ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সুবিশাল প্রাঙ্গণে রাগ বৈরাগী (বা বৈরাগী ভৈরব) হলো একটি অতি গভীর, শান্ত এবং আধ্যাত্মিক ভাবোদ্দীপক রাগ। এটি মূলত ভৈরব ঠাটের অন্তর্ভুক্ত একটি রাগ। এর নামের মাঝেই লুকিয়ে আছে এর প্রকৃত স্বরূপ—’বৈরাগ্য’। সংসারের মায়া ত্যাগ করে পরমাত্মার সন্ধানে রত কোনো যোগীর হৃদয়ের ব্যাকুলতা যেন এই রাগের সুরলহরীতে মূর্ত হয়ে ওঠে।
রাগ বৈরাগী
রাগ বৈরাগী ভৈরবের পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস
রাগ বৈরাগী মূলত কর্ণাটকী সংগীতের ‘রেবতী’ রাগের সমতুল্য, যা উত্তর ভারতীয় সংগীত পদ্ধতিতে ‘বৈরাগী’ বা ‘বৈরাগী ভৈরব’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে। এই রাগটি বিংশ শতাব্দীতে পণ্ডিত রবিশঙ্করের মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের হাত ধরে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এটি একটি ঔড়ব-ঔড়ব জাতির রাগ, অর্থাৎ এর আরোহ ও অবরোহ উভয় ক্ষেত্রেই মাত্র ৫টি স্বর ব্যবহৃত হয়।
এই রাগের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর কোমল ঋষভ (রে) এবং কোমল নিষাদ (নি)-এর প্রয়োগ। গান্ধার (গা) এবং ধৈবত (ধা) সম্পূর্ণ বর্জিত হওয়ার কারণে এই রাগের চলন অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং একাগ্র। এটি মূলত একটি প্রাতঃকালীন সন্ধিপ্রকাশ রাগ। ভোরের সূর্যোদয়ের সময় যখন প্রকৃতি এক অপার স্তব্ধতায় নিমগ্ন থাকে, তখন বৈরাগী রাগের মন্দ্র সপ্তকের আলাপ শ্রোতার মনে এক ধরণের অন্তর্মুখী চেতনার সৃষ্টি করে। এটি ভক্তি ও শান্ত রসের এক অনন্য আধার।
রাগের শাস্ত্র
- ঠাট: ভৈরব।
- জাতি: ঔড়ব-ঔড়ব (আরোহে ৫টি এবং অবরোহে ৫টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- আরোহ: স র ম প ন স।
- অবরোহ: স ন প ম র স।
- বাদী স্বর: ম (মধ্যম)।
- সমবাদী স্বর: স (ষড়জ)।
- বর্জিত স্বর: আরোহ ও অবরোহ উভয় ক্ষেত্রেই ‘গ’ (গান্ধার) এবং ‘ধ’ (ধৈবত) বর্জিত।
- ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ R এবং নিষাদ কোমল; বাকি স্বর—ষড়জ, মধ্যম এবং পঞ্চম শুদ্ধ।
- সময়: প্রাতঃকাল (ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত)।
- প্রকৃতি: অত্যন্ত শান্ত, বৈরাগ্য ও ভক্তি রসপ্রধান।
সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ
- রাগ ভৈরব: বৈরাগীর মূল ঠাট রাগ; ভৈরবে ঋষভ ও ধৈবত কোমল হলেও বৈরাগীতে ধৈবত বর্জিত।
- রাগ রেবতী: কর্ণাটকী সংগীতের রাগ, যা স্বর বিন্যাসের দিক থেকে বৈরাগীর সাথে হুবহু এক।
- রাগ আহির ভৈরব: উভয় রাগে কোমল ঋষভ ও কোমল নিষাদ থাকলেও আহির ভৈরবে গান্ধার ও ধৈবত ব্যবহৃত হয়।
- রাগ গুণকালী: গুণকালীও একটি প্রাতঃকালীন ঔড়ব রাগ, কিন্তু এতে নিষাদ বর্জিত এবং ধৈবত ব্যবহৃত হয়।
- রাগ শিবরঞ্জনী: গঠনগত সাদৃশ্য থাকলেও শিবরঞ্জনীর ঠাট আলাদা এবং এর মেজাজ অনেক বেশি চঞ্চল ও করুণ।
রাগ বৈরাগী ভৈরব হলো ভারতীয় সংগীতের সেই মায়াবী সুর যা মানুষকে পার্থিব কোলাহল থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়। এর পাঁচটি স্বরের মিতব্যয়ী ব্যবহার প্রমাণ করে যে, সুরের শক্তি কেবল জটিলতায় নয়, বরং তার সরলতা ও প্রয়োগের গভীরতায় নিহিত। ভক্তি ও শান্ত রসের এমন নির্মল মিলন খুব কম রাগে দেখা যায়। আধুনিক শাস্ত্রীয় সংগীতের আসরে বৈরাগী আজও তার আধ্যাত্মিক মেজাজ এবং স্বকীয় আভিজাত্য নিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন।
তথ্যসূত্র:
১. পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — ‘হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতি’ (খণ্ড ৩): রাগের তাত্ত্বিক কাঠামো ও ঠাট নির্ধারণের জন্য।
২. বসন্ত — ‘সংগীত বিশারদ’ (Sangeet Karyalaya): বাদী-সমবাদী এবং জাতি সংক্রান্ত প্রামাণ্য তথ্যের জন্য।
৩. Joep Bor — ‘The Raga Guide’: আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাগের তথ্যকোষ ও নোটেশন যাচাইয়ের জন্য।
৪. পণ্ডিত রবিশঙ্করের জীবন ও সৃষ্টি: বৈরাগী রাগের আধুনিক প্রচার ও প্রয়োগ সংক্রান্ত তথ্যের জন্য।
৫. বিমলকান্ত রায় চৌধুরী — ‘ভারতীয় সংগীতকোষ’: রাগের ঐতিহাসিক বিবর্তন ও তুলনামূলক আলোচনার রেফারেন্স।
আরও দেখুন: