রাগ নট ভৈরব । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সুবিশাল প্রাঙ্গণে রাগ নট ভৈরব (Nat Bhairav) একটি অত্যন্ত জনপ্রিয়, শ্রুতিমধুর এবং গম্ভীর প্রকৃতির রাগ। এটি মূলত ভৈরব ঠাটের একটি অতি পরিচিত প্রকারভেদ। প্রাতঃকালের শান্ত পরিবেশে এই রাগের সুরলহরী শ্রোতার মনে এক গভীর আধ্যাত্মিক প্রশান্তি এবং একই সাথে এক ধরণের প্রসন্নতার উদ্রেক করে। শুদ্ধ ভৈরবের করুণ রসের সাথে নট অঙ্গের উজ্জ্বলতার সংমিশ্রণে এই রাগটি এক অনন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য লাভ করেছে।

রাগ নট ভৈরব

রাগ নট ভৈরবের পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস

রাগ নট ভৈরব মূলত দুটি রাগের অপূর্ব শৈল্পিক সংমিশ্রণ—রাগ নট এবং রাগ ভৈরব। এই রাগের পূর্বাঙ্গ (সা থেকে পা) সাধারণত নট রাগের ন্যায় শুদ্ধ স্বরবহুল এবং উত্তরাাঙ্গ (পা থেকে সা) ভৈরব রাগের ন্যায় গম্ভীর। এই রাগের উদ্ভাবন ও জনপ্রিয়তার পেছনে আধুনিক যুগের মহান সংগীতজ্ঞ পণ্ডিত রবিশঙ্করের অবদান অনস্বীকার্য, যদিও অনেক আগে থেকেই বিভিন্ন ঘরানায় এর চর্চা ছিল।

এই রাগের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর কোমল ধৈবত (দা)-এর প্রয়োগ। শুদ্ধ ভৈরবে ঋষভ ও ধৈবত উভয়ই কোমল হয়, কিন্তু নট ভৈরবে ঋষভ (রে) সর্বদা শুদ্ধ থাকে এবং কেবল ধৈবত (ধা) কোমল হয়। এই সামান্য পরিবর্তনের ফলে রাগের মেজাজ ভৈরব থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যায়। এতে ভৈরবের বৈরাগ্য যেমন আছে, তেমনি নট অঙ্গের কারণে একটি রাজকীয় উজ্জ্বলতাও বিদ্যমান। এটি মূলত একটি ‘সন্ধিপ্রকাশ’ রাগ, যা ভোরের আলো ফোটার সময় গীত হয়। খেয়াল গায়কির জন্য এটি অত্যন্ত উপযোগী এবং এর বিস্তার মন্দ্র ও মধ্য সপ্তকে অত্যন্ত মাধুর্যপূর্ণ শোনায়।

রাগের শাস্ত্র: নট ভৈরব

  • ঠাট: ভৈরব।
  • জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহে ৭টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ: সা রে গা মা পা দা না র্সা
  • অবরোহ: র্সা না দা পা মা গা রে সা
  • বাদী স্বর: দা (কোমল ধৈবত)।
  • সমবাদী স্বর: রে (শুদ্ধ ঋষভ)।
  • বর্জিত স্বর: কোনো স্বর বর্জিত নয়।
  • ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ (রে) শুদ্ধ এবং ধৈবত (দা) কোমল; বাকি সব স্বর (সা, গা, মা, পা, না) শুদ্ধ
  • সময়: প্রাতঃকাল (ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত বা দিনের প্রথম প্রহর)।
  • প্রকৃতি: গম্ভীর, শান্ত এবং ভক্তি রসপ্রধান।

 

সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ

  • রাগ ভৈরব: নট ভৈরবের মূল ঠাট রাগ; ভৈরবে ঋষভ ও ধৈবত উভয়ই কোমল, কিন্তু এখানে কেবল ধৈবত কোমল।
  • রাগ নট: এই রাগের আরোহী চলন এবং শুদ্ধ ঋষভের মেজাজ নট ভৈরবে বিদ্যমান।
  • রাগ অহির্ ভৈরব: উভয় রাগে ভৈরব অঙ্গ থাকলেও অহির্ ভৈরবে ঋষভ কোমল এবং নিষাদ কোমল ব্যবহৃত হয়।
  • রাগ কলিঙ্গড়া: স্বরবিন্যাসের ক্ষেত্রে মিল থাকলেও কলিঙ্গড়াতে ঋষভ কোমল ব্যবহৃত হয়।
  • রাগ সরস্বতী: স্বরবিন্যাসে কিছুটা সাদৃশ্য থাকলেও সরস্বতী রাগের জাতি এবং গায়নশৈলী ভিন্ন।

রাগ নট ভৈরব হলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সেই মায়াবী সুর যা ভোরের নিস্তব্ধতাকে এক উজ্জ্বল আধ্যাত্মিকতায় পূর্ণ করে তোলে। ভৈরবের আভিজাত্য আর নট অঙ্গের মিষ্টতা—এই দুয়ের সার্থক মিলনই হলো এই রাগ। শুদ্ধ ঋষভ এবং কোমল ধৈবতের এই বৈপরীত্য শিল্পীর সৃজনশীলতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। আধুনিক শাস্ত্রীয় সংগীতের আসরে নট ভৈরব আজও তার প্রসন্নতা ও গাম্ভীর্য নিয়ে শ্রোতাদের হৃদয়ে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

রাগিণী নাটিকা (বা রাগ নট) - রাগমালা পেইন্টিং
রাগিণী নাটিকা (বা রাগ নট) – রাগমালা পেইন্টিং

তথ্যসূত্র:

১. পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — ‘হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতি’ (খণ্ড ২ ও ৩): ভৈরব অঙ্গের রাগসমূহের ব্যাকরণগত বিশ্লেষণের জন্য।

২. বসন্ত — ‘সংগীত বিশারদ’ (Sangeet Karyalaya): রাগের বাদী-সমবাদী এবং জাতি নির্ধারণের নির্ভরযোগ্য আকর।

৩. বিমলকান্ত রায় চৌধুরী — ‘ভারতীয় সংগীতকোষ’: মিশ্র রাগসমূহের পরিচয় ও বিবর্তনের ঐতিহাসিক রেফারেন্স।

৪. Joep Bor — ‘The Raga Guide’: আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাগের তথ্যকোষ ও নোটেশন যাচাইয়ের জন্য।

৫. পণ্ডিত রবিশঙ্করের রাগ চর্চা ও আলাপ: নট ভৈরবের আধুনিক চলন ও জনপ্রিয়করণ সংক্রান্ত তথ্যের জন্য।

আরও দেখুন: