রাগ দেশকার । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

রাগ দেশকার বিলাবল ঠাট থেকে উদ্ভূত একটি রাগ। এটি একটি প্রাচীন রাগ এবং শাস্ত্রীয় সংগীতের উচ্চাঙ্গ ধারায় এর বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। অনেক সময় একে ‘ভূপালী’ রাগের সমান্তরাল মনে করা হলেও, এর চলন এবং গায়কি একে সম্পূর্ণ আলাদা বৈশিষ্ট্য দান করেছে। এটি প্রধানত উচ্চ সপ্তকের (তার সপ্তক) রাগ, অর্থাৎ এর বিস্তার উপরের দিকে বেশি সুন্দর শোনায়।

দেশকার একটি ঔড়ব-ঔড়ব জাতির রাগ। এর আরোহ এবং অবরোহ উভয় ক্ষেত্রেই পাঁচটি করে স্বর ব্যবহৃত হয়। এই রাগে মধ্যম (মা) এবং নিষাদ (নি) সম্পূর্ণ বর্জিত। এর মূল সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে ‘ধৈবত’ (ধা) স্বরের ওপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদানে। সকালের রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশের মতো এই রাগের প্রকৃতি অত্যন্ত স্বচ্ছ ও তেজদীপ্ত।

রাগের শাস্ত্র

  • ঠাট: বিলাবল।
  • জাতি: ঔড়ব-ঔড়ব (আরোহে ৫ স্বর, অবরোহে ৫ স্বর)।
  • আরোহ: সা রে গা পা ধা সা।
  • অবরোহ: সা ধা পা গা রে সা।
  • বাদী স্বর: ধৈবত (ধা)।
  • সমবাদী স্বর: গান্ধার (গা)।
  • বর্জিত স্বর: মধ্যম (মা) এবং নিষাদ (নি) আরোহ ও অবরোহ উভয় ক্ষেত্রে বর্জিত।
  • ব্যবহৃত স্বর: ষড়জ (সা), শুদ্ধ ঋষভ (রে), শুদ্ধ গান্ধার (গা), পঞ্চম (পা) এবং শুদ্ধ ধৈবত (ধা)।
  • সময়: দিনের প্রথম প্রহর (সূর্যোদয়ের পর সকাল ৬টা থেকে ৯টা)।
  • প্রকৃতি: চঞ্চল, তেজস্বী এবং ভক্তিপ্রধান।

 

সম্পর্কিত বা সদৃশ রাগ

  • রাগ ভূপালী: দেশকারের সাথে এর স্বর হুবহু মিলে যায়, কিন্তু ভূপালীর বাদী স্বর ‘গা’ এবং এটি শান্ত প্রকৃতির কল্যাণ ঠাটের রাগ, যেখানে দেশকার বিলাবল ঠাটের এবং বাদী স্বর ‘ধা’।
  • রাগ জৈৎ: এই রাগের সাথেও স্বরগত মিল পাওয়া যায়, তবে এর চলন ও প্রয়োগ ভিন্ন।
  • রাগ শুদ্ধ কল্যাণ: এর আরোহে দেশকারের মতো স্বরবিন্যাস থাকলেও অবরোহে মধ্যম ও নিষাদের বক্র ব্যবহার থাকে।
  • রাগ পাহাড়ী: অনেক সময় পাহাড়ী রাগের স্বরবিন্যাসে দেশকারের ছায়া দেখা যায়, তবে পাহাড়ী অনেক বেশি লোকজ ও চঞ্চল।

রাগ দেশকার তার সরল স্বরবিন্যাস সত্ত্বেও গায়কির জটিলতায় অত্যন্ত সমৃদ্ধ। বিশেষ করে ধ্রুপদ ও খেয়াল অঙ্গে এই রাগের তার সপ্তকের কাজগুলো এক অনন্য বীরত্বের আবেশ তৈরি করে। সকালের শান্ত পরিবেশে ধৈবত স্বরের স্থিতিশীলতা শ্রোতার মনে এক নির্মল আনন্দের সঞ্চার করে। শুদ্ধ স্বরের এই বিন্যাসটি ভারতীয় সংগীতের অন্যতম শক্তিশালী ও বিশুদ্ধ রাগ হিসেবে স্বীকৃত।

তথ্যসূত্র (Sources)::

১. রাগ পরিচয় (দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড) – পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।

২. অভিনব গীতাঞ্জলি – পণ্ডিত রামাশ্রয় ঝা।

৩. সংগীত শাস্ত্র – ড. পান্নালাল মদন।

৪. রাগ বিজ্ঞান – পণ্ডিত বিনায়ক রাও পট্টবর্ধন।