রাগ বাঙ্গাল ভৈরব । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সুবিশাল কাননে রাগ বাঙ্গাল ভৈরব (Bengal Bhairav) একটি অত্যন্ত প্রাচীন, গম্ভীর এবং ভক্তি রসপ্রধান রাগ। নাম থেকেই স্পষ্ট যে এটি ‘ভৈরব’ অঙ্গের একটি রাগ। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে মনে করা হয়, এই রাগের উৎপত্তি প্রাচীন বঙ্গ জনপদের লোকজ সুর বা আঞ্চলিক গায়নশৈলীর সাথে শাস্ত্রীয় ভৈরবের মিলনে ঘটেছে। এটি মূলত ভোরের প্রশান্তি এবং বৈরাগ্যের এক অনন্য সুরমূর্ত।

রাগ বাঙ্গাল ভৈরব

রাগ বাঙ্গাল ভৈরবের পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস

রাগ বাঙ্গাল ভৈরব মূলত ভৈরব ঠাটের একটি অতি বিরল এবং অপ্রচলিত রাগ। প্রাচীন সংগীত গ্রন্থগুলোতে ‘বঙ্গাল’ বা ‘বাঙাল’ নামে এই রাগের উল্লেখ পাওয়া যায়। মধ্যযুগীয় সংগীতে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাগ ছিল, যদিও আধুনিক শাস্ত্রীয় সংগীতের আসরগুলোতে এর প্রচলন কিছুটা কমে এসেছে। এই রাগের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর ঔড়ব-সম্পূর্ণ বা কোথাও ষাড়ব-সম্পূর্ণ জাতিগত চলন।

এই রাগের চলনে ভৈরবের মতো কোমল ঋষভ (রে) এবং কোমল ধৈবত (ধা)-এর আন্দোলন থাকলেও এর আরোহের বিশেষ গঠন একে মূল ভৈরব থেকে পৃথক করে। বাঙ্গাল ভৈরবে বীর ও ভক্তি রসের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়। অনেক পণ্ডিত মনে করেন, এই রাগের গঠনশৈলীর মধ্যে প্রাচীন তান্ত্রিক বা শাক্ত সংগীতের এক ধরণের গাম্ভীর্য লুকিয়ে আছে। এটি মূলত একটি সন্ধিপ্রকাশ রাগ, যা সূর্যোদয়ের সময় এক গম্ভীর ও পবিত্র আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি করে।

রাগের শাস্ত্র

  • ঠাটে: ভৈরব।
  • জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহে ৫টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ: স র গ প ধ স।
  • অবরোহ: স ন ধ প ম গ র স [কেউ কেউ অবরোহে ধৈবত শুদ্ধ রাখার পক্ষপাতি, তবে কোমল ধৈবতই অধিক প্রচলিত]।
  • বাদী স্বর: র (কোমল ঋষভ)।
  • সমবাদী স্বর: প (পঞ্চম)।
  • বর্জিত স্বর: আরোহে ‘ম’ (মধ্যম) এবং ‘ন’ (নিষাদ) বর্জিত।
  • ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ R এবং ধৈবত D কোমল; বাকি সব স্বর শুদ্ধ ব্যবহৃত হয়।
  • সময়: প্রাতঃকাল (ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত বা দিনের প্রথম প্রহর)।
  • প্রকৃতি: গম্ভীর, ভক্তি ও বৈরাগ্য রসপ্রধান।

সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ

  • রাগ ভৈরব: বাঙ্গাল ভৈরবের জনক রাগ; ভৈরবে আরোহে সব স্বর ব্যবহৃত হয় কিন্তু বাঙ্গাল ভৈরবে আরোহে মধ্যম ও নিষাদ বর্জিত।
  • রাগ বিভাস: বিভাসের সাথে এর গভীর মিল রয়েছে কারণ বিভাসও ঔড়ব জাতির এবং ভৈরব ঠাটের, তবে বিভাসের বাদী-সমবাদী ভিন্ন।
  • রাগ গুণকালী: গুণকালীতেও আরোহে ৫টি স্বর থাকে, তবে এতে মধ্যম ব্যবহৃত হয় এবং গান্ধার বর্জিত থাকে।
  • রাগ রামকালী: রামকালীতে তীব্র মধ্যমের প্রয়োগ থাকে যা বাঙ্গাল ভৈরবে নেই।
  • রাগ রেওয়া: মারওয়া ঠাটের হওয়ার কারণে স্বরবিন্যাস এক হলেও প্রকৃতি ও গায়নশৈলী সম্পূর্ণ ভিন্ন।

রাগ বাঙ্গাল ভৈরব হলো ভারতীয় সংগীতের সেই প্রাচীন ঐতিহ্য যা সময়ের সাথে সাথে অনেকটাই নিভৃত হয়ে পড়েছে। এর পাঁচটি স্বরের আরোহী কাঠামো এবং ভৈরবের মতো গম্ভীর অবরোহী চলন শিল্পীকে এক নিবিড় ধ্যানের স্তরে নিয়ে যায়। নামটির সাথে ‘বঙ্গাল’ যুক্ত থাকায় এটি আমাদের আঞ্চলিক শেকড়ের সাথে শাস্ত্রীয় সংগীতের এক ঐতিহাসিক যোগসূত্র স্থাপন করে। বর্তমান সময়ে এই দুর্লভ রাগটির চর্চা এবং সংরক্ষণ করা শাস্ত্রীয় সংগীতের বৈচিত্র্য বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন।

তথ্যসূত্র:

১/ পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — ‘হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতি’ (Kramik Pustak Malika, খণ্ড ২ ও ৩): বাঙ্গাল ভৈরব রাগের ব্যাকরণ ও ঠাট নির্ধারণের প্রধান উৎস।

২/ বসন্ত — ‘সংগীত বিশারদ’ (Sangeet Karyalaya): রাগের বাদী-সমবাদী এবং জাতি নির্ধারণের নির্ভরযোগ্য আকর।

৩/ বিমলকান্ত রায় চৌধুরী — ‘ভারতীয় সংগীতকোষ’: রাগের ঐতিহাসিক বিবর্তন ও প্রাচীন গ্রন্থসমূহের রেফারেন্স।

৪/ Joep Bor — ‘The Raga Guide’: আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাগের তথ্যকোষ ও নোটেশন যাচাইয়ের জন্য।

৫/ স্বামী প্রজ্ঞানন্দ — ‘ভারতীয় সংগীতের ইতিহাস’: রাগের নামতত্ত্ব ও প্রাচীন ভারতের আঞ্চলিক সংগীতের প্রভাব আলোচনার জন্য।

আরও দেখুন: