ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের জগতে সবচেয়ে রহস্যময়, রোমাঞ্চকর এবং অতিপ্রাকৃত কিংবদন্তিতে ঘেরা একটি নাম হলো রাগ দীপক। অগ্নি বা আলোর প্রতীক এই রাগটি কেবল সুরের বিন্যাস নয়, বরং এটি একটি আধ্যাত্মিক ও মনস্তাত্ত্বিক শক্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।

রাগ দীপক
রাগ দীপকের পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস
রাগ দীপক একটি অপ্রচলিত বা ‘ক্ষুদ্র’ রাগ হলেও এর ঐতিহাসিক ও লৌকিক গুরুত্ব অপরিসীম। এই রাগটি নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত গল্পটি হলো মোগল সম্রাট আকবরের সভার নবরত্ন তানসেনের। লোকশ্রুতি অনুযায়ী, তানসেন যখন এই রাগ গেয়েছিলেন, তখন প্রদীপগুলো আপনাআপনি জ্বলে উঠেছিল এবং তাঁর শরীরে প্রচণ্ড দহন অনুভূত হয়েছিল। এই অতিপ্রাকৃত বিশ্বাসের কারণে আজও এই রাগটি নিয়ে এক ধরনের ভয় ও সংস্কার কাজ করে।
অনেক ওস্তাদ বা পণ্ডিত অত্যন্ত গোপনে এই রাগটি শেখান। কোনো শিষ্যকে শেখালেও তার শিক্ষা জীবনের একেবারে শেষ দিকে গিয়ে এটি শেখানো হয় এবং জনসমক্ষে এটি বেশি গাইতে বা বাজাতে কড়াভাবে নিষেধ করা হয়। এই সংস্কারের কারণেই আজ বিশুদ্ধ ‘ঘরানাদার সিলসিলা’ বা গুরু-শিষ্য পরম্পরায় দীপক শিখেছেন এমন শিল্পী খুব কম পাওয়া যায়। এই রাগের দহনাত্মক মেজাজ বুঝতে কিংবদন্তি শিল্পী মান্না দে-র গাওয়া বিখ্যাত গান— “প্রখর দারুণ অতি দীর্ঘ দগ্ধ দিন” একটি চমৎকার উদাহরণ হতে পারে। এই রাগটি চেনার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো পঞ্চম (প) থেকে ধৈবতকে (ধ) আলতো ধাক্কা দিয়ে পুনরায় পঞ্চমে (প) ফিরে আসা।
রাগের শাস্ত্র (পণ্ডিত ভাতখণ্ডে স্বীকৃত পূর্বী ঠাট অনুযায়ী)
রাগ দীপকের শাস্ত্র নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। পণ্ডিত ভাতখণ্ডে দুই ধরনের দীপকের উল্লেখ করেছেন (পূর্বী ও বিলাবল), আবার কোথাও এটি খামাজ ঠাটেও গীত হয়। নিচে সর্বাধিক প্রচলিত রূপটি দেওয়া হলো:
- ঠাটে: পূর্বী।
- জাতি: ষাড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহে ৬টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- আরোহ: স গ ম প, দ ন স (সা গা তীব্র-মা পা, কোমল-ধা নি সা)।
- অবরোহ: স দ প, ম গ র স (সা কোমল-ধা পা, তীব্র-মা গা রে সা)।
- বাদী স্বর: স (ষড়জ)।
- সমবাদী স্বর: প (পঞ্চম)।
- বর্জিত স্বর: আরোহে ‘র’ (ঋষভ) বর্জিত।
- ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ ও ধৈবত কোমল, মধ্যম তীব্র এবং বাকি সব শুদ্ধ স্বর।
- সময়: রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর (রাত ৯টা থেকে ১২টা)।
- প্রকৃতি: গম্ভীর, দহনাত্মক এবং তেজস্বী।
দীপক রাগের ভেরিয়েশন বা প্রকারভেদ
রাগ দীপকের তিনটি প্রধান ভেরিয়েশন বা রূপের শাস্ত্রীয় কাঠামো নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো। দীপকের প্রতিটি রূপই তার নিজস্ব ঠাট এবং স্বর বিন্যাসের কারণে আলাদা মেজাজ তৈরি করে।
১. পূর্বী ঠাটের দীপক (সর্বাধিক প্রচলিত)
এটিই মূলত সেই ‘ভীষণ’ বা ‘দহনাত্মক’ দীপক, যা তানসেনের কিংবদন্তির সাথে যুক্ত। এর তীব্র মধ্যম এবং কোমল স্বরগুলো এক ধরণের অস্থিরতা ও উত্তাপ তৈরি করে।
ঠাট: পূর্বী।
জাতি: ষাড়ব-সম্পূর্ণ।
আরোহ: স গ ম প, দ ন স
অবরোহ: স ন দ প, ম গ র স [এখানে ঋষভ ও ধৈবত কোমল, মধ্যম তীব্র]।
বাদী স্বর: স (ষড়জ)।
সমবাদী স্বর: প (পঞ্চম)।
বিশেষত্ব: আরোহে ‘রে’ ($R$) বর্জিত। পঞ্চম থেকে ধৈবতের দিকে একটি বিশেষ আন্দোলনের (ধাক্কা) মাধ্যমে এই রাগ চেনা যায়।
২. বিলাবল ঠাটের দীপক (শুদ্ধ স্বরপ্রধান)
প্রাচীন অনেক গ্রন্থে দীপককে বিলাবল ঠাটের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই রূপটি পূর্বী ঠাটের মতো অতটা গম্ভীর বা রহস্যময় নয়, বরং অনেক বেশি উজ্জ্বল ও প্রশান্ত।
ঠাট: বিলাবল।
জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ (মতান্তরে সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ)।
আরোহ: স র গ ম প ধ ন স [সবই শুদ্ধ স্বর]।
অবরোহ: স ন ধ প ম গ র স।
বাদী স্বর: প (পঞ্চম)।
সমবাদী স্বর: স (ষড়জ)।
বিশেষত্ব: এটি বর্তমানে খুব একটা প্রচলিত নেই, তবে কিছু প্রাচীন ঘরানায় শুদ্ধ স্বরের এই দীপক শেখানো হয়। এর চলন অনেকটা ‘রাগ বিলাবল’ বা ‘অলহিয়া বিলাবল’-এর মতো হলেও পঞ্চম স্বরের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
৩. খামাজ ঠাটের দীপক (কোমল নিষাদপ্রধান)
খামাজ ঠাটের দীপক মূলত লঘু শাস্ত্রীয় সংগীত বা ঠুমরি গায়নে বেশি ব্যবহৃত হয়। এতে কোমল নিষাদের প্রয়োগ রাগটিতে এক ধরণের চঞ্চলতা ও করুণ রসের সংমিশ্রণ ঘটায়।
ঠাট: খামাজ।
জাতি: ষাড়ব-সম্পূর্ণ।
আরোহ: স গ ম প ধ ন স [এখানে নিষাদ শুদ্ধ]।
অবরোহ: স ন ধ প ম গ র স [এখানে নিষাদ কোমল]।
বাদী স্বর: গ (গান্ধার) অথবা প (পঞ্চম)।
সমবাদী স্বর: ন (নিষাদ) অথবা স (ষড়জ)।
বিশেষত্ব: আরোহে ‘রে’ (R) বর্জিত থাকে। এই রূপটি শুনতে অনেকটা ‘রাগ খামাজ’ বা ‘দেশ’-এর কাছাকাছি মনে হতে পারে, তবে এর চলন ও ‘প’ থেকে ‘ধ’-এর বিশেষ কাজ একে আলাদা করে।
সংক্ষেপে স্বরলিপি তুলনা (Notation Table):
| ভেরিয়েশন | ঠাট | আরোহ স্বরসমূহ | অবরোহ স্বরসমূহ |
| পূর্বী দীপক | পূর্বী | স গ ম প দ ন স | স ন দ প ম গ র স (র, দ কোমল; ম তীব্র) |
| বিলাবল দীপক | বিলাবল | স র গ ম প ধ ন স | স ন ধ প ম গ র স (সবই শুদ্ধ) |
| খামাজ দীপক | খামাজ | স গ ম প ধ ন স | স ন ধ প ম গ র স (নি কোমল) |
রাগ দীপকের যেকোনো ভেরিয়েশন গাওয়ার সময় এর প্রথাগত গাম্ভীর্য এবং ‘প’ স্বরের বিশেষ প্রয়োগের দিকে খেয়াল রাখা জরুরি। ওস্তাদদের মতে, দীপকের সঠিক রূপটি কেবল তার স্বরলিপিতে নয়, বরং এর পরিবেশনার ‘মেজাজ’ বা ‘তাশির’-এর মধ্যে লুকিয়ে থাকে।
সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ
- রাগ পুরিয়া ধানাশ্রী: স্বর সংগতির দিক থেকে দীপকের সাথে এর নিবিড় সাদৃশ্য রয়েছে।
- রাগ মারওয়া: তীব্র মধ্যম ও কোমল ঋষভের বিন্যাসে মারওয়ার সাথে দীপকের কিছুটা ছায়া পাওয়া যায়।
- রাগ বসন্ত: দীপকের গম্ভীর প্রকৃতির সাথে অনেক সময় বসন্ত রাগের চলনগত মিল অনুভূত হয়।
- রাগ শ্রী: দহন ও তেজের দিক থেকে শ্রী রাগের সাথে এর মেজাজের তুলনা করা হয়।
- রাগ গৌড় সারং: বিলাবল ঠাটের দীপকের সাথে গৌড় সারং-এর কিছুটা সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়।
রাগ দীপক কেবল শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি অধ্যায় নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির এক মায়াবী রহস্য। অগ্নিকাণ্ডের গল্পগুলো বৈজ্ঞানিক না হলেও, এই রাগের সুরের তীব্রতা ও গাম্ভীর্য শ্রোতার মনে প্রচণ্ড তাপ বা উত্তেজনার সৃষ্টি করতে সক্ষম—এটি অনস্বীকার্য। সংস্কার ও ভয়ের কারণে এই রাগের প্রচার কম হলেও, উচ্চাঙ্গ সংগীতের সমৃদ্ধি ও বৈচিত্র্য রক্ষায় রাগ দীপক এক অমূল্য রত্ন হিসেবে টিকে থাকবে।

রাগ দীপকে গান বাজনা:
দীপকে হাতে গোনা কিছু গানবাজনা পাওয়া যায়। সব রকম সঙ্গীতে দীপক ব্যবহারও হয়নি। তাই যা পাওয়া যার একটা তালিকা দিতে চেষ্টা করলাম নিচে:
১. গোলাম মুস্তফা খানের রাগ দিপক:
তথ্যসূত্র:
১. পণ্ডিত বিষ্ণুন নারায়ণ ভাতখণ্ডে: ‘ক্রমিক পুস্তক মালিকা’ (১ম-৪র্থ খণ্ড) — যেখানে দীপকের শাস্ত্রীয় রূপ বর্ণিত আছে।
২. মান্না দে-র সংগীত সংকলন: রাগের ব্যবহারিক প্রয়োগ ও ছায়া বোঝার জন্য।
৩. সংগীত বিশারদ (বসন্ত): ঠাট, বাদী-সমবাদী ও রাগের প্রকৃতি বিশ্লেষণের প্রামাণ্য গ্রন্থ।
৪. রাগ পরিচয় (পণ্ডিত ওমকারনাথ ঠাকুর): রাগের ঐতিহাসিক ও কিংবদন্তি সংক্রান্ত আলোচনা।
শ্রোতা সহায়িকা নোট সিরিজে আজকের রাগ – রাগ হাম্বীর বা হামীর। এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আপডেট পেতে আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।
সিরিজের বিভিন্ন ধরনের আর্টিকেল সূচি:
