রাগ দেবরঞ্জনী । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সুবিশাল রাগ-সাগরে রাগ দেবরঞ্জনী (Devaranjani) একটি অত্যন্ত দুর্লভ, পবিত্র এবং আধ্যাত্মিক ভাবোদ্দীপক রাগ। এটি মূলত দক্ষিণ ভারতীয় বা কর্ণাটকী সংগীত পদ্ধতি থেকে উত্তর ভারতীয় হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। নাম থেকেই স্পষ্ট যে এই রাগটি ‘দেবতাদের রঞ্জনকারী’ বা ঈশ্বর আরাধনার জন্য বিশেষভাবে সৃষ্ট। এর স্বর বিন্যাস অত্যন্ত মিতব্যয়ী হওয়ায় এটি এক ধরণের অনন্য গাম্ভীর্য ও প্রশান্তি বহন করে।

রাগ দেবরঞ্জনী

রাগ দেবরঞ্জনীর পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস

রাগ দেবরঞ্জনী মূলত ভৈরব ঠাটের (কর্ণাটকী পদ্ধতিতে ‘মায়ামালবগৌলা’ মেলকর্তা) অন্তর্ভুক্ত একটি রাগ। এই রাগের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর ঔড়ব-ঔড়ব জাতি, অর্থাৎ আরোহ ও অবরোহ উভয় ক্ষেত্রেই মাত্র ৫টি স্বর ব্যবহৃত হয়। তবে এই ৫টি স্বরের বিন্যাস অত্যন্ত কৌতূহল উদ্দীপক। এতে শুদ্ধ গান্ধার ও শুদ্ধ নিষাদ বর্জিত হওয়ার পাশাপাশি পঞ্চম স্বরটিও বর্জিত থাকে।

ঐতিহাসিকভাবে, এই রাগটি মন্দির এবং আধ্যাত্মিক পরিবেশনার জন্য ব্যবহৃত হতো। পঞ্চম (পা) স্বর বর্জিত হওয়ায় এই রাগের চলনে এক ধরণের শূন্যতা বা ‘বৈরাগ্য’ অনুভূত হয়, যা শ্রোতাকে পার্থিব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক অপার্থিব ধ্যানমগ্ন অবস্থায় নিয়ে যায়। এটি একটি প্রাতঃকালীন রাগ। হিন্দুস্তানি সংগীতে এই রাগের প্রচলন খুব বেশি না থাকলেও, বিদগ্ধ সংগীতজ্ঞ ও ঘরানার ওস্তাদগণ এর শুদ্ধতা ও আধ্যাত্মিক মূল্যের কারণে একে উচ্চ মর্যাদা দিয়ে থাকেন। এই রাগে মূলত ভক্তি ও শান্ত রসের প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়।

রাগের শস্ত্র:

  • ঠাট: ভৈরব।
  • জাতি: ঔড়ব-ঔড়ব (আরোহে ৫টি এবং অবরোহে ৫টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ: সা রে মা পা ধা সা। (দ্রষ্টব্য: কোনো কোনো মতে এটি সা রে মা ধা নি সা)।
  • অবরোহ: সা ধা পা মা রে সা।
  • বাদী স্বর: মা (শুদ্ধ মধ্যম)।
  • সমবাদী স্বর: সা (ষড়জ)।
  • বর্জিত স্বর: আরোহ ও অবরোহ উভয় ক্ষেত্রে ‘গা’ (গান্ধার) এবং ‘নি’ (নিষাদ) সম্পূর্ণ বর্জিত। (পঞ্চম স্বর নিয়েও ভিন্ন মত আছে, তবে ভৈরব অঙ্গে অনেক সময় পঞ্চমকে দুর্বল রাখা হয়)।
  • ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ এবং ধৈবত কোমল; ষড়জ (সা), মধ্যম (মা) এবং পঞ্চম (পা) শুদ্ধ
  • সময়: প্রাতঃকাল (ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত)।
  • প্রকৃতি: অত্যন্ত শান্ত, গম্ভীর এবং ভক্তি রসপ্রধান।

সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ

  • রাগ ভৈরব: দেবরঞ্জনীর মূল ঠাট রাগ; ভৈরবে সব স্বর থাকলেও দেবরঞ্জনী এর একটি সংক্ষিপ্ত ও বিশেষ রূপ।
  • রাগ গুণকালী: আরোহ ও অবরোহে ধৈবত ও ঋষভ কোমল থাকার কারণে গুণকালীর সাথে এর গভীর সাদৃশ্য রয়েছে।
  • রাগ বৈরাগী: বৈরাগীতে পঞ্চম বর্জিত থাকে এবং নিষাদ ব্যবহৃত হয়, যেখানে দেবরঞ্জনীতে নিষাদ বর্জিত।
  • রাগ মেঘরঞ্জনী: স্বর বিন্যাসের ক্ষেত্রে দেবরঞ্জনীর সাথে মেঘরঞ্জনীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান।
  • রাগ বিভাস: বিভাস একটি প্রাতঃকালীন ঔড়ব রাগ, তবে এর ঠাট এবং চলন ভিন্ন।

রাগ দেবরঞ্জনী হলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সেই নিভৃত রত্ন যা ভোরের নিস্তব্ধতাকে এক স্বর্গীয় আধ্যাত্মিকতায় পূর্ণ করে তোলে। এর মিতব্যয়ী স্বর প্রয়োগ এবং পঞ্চমের অনুপস্থিতি এক ধরণের বিরল গাম্ভীর্য তৈরি করে যা সরাসরি মানুষের অন্তরাত্মাকে স্পর্শ করে। যদিও সাধারণ সংগীতের আসরগুলোতে এর দেখা খুব কম পাওয়া যায়, তবুও আধ্যাত্মিক সাধনা এবং ধ্যানের জন্য এই রাগের গুরুত্ব অপরিসীম। শুদ্ধ চিত্তে দেবরঞ্জনীর সুর শ্রবণ করলে তা মানুষের মনের অস্থিরতা দূর করে এক অপার প্রশান্তি দান করে।

তথ্যসূত্র:

১. পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — ‘হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতি’ (ক্রমিক পুস্তক মালিকা): রাগের তাত্ত্বিক ও ব্যাকরণগত কাঠামো যাচাইয়ের জন্য।

২. বসন্ত — ‘সংগীত বিশারদ’ (সংগীত কার্যালয়, হাতরস): রাগের বাদী-সমবাদী এবং জাতি সংক্রান্ত তথ্যের জন্য।

৩. বিমলকান্ত রায় চৌধুরী — ‘ভারতীয় সংগীতকোষ’: রাগের ঐতিহাসিক বিবর্তন ও ঘরানা সংক্রান্ত তথ্যের জন্য।

৪. কর্ণাটকী সংগীত রত্নাকর (South Indian Music Dictionary): রাগের মূল উৎস ও দেবতাতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের জন্য।

৫. পণ্ডিত ওমকারনাথ ঠাকুর — ‘প্রণব ভারতী’: রাগের আধ্যাত্মিক ও রসতাত্ত্বিক আলোচনার প্রামাণ্য গ্রন্থ।

আরও দেখুন: