প্রথমেই বলে রাখি রাগ নির্ঝরিণী হিন্দুস্তানি মার্গ সঙ্গীতের কোনো প্রাচীন বা ঐতিহ্যবাহী শাস্ত্রীয় রাগ নয়। এটি মূলত বিংশ শতাব্দীর আধুনিক সুরকার ও সঙ্গীতজ্ঞদের দ্বারা সৃষ্টি করা একটি অপ্রচলিত আধুনিক রাগ। ‘নির্ঝরিণী’ শব্দের অর্থ হলো ঝরনা বা জলপ্রপাত। জলপ্রপাতের বহমানতা এবং মিষ্টি কলকল ধ্বনিকে সুরে রূপ দিতেই আধুনিক গুণী শিল্পীরা এই মিশ্র রাগটি সৃষ্টি করেছেন।
রাগ নির্ঝরিণী
এটি মূলত রাগ মারু বিহাগ (Maru Bihag) এবং রাগ কলাবতী (Kalavati)-র কিছু চলন মিলিয়ে তৈরি একটি চঞ্চল ও মিষ্টি প্রকৃতির আধুনিক সুর। যেহেতু এটি প্রাচীন সঙ্গীতশাস্ত্রে স্বীকৃত নয়, তাই এর কোনো নির্দিষ্ট ইতিহাস বা প্রামাণিক প্রাচীন ঐতিহ্য খুঁজে পাওয়া যায় না।
রাগের শাস্ত্র:
যেহেতু এটি একটি আধুনিক অপ্রচলিত মিশ্র রাগ, তাই শাস্ত্রীয় সঙ্গীতজ্ঞদের একাংশ এর চলন ও স্বরবিন্যাস নিচে দেওয়া নিয়ম অনুযায়ী ব্যাখ্যা করেন:
- ঠাট: এটি প্রামাণিক কোনো প্রাচীন ঠাটের অন্তর্ভুক্ত নয়। স্বরবিন্যাসের বিচারে আধুনিক পণ্ডিতরা একে কল্যাণ ঠাট-এর সমগোত্রীয় বলে মনে করেন।
- জাতি: ঔড়ব-ষাড়ব (আরোহণে ৫টি এবং অবরোহণে ৬টি স্বর)।
- আরোহ: সা — গা — ম্পা — ধা — নী — র্সা (তীব্র মধ্যম এবং পঞ্চম ব্যবহৃত হয়)।
- অবরোহ: র্সা — নী — ধা — পা — ম্পা — গা — রে — সা।
- বাদী স্বর: গান্ধার (গা)।
- সমবাদী স্বর: নিখাদ (নী)।
- বর্জিত স্বর: আরোহণে ঋষভ (রে) এবং মধ্যম বর্জিত।
- ব্যবহৃত স্বর: সা, শুদ্ধ রে, শুদ্ধ গা, তীব্র ম্পা (তীব্র মধ্যম), পা, শুদ্ধ ধা এবং শুদ্ধ ন।
- সময়: রাতের প্রথম প্রহর (রাত ৮টা থেকে ১০টা)।
- প্রকৃতি: অত্যন্ত চঞ্চল, উজ্জ্বল এবং মিষ্টি প্রকৃতির আধুনিক সুর।
নির্ঝরিণীর সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য রাগ
- ১. মারু বিহাগ — নির্ঝরিণী রাগের আরোহ ও অবরোহে তীব্র মধ্যমের প্রয়োগ সরাসরি মারু বিহাগের কথা মনে করিয়ে দেয়।
- ২. কলাবতী — নির্ঝরিণীর মিষ্টি ও চঞ্চল চলন রাগ কলাবতীর কাছাকাছি।
- ৩. হংসধ্বনি — নির্ঝরিণী থেকে তীব্র মধ্যম বর্জন করলে তা হংসধ্বনির চলনে পরিণত হতে পারে।
রাগ নির্ঝরিণী কোনো প্রাচীন শাস্ত্রীয় আভিজাত্যের প্রতীক নয়, বরং এটি শাস্ত্রীয় সুরের আধুনিক ভাঙাগড়ার একটি মিষ্টি প্রয়াস। ঝরনার চপল বহমানতাকে সুরে বাঁধার জন্য আধুনিক যন্ত্রসঙ্গীত শিল্পী এবং সুরকাররা এই মিশ্র রূপটি ব্যবহার করে থাকেন। শাস্ত্রীয় কঠোর ব্যাকরণের চেয়ে এই সুরের আবেদন সৃষ্টিশীল আধুনিক সুরের ক্ষেত্রে বেশি প্রযোজ্য।