ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের জগত অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং নিয়মতান্ত্রিক। এই রাগ-সাম্রাজ্যে রাগ পূরবী (Purvi) একটি অত্যন্ত গম্ভীর, প্রাচীন এবং উচ্চাঙ্গের রাগ। এটি নিজস্ব ‘পূরবী ঠাটের’ জনক বা আশ্রয়া রাগ। দিনের আলো যখন ম্লান হয়ে আসে এবং প্রকৃতিতে এক ধরণের শান্ত বিষণ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে, তখন পূরবীর সুরলহরী এক আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি করে।

রাগ পূরবী বা পূর্বী
রাগ পূরবীর পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস
রাগ পূরবী একটি পূর্বাঙ্গ প্রধান ও সন্ধিপ্রকাশ রাগ। সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমীর (SRA) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই রাগটি বিকেল ৪টা থেকে ৬টা পর্যন্ত গাওয়ার জন্য প্রশস্ত। এর প্রকৃতি অত্যন্ত গম্ভীর এবং বৈরাগ্যপূর্ণ। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এটি একটি অতি প্রাচীন রাগ এবং মুঘল আমল থেকে শুরু করে আধুনিক কাল পর্যন্ত ধ্রুপদ ও খেয়াল গায়কির জন্য এটি শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন।
এই রাগের প্রধান বিশেষত্ব হলো এতে উভয় মধ্যমের (শুদ্ধ ও তীব্র) প্রয়োগ। এই দুটি মধ্যমের শৈল্পিক ব্যবহারই একে সমপ্রকৃতির রাগ ‘পুরিয়া ধনাশ্রী’ থেকে আলাদা করে। পূরবীর স্বর বিন্যাস অত্যন্ত বক্র, যা নিপুণ গায়কি ও দীর্ঘ সাধনার দাবি রাখে। মজার বিষয় হলো, প্রচলিত পূরবী ছাড়াও এর আরও দুটি রূপ দেখা যায়। একটিতে শুদ্ধ ও কোমল উভয় ধৈবত ব্যবহৃত হয়; অন্যটিতে রিশব কোমল ও শুদ্ধ এবং শুদ্ধ ধৈবতের মিশ্রণ থাকে, যা প্রধানত রবীন্দ্রসংগীতে লক্ষ্য করা যায়।

রাগের শাস্ত্র
- ঠাট: পূরবী।
- জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহে ৭টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- আরোহ: সা ঋা গা ক্ষা পা দা না র্সা
- অবরোহ: র্সা না দা পা ক্ষা গা মা গা ঋা সা
- পকড়: ন্ সা ঋা গা , মা গা, ক্ষা গা, ঋা গা, ঋা সা
- বাদী স্বর: গা (শুদ্ধ গান্ধার)।
- সমবাদী স্বর: না (শুদ্ধ নিষাদ)।
- বর্জিত স্বর: কোনো স্বর বর্জিত নয়।
- ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ (ঋা) এবং ধৈবত (দা) কোমল; মধ্যম উভয় (শুদ্ধ-মা ও তীব্র-ক্ষা) ব্যবহৃত হয়; বাকি সব স্বর (সা, গা, পা, না) শুদ্ধ।
- সময়: সায়ংকাল বা গোধূলি বেলা (বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত)।
- প্রকৃতি: অত্যন্ত গম্ভীর, বৈরাগ্য ও ভক্তি রসপ্রধান।
সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ
- রাগ পুরিয়া ধনাশ্রী: এই রাগের সাথে পূরবীর গভীর সাদৃশ্য রয়েছে, তবে এতে শুদ্ধ মধ্যমের ব্যবহার নেই এবং বাদী স্বর ‘পা’।
- রাগ মারওয়া: মারওয়াতে ‘পা’ বর্জিত থাকে এবং ঋষভ অতি কোমল।
- রাগ শ্রী: শ্রী রাগের চলন ও গাম্ভীর্য পূরবীর কাছাকাছি হলেও এতে ‘পা’ ও ‘ঋা’ এর ওপর জোর বেশি থাকে।
- রাগ গৌরী (পূরবী ঠাট): আরোহে ‘দা’ বর্জিত থাকে এবং চলনগত পার্থক্য আছে।
- রাগ ললিত: উভয় মধ্যমের প্রয়োগ থাকলেও এর ঠাট ও সময় ভিন্ন।
- রাগ বসন্ত: পূরবীর স্বর ব্যবহৃত হলেও বসন্ত রাগটি অনেক বেশি চপল ও ঋতুপ্রধান।
রাগ পূরবী হলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সেই ধ্রুপদী সুর যা দিনের সমাপ্তিকে এক অপার্থিব আধ্যাত্মিকতায় রূপান্তরিত করে। এর শুদ্ধ মধ্যমের সূক্ষ্ম প্রয়োগ এবং বক্র চলন একজন শিল্পীর মুন্সিয়ানা ফুটিয়ে তোলে। রবীন্দ্রসংগীতে এই রাগের যে ভিন্নরূপ দেখা যায়, তা এর নমনীয়তা ও গভীরতাকেই প্রমাণ করে। দিনের কোলাহল শেষে যখন মানুষ প্রশান্তি খোঁজে, তখন পূরবীর গম্ভীর আলাপ মনের অস্থিরতা দূর করে এক ধ্যানের জগতে নিয়ে যায়।

কাজী নজরুল ইসলামের গানে রাগ পূরবী:
নজরুলের অনেক গান রাগাশ্রয়ী। নির্দিষ্ট রাগের আশ্রয়ে যে গানগুলোতে সুর করা হয়েছে, সেগুলোর পুরো সুরে রাগের অবয়ব বজায় রাখার চেষ্টা থেকেছে; খুব বেশি রাগভ্রষ্ট হয়নি। তাই নজরুলের গানগুলো কান তৈরিতে বেশি উপযোগী বলে আমার কাছে মনে হয়।
১. আজ যুগের পরে ঘরে ফিরে
২. কে তুমি দূরের সাথি
৩. বিদায়ের বেলা মোর ঘনায়ে আসে
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের গানে পূরবী:
কবিগুরু তার অনেক কম্পোজিশনে প্রচলিত রাগের আশ্রয় নিলেও অনেক সময় রাগের কাঠামোতে তিনি আটকে থাকতে চাননি। তাঁর সুরের পথ রাগের বাইরে চলে গেছে প্রায়শই। আমার কাঁচা কান যা বলে, তাতে বিশুদ্ধ রাগাশ্রয়ী গান হিসেবে তাঁর গান অনেক ক্ষেত্রেই খুব ভালো উদাহরণ নয়।
১. আজি এ আনন্দ সন্ধ্যা
২. অশ্রুনদীর সুদূর পারে
৩. নিভৃত প্রাণের দেবতা
আধুনিক গানে পূরবী:
১. দিবা অবসান হোলো – কণ্ঠ: ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য (কথা- অমৃতলাল গুপ্ত)।
গজলে পূরবী:
ভজনে পূরবী:
১.
ঠুমরিতে পূরবী:
১.
অন্যান্য:
১.
যন্দ্রে পূরবী:
সেতার:
১. ইমদাদখানী ঘরানার শহীদ পারভেজ খানের সেতারে – পূরবী।
সরদ:
১.মাইহার ঘরানার খলিফা ওস্তাদ আলী আকবর খানের সরদে- পূরবী।
২. পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সরদে- পূরবী।
খেয়াল:
১. রামপুর সহসওয়ান ঘরানার ওস্তাদ রশিদ খানের – পূরবী।
২. আমীর খান সাহেব এর- পূরবী।
৩. পণ্ডিত কুমার গান্ধর্বের কেদার – পূরবী।
৪. জয়পুর ঘরানার শিল্পী কিশোরী আমনকারের গলায় – পূরবী।
৫. পণ্ডিত মুকুল শিবপুত্রের- পূরবী।
৬. বিদুষী শোভা মুডগালের- পূরবী।
টিউটোরিয়াল:
যেকোনো রাগের স্বরের চলাফেরা বোঝার জন্য ২/৫ টি স্বর-মালিকা বা সারগম-গীত শোনা দরকার। স্বর মল্লিকার পাশাপাশি দু একটি লক্ষণ গীত (বা ছোট খেয়াল) শুনলে সহজ হতে পারে। লক্ষণ গীত মূলত শেখানো হয় রাগের লক্ষণগুলো সহজে ধরতে। লক্ষণ গীত ছোট খেয়াল প্রায় একই কাজ করে। অনলাইনে অনেক গুলো আছে। একটু খোঁজাখুঁজি করলে পেয়ে যাবেন। স্যাম্পল হিসেবে নিচের দুটো লিংক দেয়া হল।
১. রাগ পূরবীর এর স্বরমল্লিকা।
২. এনসিইআরটি টিউটোরিয়াল।
৩. AUTRIM প্রজেক্ট আর্টিকেল
তথ্যসূত্র:
১. সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমী (SRA): রাগের সময়কাল ও পরিবেশনার সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত তথ্যের জন্য।
২. পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — ‘হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতি’ (খণ্ড ৪): পূরবী ঠাট ও রাগের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের জন্য।
৩. বিমলকান্ত রায় চৌধুরী — ‘ভারতীয় সংগীতকোষ’: রাগের ঐতিহাসিক বিবর্তন ও রবীন্দ্রসংগীতে এর প্রয়োগ সংক্রান্ত তথ্যের জন্য।
৪. বসন্ত — ‘সংগীত বিশারদ’: শাস্ত্রীয় নিয়ম ও বাদী-সমবাদী যাচাইয়ের জন্য।
৫. পণ্ডিত ওমকারনাথ ঠাকুর — ‘প্রণাব ভারতী’: রাগের রসতাত্ত্বিক ও গায়নশৈলী নিশ্চিতকরণের জন্য।
শ্রোতা সহায়িকা নোট সিরিজে আজকের রাগ – রাগ পূরবী বা পূর্বী। এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আপডেট পেতে আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।
