রাগ বিলাবল । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

রাগ বিলাবল উত্তর ভারতীয় বা হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অত্যন্ত মৌলিক এবং প্রাচীন একটি রাগ। এই রাগটির গুরুত্ব এতটাই বেশি যে, আধুনিক হিন্দুস্তানি মার্গ সঙ্গীতে এটিকে ‘শুদ্ধ ঠাট’ বা স্কেলের ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। অর্থাৎ, এই রাগের সাতটি স্বরই শুদ্ধ (Natural Notes), কোনো কোমল বা তীব্র স্বর নেই। পাশ্চাত্য সঙ্গীতের ‘Major Scale’ (C Major)-এর সাথে বিলাবলের হুবহু মিল পাওয়া যায়।

রাগ বিলাবল

ঐতিহাসিকভাবে, প্রাচীন ভারতে ‘শুদ্ধ ঠাট’ হিসেবে রাগ কাফি-কে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু আধুনিক যুগে পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখণ্ডের শাস্ত্রীয় সংস্কারের পর ‘বিলাবল’ ঠাটকে শুদ্ধ স্বরের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। বিলাবল রাগটি অত্যন্ত স্নিগ্ধ, বীরত্বপূর্ণ এবং ভক্তিভাব জাগানো এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতায় ভরপুর। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের একদম প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের এই রাগের মাধ্যমেই স্বরজ্ঞান দেওয়া হয়। বর্তমানে রাগ বিলাবল বলতে মূলত ‘আলহাইয়া বিলাবল’ রূপটিকেই সবচেয়ে বেশি গাওয়া ও বাজানো হয়।

রাগের শাস্ত্র (The Science of Raga)

  • ঠাট: বিলাবল (এটি বিলাবল ঠাটেরই আশ্রিত বা জনক রাগ)।
  • জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহণে ৫টি এবং অবরোহণে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)। তবে প্রচলিত আলহাইয়া বিলাবলে আরোহণে মধ্যম বর্জন করে ষাড়ব-সম্পূর্ণ (৬-৭) রূপটিও বহুল ব্যবহৃত।
  • আরোহ: স রে গ ম প ধ ন র্স (কিংবা বক্র চলনে: স রে গ রে, গ প, ধ ন র্স)।
  • অবরোহ: র্স ন ধ প, ম গ, রে স (কোমল নিষাদের অবরোহী সূক্ষ্ম ছোঁয়া আলহাইয়া বিলাবলের বিশেষত্ব)।
  • বাদী স্বর: ধৈবত ()।
  • সমবাদী স্বর: গান্ধার (গা)।
  • বর্জিত স্বর: আরোহণে মধ্যম (মা) এবং অনেক সময় পঞ্চম (পা) বর্জিত থাকে।
  • ব্যবহৃত স্বর: স, শুদ্ধ রে, শুদ্ধ গ, শুদ্ধ ম, প, শুদ্ধ ধ এবং শুদ্ধ ন (অবরোহে কদাচিৎ কোমল ণ)।
  • সময়: সকালের প্রথম প্রহর (ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত গাওয়ার আদর্শ সময়)।
  • প্রকৃতি: স্নিগ্ধ, উজ্জ্বল, ভক্তি এবং বীররস সমৃদ্ধ প্রাতঃকালীন রাগ।

 

বিলাবলের সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য রাগ

১. আলহাইয়া বিলাবল — শুদ্ধ বিলাবলের অবরোহে সামান্য কোমল নিষাদ (ণ) ব্যবহার করলে তা আলহাইয়া বিলাবলে রূপ নেয় (বর্তমানে এটিই বিলাবল নামে গাওয়া হয়)।

২. বিলাবল খাম্বাজ — বিলাবলের শুদ্ধ রূপের সাথে রাগ খাম্বাজের অঙ্গ মেশালে এই মিশ্র রাগটি সৃষ্টি হয়।

৩. যমুনী বিলাবল — বিলাবল রাগের চলনের সাথে রাগ যমন-এর তীব্র মধ্যম মেশালে এই অপ্রচলিত জোড়-রাগটি তৈরি হয়।

৪. শুক্ল বিলাবল — বিলাবল রাগের সাথে সকালের রাগ ভৈরবীর ছায়া ও শুদ্ধ স্বরের মিশেলে তৈরি একটি অতি প্রাচীন রাগ।

রাগ বিলাবল হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রবেশদ্বার। যে কোনো সঙ্গীত শিক্ষার্থীর স্বরলিপি এবং সুরের কান তৈরি করার মূল কারিগর এই বিলাবল। এই রাগের সাতটি শুদ্ধ স্বর সকালের আলোর মতো পবিত্র এবং নিষ্কলুষ। শুদ্ধ বিলাবল বা আলহাইয়া বিলাবল শুধু উচ্চাঙ্গ কণ্ঠসঙ্গীতেই নয়, সেতার, সরোদ এবং বাঁশিতে বাজালে এক স্বর্গীয় প্রশান্তি ও ভক্তিভাবের সৃষ্টি করে।

সূত্র:

১. পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখণ্ডে রচিত “ক্রমিক পুস্তক মালিকা” (খণ্ড-১ ও ২ – হিন্দুস্তানি সঙ্গীতের মূল ব্যাকরণ গ্রন্থ)।

২. আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমি (ITC-SRA) – রাগ ক্যাটালগ এবং রিসার্চ আর্কাইভ।

৩. প্রখ্যাত সঙ্গীত তাত্ত্বিক বি. সুব্বা রাও প্রণীত “Raganidhi” (খণ্ড-১)।