ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশাল ক্যানভাসে প্রকৃতি ও ঋতুবৈচিত্র্যকে কেন্দ্র করে যেসব রাগ গড়ে উঠেছে, তার মধ্যে অত্যন্ত অপ্রচলিত, বিরল অথচ পরম নান্দনিক একটি সংমিশ্রণ হলো ‘রাগ বাসন্তী মালহার’ (বা সংক্ষেপে ‘বাসন্তী-মালহার’)। নাম থেকেই স্পষ্টভাবে অনুমেয় যে, এটি হিন্দুস্তানি মার্গ সঙ্গীতের দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ঋতুর ভাবধারা—বসন্তের উজ্জ্বল, চপল প্রফুল্লতা প্রকাশকারী বসন্ত অঙ্গ এবং বর্ষার সজল, সুগম্ভীর ও সুফি প্রকৃতির মালহার অঙ্গের এক অনবদ্য সাঙ্গীতিক মেলবন্ধন।
সঙ্গীত শাস্ত্রে স্থান, প্রথা ও প্রামাণ্য গ্রন্থভেদে এটি ‘বাসন্তী মালহার’, ‘বাসন্তী-মালহার’ বা কেবল ‘বসন্ত মালহার’ নামেও বহুল সমাদৃত।
ইতিহাস ও রাগের পরিচয়
শাস্ত্রীয় সঙ্গীত গবেষক ও প্রখ্যাত পণ্ডিতদের মতে, রাগ বাসন্তী মালহার কোনো একক জনক রাগ নয়; এটি মূলত কাফী ঠাট বা ক্ষেত্রবিশেষে পূর্বী/মারবা অঙ্গের আশ্রয়ে গড়ে ওঠা একটি অত্যন্ত সুসংহত জোড়-রাগ (Jod-Raga)। প্রাচীন সুরসাধকগণ বর্ষার সোঁদা গন্ধ আর মেঘের ডাকের সাথে বসন্তের উজ্জ্বল হলুদ রঙ ও নতুন কচি পাতার প্রফুল্লতাকে একই সুরের সূত্রে বাঁধতে এই অপূর্ব রূপটির উদ্ভাবন করেছিলেন।
মালহারের গম্ভীর গাম্ভীর্য ও ‘ম প g m r s’ মীড়ের ভেতর যখন রাগ বসন্তের বিশেষ চলন ও তীব্র মধ্যমের ছোঁয়া এসে মেশে, তখন আসরে তৈরি হয় এক অদ্ভুত রোমান্টিক ও অদ্ভুত রস। এর মূল রস হলো শৃঙ্গার (মিলন ও বিরহের সংমিশ্রণ), আদ্ভূত এবং প্রসন্ন রস।
রাগের শাস্ত্রীয় কাঠামো
- ঠাট: কাফী ঠাট (তবে বাসন্তী অঙ্গের তীব্র মধ্যম ও কোমল ঋষভ ক্ষেত্রবিশেষে প্রয়োগ ভেদে কাফী-পূর্বী মিশ্র রূপে দেখা যায়)।
- জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহণ এবং অবরোহণ—উভয় ক্ষেত্রেই সাতটি করে স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- বাদী স্বর: ম (শুদ্ধ মধ্যম) বা প (শুদ্ধ পঞ্চম—ঘরানাভেদে)।
- সমবাদী স্বর: স (ষড়্জ) বা র (ঋষভ)।
- বর্জিত স্বর: কোনো স্বর বর্জিত নয় (তবে উভয় অঙ্গের স্বরসীমা বজায় রেখে অত্যন্ত সুসংহতভাবে বিস্তার ঘটে)।
- ব্যবহৃত স্বর: শুদ্ধ ঋষভ (র), কোমল ঋষভ (র – বসন্ত অঙ্গের বিশেষ স্পর্শে), কোমল গান্ধার (গ – মালহার অঙ্গ), শুদ্ধ মধ্যম (ম), তীব্র মধ্যম (হ্ম – বাসন্তী অঙ্গ), শুদ্ধ পঞ্চম (প), শুদ্ধ ধৈবত (দ), শুদ্ধ নিখাদ (ন – আরোহে) এবং কোমল নিখাদ (ণ – অবরোহে)।
- সময়: বর্ষা ঋতুতে যেকোনো সময়; এছাড়া বসন্তকালেও এটি গীত হয়। প্রথাগত সময় অনুযায়ী রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর (মধ্যরাত)।
- প্রকৃতি: অত্যন্ত গম্ভীর, প্রফুল্ল, মরমী, রোমান্টিক ও আভিজাত্যপূর্ণ।
আরোহণ (বাসন্তী অঙ্গ প্রাধান্য): স ম, ম প, ধ নি র্স / স র গ ম, হ্ম প, ধ নি র্স
অবরোহণ (মালহার অঙ্গ প্রাধান্য): র্স ণ ধ প, ম প, g m r s
প্রধান স্বরসংগতি (পকড়):
স ম, হ্ম প, ধ নি র্স, র্স ণ ধ প, m p g m r s
গায়কি ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য
রাগ বাসন্তী মালহারের প্রধান সৌন্দর্য ও কারিগরি চ্যালেঞ্জ লুকিয়ে রয়েছে দুই ভিন্ন মেজাজের অঙ্গের নিখুঁত সীমানা রক্ষা করার ওপর।
১. উভয় মধ্যমের সুনিপুণ ব্যবহার: আরোহণে বসন্ত অঙ্গের আভাস দিতে তীব্র মধ্যম (হ্ম) এবং পঞ্চমে রূপান্তর ঘটে (হ্ম প)। আবার অবরোহণে স্পষ্ট মালহার অঙ্গ ফুটিয়ে তুলতে শুদ্ধ মধ্যম ধরে র্স ণ ধ প, m p g m r s মীড়সহ ষড়্জে নামা হয়।
২. দুই নিখাদ ও বসন্ত অঙ্গের দোলা: আরোহণে শুদ্ধ নিখাদ এবং অবরোহণে অতি প্রঞ্জলভাবে কোমল নিখাদ স্পর্শ করার নিয়ম রয়েছে। বসন্ত রাগের মতো তারা সপ্তকে ওঠার সময় ধৈবত ও নিখাদের বিশেষ দুলন রাগে এক অদ্ভুত রঙের উন্মেষ ঘটায়।
৩. বর্ষা ও বসন্তের ঋতু-মেলবন্ধন: এতে একদিকে যেমন মেঘের গম্ভীর আহ্বান প্রকাশ পায়, অন্যদিকে আবীরের প্রফুল্ল রঙ শ্রোতার হৃদয় দোলা দেয়।
ধ্রুপদ, ধামার এবং মার্গীয় খেয়াল বন্দিশে রাগ বাসন্তী মালহারের রূপ সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেতার, সরোদ, সানাই ও বাঁশিতে এই রাগের বিস্তার মেহফিলে এক পরম অনাবিল ও রাজকীয় মেজাজের সৃষ্টি করে। ওপরের সংযুক্ত ভিডিওগুলোতে প্রখ্যাত শিল্পীদের কণ্ঠে ও যন্ত্রে এই বিরল রাগের অনবদ্য পরিবেশনা সরাসরি উপভোগ করা যায়।
সম্পর্কিত রাগের তালিকা
- রাগ বসন্ত: পূর্বী ঠাটের অন্যতম প্রধান বসন্তকালীন রাগ; বাসন্তী মালহারের প্রধান অঙ্গগুলোর একটি।
- রাগ মিঞাঁ কি মালহার: মালহার পরিবারের গম্ভীরতম রূপ; এতে বসন্তের চপলতা থাকে না।
- রাগ বাহার-মালহার: বসন্ত ও বর্ষার সংমিশ্রণে তৈরি আরেকটি প্রখ্যাত জোড়-রাগ; তবে এতে বাহারের চলন বেশি স্পষ্ট।
- রাগ রূপমঞ্জরী মালহার: মালহার অঙ্গের আরেকটি বিরল ও মনোহর শাখা রূপ।
উপসংহার
রাগ বাসন্তী মালহার হলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ঐতিহ্যের সেই অপূর্ব সৃষ্টি, যেখানে প্রকৃতির দুই বিপরীতমুখী সৌন্দর্য—বৃষ্টির স্নিগ্ধতা আর বসন্তের উচ্ছলতা এক সুরের সুতোয় বাঁধা পড়েছে। গম্ভীর মেঘলা বাতাসে যখন শিল্পীর কণ্ঠে কিংবা যন্ত্রের তারে বাসন্তী মালহারের ‘হ্ম প, ধ নি র্স, র্স ণ ধ প, m p g m r s’-র মায়াবী তান ভেসে আসে, তখন তা মুহূর্তের মধ্যে মনকে এক অনাবিল, রঙিন ও স্নিগ্ধ সুরলোকে নিয়ে যায়।
সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স
১. ক্রমিক পুস্তক মালিকা (খণ্ড ৩ ও ৪) — পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।
২. রাগ প্রবীণ ও রাগ বিজ্ঞান — পণ্ডিত বিনায়ক রাও পটবর্ধন।
৩. Raganidhi (Vol 1-4) — বি. সুব্বা রাও (প্রখ্যাত সঙ্গীত তাত্ত্বিক)।
৪. আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমি (SRA) আর্কাইভ — মালহার অঙ্গের বিরল ও জোড়-রাগ বিশ্লেষণ।