শ্রোতা সহায়িকা নোট সিরিজে আজকের রাগ – রাগ ভাটিয়ার। এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আপডেট পেতে আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।

রাগ ভাটিয়ার
হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের ভোরের রাগগুলোর মধ্যে রাগ ভাটিয়ার এক অনন্য এবং গম্ভীর প্রকৃতির রাগ। এটি মূলত ‘সন্ধিপ্রকাশ’ রাগ (দিনের আলো ও অন্ধকারের মিলনক্ষণ) হিসেবে পরিচিত। ভাটিয়ার রাগের সুর শুনলে মনে এক আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও ভক্তিভাব জাগ্রত হয়। এই রাগটির নামকরণ নিয়ে মতভেদ থাকলেও, অনেকে মনে করেন এটি প্রাচীন ‘ভাট’ সম্প্রদায়ের গায়কী বা লোকসুর থেকে শাস্ত্রীয় সংগীতে স্থান করে নিয়েছে। এটি শুদ্ধ ও কোমল স্বরের এক চমৎকার মিশ্রণ, যা শিল্পীর গায়কিতে এক বিশেষ কারুণ্য ও গাম্ভীর্য ফুটিয়ে তোলে।
ভাটিয়ার রাগটি পরিবেশন করা বেশ কঠিন, কারণ এর চলন কিছুটা বক্র এবং এটি অন্য কিছু ভোরের রাগের (যেমন—মান্দ বা পঞ্চমহী) কাছাকাছি মনে হতে পারে। তবে এর নির্দিষ্ট স্বরপ্রয়োগ একে স্বতন্ত্র মর্যাদা দেয়। এটি মূলত ভৈরব এবং মারওয়া ঠাটের সংমিশ্রণে সৃষ্ট একটি জটিল কিন্তু সুমধুর রাগ।
মান্না দের গাওয়া – এ কি অপুর্ব প্রেম গানটি ভাটিয়ার রাগের উপরে বাঁধা। এই রাগটি একটু কঠিন, বক্র প্রকৃতির রাগ। সকালের দিকে গাওয়া বাজাবার রাগ এটি। এই রাগে দুটি মধ্যম, কোমল রিশব, বাকি সব স্বর শুদ্ধ। এই রাগের স, ধ, প, ধ, ম রাগ প্রকাশক বিন্যাস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই রাগে শুদ্ধ মধ্যমের প্রাধান্য রয়েছে, তারপরেও তীব্র মধ্যম ব্যবহারের মাধ্যমে এই রাগের বিশেষ রূপ প্রকাশ পায়।
এই কারণে এই রাগটি মারবা ঠাটের অন্তর্গত করা হয়েছে। এই রাগে মাঝে মাঝে মান্ড রাগের ছাড়া দেখা যায়। সা ধা; না পা; ধা ক্ষা; পা গা স্বরগুলো এই রাগে ভিন্ন একটি স্বতন্ত্র মাত্রা দেয়।
কথিত আছে এই পুরাতন রাগের নামটি নেয়া হয়েছে রাজা ভার্তেরির কাছ থেকে।
রাগের শাস্ত্র
- ঠাঠ: মারওয়া। (যদিও মারওয়া ঠাটের অন্তর্গত, তবে এতে ভৈরব ও বিলাবল অঙ্গের প্রভাব স্পষ্ট)।
- জাতি: ষাড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহে ৬টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- আরোহ: স, রে ম প, ধ প, ধ নি সং।
- অবরোহ: সং নি ধ প, ম প ধ ম, গ রে স।
- বাদী স্বর: শুদ্ধ মধ্যম (ম)।
- সংবাদী স্বর: শজ (স)।
- বর্জিত স্বর: আরোহে গান্ধার (গ) স্বরটি বর্জিত।
- ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ (রে) কোমল; মধ্যম (ম) শুদ্ধ ও তীব্র (তীব্র ম এর প্রয়োগ অতি সামান্য ও বক্র); বাকি সব স্বর শুদ্ধ।
- সময়: দিনের প্রথম প্রহর (ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা)।
- প্রকৃতি: গম্ভীর, ভক্তি রসাত্মক এবং শান্ত।
- কয়েকটি চলন: ১. স রে ম, ম প, ধ প, ম প ধ ম, গ রে স। ২. স রে ম, প ধ নি সং, সং ধ প, ম প ধ ম। ৩. প ধ নি ধ প, ম প ধ ম, গ রে স।

সম্পর্কিত রাগসমূহ
- রাগ ভৈরব: এই রাগের সাথে ভাটিয়ারের কোমল ঋষভের মিল পাওয়া যায়, তবে ভৈরবে মধ্যম বাদী নয়।
- রাগ পঞ্চমহী: এটি ভাটিয়ারের একটি কাছাকাছি রূপ, যার চলন অনেক সময় শ্রোতাকে বিভ্রান্ত করতে পারে।
- রাগ মারওয়া: ঠাট একই হওয়ায় অনেক স্বর মিল থাকলেও ভাটিয়ারে মধ্যমের প্রাধান্য একে আলাদা করে।
- রাগ ললিত: ললিতের মতো ভাটিয়ারেও মধ্যমের বিশেষ কাজ থাকে, তবে ললিতের কোমল ধৈবত একে ভিন্নতা দেয়।
- রাগ মন্দ: রাজস্থানি এই রাগের কিছু ছোঁয়া ভাটিয়ারের আরোহে লক্ষ্য করা যায়।

আধুনিক গানে ভাটিয়ার:
১. মান্না দে – জ্বালাও আকাশ প্রদীপ (কথা : পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুর : প্রভাস দে)
রাগ ভাটিয়ার কেবল একটি সুরসমষ্টি নয়, এটি ভোরের নির্জনতায় নিজের অন্তরাত্মার সাথে সংযোগ স্থাপনের একটি মাধ্যম। শুদ্ধ মধ্যমের স্থায়িত্ব এবং কোমল ঋষভের করুণ আবেদন এই রাগকে এক উচ্চতর আধ্যাত্মিক স্তরে নিয়ে যায়। পণ্ডিত ওঙ্কারনাথ ঠাকুর বা ওস্তাদ আমির খাঁ-র মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের কণ্ঠে এই রাগের রূপ যেভাবে ফুটে উঠেছে, তা আজও সংগীত পিপাসুদের কাছে এক পরম সম্পদ। শাস্ত্রীয় সংগীতের জটিল ব্যাকরণ মেনেও কীভাবে হৃদয়ের আর্তি প্রকাশ করা যায়, ভাটিয়ার তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
তথ্যসূত্র:
১. রাগ-বিজ্ঞা – পণ্ডিত বিনায়ক রাও পট্টবর্ধন।
২. ক্রমিক পুস্তক মালিকা – পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখন্ডে।
৩. সংগীত বিশারদ – বসন্ত।
৪. রাগ পরিচয় – পণ্ডিত হরিশ্চন্দ্র শ্রীবাস্তব।
আরও দেখুন:
