রাগ বিহাদ ভৈরব । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সুবিশাল আকাশতলে রাগ বিহাদ ভৈরব (Bihad Bhairav) একটি অত্যন্ত বিরল, অপ্রচলিত এবং গম্ভীর প্রকৃতির রাগ। এটি মূলত ভৈরব ঠাটের একটি বিশেষ মিশ্র রূপ। শুদ্ধ ভৈরব বা আহির ভৈরব যতটা পরিচিত, বিহাদ ভৈরব ততটাই নিভৃতচারী এবং উচ্চস্তরের সংগীত সাধকদের প্রিয়। এই রাগটি মূলত প্রাতঃকালের শান্ত পরিবেশে এক অপার্থিব আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি করে।

রাগ বিহাদ ভৈরব

রাগ বিহাদ ভৈরবের পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস

রাগ বিহাদ ভৈরব মূলত ভৈরব এবং বিহাগ—এই দুটি ভিন্ন প্রকৃতির রাগের এক অপূর্ব শৈল্পিক সংমিশ্রণ। ভৈরব হলো ভোরের গম্ভীর ও বৈরাগ্যপ্রধান রাগ, আর বিহাগ হলো রাত্রিকালীন শৃঙ্গার ও ভক্তি রসপ্রধান রাগ। এই দুইয়ের মিলনে বিহাদ ভৈরব এক অনন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য লাভ করেছে।

এই রাগের বিশেষত্ব হলো এর চলনে ভৈরব রাগের কোমল ঋষভ (রে) এবং কোমল ধৈবত (ধা)-এর গাম্ভীর্য বজায় থাকে, কিন্তু আরোহের সময় বিহাগ রাগের মতো শুদ্ধ গান্ধার ও শুদ্ধ নিষাদের বিশেষ প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। ঐতিহাসিকভাবে, এই ধরণের মিশ্র রাগগুলো মুঘল পরবর্তী আমলে বিভিন্ন ঘরানার ওস্তাদদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে জন্ম নিয়েছে। এটি গাওয়ার সময় শিল্পীকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হয় যাতে ভৈরবের গম্ভীর মেজাজ ক্ষুণ্ণ না হয়, আবার বিহাগের মিষ্টতাও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। এটি মূলত ধ্রুপদ ও খেয়াল গায়কির উপযোগী একটি রাগ।

রাগের শাস্ত্র

  • ঠাট: ভৈরব।
  • জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহে ৭টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ: স র গ ম প ধ ন স।
  • অবরোহ: স ন ধ প ম গ র স [অবরোহে বিহাগের ন্যায় গ-ম-গ-র-স প্রয়োগ দেখা যায়]।
  • বাদী স্বর: ধ (কোমল ধৈবত)।
  • সমবাদী স্বর: র (কোমল ঋষভ)।
  • বর্জিত স্বর: কোনো স্বর বর্জিত নয়।
  • ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ R এবং ধৈবত D কোমল; বাকি সব স্বর (সা, গা, মা, পা, নি) শুদ্ধ
  • সময়: প্রাতঃকাল (ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত)।
  • প্রকৃতি: গম্ভীর, শান্ত এবং ভক্তি রসপ্রধান।

 

সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ

  • রাগ ভৈরব: বিহাদ ভৈরবের মূল ভিত্তি এবং প্রধান অঙ্গ রাগ।
  • রাগ বিহাগ: এই রাগের আরোহী চলন এবং গান্ধার-নিষাদের প্রয়োগ বিহাদ ভৈরবে মিশে থাকে।
  • রাগ নট ভৈরব: স্বর বিন্যাসের উজ্জ্বলতায় সাদৃশ্য থাকলেও নট ভৈরবে বিহাগের ছায়া থাকে না।
  • রাগ রামকালী: রামকালীতে তীব্র মধ্যম ব্যবহৃত হয়, যা একে বিহাদ ভৈরব থেকে পৃথক করে।
  • রাগ কলিঙ্গড়া: দ্রুত চলনের রাগ হলেও স্বর বিন্যাসের কারণে ভৈরব অঙ্গের মিল অনুভূত হয়।

রাগ বিহাদ ভৈরব হলো ভারতীয় সংগীতের সেই নিভৃত রত্ন যা ভোরের নিস্তব্ধতাকে এক পবিত্র ও উজ্জ্বল আধ্যাত্মিকতায় পূর্ণ করে তোলে। ভৈরবের আভিজাত্য আর বিহাগের মিষ্টতা—এই দুয়ের সার্থক মিলনই হলো এই রাগ। যদিও বর্তমান সময়ের আসরগুলোতে এই রাগের চর্চা অত্যন্ত সীমিত, তবুও এর তাত্ত্বিক ও শৈল্পিক গুরুত্ব অপরিসীম। যারা গতানুগতিক রাগের বাইরে নতুনত্বের সন্ধান করেন, তাদের কাছে বিহাদ ভৈরব এক অনন্য সৃজনশীল ক্যানভাস।

তথ্যসূত্র:

১/ পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — ‘হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতি’ (খণ্ড ৪): বিরল এবং অপ্রচলিত মিশ্র রাগসমূহের ব্যাকরণগত ভিত্তির জন্য।

২/ বসন্ত — ‘সংগীত বিশারদ’ (Sangeet Karyalaya, Hathras): রাগের বাদী-সমবাদী এবং জাতি নির্ধারণের নির্ভরযোগ্য উৎস।

৩/ বিমলকান্ত রায় চৌধুরী — ‘ভারতীয় সংগীতকোষ’: মিশ্র রাগসমূহের পরিচয় ও বিবর্তনের ঐতিহাসিক রেফারেন্স।

৪/ Joep Bor — ‘The Raga Guide’: আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাগের তথ্যকোষ ও নোটেশন যাচাইয়ের জন্য।

৫/ অপ্রচলিত রাগ সংকলন (বিভিন্ন ঘরানা): বিহাদ ভৈরব-এর মতো দুর্লভ রাগগুলোর প্রয়োগ পদ্ধতি ও চলন সংক্রান্ত তথ্যের জন্য।

আরও দেখুন: