ খাঁ (Ustad Shahid Parvez Khan) — ইটাওয়া ঘরানা
সমসাময়িক সেতার বাদকদের মধ্যে শাহিদ পারভেজের গায়কি অঙ্গের দরবারী কানাড়া সবচেয়ে প্রামাণিক। তাঁর অতি-কোমল স্বরের সূক্ষ্ম কাঁপন (আন্দোলন) এক কথায় অবিশ্বাস্য।
৭. পণ্ডিত বুধাদিত্য মুখার্জী (Pandit Budhaditya Mukherjee) — ইমদাদখানি ঘরানা
তাঁর সেতারের বোল ও নিখুঁত ডান হাতের কাজের সাথে দরবারীর মন্দ্র সপ্তকের আলাপ এক অদ্ভুত জ্যামিতিক সৌন্দর্য তৈরি করে।
৮. ওস্তাদ সুজাত খাঁ (Ustad Shujaat Khan) — ইমদাদখানি ঘরানা
বিলায়েত খাঁ সাহেবের সুযোগ্য পুত্র সুজাত খাঁ সাহেবের দরবারীর চলন অনেক বেশি মায়াবী এবং সহজবোধ্য। তাঁর আলাপের গায়কি অঙ্গ শ্রোতাকে খুব দ্রুত আচ্ছন্ন করে ফেলে।
৯. পণ্ডিত কার্তিক কুমার (Pandit Kartick Kumar) — মাইহার ঘরানা
রবিশঙ্করের সিনিয়র শিষ্য কার্তিক কুমারের দরবারী কানাড়ার রেকর্ডিংগুলোতে মাইহার ঘরানার বিশুদ্ধতা এবং রাশভারী রূপটি স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
১০. পণ্ডিত কুশল দাস (Pandit Kushal Das) — মাইহার ঘরানা
বর্তমান প্রজন্মের এই অগ্রণী সেতার শিল্পীর দরবারীর রেকর্ডিংটি অত্যন্ত নিখুঁত সুর ও শ্রুতির প্রয়োগের কারণে সঙ্গীতবোদ্ধাদের কাছে দারুণ প্রশংসিত।
সারোদে দরবারী-কানাড়া:
রাগ দরবারী কানাড়া সরোদে (Sarod) শোনার অভিজ্ঞতা এক কথায় ঐশ্বরিক। সরোদের গম্ভীর আওয়াজ, খাদের তারের গুমরানি দরবারী-কানাড়াতে একটা আলাদা স্বাদের জন্ম দেয়।
সরোদে দরবারী কানাড়ার নিচের রেকর্ডিং গুলো শুনতে পারেন।
১. ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ (Ustad Ali Akbar Khan) — রাগ দরবারী কানাড়া (লাইভ ইন ক্যালকাটা / ক্যালিফোর্নিয়া)
সরোদের সম্রাট ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ সাহেবের দরবারী বাজানোকে বলা হয় এই রাগের বাইবেল। তাঁর সরোদের খাদের তারের আন্দোলন এবং অতি-কোমল গান্ধারের প্রয়োগ শুনলে দরবারীর আসল আভিজাত্য বোঝা যায়।
২. ওস্তাদ আমজাদ আলী খাঁ (Ustad Amjad Ali Khan) — রাগ দরবারী কানাড়া (প্রেসিডেন্সিয়াল অ্যাওয়ার্ড কনসার্ট / সাভ্রে রেকর্ডস)
আমজাদ আলী খাঁ সাহেবের দ্রুত ও বিদ্যুৎগতির ইখারা তান এবং দরবারীর আলাপের গম্ভীর বিস্তার এই রেকর্ডিংয়ে এক অদ্ভুত বিষাদ ও রাজকীয়তার জন্ম দেয়।
৩. পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত (Pandit Buddhadev Das Gupta) — রাগ দরবারী কানাড়া (অল ইন্ডিয়া রেডিও ও দূরদর্শন আর্কাইভ)
সেনিয়া শাহজাহানপুর ঘরানার এই পণ্ডিতের বাজনায় দরবারীর ব্যাকরণ অত্যন্ত নিখুঁত। এর আলাপ ও জোড়ের অংশটি তাত্ত্বিকভাবে প্রশ্নাতীত।
৪. ওস্তাদ হাফিজ আলী খাঁ (Ustad Hafiz Ali Khan) — রাগ দরবারী কানাড়া (ঐতিহাসিক রেকর্ড)
ওস্তাদ আমজাদ আলী খাঁর পিতা এবং গুরু। প্রাচীন ভারতের দরবারী সঙ্গীতের সেই আদি ও অকৃত্রিম রাজকীয় মেজাজ এই রেকর্ডিংয়ে পাওয়া যায়।
৫. পণ্ডিত তেজেন্দ্র নারায়ণ মজুমদার (Pandit Tejendra Narayan Majumdar) — রাগ দরবারী কানাড়া (লাইভ কনসার্ট রেকর্ডিং)
সেনিয়া মাইহার ঘরানার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বর্তমান প্রতিনিধি। ওস্তাদ আলী আকবর খাঁর শিক্ষার ছায়ায় ওনার বাজানো দরবারীর জোড় এবং ঝালা শোনার মতো।
৬. ড. রাজীব চক্রবর্তী (Dr. Rajeev Chakraborty) — রাগ দরবারী কানাড়া (মাইহার ঘরানা)
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আধুনিক পণ্ডিত। ওনার বাজনার সূক্ষ্ম কারুকাজ এবং দরবারীর চলন নতুন প্রজন্মের কান তৈরির জন্য দারুণ।
৭. আমান আলী ও অয়ান আলী বাঙ্গাশ (Amaan Ali Khan & Ayaan Ali Khan) — ওস্তাদ আমজাদ আলী খাঁর সাথে যুগলবন্দী
তরুণ প্রজন্মের সরোদবাদকদের মধ্যে পিতা আমজাদ আলী খাঁর হাত ধরে দরবারীর ঐতিহ্য তাঁরা দারুণভাবে বয়ে নিয়ে চলেছেন।
৮. ওস্তাদ বাহাদুর খাঁ (Ustad Bahadur Khan) — রাগ দরবারী কানাড়া (বাংলাদেশ ও ভারতের লাইভ কনসার্ট আর্কাইভ)
ওস্তাদ আয়াত আলী খাঁ সাহেবের সুযোগ্য পুত্র। তাঁর পরিমিতিবোধ ও দরবারীর মীড়ের কাজ সরোদপ্রেমীদের কাছে ভীষণ প্রিয়।
৯. পণ্ডিত দেবজ্যোতি বোস (Pandit Debojyoti Bose) — রাগ দরবারী কানাড়া
ওস্তাদ আমজাদ আলী খাঁ সাহেবের সুযোগ্য ছাত্র। তাঁর বাজনায় দরবারী কানাড়ার গম্ভীরতার সাথে চমৎকার ছন্দের মেলবন্ধন রয়েছে।
১০. ওস্তাদ আশীষ খাঁ (Ustad Aashish Khan) — রাগ দরবারী কানাড়া
ওস্তাদ আলী আকবর খাঁর পুত্র। পিতা ও পিতামহের (বাবা আলাউদ্দিন খাঁ) ঐতিহ্য বজায় রেখে সরোদে দরবারীর এক দারুণ ওজস্বী রূপ তিনি তুলে ধরেছেন।
রাগ দরবারী কানাড়া সম্পর্কিত অন্যান্য রাগ (Related Ragas of Darbari Kanada):
১. রাগ আড়ানা (Raga Adana): দরবারী কানাড়ার সবচেয়ে কাছের চপল রূপ; দরবারী যেখানে খাদের (মন্দ্র সপ্তকের) গম্ভীর রাগ, আড়ানা সেখানে চড়া সুরের (তার সপ্তকের) দ্রুত গতির চঞ্চল রাগ।
২. রাগ শাহানা কানাড়া (Raga Shahana): দরবারীর গম্ভীর বেদনাকে সরিয়ে এটি কানাড়া অঙ্গের অনেক বেশি রোমান্টিক ও শৃঙ্গার রসের রূপ; এতে কোমল ধৈবতের আন্দোলন হয় না এবং চলন অনেক বেশি সোজা।
৩. রাগ নায়কী কানাড়া (Raga Nayaki Kanada): দরবারীর অতি-কোমল গান্ধারের জায়গায় এতে শুদ্ধ মধ্যম থেকে কোমল গান্ধারের দিকে একটি বিশেষ টান (মীড়) ব্যবহার করা হয়, যা একে দরবারী থেকে আলাদা মেজাজ দেয়।
৪. রাগ কৌশিক কানাড়া (Raga Kaushik Kanada): এটি রাগ মালকোষ এবং কানাড়া অঙ্গের এক অপূর্ব মিশ্রণ; মালকোষের পঞ্চমহীন চলনে কানাড়ার কোমল গান্ধার ও নিখাদের প্রয়োগ একে অনন্য করে তোলে।
৫. রাগ অভোগী কানাড়া (Raga Abhogi Kanada): এটি দক্ষিণ ভারতীয় (কর্ণাটকী) সঙ্গীত থেকে হিন্দুস্তানি সঙ্গীতে আসা কানাড়া অঙ্গের রাগ; এতে পঞ্চম এবং নিখাদ বর্জিত থাকে, ফলে দরবারীর ভারী মেজাজ এতে থাকে না।
৬. রাগ দেবসাক কানাড়া (Raga Devsakh Kanada): এটি কানাড়া অঙ্গের সাথে বিলাবল বা সারং অঙ্গের একটি মিশ্রণ, যা সকালের দিকে গাওয়া হয় এবং দরবারীর রাতের নিস্তব্ধতার চেয়ে অনেক বেশি সজীব।
৭. রাগ সুহা কানাড়া (Raga Suha Kanada): এটি মূলত কাফি ঠাটের অন্তর্গত একটি ছোট এবং চপল কানাড়া; দরবারীর মতো রাজকীয় গাম্ভীর্য বর্জন করে এটি দ্রুত লয়ের তান ও তরাণার জন্য বেশি মানানসই।
৮. রাগ জৌনপুরী (Raga Jaunpuri): দরবারীর মতোই আসাবরী ঠাটের রাগ এবং একই স্বর (কোমল রে, জ্ঞা, দা, নী) ব্যবহৃত হয়; তবে জৌনপুরীতে কানাড়া অঙ্গের সেই বিশেষ বক্র চলন এবং কোমল স্বরের ধীর আন্দোলন থাকে না।
৯. রাগ আসাবরী (Raga Asavari): দরবারী কানাড়ার উৎপত্তিস্থল বা মূল ঠাট; দরবারী যেখানে পেঁচিয়ে এবং খাদের দিকে চলে, আসাবরী সেখানে সরল রেখায় দিনের বেলায় করুণ রস তৈরি করে।
সঙ্গীত শাস্ত্রে কানাড়া একটি বিশাল অঙ্গের নাম। কানাড়া অঙ্গের প্রায় ১৮ থেকে ২০টি রাগ থাকলেও তার মধ্যে ‘দরবারী কানাড়া’ হলো রাজা। আড়ানা, শাহানা বা নায়কী কানাড়াগুলো যেখানে চপল ও রোমান্টিক, দরবারী সেখানে খাদের গুমরানি ও রাজকীয় গাম্ভীর্যে একক এবং অনন্য।

শ্রোতা সহায়িকা নোট সিরিজে আজকের রাগ – রাগ দরবারী ও দরবারী-কানাড়া [ Raga Darbari Kanada ] । এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আপডেট পেতে আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।
সূত্র:
১. পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখণ্ডে রচিত “ক্রমিক পুস্তক মালিকা” (খণ্ড-৪)।
২. আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমি (ITC-SRA) রাগ ক্যাটালগ ও আর্কাইভ।
আরও দেখুন:
