ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সুবিশাল কাননে রাগ দেবতা ভৈরব (Devata Bhairav) একটি অত্যন্ত দুর্লভ, আধ্যাত্মিক এবং গম্ভীর প্রকৃতির রাগ। নাম থেকেই অনুমেয় যে এই রাগটি দেবত্বের আরাধনা বা আধ্যাত্মিক ধ্যানের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এটি মূলত ভৈরব ঠাটের একটি বিশেষ অপ্রচলিত রূপ, যা উচ্চমার্গের সংগীত সাধকদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ও বিশেষ মর্যাদার অধিকারী।
রাগ দেবতা ভৈরব
রাগ দেবতা ভৈরব-এর পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস
রাগ দেবতা ভৈরব মূলত ভৈরব এবং আহির ভৈরব-এর সংমিশ্রণে সৃষ্ট একটি মরমী রাগ। এই রাগের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর শুদ্ধ ও কোমল স্বরগুলোর এমন এক বিন্যাস, যা শ্রোতার মনে এক ধরণের দিব্য অনুভূতি বা ভক্তি রসের উদ্রেক করে। ‘দেবতা’ শব্দটি এখানে রাগের উচ্চমার্গীয় বিশুদ্ধতা এবং পবিত্রতাকে ইঙ্গিত করে।
ঐতিহাসিকভাবে, এই রাগটি খুব বেশি প্রাচীন না হলেও মধ্যযুগীয় উত্তর ভারতীয় সংগীত ধারার বিভিন্ন ঘরানার ওস্তাদদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফসল। এটি একটি ‘সন্ধিপ্রকাশ’ রাগ, যা প্রাতঃকালে সূর্যোদয়ের মুহূর্তে গীত হয়। এই রাগের গায়নশৈলীতে ভৈরব রাগের চিরাচরিত গাম্ভীর্য বজায় থাকলেও, এর চলনে এক ধরণের প্রসন্নতা এবং সমর্পণের ভাব থাকে। বিশেষ করে মন্দ্র ও মধ্য সপ্তকে এর বিস্তার অত্যন্ত গম্ভীর ও শান্ত শোনায়। দেবতা ভৈরব মূলত ধ্রুপদ ও খেয়াল গায়কির জন্য আদর্শ, যেখানে বিলম্বিত লয়ে রাগের প্রকৃত রূপটি ফুটে ওঠে।
রাগের শাস্ত্র
- ঠাট: ভৈরব।
- জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহে ৭টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- আরোহ: স র গ ম প ধ ন স।
- অবরোহ: স ন ধ প ম গ র স।
- বাদী স্বর: প (পঞ্চম)।
- সমবাদী স্বর: স (ষড়জ)।
- বর্জিত স্বর: কোনো স্বর বর্জিত নয়।
- ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ এবং নিষাদ কোমল ব্যবহৃত হয়; বাকি সব স্বর (সা, গা, মা, পা, ধা) শুদ্ধ। (উল্লেখ্য যে, এখানে ধৈবত শুদ্ধ রাখা হয় এবং আরোহ-অবরোহ উভয় ক্ষেত্রে কোমল নিষাদ প্রয়োগ করা হয়)।
- সময়: প্রাতঃকাল (ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত বা দিনের প্রথম প্রহর)।
- প্রকৃতি: অত্যন্ত শান্ত, ভক্তি ও পবিত্রতা রসপ্রধান।
সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ
- রাগ ভৈরব: দেবতা ভৈরবের মূল ভিত্তি; তবে ভৈরবে ধৈবত কোমল হয়, যা এখানে শুদ্ধ।
- রাগ আহির ভৈরব: উভয় রাগে কোমল ঋষভ ও কোমল নিষাদ ব্যবহৃত হয় বলে এদের মেজাজে মিল পাওয়া যায়।
- রাগ নট ভৈরব: নট ভৈরবে নিষাদ শুদ্ধ থাকে, কিন্তু দেবতা ভৈরবে নিষাদ কোমল।
- রাগ মঙ্গল ভৈরব: এই রাগের সাথে দেবতা ভৈরবের গভীর সাদৃশ্য রয়েছে, চলনগত সামান্য পার্থক্য বিদ্যমান।
- রাগ বসন্ত মুখরি: এই রাগে ধৈবত কোমল হয়, যা দেবতা ভৈরব থেকে একে আলাদা করে।
রাগ দেবতা ভৈরব হলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সেই গোপন রত্ন যা ভোরের নিস্তব্ধতাকে এক স্বর্গীয় আধ্যাত্মিকতায় পূর্ণ করে তোলে। ভৈরবের আভিজাত্য আর শুদ্ধ ধৈবতের উজ্জ্বলতা—এই দুয়ের সার্থক মিলনই হলো এই রাগ। যদিও বর্তমান সময়ের সাধারণ আসরগুলোতে এই রাগের প্রচলন কিছুটা সীমিত, তবুও এর তাত্ত্বিক ও শৈল্পিক গভীরতা অপরিসীম। শুদ্ধ চিত্তে এই রাগের আলাপ শুনলে তা শ্রোতা ও শিল্পী উভয়কেই এক অপার্থিব প্রশান্তির জগতের সন্ধান দেয়। দেবতার চরণে নিবেদিত সুর হিসেবে এর আবেদন চিরন্তন।
তথ্যসূত্র:
১/ পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — ‘হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতি’ (Kramik Pustak Malika, খণ্ড ২ ও ৩): ভৈরব অঙ্গের মিশ্র রাগসমূহের ব্যাকরণগত বিশ্লেষণের জন্য।
২/ বসন্ত — ‘সংগীত বিশারদ’ (Sangeet Karyalaya): রাগের বাদী-সমবাদী এবং জাতি নির্ধারণের প্রামাণ্য উৎস।
৩/ বিমলকান্ত রায় চৌধুরী — ‘ভারতীয় সংগীতকোষ’: অপ্রচলিত ও বিরল রাগসমূহের পরিচয় ও বিবর্তনের রেফারেন্স।
৪/ Joep Bor — ‘The Raga Guide’: আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাগের তথ্যকোষ ও স্বর বিন্যাস যাচাইয়ের জন্য।
৫/ অপ্রচলিত রাগ সংকলন (বিভিন্ন ঘরানা): দেবতা ভৈরবের মতো দুর্লভ রাগগুলোর প্রয়োগ পদ্ধতি সংক্রান্ত তথ্যের জন্য।
আরও দেখুন: